প্রসঙ্গ :২০ মে, ১৯৯৬ সেনা অভ্যুত্থানের ভিতরে-বাইরে ( প্রথম পর্ব)

0

১৯৯৬ সালের ২০ শে মে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক সেনা অভ্যুত্থান করার চেষ্টা করে কিন্তু তা সফল হয় নি। ৯৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে ভিতরকার ঘটনা শুনা যাক তখনকার যশোরের জিওসি মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীমের মুখে –

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ১৯৯৬ সালের ২০ মে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি অপ্রকাশিত বা আংশিক প্রকাশিত একটি ঐতিহাসিক বিতর্কিত ঘটনা। ১৮ তারিখে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান আবু সালেহ মুহাম্মদ নাসিম টাঙ্গাইলে একটি ঘূর্ণিঝড়কবলিত এলাকায় আক্রান্ত মানুষের মাঝে চলা ত্রাণ তৎপরতা দেখতে বা পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরে হেলিকপ্টার থেকে নেমেই সংবাদ পেলেন দু’জন অফিসারকে অবসরের আদেশ দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে বিষয়টি তার আগে থেকেই অবগত হওয়ার কথা, অথচ তিনি জানতেন না। সেদিন জেনারেল নাসিমকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তিনি কি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এ অবসর আদেশ মেনে নেবেন? না নেবেন না। বাংলাদেশ সরকার বাধ্যতামূলক অবসর আদেশ প্রদান করেছিলেন বগুড়ার জিওসি মেজর জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খান এবং তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের উপ-মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মিরন হামিদুর রহমানকে। জেনারেল নাসিমের মনে সম্ভবত অনেকগুলো প্রশ্ন ছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় যে কোন সেনাবাহিনীর প্রধান সরকারের এ আদেশ মেনে নেবেন। জেনারেল নাসিমের আগে-পরে যারাই সেনাপ্রধান হিসেবে এসেছেন তারা সবাই এরূপ আদেশ মেনে নিয়েছেন; কিন্তু জেনারেল নাসিম চিন্তা করলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং তার আমলের রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস এ বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে অলিখিতভাবে কী বার্তা প্রদান করছেন! শুভাকাক্সক্ষী ও পরামর্শদাতাগণ তাকে বোঝালেন, হেলাল মোরশেদ আপনার প্রিয়তম জেনারেল, তাকে অবসর প্রদান করে সরকার বোঝাতে চাচ্ছে তারা আপনার উপর অসন্তুষ্ট এবং এরপর আপনার অন্য প্রিয় ব্যক্তিদের অবসর প্রদান করা হবে এবং সর্বশেষ আপনাকেও অবসরে পাঠিয়ে দিতে পারে। লিখিতভাবে না এলেও অলিখিতভাবে আলোচনায় প্রশ্ন এল, কেন জেনারেল হেলাল মোরশেদকে অবসরে পাঠানো হবে? তার সহজ উত্তর ছিল এরূপ; তিনি সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে অশোভন কথা বলে সমালোচনা করেছেন যাতে জেনারেল নাসিমেরও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বলে সরকারের বিশ্বাস। আইনের দিক থেকে হঠাৎ করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াটি কিঞ্চিৎ ত্র“টিপূর্ণ ছিল এটা বাস্তব। জেনারেল আবু সালেহ মুহাম্মদ নাসিম (বীরবিক্রম) তার প্রিয়তম জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খানের বাধ্যতামূলক অবসর আদেশটিকে স্বস্তির সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এটি তিনি মানবেন না।

১৯ তারিখ সারাদিন এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা, গবেষণা, সমালোচনার কোন কমতি ছিল না। তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে যারা ঢাকায় আছেন তাদের সঙ্গে মুখোমুখি, আর যারা ঢাকায় নেই তাদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করছিলেন। সর্বোপরি সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এ অবসরের প্রতিবাদ করবেন আইনানুগভাবে। এ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তিনি সরকারের কাছে চিঠি লিখলেন। দ্বিতীয় বিষয়টি পরে আবিষ্কার হওয়ার কারণ, যখন প্রতিবাদ করছিলেন তখন জেনারেল নাসিম বুঝতে পারেননি দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিরাজ থাকার কারণে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়টি রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের অধীনে আছে। ১৯ মে সকালবেলা জেনারেল নাসিম রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করতে বঙ্গভবনে ছুটে যান। সেখানে জেনারেল নাসিম রাষ্ট্রপতির কাছে মৌখিক প্রতিবাদ জানান এবং বাধ্যতামূলক অবসর আদেশ প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেন। রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস তার এ বক্তব্যে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। পরিস্থিতি ঠিক এরকম : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি যিনি সংবিধান মোতাবেক দেশের ও সরকারের প্রধান, ঠিক ওই মুহূর্তে তিনি আদেশ করছেন দু’জন ব্যক্তিকে অবসরে যাওয়ার জন্য, অপরপক্ষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান চাচ্ছেন তারা অবসরে না যাক। এ বিপরীতম-খী প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাব থমথমে এক উত্তেজনার সৃষ্টি করে। সংঘর্ষের দিক থেকে এটাকে আমরা সাংবিধানিক সংঘর্ষ, আধা রাজনৈতিক সংঘর্ষ কিংবা আধা কমান্ড সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষ বলতে পারি। এরূপ পরিস্থিতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এর আগে কখনও ঘটেনি এযাবৎকালেও হয়নি।

