বাংলাদেশে যুগে যুগে ভারতের আধিপত্যবাদ, কুৎসিত জঘন্য সাম্রাজ্যবাদ ও * র*- হাসিনার ষড়যন্ত্র আদ্যোপান্ত -১ম পর্ব

0

পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার যে প্রক্রিয়া ১৯৭১ সনে পূর্ণতা লাভ করে তার স্থপতি-কারিগর হচ্ছে ভারত। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্ম লাভের পরপরই ভারতীয় সংবাদপত্র এই মর্মে এক বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা শুরু করে যে পূর্ব পাকিস্তান হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের ‘কলোনী’ এবং উক্ত প্রচারণায় এটাও বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানকে কেবল নিষ্ঠুর রাজনৈতিক শোষণই নয়, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিকভাবেও শোষণ করা হচ্ছে। ঐ বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণাকে আরো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলার জন্যে সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবিরূপী ভারতীয় চর অতি উৎসাহের সাথে উঠে পড়ে লাগে এবং সে কাজে তারা বছরের পর বছর থেকে লেগে থাকে। আর তাদের সেই অতি উৎসাহী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতায় সামিল হয় তখনকার একশ্রেণীর সংবাদপত্র। পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ তাদের প্রচারণায় অতিদ্রুতই কাবু হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ এটা সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করে যে, তাদের সকল ধরণের দুর্ভোগ ও দুঃর্ভাগ্যের জন্য দায়ী হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানীরা। ফলে ষাট-এর দশকের শেষ দিকে উক্ত প্রচারণার শিকার পূর্ব পাকিস্তানীরা এটা বদ্ধমূলকভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, পশ্চিম পাকিস্তানীদের যদি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি থেকে তাড়িয়ে দেয়া যায়, তা হলে পূর্ব পাকিস্তান সোনার বাংলায় পরিণত হয়ে যাবে-যেখানে দুধ ও মধুর নহর বইবে আর তারা তা অবারিতভাবে উপভোগ করবে।
images
উপরিউল্লেখিত বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণার জন্ম দেয়া হতো ভারতের মাটিতে, আর তা পূর্ব পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবিদের নিকট সরবরাহ করা হতো। সেই প্রচারণাকে মোকাবেলার ক্ষেত্রে পাকিস্তানী সংবাদ মাধ্যম অত্যন্ত দূর্বলতার পরিচয় দেয় কিংবা তারা বোকার মতো এক ধরণের আত্মপ্রসাদ-এ তন্ময় হয়ে থাকে। ফলে ১৯৭১ সালে পতন ঘটে পূর্ব পাকিস্তানের; আর সে ধ্বংসাবশেষ থেকে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।

download

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তার স্বাধীনতার ৩৭ বছর পার করেছে। প্রায় ১৪ কোটি মানুষের এই দেশে অতি স্বল্প সংখ্যক মানুষ হয়তো তাদের ভাগ্য গড়ে স্বচ্ছলতা অর্জন করেছে। কিন্তু তাদের অনেকের অবস্থা পূর্বেকার চাইতেও খারাপ হয়েছে। অন্ততঃ ৪ কোটি অবস্থান দ্রারিদ্র সীমার বহু নিচে। শ্লোগানের উচ্ছ্বাস আর উচ্ছাশা এখনও অলীক ও মিথ্যাই রয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে সাহায্য ও ঋণ হিসেবে বাইরে থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যোগান দেয়ার পরও কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন নিঃস্বতর পর্যায়ে পর্যবসিত হয়েছে। স্বাধীনতা লাভকারী পৃথিবীর অপরাপর কোন দেশের ক্ষেত্রে এমন নজীর নেই। এ থেকে এটা সহজেই অনুমেয় যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের যে জিগির তুলে ষাট এর দশক থেকে বিচ্ছিন্নতার বীজ বপণ ও বিচ্ছিন্নতার দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেসব জিগির ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।

রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ নামেমাত্র একটি রাষ্ট্র। বস্তুতঃ গত ৩৭ বছর ধরে দেশটাকে ভারতের একটি জায়গীর হিসেবে পরিচালনা করে আসছে ভারতের এজেন্ট এবং কুইসলিংরা- যারা দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। তাদের একমাত্র বিশ্বাস হচ্ছে দিল্লীতে থাকা তাদের মনিবদের স্বার্থরক্ষা করাই তাদের দায়িত্ব। আমলাদের একাংশ শাসকদের মতই অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজ এবং অত্যন্ত হীনভাবে ভারতের গোলামী করতে একপায়ে খাড়া থাকে।

download

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়োগ করা হয় ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW (Research and Analysis Wing) এর সুপারিশ মোতাবেক। এটা কোন কাল্পনিক বিশ্লেষণ নয়; এটা হচ্ছে অত্যন্ত বাস্তব সত্যি, যা খুব একটা রাখ-ডাক পর্যায়েও নেই।

সাংস্কৃতিকভাবেও ভারত বাংলাদেশের উপর তার আধিপত্য চালিয়ে থাকে। শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দেবত্ববাদী পৌত্তলিক হিন্দু ধর্ম থেকে উৎসারিত ভারতীয় দর্শনের প্লাবন বইছে। অথচ বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষের হৃদয় একশ্বেরবাদী ধর্মে নিবেদিত। উচ্চশিক্ষার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ রাজধানীতে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে ভারতীয় অনুচররা।

