বঙ্গবন্ধু নয়, “পাক বন্ধু’ হওয়া তার কর্মের প্রতি সুবিচার

0

২৬ মার্চ পাকিস্তানী আক্রমনের মুখে শেখ মুজিবের নামে একটি প্রচারপত্র ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ে – তাতে পাকবাহিনীর আক্রমনের কথা উল্লেখ ছিল এবং আহবান ছিল লড়াইয়ের। এর সূত্র খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ২৫ তারিখ রাতে ৩২ ধানমন্ডি থেকে নিজের বাসায় ফেরেন তাজউদ্দিন, অতঃপর আমীরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে লালমাটিয়ায় আবদুল গফুরের বাসায় আত্মগোপন করেছিলেন, যার পাশেই ছিলো ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অফিস।

এ প্রসঙ্গে মঈদুল হাসান বলেন, ”স্বাধীনতার ঘোষণার ওই যে ছোট্ট খসড়াটি তাজউদ্দিন আহমদ তৈরি করেছেলেন ২৬ মার্চ, সেটির প্রায় একই রকমের ঘোষণা দেখি- একই সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য কাগজে প্রচারিত হতে, ভারতের কাগজেও হয়েছে। সুতরাং আমি ধরে নিতে পারি, সে সময় তাজউদ্দিন আহমদ যে খসড়া করেছিলেন, সেটা অন্য কাউকে তিনি হয়তো দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে তখন তরুণ কর্মীর কোনো অভাব ছিল না। বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব তখনই স্বাধীনতা ঘোষণা চাইছিল। এদের মাধ্যমে যদি এটা প্রচারিত হয়ে থাকে, তাহলে আমি বিস্মিত হব না”(সূত্রঃ ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’, প্রথমা প্রকাশনী, ২০১০)।

এর একটি কপি হয়ত উৎসাহী কেউ টেলিগ্রাম অফিসে পৌছে দিয়ে থাকতে পারে, যা সেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে টেলিগ্রামে যেতে পারে। তাহলে এটাই হচ্ছে, শেখ মুজিবের নামে তথাকথিত বার্তাটির গূঢ় রহস্য- যা মুজিবের অগোচরেই নিজ দায়িত্বে তাজউদ্দিন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন?
muhit1
৪ নভেম্বর ১৯৭২ বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। এ সংবিধানের মুখবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগন স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে ২৬ মার্চ ১৯৭১। তবে বর্তমানে আওয়ামীলীগের তরফ থেকে দাবী করা হচ্ছে, ১৯৭১ সালের ‘স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা’য় পরিস্কার হয়ে গেছে স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি, এবং বর্তমান সরকার ঐ ঘোষণাপত্রটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্ত করে দেয়ার কথা ঘোষণা দিয়েছে। ঘোষণাপত্রটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ গণপরিষদ সদস্যদের পক্ষ থেকে (পূর্ব পাকিস্তানের গণপরিষদের জন্য নির্বাচিত) একটি “স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা” প্রচার করা হয়, যা ১০ এপ্রিল থেকে কার্যকারিতা লাভ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ঐ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে লেখা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বিশেষ সহকারী মঈদুল হাসান এ ঘটনাটির ব্যাখা করেছেন এভাবে,‘স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণার’ প্রধান মূল প্রয়োজন দেখা দেয় নবগঠিত সরকারের আইনগত ভিত্তি বৈধকরণের জন্যই” (মূলধারাঃ৭১)। মঈদুল হাসানের বক্তব্য থেকে পরিস্কার বোঝা যায়, অস্থায়ী সরকারের অস্তিত্ব ও তার কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি বৈধকরনের জন্যই ‘স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা’টি তৈরী করা হয়, যেখানে ভূতাপেক্ষভাবে ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কার্যকর দেখানো হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই সকল প্রশ্নের জবাব মেলে – শেখ মুজিব কতৃক স্বাধীনতার ঘোষণা বাস্তবে ঘটনা না ঘটলেও, ধারনাগতভাবে এটি ২৬ মার্চ থেকে কাগজে কলমে দেখানো হয়, অন্যথায় প্রবাসী সরকারের অস্তিত্ব থাকে না।