আমি তখন যশোরের জিওসি। ১৯৯৬’র ২০ মে বিকাল ৪টায় বা ওইরকম সময়ে যশোরে আমি জেনারেল নাসিমের পক্ষ থেকে লিখিত আদেশ পাই। আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরেটের একজন জিএসও-১। ২০ মে সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমের হুকুমে ময়মনসিংহ ও বগুড়া থেকে সেনাদল ঢাকা অভিমুখে রওনা দেয়। যশোরে আদেশ পৌঁছানোর দেড় ঘণ্টা পরই যেহেতু রেডিও-টিভির মাধ্যমে জানা যায় জেনারেল নাসিম আর সেনাপ্রধান নেই, সেহেতু ঢাকায় সেনাদল পাঠানোর প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এর অল্প কিছুক্ষণ পরেই নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল মাহবুব যশোর সেনানিবাসের অবস্থান সম্পর্কে আমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে তার আগে জেনারেল নাসিম কর্তৃক ওই আদেশ পাওয়ার পর আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল আমি কী করব। ইতিমধ্যে দিনের বেলা অনেকবার জেনারেল নাসিমের সঙ্গে কথা হয়। আমি জেনারেল নাসিমের কিছু কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডকে অপরিণামদর্শী বলে বর্ণনা করি। জেনারেল নাসিমের মুখ থেকেই অন্যান্য সেনানিবাসের খবর পাই। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম মহানগরে লালদীঘির পাড়ে অবস্থিত জেলখানার অভ্যন্তরে তৎকালীন সেনা বিদ্রোহ মামলায় অভিযুক্তদের চেহারা ও পারিপার্শ্বিকতা আমার চোখে ভেসে ওঠে এবং আমি জেনারেল নাসিমকে সেই উদ্বেগ বোঝাতে চেষ্টা করি। তিনি আমার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। আমিও অন্তরের অন্তস্তল থেকে তার সঙ্গে একমত হতে পারিনি। জেনারেল নাসিমের সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের বাবর হাউসে, ১৯৬৪ সালের জুন পর্যন্ত। অতঃপর ১৯৭০-এর সেপ্টেম্বর থেকে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তিনি মারাÍকভাবে আঘাত পাওয়া পর্যন্ত। অতঃপর ১৯৭৩ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে সামরিক সচিবের শাখায়। অতঃপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমি সেনাবাহিনী সদর দফতরে ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স এবং তিনি ঢাকা সেনানিবাসেই ডিজিএফআই প্রধান। ঢাকা সেনানিবাসে শহীদ বেলায়েত রোডে তার বাসা এবং আমার বাসার দূরত্ব একশ’ গজ। জেনারেল নাসিম ও আমার স্ত্রীর মধ্যে সামাজিক সখ্য গভীর ছিল। উভয় পরিবারের সন্তানদের মধ্যে গভীর নৈকট্য ছিল। সার্বিকভাবে জেনারেল নাসিম দাবি করতেই পারেন, ইবরাহিম তার কথার বাইরে যাবে না। কিন্তু ২০ মে আমি একলা ছিলাম না। আমার মৌখিক বা লিখিত আদেশ পুরো ডিভিশনকে ভালো বা মন্দভাবে সংশ্লিষ্ট বা ‘এফেক্ট’ করত।

এই প্রেক্ষাপটেই আমি জেনারেল নাসিমের জন্য যেমন উদ্বিগ্ন ছিলাম, তেমনই উদ্বিগ্ন ছিলাম আমার অধীনস্থ ডিভিশনের জন্য। অনেক ভেবেচিন্তে আদেশ দিলাম, যশোর সেনানিবাস থেকে একটি ক্ষুদ্র পদাতিক ও গোলন্দাজ দল রওনা দিতে প্রস্তুত থাকবে। ২০ মে ১৯৯৬, রাত ৮টা। আদেশ দেয়ার সময়ই আমি জানি, সাভার সেনানিবাস থেকে আগত সেনাদল আরিচায় প্রতিরক্ষা ব্যূহ স্থাপন করেছে যেন বগুড়া থেকে কোন সেনাদল নগরবাড়ি ফেরিতে উঠে আরিচা নামতে না পারে অথবা যশোর থেকে কোন সেনাদল দৌলতদিয়া থেকে ফেরিতে উঠে আরিচা নামতে না পারে। যেহেতু দৌলতদিয়ায় পদ্মা পার হয়ে আরিচা দিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথ বন্ধ, সেহেতু একমাত্র বিকল্প আমি কাগজে-কলমে বেছে নিলাম। ওই সময় আমি নিজে খুব ভালো করে জানতাম, যশোর-মাওয়া-ঢাকা সড়ক পথে ফেরির অভাবে পদ্মা নদীর পূর্ব পাড়ে তথা মাওয়া পৌঁছানো যাবে না। ফেরি আছে এবং কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা নেই এমন অনুমান করলেও, যে কোন পরিকল্পনায় যশোরের সেনাদল তার লটবহর নিয়ে ২২ মে ভোরের আগে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা নয়। এ পরিস্থিতিতে আমি বুঝলাম, যশোর থেকে ঢাকায় সেনাদল পাঠানোর আদেশ যত না বাস্তবতা সম্পর্কিত, তার থেকে বেশি প্রতীকী তথা শুধু সেনাপ্রধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী একটি ইঙ্গিত মাত্র।