১৯৭১ উত্তর সময়ের ছাত্র সমাজের অনেকেই ভারতের বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারনায় প্রভাবান্বিত হয়ে নিজেদের ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা ধর্মনিরপেক্ষতার শ্লোগান দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির দূহিতায় পরিণত হয়, যে সংস্কৃতিতে কোন সুনিদ্দিষ্ট মূল্যবোধ বিধৃত নেই। এদের মধ্যে অনেকে ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবিদের সাহায্য-সমর্থনে ছাত্রদের নেতৃত্বে সমাসীন হয়। এই অতি দক্ষ ও সচতুর ভারতীয় প্রভাব কেবল সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহেই নয়; অপরাপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং প্রকারান্তরে দেশের রাজনীতিতেও তার বিস্তৃতি ঘটে। এই ছাত্র নেতারা তাদের পূর্বসূরী ৭০-৭১ সনে ‘চার খলিফা’ হিসেবে পরিচিতদের ন্যায় অসৎ ও অন্যায় পথে অগাধ বিত্ত-বৈভবেরও মালিক হয়ে যায়। দল মত নির্বিশেষে রাজনীতিবীদরা এই ছাত্রদের সমর্থনের জন্য সর্বাবস্থাতেই উন্মুখ হয়ে থাকে। ১৯৯১ সাল ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সর্বাত্মকভাবে ছাত্রদের সাহায্য-সমর্থন-অংশগ্রহণের বদৌলতে রাজনৈতিক সাফল্য লাভ করেন বেগম খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ, জামাতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও একইভাবে ছাত্রদের হীন আচরণ ও তাদের খেয়াল-খুশী চরিতার্থ করার ক্ষেত্র সৃষ্টি করে দেয় তাদের রাজনীতির লক্ষ্য অর্জনের জন্য। কিন্তু নিষ্ঠুর রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল এই সব ছাত্র নেতারা যেহেতু ধর্ম নিরপেক্ষতার দীক্ষা গ্রহণ করে, সেহেতু তারা মুখ্যতই চায় বাংলাদেশে ভারতীয় আগ্রাসন ও তাদের সংস্কৃতির বিকাশ। তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ৯০ শতাংশের মুসলিম মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক আকাঙ্খার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। বস্তুতঃ ইসলাম ও তাদের সংস্কৃতিকে হেয় ও ধ্বংস করাই হচ্ছে তাদের মূল লক্ষ্য।

১৯৭১ সালে জনগণকে এই মর্মে আশান্বিত করা হয়েছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের জীবন ব্যবস্থারই কেবল উন্নতি হবে না; দেশ হিসেবে বিশ্বের জাতিপুঞ্জের মতো বাংলাদেশেরও থাকবে সার্বভৌমত্ব। কিন্তু গত ৩৭ বছরের ইতিহাস মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে যে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জনগণের জীবনের কোন উন্নতি ঘটেনি। ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে তারা রেহাই পায়নি। এমনকি ভারতের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কের যে চালচিত্র তা থেকে এটা স্পষ্ট যে দেশের সার্বভৌমত্বও বলা যায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং ঘটনা পরম্পরায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে বাংলাদেশের বাজার হচ্ছে ভারতীয় পণ্যের নিকট বন্দী, সংস্কৃতি হচ্ছে ভারতের বৈদিক সংস্কৃতির বর্ধিত রূপ এবং রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভারতের গোলাম-এ। কেউ সরকারে থাকুক কিংবা না থাকুক বাংলাদেশে ভারতের আগ্রাসী প্রয়োজন মেটাতে রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রায় প্রত্যেককে অতি বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাংলাদেশের ভূখন্ড দিয়ে ভারতের অবাধ ট্যানজিট সুবিধা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের ব্যবধান মাত্র। তাদের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে উদ্দিষ্ট অবস্থা সৃষ্টি করতে দিল্লীর শাসকরা তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর মাধ্যমে ভিতর এবং বাইরে থেকে সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়ে থাকে। ভারতের অশুভ খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে তার বন্ধুর দরকার। এটা করার পথে ভারত প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে গিয়ে অনেক জাতি, রাষ্ট্রই ভারতের আগ্রাসী আচরণে বিভিন্নভাবে শরমিন্দা ও বিবৃত হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের সাথে অতীতের বহু নিষ্পন্ন ইস্যু উঠিয়ে প্রায়শই ভারতপন্থী মহল বিষাক্ত প্রচারণার সৃষ্টি করে; যার লক্ষ্য হচ্ছে কোনভাবেই যেন পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে না পারে। এছাড়াও ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো অব্যাহতভাবে সেই পুরনো প্রচারণা চালিয়ে থাকে যে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ ছিল একটা মস্তবড় ভুল; যা থেকে বাংলাদেশ-এর শিক্ষা গ্রহণ পূর্বক বাংলাদেশ যদি ভারতের একটি প্রদেশ-এ রূপান্তরিত হয়, তাহলে দেশটির সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। চাকমা ইস্যুতে ভারতের উস্কানী ও প্রত্যক্ষ মদদ, অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা নির্ধারণে ভারতের অসম্মতি, বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ ভূখন্ড নিয়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের উদ্ভাবিত স্বাধীন বঙ্গভূমির তথাকথিত আন্দোলনে ভারতের প্রত্যক্ষ মদদ ও উস্কানী হচ্ছে বাংলাদেশের ঐক্য, সংহতি ও সার্বভৌমত্ব ধ্বংসকারী ভারতীয় অপতৎপরতার লীলাখেলা। ভারতের নগ্ন আগ্রাসনে বাংলাদেশের অসহায়ত্ব দেশ- বিদেশের সকল মহলের জানা। অনেকেই আজ নিশ্চিত যে ১৯৭১ সনে বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত ভারত আসলে পরেছিল বন্ধুতের ছদ্মাবরণ। সেই বন্ধুত্বের ভেক ধরার পিছনে তাদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিবেচনায় তাদের এক নম্বরের শত্রু পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য তাদের নোংরা চেহারাটা লুকানো। ১৯৭১ সালে তাদের সেই লক্ষ্য অর্জনের পর তারা তার চূড়ান্ত যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ বাংলাদেশকে ভারতের সাথে একীভূত করার লক্ষ্য সাধনে নিজদেরকে নিয়োজিত করে। এ কারণেই একদিনের জন্যও ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের নানাবিধ হীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বন্ধ রাখেনি। তাদের এই অব্যাহত হীন প্রচারণায় বরাবরই পাকিস্তান কর্তৃক তার পূর্বাঞ্চলকে শোষণের সেই পুরনো কেচ্ছা ফাঁদিয়ে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশের কেউ কেউ এই সব প্রচারণায় ভারতের কোন দুরভিসন্ধিপূর্ণ উদ্দেশ্য নেই বলে মনে করে।

বন্ধুরা,  আসুন  সসম্পুর্ণ নির্মোহ নিরপেক্ষ   দৃষ্টি দিয়ে জেনে নেই পূর্ব আর পশ্চিমের পাকিস্তানের আসল বৈষম্য কোথায় ছিল  আর কেনই বা ছিল???

