বাংলাদেশের গুমের ঘটনাবলী ‘গুরুতর উদ্বেগের বিষয়’ -আল জাজিরা নিউজ

0
  • User Ratings (0 Votes) 0
    Your Rating:
Summary

কিছু মানুষ ফিরে আসলেও  গত ৪ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে নিখোঁজ সাবেক রাষ্ট্রদুত মারুফ জামান সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের একের পর এক  অন্তর্ধান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি  ধারাবাহিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে।

Awesome

বাংলাদেশের গুমের ঘটনাবলী  ‘গুরুতর উদ্বেগের বিষয়’ -আল জাজিরা নিউজ

মূল সংবাদ: আল জাজিরা নিউজ(Al Jazeera News), লেখক: ফয়সাল মাহমুদ(Faisal Mahmud), অনুবাদ: অবরুদ্ধ গণতন্ত্র(Impresoned Democracy)

অবরুদ্ধ গনতন্ত্র

জিসাফো ডেস্ক : দির্ঘ এক মাসের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ এক শিক্ষক বাড়ী ফিরে আসার পর বলেন  “ঢাকার শহরের  ব্যস্ততম একটি  সড়ক থেকে  অজ্ঞাত অপহরণকারীরা গত মাসে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় ।”

গত শুক্রবার মুক্তি পাওয়া নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির  রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বের হাসান(৭ নভেম্বর ২০১৭ অপহৃত)বলেন, অপহরনের একটি বাসায় নিয়ে চোখ বাধা অবস্থায় সূর্যের আলো বিহিন একটি রুমে ৪৪ দিন আটক রাখে তাকে অপহরন কারিরা।তারপর গত গত শুক্রবার পুনরায় চোখ বাধা অবস্থায় একটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে রাজধানী ঢাকার অদুরের একটি মহাসড়কে নামিয়ে দিয়ে বলে “সোজা হেটে চলে যান, পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করবেন না, যদি আপনি পিছনে তাকান,  আমরা আপনাকে হত্যা করবো” ।

শুক্রবার সন্ধ্যায় মুক্তি পাওয়ার পর ১২ ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের সাক্ষাতে হাসান জানান, ” দির্ঘ দিন পর প্রথমবার দিনের আলো দেখতে পাচ্ছি আমি “

হাসান অপহরণওমুক্তি ঘটনা এবং ঢাকা ভিত্তিকপত্রিকার রিপোর্টার উৎপল দাশ(দির্ঘ ৭১ দিন বন্দি থাকার পর হাসান ফিরে আসার মাত্র দুই দিন আগে মুক্তি পায়) অপহরণওমুক্তি ঘটনায় যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

দাশের বর্ননা মতেও প্রাকাশ্য দিবালোকে  চার বা পাঁচ “অজ্ঞাত অপহরণকারী” ঢাকার একটি সড়ক থেকে তাকে গাড়ীতে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং মুক্তি দেওয়ার সময় চোখ বাধা অবস্থায় একটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে রাজধানী ঢাকার অদুরের একটি মহাসড়কে নামিয়ে দিয়ে যায়।

চৈতন্য হীনতা

হাসানের বর্ননায়, অপহরণকারীদের একজন তার চোখে কিছু ঘষে দেওয়ার পরপরই  চেতনা হারিয়ে ফেলেন তিনি, অপর দিকে দাশের বর্ননায়, একটি কালো কাপড়ে দিয়ে তার মুখ মন্ডল মুড়ে দেওয়া হয় তাতে অপহরনকারিদের সনাক্ত করনে অপরাগ হয়ে পরে সে।

কিছু মানুষ ফিরে আসলেও  গত ৪ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে নিখোঁজ সাবেক রাষ্ট্রদুত মারুফ জামান সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের একের পর এক  অন্তর্ধান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি  ধারাবাহিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত এবছরের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে আজ অবধি  বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শত শত লোককে অবৈধভাবে আটক রেখেছে  এবং কেবল গত বছরেই  “বলপূর্বক অন্তর্ধানের শিকার” হয় ৯০ জন।

গুমের ঘটনাবলী সম্পর্কে যথেষ্ট নথি ও রিপোর্ট সংগ্রীহিত থাকা সত্বেও সরকারের অবিরত উদাসিনতা সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের কেও উদাসিন করে তুলছে, আইনের শাসনের প্রতি দায়ব্ধতা লোপ পাচ্ছে ।-ব্রায়েন এ্যাডামস, ডাইরেক্টর(এশিয়া)এইচআরডব্লিউ।

জনগনকে বন্দি করা অত:পর  তাদের শাস্তি নির্ধারন ও আটক রাখা এমনকি বন্দির জীবন-মৃত্যুও নির্ভর করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর মর্জির উপর এ ব্যাপারে তারা স্বাধীন ভাবে সিদ্ধাত নিতে পারে।

ঢাকা ট্রিবিউনের রিপোর্ট অনুযায়ী গত চার মাসে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়েছে ১৪ জন। হাসান ও দাস সহ তাদের মধ্যে পাঁচজন পরবর্তিতে ফিরে এসেছে। নিখোঁজ হয়ে  যাওয়া মানুষের মধ্যে তিনজনকে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার দেখানো হয়, জামান সহ  অন্যান্য নিখোঁজ ব্যাক্তিদের ভাগ্যেকি ঘটেছে সেটি আজো অজানাই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সম্প্রতি  এক বিবৃতিতে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার এ্যক্টিভিষ্টদের কঠোর সমালোচনা করেন, বিবৃতিতে তিনি এও বলে যে, সকল গুম হয়ে যাওয়া মানুষেরা অচিরেই ফিরে আসবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া