১৯৭১ সালে ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনাকালে মুজিবের ঘনিষ্ট সহচর ছিলেন ড‍ঃ কামাল হোসেন। আগেই বলা হয়েছে, যুদ্ধকালে শেখ মুজিবের পাকিস্তানে অন্তরীণকালে ডঃ কামাল ছিলেন তার একজন কৌশুলী। সম্প্রতি ড‍ঃ কামাল জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালীতে বসেই ১৭ ডিসেম্বর শেখ মুজিব স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের সংবাদ পেয়েছিলেন (সাপ্তাহিক ২৮ অক্টোবর ২০১০)। এরপরে শেখ মুজিব ও ডঃ কামাল হেসেন কার্যতঃ প্রায় মুক্ত ছিলেন। ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভুট্টোর সাথে মুজিবের গুরুত্বপূর্ন বৈঠক হয়, যাতে ভুট্টো পাকিস্তানের দুই খন্ডকে কনফেডারেশন হিসাবে একত্র থাকার প্রস্তাব দিলে মুজিব তাকে আশ্বস্ত করে আসেন। ভুট্টো-মুজিব এ আলোচনায় মুজিবের অবস্থান সম্পর্কে Stanley Wolpert তাঁর Zulfi Bhutto of Pakistan বইটিতে লিখেছেন,“..I told you it will be confederation. This is also between you and me… You leave it to me…Absolutely leave it to me. Trust me… My idea was we will live together and we will rule this country. You know the occupation (Indian) army is there. “(P.175)। 
pak_bondhu_end1
অনুরূপ আরেকটি সংবাদ পাওয়া যায়, পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পথে মুজিব লন্ডনে “দি টাইমস” এর প্রখ্যাত সাংবাদিক এ্যান্থনি ম্যাসক্যারেনহাসকে একটি সুখবর দিয়েছিলেন। আর তা হলো, ”Going to keep some link with Pakistan” (Anthony Mascarenhas, Bangladesh: A legacy of Blood, Chapter 5)। দু’দিন পরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরন করলেন মুজিব। টারমাক থেকে তাজউদ্দিন ও খন্দকার মোশতাকের ঘাড়ে দু’হাত দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় মুজিব তাজউদ্দিন আহমদকে তিরস্কার করেছিলেন, “তাজুদ্দীন, শেষ পর্যন্ত তোমরা পাকিস্তান ভাইঙ্গাই ফেললা?” এ কথাটি শুনেছিলেন ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের রচয়িতা প্রফেসর আফতাব আহমদ (সুত্রঃ তাজাম্মুল হোসেনের ওয়েবসাইট)। কিন্তু দেশে ফিরে মুজিব যখন দেখলেন, পাকিস্তান পুরোপরি ভাগ হয়ে গেছে এবং আর কোনভাবেই কনফেডারেশন সম্ভব নয়, এ বাস্তবতায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় ভুট্টোর উদ্দেশ্যে মুজিব বললেন, “আমাদের মধ্যে আর কোনো সম্পর্ক সম্ভব নয়। আপনারা সুখে থাকুন।” এর অর্থ দাড়ায়, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারীও মুজিব তার মূল ভাবনা ”পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন” নিয়ে বিভোর ছিলেন, কিন্তু বাস্তবতার কাছে তাকে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে। আর এভাবেই ”বঙ্গবন্ধু নয়, একজন পাকবন্ধুর “ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান” গড়ার স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশ জন্মের পরও যার ধ্যানে কল্পনায় কেবলই ‘পাকিস্তান’,  তার নামে কি করে বঙ্গবন্ধু হয়? বরং “পাক বন্ধু’ হওয়া তার কর্মের প্রতি সুবিচার।

লেখক: মোঃ শামসুল আলম
মুক্তিযুদ্ধের গবেষক

(সংগ্রহেঃ মোঃ আলফাজ উদ্দিন)