এর পিছনে কি কি যুক্তি আছে?  কেউ কি বাংগালী জাতিকে ভুল বুঝিয়েছে?  আমি আমার দেশ বর্তমানের বাংলাদেশকে আদৌ ছোট করছি না, বাংলাদেশ আমার গর্বের ধন,  বাংলাদেশ আমার প্রিয় জন্মভূমি,  আমি  বরং জন্মভূমির প্রতি ন্যায়বিচার এর স্বার্থে  কালের পরিক্রমায় সত্যি কথাকে এই জাতির সামনে পরিস্কার করতে চাই…! কারন সত্য চিরকালই আনিন্দ সুন্দর .

নিচে ৫ টি পয়েণ্ট এ  পূর্ব – পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে * র * আর ভারতের মিথ্যা  প্রোপাগান্ডার নমুনা দেখুন,  আশাকরি বিবেকের দরজায় আমি কড়া নাড়তে পারবো আজ  :

১. তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ

পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার পিছনে প্রধান যে তত্ত্বকথা ও যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছিল তা ছিল দু’অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষেত্রের দৃশ্যমান বৈষম্য ও বিভিন্নতা এবং পূর্ব পাকিস্তানকে দেখানো হয় পশ্চিম পাকিস্তানী জনগোষ্ঠীর শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন না থাকার বিষয়টিকেও সেই কল্পিত বৈষম্যের প্রচারণার সাথে যুক্ত করা হয়।

আপাতদৃষ্টে বৈষম্যের যে চালচিত্র দেখানো হয়, ষাট-এর দশকের শেষ দিকে প্রাপ্ত কিছু সংখ্যা ও সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে। এর মধ্যে উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের তথা কেন্দ্রীয় সুপিরিয়ার সার্ভিস (সিএসএস) ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কম থাকা। উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে এটাও দেখানো হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় উন্নয়ন খাতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কম অর্থ বরাদ্দ করা। যদিও উপস্থাপিত ঐ পরিসংখ্যান অসত্য ছিলনা; কিন্তু জনগণের সামনে যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং প্রচারণা সেই পরিসংখ্যান নিয়ে চালানো হয়েছে, তা মোটেই সত্যি ও বাস্তব নির্ভর ছিল না। ঐসব পরিসংখ্যানকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও প্রচারণা সর্বোতভাবে সত্যি ছিল না; হয়তো কিয়দাংশ ছিল ব্যতিক্রম এবং তাও ছিল অর্ধ সত্য।

সীমারেখা

কোন ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ কখনও করা সম্ভব নয়, যদি সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর ব্যাপক তথ্যপঞ্জী নির্দেশিত না হয়; বিশেষত যথার্থ ও বাস্তব সীমারেখা র্নিনীত না হয়। আসলে বিশ্বাসযোগ্য কোন বিশ্লেষণ এক দেশদর্শী দর্শন দিয়ে সম্ভব নয় এবং সম্ভব নয় কোন শুন্যতার মধ্যেও। দুর্ভাগ্যবশতঃ পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করার পুরো থিসিসটাই এর উদগাতারা প্রণয়ন করে ব্যাপক ভিত্তিক কোন তথ্যপঞ্জী নির্ভর সীমারেখা ছাড়াই। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ছিল বাস্তবে দুটি অসম ভৌগলিক অবয়ব। কিন্তু ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান হবার সময় এই দুটি অসম ভৌগলিক অবয়বকে অস্বীকার করে দুটির সামগ্রিক কাঠামোর সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান- যা ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলা নামে পরিচিত ছিল এবং যা তদানীন্তন ভারতের যে কোন অঞ্চলের চাইতে ছিল পশ্চাদপদ, যা কারুরই অজানা থাকার কথা নয়। পূর্ব পাকিস্তানের নতুন রাজধানী ঢাকার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী, লাহোর ও অন্যান্য শহরের একটি তুলনা করতে গিয়ে এক সময়ের পূর্ব বাংলা সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক-লেখক এইচ.এম আব্বাসী লিখেন: ‘ঢাকা যখন রাজধানীতে পরিণত হয় তখন সেখানে মুসলমান কিংবা হিন্দু মালিকানায় একটি সংবাদপত্রও প্রকাশিত হতোনা।

azad-1

মাত্র ৫ ওয়াটের একটি রেডিও ষ্টেশন ছিল এবং বেশ কয়েক বছর সময় লাগে সেখান থেকে বাংলা দৈনিক আজাদ ও ইংরেজী দৈনিক মনিং নিউজ প্রকাশনা শুরু হতে। আমার একটা বড় দায়িত্ব ছিল পত্রিকার ছবি ব্লক করে করাচী থেকে বিমান যোগে তা ঢাকায় প্রেরণ করা যা নতুন ইংরেজী দৈনিক অবজারভার-এ প্রকাশিত হতো অর্থাৎ ঢাকায় ব্লক বানানোর কোন মেশিনও ছিল না। [এইচ,এম, আব্বাসী (অনলুকার-এ জার্নালিষ্ট), ওভার এ কাপ অব টী, মাশহুর অফসেট প্রেস, করাচী, ১৯৭৪ পৃ : ৪৬২]

এটা রীতিমত অবিশ্বাস্যকর। পূর্ব পাকিস্তান তার জীবন শুরু করে বলা যায় সম্পূর্ণ পথ হাতড়িয়ে, অর্থনৈতিক ও শিল্প ক্ষেত্রে প্রদেশটির কোনই অবকাঠামো ছিল না। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান ছিল মোটামোটি শিল্প সমৃদ্ধ এবং ছিল সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অব কাঠামো। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে সর্ব বিবেচনায় পশ্চিম পাকিস্তান ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় অনেক অগ্রসর।’