মোহাম্মদ মাহমুদ খান(মিডিয়া এ্যান্ড ল উইং ডাইরেক্টর, RAB) আল জাজিরাকে বলেন, নিখোঁজ ব্যাক্তি সংক্রান্ত বিষয়াদি পুলিশি বিচারব্যবস্থার অধীন (***ব্যক্তির জীবন-মরনের প্রশ্ন এখানে মূল্য হীন***) এক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করনিয় নেই।

জাহাঙ্গীর কবির খান(অনুসন্ধানী কর্মকর্তা, খিলগাঁও থানা, যে থানায় হাসানের পরিবার তার নিখোঁজের সাধারন ডায়েরি করে) আল জাজিরাকে বলেন,তারা এখন পর্যন্ত হাসানের অপহরনকারীদের সনাক্ত করতে সক্ষম হয়নি। তবে সে ফিরে আসায় দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী তার বক্তব্যের ভিত্তিতে নিখোঁজের ঘটনাটিকে অপহরন হিসাবে নতুন করে একটি কেইস ফাইল করতে পারবে হাসানের পরিবার এখন ।

হাসান এর বোন তাসনিম তামান্না আল জাজিরাকে জানান, যে ভাবেই হোক হাসানকে ফিরে পেয়ে তারা খুশি এবং কোনও অপহরণ মামলা দায়ের করার প্লান পরিবারটির আপাতত নেই ।

অপরদিকে সাবেক রাষ্ট্রদুত মারুফ জামানের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে ধানমন্ডি থানা(সাবেক রাষ্ট্রদুত মারুফ জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর নিখোঁজের সাধারন ডায়েরি করা হয় যে থানায়)’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফকে প্রশ্ন করা হলে তিনি আল জাজিরাকে জানান, “পুলিশ এখনও তার অন্তর্ধান রহস্যের সুত্র অনুসন্ধান করছে “।

নিখোঁজ সাবেক রাষ্ট্রদুত মারুফ জামানের বড় মেয়ে শবনম জামান আল জাজিরাকে জানান, ডিসেম্বর ৫(২০১৭)তারিখে এয়ারপোর্টের পার্শবর্তি এলাকা থেকে বাবার পরিত্যাক্ত গাড়ীটি উদ্ধার হবার পর এখন পর্যন্ত বাবার সম্পর্কে তারা নতুন কোন খবর পায়নি।পরিবারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে ধানমন্ডি জোনের এ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার অব পুলিশ জনাব আব্দুল্লাহিল কাফির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে, ঘটনাটি সম্পর্কে পুলিশ এখনও তদন্দ করছে।

“এই পর্যায়ে আমরা আশা রাখি যে অচিরেই সে মুক্তি পাবে”।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার জনাব মাসুদুর রহমান আল জাজিরাকে জানান যে,  খান ও দাস সহ মুক্তিপ্রাপ্ত সবাইকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং তাদের অপহরন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাবার চেষ্টা করা হবে ।

‘গভীর উদ্বেগ’

গুম, বল পূর্ব অন্তর্ধানের মতো কেইস গুলির ব্যাপারে আইন শৃঙ্খালা রক্ষা কারি বাহীনি ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের উদাসিনতা এবং গুরুত্বহীনতা নিয়ে মানবাধিকার বিষয়ক অনেক আইনজীবীই  আজ প্রশ্ন তুলছেন ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার আফসান চৌধুরি আল জাজিরাকে বলেন যে,   বাংলাদেশে এখন গুম ও বলপূর্বক অন্তর্ধানের মতো ঘটনা গুলি ভিন্ন মতাবলম্বী দমনের সিকৃত পন্থায় পরিনত হয়েছে এবং সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন।

নূর খান লিটন (পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক, ) দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন ) জানতে চেয়েছেন যে,  গুম, অন্তর্ধানের সাথে জড়িত সেই ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ ব্যাক্তি বর্গ কি এমন  অসাধারণ ক্ষমতার অধীকারি যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি তাদের খোঁজে করার চেষ্টা করতেও দিধা করছে?

লিটন বলেন, মোবাশ্বের ও উৎপলের বক্তব্যে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, অপহরন কারি  অজ্ঞাত ব্যক্তিরা শহরের ব্যাস্ততম এলাকা থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে যে কাউকে অপহরণ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য গোপন স্থানে রেখে তাদেরকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে নিজেরা সম্পুর্ন ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকার মতো  ক্ষমতা রাখে ।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের নিকট আমার অনুরোধ গুরুতর উদ্বেগের এই বিষয়টিকে অবহেলা না করে অপহরণকারীদের খুঁজে বের করার জন্য তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা  করুক ।

মূল সংবাদ : আল জাজিরা নিউজ (Al Jazeera News)

লেখক : ফয়সাল মাহমুদ(Faisal Mahmud)

অনুবাদ : অবরুদ্ধ গণতন্ত্র(Impresoned Democracy)