২.** বিবেচনার ভিত্তি সাল-১৯৪৭ **

১৯৪৭ সালের বাস্তব চিত্র কি ছিল? পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশের জনগনই ছিল গরীব। বৃটিশ যুগের পূর্ব বাংলায় বসতি স্থাপনকারীদের জীবনের মান ছিল অতি নীচে। এর সুস্পষ্ট কারণ ছিল পূর্ব বাংলা বৃটিশদের কলোনী হিসেবে শোষিত ও নিগৃহীত হয়েছে ১৯০ বছর তথা ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত।

download (1)
পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তান অঞ্চলে বৃটিশদের কলোনী ও শোষণের সময়কাল ছিল ৯০ বছর। প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৮৫৮ সালে বৃটিশ রাণী ভিক্টোরিয়া পুরো ভারতের কর্তৃত্ব গ্রহণের পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। এটা মোটেই অবিশ্বাস্য নয় যে, বৃটিশদের শাসনামলে পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক বেশী শোষিত ও নিগৃহীত হয়েছিল। বিদেশী শাসন-শোষণ ছাড়াও পূর্ব বাংলার জনসাধারণ তাদের স্বদেশীদের দ্বারাও বৃটিশ শোষণ থেকে কম নির্যাতিত ও শোষিত হয়নি। জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ভূমির প্রায় নিরঙ্কুশ মালিকানা ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের। ১৯৪৭ সাল নাগাদ তারা ৮০ শতাংশ ভূমির মালিক ছিল। [ঐ পৃ: ৪৬১ পোট্রেট অব এ মার্টায়ার জাইকো পাবলিশিং হাউস, বোম্বে, ১৯৬৯ বইতে বি, মাধোক তা উদ্ধৃত করেন]

এই পরিসংখ্যান কোন কল্পিত কিছু নয়। এটা সেই সময়কার হিন্দু মহাসভার নেতা ডা. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর প্রদত্ত তথ্য থেকেই পাওয়া যায়। বৃটিশ শাসনামলে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস সহ কোন উচ্চ শিক্ষা সম্পর্কিত পেশায় প্রবেশের সুযোগ ছিল না এবং সেনাবাহিনীতে ছিল একেবারেই নগন্য সংখ্যক পূর্ব বাংলার মুসলমান।

১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের পরঃ

PolashiBG_713978079

রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কিত বিষয়াদি পূর্ব বাংলার জন্য কোন অকস্মাৎ ঘটনাপ্রবাহ ছিলনা। বস্তুতঃ এটা ছিল এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া- যার পূর্ণতা রূপ লাভ করে ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে পূর্ব বাংলায় মুসলিম শাসনের পতন ও অবক্ষয়ের সূচনা করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি তারা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাও হারায়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জীবনে চরম দুরাবস্থা ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এক সময়ের খাজনা আদায়কারীরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবাধে রাতারাতি স্থায়ী জমিদারে পরিণত হয়। তারা বছর প্রতি অতি নগণ্য পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে প্রচুর ভূ সম্পত্তির মালিক বনে গিয়ে সামন্ত প্রথার দ্বারা গরীব কৃষকদের জীবনে অবৈধ শোষক-এর স্থান লাভ করে। এই নতুন ভূ-সম্পত্তির মালিক শ্রেণী ছিল হিন্দুরা। তারা পূর্ব বাংলার কৃষকদের নিষ্ঠুরভাবে শোষণ করে। কৃষকদের মধ্যে বিশেষত ছোট-খাট ভূ-সম্পত্তির মালিকদের মধ্যে বিরাট অংশ ছিল মুসলমান যারা অল্পকালের মধ্যেই তাদের ভূ-সম্পত্তি হারিয়ে জমি হারা সাধারণ কৃষকে পরিণত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রায়ত (সাধারণ মানুষ) দেরকে জমিদারদের শোষণ নির্যাতন থেকে রক্ষার কোন ব্যবস্থাই রাখেনি। যার ফলে পূর্ব বাংলার কৃষকরা মারাত্মক শোষণ ও নির্যাতনে সর্বশ্রান্ত হয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে স্থাপিত ঋণ সালিসী বোর্ড তাদের এই দুরাবস্থা নিরসনে কিছুটা স্বস্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

১৯৪৭ সালে তুলনামূলকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাল অবস্থা

বৃটিশ শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের ভূমি ভোগদখল ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সেখানে পূর্ব থেকেই একটি শক্তিশালী সামন্ত শ্রেণী ছিল, যারা সেখানকার কৃষক সম্প্রদায়কে নানাবিধভাবে শোষণ করতো। তবে সেখানকার কৃষক সম্প্রদায়ের কিছুটা অনুকূল অবস্থাও ছিল। তাদের জীবন ব্যবস্থায় ছিল অত্যন্ত গতিময়তা। ফলে কোন এলাকা তাদের জীবন-ধারণের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠলে তারা নতুন চাষযোগ্য ও চারণ ভূমিতে স্থানান্তরিত হতে পারতো; কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষক সম্প্রদায় সেখানকার সামন্ত শ্রেণীর শোষণ পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক সম্প্রদায়ের তখানকার জমিদার শ্রেণীর শোষণের চাইতে কমই ভোগ করতো। অর্থাৎ বৃটিশ শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েক সম্প্রদায় পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক সম্প্রদায়ের চাইতে অর্থনৈতিকভাবে ভাল অবস্থায় ছিল।

৩.সেনাবাহিনীতে  পূর্ব পাকিস্তানীদের কম প্রতিনিধিত্ব থাকার পটভূমি

3f1c5364dd5b147b81f9ab405fab241d_XL

কথিত বৈষম্যের প্রমাণ হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানীদের কম প্রতিনিধিত্বের অভিযোগ ছিল তখনকার সময়ে একটি জনপ্রিয় শ্লোগান। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩ লক্ষ সদস্যের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। এই সংখ্যা দেশের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য চিত্রিত করে। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবানুগভাবে বিষয়টির মূল্যায়ন করতে হলে কেহই ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনীতে বাংলাভাষী মুসলমান সৈনিকদের সংখ্যা কত ছিল এই হিসাবের দিকে অবশ্যই দৃষ্টিপাত করবে। পাকিস্তানের শুরুতে ফেডারেল সেনাবাহিনীতে বাংলাভাষী মুসলমান সৈনিকের সংখ্যা ছিল শ’কয়েক বা কোন অবস্থাতেই এক হাজারের বেশী নয়।

সেনাবাহিনীতে বাংলাভাষী মুসলমানদের সংখ্যা অতি নগণ্য হওয়ার ঐতিহাসিক কার্যকরণ রয়েছে। বৃটিশ আমলে বাংলাভাষী মুসলমানদেরকে সেনাবাহিনীতে নেয়া হতোনা। আবার বাঙালি মুসলমানরাও বৃটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে খুব একটা যেতোনা। সেনাবাহিনীতে বাঙালি মুসলমানদের এমনিতর দূরাবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হেতুই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাঙালি তথা বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তানীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করে সেনা সার্ভিসে তাদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য অনুরোধ জানান। যাই হোক, পাকিস্তানের ২৩ বছরে এক হাজার বাঙালি থেকে সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাজার-এ, যার বৃদ্ধি সূচক হচ্ছে চার হাজার শতাংশ। এই তুলনায় সেনাবাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির হার ছিল অনেক কম। ঐ সময়ে ৫০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানী সেনা সদস্য বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭১ সনে দাঁড়ায় ২,৬০,০০০ যার বৃদ্ধিসূচক হচ্ছে ১২০০ শতাংশ। অর্থাৎ তুলনামূলক বিবেচনায় সেনাবাহিনীতে অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ২৮০০ শতাংশ বেশী। বিভিন্ন প্রমাণাদিতে দেখা যায় যে সেনাবাহিনীতে চাকরী নেয়ার ব্যাপারে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি বরাবরই কাজ করতো। ফলে দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশ হওয়া সত্ত্বেও সেনাবাহিনীতে তাদের তেমন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ছিলনা। ১৯৪৮ সালের হিসাব মতে সেনাবাহিনীতে চাকরীর জন্যে পশ্চিম পাকিস্তানী প্রার্থী ছিল ২৭০৮ জন; আর পূর্ব পাকিস্তানের আবেদনকারী প্রার্থী ছিল মাত্র ৮৭ জন; অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানী প্রার্থী ছিল ৩০০ ভাগ বেশী। ১৯৫১ সালে সেনাবাহিনীতে চাকুরী প্রার্থী পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা ছিল ১৩৪ আর পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা ছিল ১০০৮ জন। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা একটু বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৬৫ জনে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যা ছিল ২০০ গুণ বেশী অর্থাৎ ৩২০৪ জন। আবেদনপত্র দাখিল কিংবা সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার ক্ষেত্রে কোন বৈষম্য কিংবা ডিসক্রিমিনেশান থাকার গালগল্প হয়তো কেউ দাঁড় করাবেন, যা কিছুতেই প্রমাণযোগ্য নয়।

এটা অবশ্যই সবার জানার কথা যে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে দরকার কঠোর ও অব্যাহত প্রশিক্ষণ যা দিন কয়েক এবং মাস কয়েকের ব্যাপার নয়। পৃথিবীর কোন দেশের পক্ষেই জেনারেল এর চাইতে অনেক নিচের একজন সেনা অফিসারকেও ২৫ বছরের কমে তৈরী করা সম্ভব নয়। ১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের দুই জন অফিসারের নাম উল্লেখ করার মত হয়ে উঠে এর একজন ছিলেন কর্ণেল ওসমানী এবং আর একজন ছিলেন মেজর গনি। অথচ ঐ সময়ের মধ্যে পাঞ্জাব ও পাঠানদের মধ্য থেকে বহু সৈনিক জেনারেল পদে পর্যন্ত উন্নীত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি পদে কর্মরত থাকাকালে আইয়ুব খান ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জনেচ্ছু ছাত্রদের এক সমাবেশে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হবার আহবান জানান। কিন্তু তাদের নিকট থেকে তেমন উৎসাহব্যাঞ্জক সাড়া পাওয়া যায়নি। এর পরের দুই বছরের পরিসংখ্যানে তা স্পষ্ট। ১৯৫৬ সালে সেনাবাহিনীর অফিসার পদে আবেদনকৃতদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিল মাত্র ২২ জন; অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছিল ১১০ জন। ১৯৫৭ সনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আবেদন করার সংখ্যা ৮০ শতাংশ উন্নীত হয়ে দাঁড়ায় ৩৯ জনে, অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আবেদনকারীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ থেকে ২৯৪-তে। [এইচ,এ, রিজভী, মিলিটারী এন্ড পলিটিক্স ইন পাকিস্তান, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, লাহোর (পাকিস্তান), ১৯৭৬ (দ্বিতীয় সংস্করণ) পৃ: ১৮১-৮২]

পাকিস্তান সৃষ্টির ১০ বছর পরও সেনাবাহিনীতে চাকরী নিতে বাঙালি মুসলমানরা ছিল অত্যন্ত লাজুক ও পশ্চাৎমুখী। অথচ ঐতিহ্যগতভাবে যোদ্ধার জাত পাঞ্জাবী, পাঠান আর বেলুচীরা সেনাবাহিনীর চাকরীর প্রতি ছিল অত্যন্ত আগ্রহী। বস্তুতঃ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বৃটিশ শাসনের শুরু থেকেই তারা পেশাগতভাবে সেনাবাহিনীর চাকরী গ্রহণে করাতে উৎসাহ জ্ঞাপন করে। সশস্ত্র বাহিনীর চাকরীতে ২৩ বছর ধরে বাঙালি মুসলমানদের অনুৎসাহিত করা কিংবা পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়া হয়ে থাকলে গত ৩৭ বছরেরও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম সংখ্যক অবস্থায় যেতে পারলনা কেন ? ১৯৯৬ সনে পাকিস্তানের জনসংখ্যা যখন ১৩ কোটি তখন সেখানকার সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল যখন ৬ লক্ষ অথচ বাংলাদেশের সেনা সদস্য সেই সময় ছিল বড় জোর এক লক্ষ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের সম্পদ দ্বারা প্রচুর অস্ত্র-সস্ত্র সংগ্রহ এবং আনবিক সামর্থ্যরে অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন সামরিকভাবে এত পিছনে পড়ে থাকলো? ৩৭ বছর পরও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৬ ভাগের একভাগে পর্যবসিত হয়ে থাকলো? এছাড়াও বাংলাদেশের আণবিক শক্তি অর্জনের লক্ষ্য হয়তো আরো বহু দিন ধরেই তিমিরে থেকে যাবে। উল্লেখ্য যে ষাট দশকের ৬-দফা দাবীর সেই ফুলঝুরির কি হলো -যে দাবী নামাতে ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধে পূর্ব পাকিস্তানের পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও শক্তিশালী মিলিশিয়া গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল ?
এটা কি সত্যি নয় যে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে ভারত কেবল ভয় দেখিয়েই বাংলাদেশের উপর কর্তৃত্ব করে চলছে। কেন বাংলাদেশ ৩৭ বছরেও ভারতের হুমকি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও তেমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মত সম্পদ ও সামর্থ বাংলাদেশের নেই। এটা আজ কোন অবস্থাতেই কোন গোপন তথ্য নয় যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যা কিছু সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে তার মধ্যে বিরাট অংশ পাকিস্তান থেকে এসেছে প্রায় বিনা পয়সায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের সামরিক শক্তির সামনে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে।

৪. পূর্ব পাকিস্তানে দক্ষ সেনাবাহিনী গড়ে  তোলার সম্পদ ও ভিত্তি 

** কঠিন বাস্তবতা বরাবরই নির্জলা সত্যকে উদঘাটন করে। **

বাস্তবে বাংলাদেশের রয়েছে সম্পদ সংকট। যার দরণ দেশটির পক্ষে নাগরিকদের জন্য ন্যুনতম পুষ্টির যোগান, স্বাস্থ্যখাতে নাগরিকদের মৌলিক সেবা প্রদান, এমনকি প্রাইমারী পর্যায়ের স্কুল-বয়সী শিশুদের শিক্ষাক্রম চালনাও সম্ভব হয়না। এই যেখানে বাংলাদেশের অবস্থা সেখানে পশ্চিম পাকিস্তান এই অভাবক্লিষ্ট দেশ থেকে কি সম্পদ লুট করেছে?

বস্তুতঃ ষাট এর দশকে তারস্বরে চালানো বৈষ্যম্যের প্রচারণা ও পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করার অভিযোগ ছিল নিদারুণ প্রবঞ্চনা ও প্রতারণামূলক। সে কারণে প্রখ্যাত বৃটিশ ঐতিহাসিক যিনি ভারতে মোঘল শাসনের ইতিহাসের অন্যতম বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য, সেই প্রফেসার এল এফ রুশব্রুক উইলিয়াম তার লিখিত দি ইস্ট পাকিস্তান ট্রাজেডী [এল,এফ, রুশব্রুক উইলিয়াম, দি ইষ্ট পাকিস্তান ট্র্যাজেডী টম ষ্ট্যাসি লিঃ, লন্ডন, ১৯৭২, পৃ: ২২] বইয়ে বেশ বাগ্মীতার সাথেই প্রশ্ন করেছেন যে পাকিস্তান যুগের ইতি হওয়ার পরও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ কিংবা শেখ মুজিবের সোনার বাংলা কেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য দু-স্বপ্নই রয়ে গেল? বস্তুতঃ এটা পাকিস্তানের তথাকথিত শোষণের জন্যে নয়; এর কারণ ইতিহাস বিধৃত যৌক্তিকতার মধ্যেই নিহিত। আসলে পূর্ব পাকিস্তান ২৪ বছর ধরে সর্বক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক অনগ্রসর ছিল। ১৯৭১ এর পরও দেশটির আর্থিক অবস্থা এবং বিভিন্ন ধরণের আভ্যন্তরীণ শোষণ-এর তেমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বাংলাদেশ কেবল যে পরিবর্তনটি দেখাতে পারে তাহলো দেশটির পতাকা; কিন্তু তার মধ্যে এমন কিছু পরিস্ফুট করানোর চেষ্টা করা হয়েছে যা দেশের বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী। সাধারণ মানুষের ভয়াবহ দরিদ্রতা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ইনস্টিটিউটের আশির দশকের এক জরীপ মতে দরিদ্রসীমার নীচে দেশটির ৭৬ শতাংশ মানুষের অবস্থান। [কে, আহমেদ এন্ড এন, হাসান (ইডি), রিপোর্ট অব দি নিউট্রিশান সার্ভে অব ১৯৭৫-৭৬ এন্ড ১৯৮১-৮২, ইনষ্টিউটিউট অব ফুড এন্ড নিউষ্ট্রিশান, ইউনির্ভাসিটি অব ঢাকা, ১৯৮৩ পৃ: ১৫, ২৮ ও ২০০৫] এর সাথে যোগ হবে দেশে অবস্থানকারী আড়াই লক্ষ দুভার্গ্যপীড়িত আটকে পড়া পাকিস্তানীদের নিগ্রহের জীবন; যারা গত ৩৭ বছর ধরে বন্দী শিবিরে মানবেতর জীবন নির্বাহ করছে। আরো লক্ষ লক্ষ বস্তিবাসী একইভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে দেশের সকল শহরাঞ্চলে, যাদের সংখ্যা এক মাত্র ঢাকা নগরীতেই ৩৫ লক্ষ বলে ধারণা করা হয়। যদিও অতি ক্ষুদ্র একটি স্বচ্ছল অংশের অভ্যুদয় বাংলাদেশে ঘটছে, কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্টীর মাথাপিছু আয় পাকিস্তানীদের মাথাপিছু আয়ের প্রায় অর্ধেকে পর্যবসিত হয়ে আছে। ১৯৯৬ সালের এক পরিসংখ্যান মতে বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ছিল ২২০ ডলার আর পাকিস্তানীদের ছিল ৪৪০ ডলার।

অথচ সেই সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২৫ বছরে পাকিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বাংলাদেশের (২.২%) চাইতে বেশী (২.৪%)। অতি ন্যুনতম মুজুরীতে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক দেশ ও বিদেশে কাজ করছে। বিশ্বের শ্রম বাজারে বাংলাদেশের শ্রম হচ্ছে সব চাইতে সস্তা। পাকিস্তানের করাচীতে প্রায় ১৫ লক্ষ অবৈধ বাংলাদেশী বিভিন্ন ধরণের বিদঘুটে পেশায় অতি অল্প মুজুরীতে দিনাতিপাত করছে।

কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস-এ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে

কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ-এর সম্মিলিত প্রতিনিধিত্বের চাইতে অনেক কম। এর পাশাপাশি আর একটি বাস্তবতা ছিল পাঞ্জাবী নয়, পশ্চিম পাকিস্তানীদের এমন প্রতিনিধিত্বের সংখ্যাও ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা তথা বাঙালি, সিন্ধী, পাঠান ও বেলুচীদের ঐতিহাসিক অনগ্রসরতারই ফল। পাঞ্জাবে বসতি গড়া ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম মোহাজেররা ছিল পূর্ব বাংলা, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের জনগোষ্ঠীর চাইতে পড়ালেখায় অনেক অগ্রসর। শিক্ষা-দীক্ষায় শেষোক্ত জনগোষ্ঠীর তুলনামূলক অনগ্রসতার কারণ ছিল অর্থনৈতিক এবং কিছুটা সামাজিক। বস্তুতঃ পূর্ব বাংলা, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের মুসলমানরা উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করে বিংশ শতাব্দীর প্রথম সিকিতে। কিন্তু পাঞ্জাব ও অন্যান্য অঞ্চলের মোহাজের মুসলমানরা আধুনিক উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের বলা যায় পর পরই। অর্থাৎ তারা পাকিস্তানের অপরাপর অঞ্চলের মুসলমানদের চাইতে শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল ৭০ থেকে ৮০ বছরের অগ্রে। এর প্রধান কারণ ছিল উনবিংশ শতাব্দীর ৭০ এর দশকে স্যার সৈয়দ আহমেদেরর নেতৃত্বে আলীগড়ে প্রতিষ্ঠিত এঙ্গলো মহামেডান কলেজ ভারতের বধিষ্ণু অঞ্চলের মুসলমানদেরকে উচ্চ শিক্ষায় আকৃষ্ট করে তোলে। পাশাপাশি লাহোর সরকারী কলেজ এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বহু আগে। ১৮৫৭ সালে স্থাপিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেগুলোতে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা ছিল অনুল্লেখ্য; এমনকি ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুখ্যত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও মুসলিম ছাত্র ও শিক্ষকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষকরা ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে কেবল ১৯৪৭ সালের পর, যখন পূর্ব বাংলার মুসলমানরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও শিক্ষকতার ফুরসত পায়। সত্যিকার অর্থে শিক্ষা-দীক্ষায় বাংলার মুসলমানদের অনগ্রসরতার কারণেই বৃটিশ যুগের ভারতীয় সিভিল সার্ভিস তথা আইসিএস-এ কোন বাঙালি মুসলমানের ঢোকার যোগ্যতা ছিলনা; যদিও উক্ত সার্ভিস ১৮৫৩ সালের অধ্যাদেশ বলে ১৮৫৪ সালে প্রবর্তিত হয়েছিল। [আলী আহমেদ রোল অব হায়ার সিভিল সার্ভিস ইন পাকিস্তান, লাহোর, পৃ: ৩৫]

ফলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের প্রশাসন পায় মাত্র ১০০ জন প্রাক্তন আইসিএস অফিসার আর ভারত পায় ৫০০ জন। প্রাপ্ত ১০০ জনের মধ্যে একজনও বাঙালি কিংবা পাকিস্তানের অন্যান্য অনগ্রসর এলাকার ছিল না।

ঐ ১০০ জনের মধ্যে কেউ কেউ ছিল বৃটিশ বংশোদ্ভুত মুসলমান, কেউ ছিল শিক্ষায় অগ্রসর ভারতের অপরাপর এলাকার মুসলিম জনগোষ্ঠীভূক্ত। সঙ্গত কারণেই তারা ছিল পাঞ্জাব বা ইউপি’র মুসলমান। পাঞ্জাব ও ইউপি’র মুসলমানদের অগ্রসরতা আর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অনগ্রসরতার আরো প্রমাণ আছে। ১৮৮৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় আইসিএস অফিসারদের মধ্যে পাঞ্জাবের ছিল তিন জন মুসলমান, শিখ ছিল দুই জন এবং হিন্দু ছিলনা একজনও; এমনকি মুসলমান সংখ্যালঘিষ্ঠ এলাকা অযোধ্যার ৫ জন মুসলমান ছিল আইসিএস আর তার বিপরীতে ছিল ছয় জন হিন্দু। অথচ বাংলা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও মাত্র দুই জন মুসলমান ছিল আইসিএস, আর ৯ জন ছিল হিন্দু। [ঐ পৃ: ৪৫]

কিন্তু সে সময়ে দুইজন বাঙালি মুসলমান আইসিএস এর পরিসংখ্যান পাওয়া গেলেও তাদের মূল আবাস বা ঠিকানার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। তবে এটা মোটামোটি বলা যায় যে, তারা কেউ পূর্ব বাংলার বাসিন্দা ছিলনা। এবং এটাও অনেকটা নিশ্চিত যে তারা হয়তো বাংলাভাষী মুসলমানও ছিলনা। সেই সময়কার বাংলার শিক্ষিত মুসলমান পরিবারসমূহ যেমন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর পরিবার কখনও নিজেদেরকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতনা। হয়তো ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান বলে পরিচয় দেওয়াটা ছিল মর্যাদা হানিকর।

৫.বৈষম্যত্বত্ত্বের জন্ম দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানকে ভাঙ্গার জন্যে

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের প্রকৃত যে পরিসংখ্যান (যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারণামূলক বলে প্রমাণিত হয়) তাতে উন্নয়নের যে গতি ছিল তা অব্যাহত থাকলে বৈষম্য সত্ত্বর বিদূরিত হয়ে দুই অংশের অর্থনৈতিক অবস্থা সমান রূপই পরিগ্রহ করতো। সে হিসেবে পাকিস্তান অবিচ্ছিন্ন থাকলে এত দিনে শুধু যে ১২৫ কোটি মুসলিম উম্মার নেতৃত্বেই দেশটি অভিষিক্ত হতো তাই নয়; বিশ্বের অন্যতম বৃহৎশক্তি হিসেবেও পাকিস্তান আবির্ভূত হতো। পাকিস্তানের তেমন সম্ভাবনাই ছিল ভারত ও ইহুদী চক্রের (যারা পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার কাজে সর্বমূখী মদদ যুগিয়েছিল) চক্ষুশুল। তারা দ্রুত গড়ে উঠা মুসলিম শক্তি পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য সকল ধরণের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতায় লিপ্ত হয়।

ভারত, বৃটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকার এক বৃহৎ শ্রেণী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে একাত্ম হয়। তবে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে অন্যদের স্বার্থ যতটুকু ছিল তার চাইতে বেশী স্বার্থ ছিল ভারতের। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ-এ পর্যবসিত করার ভারতীয় স্বার্থ ছিল বৃহত্তর ভারতের সাথে তাকে যুক্ত করা, যা তাদের ভূতপূর্ব নেতারা তথা নেহেরু, শ্যামা প্রসাদ, প্যাটেল প্রমুখ চেয়েছিলেন।

যখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান গোটা পাকিস্তানের প্রায় সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ছিল সমান অংশীদার ঠিক তখনই পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনী আখ্যায়িত করার প্রচারণা শুরু করে ভারতীয় যড়যন্ত্রের নীল নকশা বানানোর অপতৎপরতা শুরু হয়। এই অপতৎপরতার অংশ হিসেবেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মত লোকের মুখ দিয়ে বলানো হয় যে ১৯৫৬ সালেই পূর্ব পকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন ছিল ৯৮ ভাগ। যদিও সে সময়ের পূর্বেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়া হয় এবং ১৯৫৬ সালে প্রবর্তিত হয় জনপ্রিয় সংবিধান, যাতে দুই পাকিস্তানের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। অথচ দুই অংশের মধ্যকার মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়েই তথাকথিত স্বায়ত্বশাসনের দাবীর আবডালে ভারতীয় ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সর্বমূখী অপতৎপরতা সেই সময় চালানো হয়। পাকিস্তান শুরুর কয় বছর পাকিস্তান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কখনও বাংলা ভাষার মর্যাদা বা ব্যবহার হুমকির মুখে ছিল না। কিন্তু স্বায়ত্বশাসনবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সুযোগ পেলেই মীমাংসিত বিষয় নিয়ে হৈ হল্লা করতো। আজকের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটা যদি কেউ করে যে ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান যদি পাকিস্তানের কলোনী হয়ে থাকে তাহলে আজকের দুই হাজার খৃস্টাব্দের প্রথম দশকে বাংলাদেশ কাদের কলোনী ? ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত বলেছেন যে বাংলাদেশ হচ্ছে আজ ভারতীয় পণ্যের অবরুদ্ধ এক বাজার। তথাকথিত পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ১৯৭১ সালে অবসান ঘটার পর অতিবাহিত গত ৩৭ বছরেও কেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র আজও পাকিস্তানের পশ্চাতে রয়ে গেছে ?

যে কেহ এমন প্রশ্ন কি করতে পারে না যে আজ  ৪৪  বছর আগে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুট করার পথ বন্ধ হয়ে যাবার পরও নব্বই এর দশকের শেষের দিকে কিভাবে পাকিস্তান এটম বোমা বানালো ? বাংলাদেশ কেন অন্তত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমকক্ষ বা কাছাকাছি সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারলোনা; যা তার অন্তর্জাতিক সীমান্তকে অনেক বৃহৎ ভারতের সম্ভাব্য সেনা আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে পারে? কেননা ১৯৭১ এর পূর্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের কম প্রতিনিধিত্বে ক্ষুদ্ধ ও ব্যথিত হয়েছিল বাঙালি নেতারা। আজ ৪৪ বছরে বাংলাদেশ কোথায় এগিয়ে?  বাংলাদেশের কি পারমাণবিক বোমা আছে?  বাংলাদেশে কি বিশ্বখ্যাত  গোয়েন্দা বাহিনী আছে?  বাংলাদেশে কি বিশ্বখ্যাত সমর শক্তিতে ভরপুর সেনাবাহিনী আছে???

বরং ভারত বরাবরই বাংলাদেশককে একটি নিম্নতর  অংগরাজ্য হিসেবেই ধর্ষন  করেই চলেছে, এই ধর্ষন হচ্ছে বিবেকের ধর্ষন,  এই ধর্ষন  হচ্ছে উন্নয়নের ধর্ষন,  এই ধর্ষন হচ্ছে  পৃথক জাতিসত্তার ধর্ষন।  এই ধর্ষন হচ্ছে স্বাধীকারকে ধর্ষন।  আমাদের বিবেক কি আজো ঘুমিয়েইই আছে??

কেবলমাত্র অর্থনীতিই নয়; বাংলাদেশে ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক প্রভূত্বগিরি এত তুঙ্গে পৌঁছেছে যে, ঢাকার সরকার সর্বদাই কম্পমান থাকে যে তাদের কোন কাজ বা কথাবার্তা দিল্লী সরকারকে বিরক্ত করে কিনা।
পাঠক বন্ধুগন,  আসুন আজকাল জংগী জংগী বলে গলা ফাটিয়ে বাকশালীদের গলায় ক্যান্সার হবার জোগাড়,  সেই ক্যান্সার চিকিৎসায় তাসলিমা আবার অতিরিক্ত  সিফিলিস,  গাফফার  চৌ গনোরিয়া আর শাহবাগী ইমরান আবার  এইডস এর উপশম নিয়ে মমাতামাতি। আসলে এরাই এক একটা  ক্যান্সার।  এদের  গলায় চলে বিদ্দেষী নষ্ট পঁচা গাঁজাখুরি কথা যা শুনে পাগলেও হেসে কুটি কুটি।

চলবে………………………

লেখকঃ ডঃ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

সম্পাদনাঃ মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম। যুক্তরাজ্য।