১৮ মে-তে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস দু’জন অফিসারকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়ার সময় সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেননি। সঠিক প্রক্রিয়া কী সেটা অনুধাবন করতে হলে যে কোন ব্যক্তিকে নিুলিখিত ধারা বা আইন বা রুল বা বিধান ইত্যাদি মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে। যথাÑ বাংলাদেশ সংবিধানের আর্টিকেল ৬২(১) (খ), সংবিধানের আর্টিকেল ১৩৪, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইনের সেকশন ১৮, সেনাবাহিনী আইন রুলসের রুল ৯-এ, ৯-বি, ৯-সি, ১২ ও তৎসংলগ্ন নোট, আর্মি রেগুলেশন রুলসের রুল ২৬২ এবং ২৬৯-এ ধারাবাহিকভাবে দ্রষ্টব্য। মূল কথা হল, সেনাবাহিনী আইন দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া লংঘন করে তাদের অবসর দেয়া হয়। অনানুষ্ঠানিকভাবে জেনারেল নাসিম বলেন, সেনাবাহিনী আইনের সম্মান এবং সেনাবাহিনীর স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের কাছে এ অনিয়মের প্রতিবাদ করেন। কিন্তু নাসিমের সমালোচকরা বলেন, সেনাবাহিনীতে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অফিসার হেলাল মোরশেদের চাকরি যাওয়ার কারণে তিনি নিজের অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েন এবং সেজন্যই প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নেন।

সেনাবাহিনীর ১৯-২০ মে সময়টা ছিল কাগজে-কলমে উপরে উপরে সব ঠিকঠাক ও স্বাভাবিক। বাস্তবে সবকিছু ছিল উল্টাপাল্টা এবং অস্বাভাবিক সঙ্ঘাতময় উত্তেজনাপূর্ণ। পুরো সেনাবাহিনী প্রায় দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একদিকে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের প্রতি অনুগত একটি দল, অপরদিকে জেনারেল নাসিমের প্রতি অনুগত একটি দল। সেনাবাহিনী প্রধান ঢাকার বাইরে থেকে সৈন্যদের ঢাকায় আসার জন্য আদেশ করেছিলেন। এ আদেশের পেছনে অছিলা ছিল ঢাকায় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি। এ আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার জন্য অতিরিক্ত সৈন্য প্রয়োজন। সমগ্র বাংলাদেশে নয়, ঢাকার অদূরে ময়মনসিংহ থেকে একটি সেনাদল জয়দেবপুরের চৌরাস্তার কাছাকাছি এসে অবস্থান নেয়। অপরপক্ষে সাভার থেকে একটি সেনাদল গিয়ে জয়দেবপুরের চৌরাস্তার কাছে অবস্থান নেয়। সাভার থেকে যারা যায় তারা রাষ্ট্রপতির প্রতি অনুগত আর ময়মনসিংহ থেকে যারা আসে তারা সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতি অনুগত। কিন্তু সরেজমিন যেসব কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার উপস্থিত ছিলেন তাদের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে সৈন্যবাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়নি। তাতে করে বাংলাদেশ একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে পরিত্রাণ পায়। সেদিনের উত্তেজনাময় মুহূর্তটি বাংলার আকাশ-বাতাসকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলÑ কোন এক অছিলায় আমরা মুক্তি পেয়ে প্রাণে বেঁচে যাই।

তবে সব ঘটনার পেছনেই কিছু প্রেক্ষাপট থাকে। আমি গত পনের বছরে একাধিক জায়গা থেকে একাধিক সূত্রে শুনেছি, ১৯৯৫ সালের শেষ থেকে ১৯৯৬ সালের শুরু অবধি বগুড়ার জিওসি হেলাল মোরশেদ খান বীরবিক্রম সরকারের ওপর তথা ওই আমলের বিএনপি সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি জেনারেল নাসিমের কানও ভারি করার চেষ্টা করতেন। এসব তথ্য সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর কানে যাওয়ার কথা, পনের বছর যাবৎ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ধারণা পেয়েছি ও শুনেছি। সে সময় বাকি সেনাবাহিনী সরকারের প্রতি অনুগত ছিল, থাকাটাই স্বাভাবিক। সেনাবাহিনী এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেটি সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকবে ও সংবিধানসম্মত সরকারের প্রতি অনুগত থাকবে, যেমনটি থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ তারা এ স্বাভাবিকতার প্রতি অনুগত এবং প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে সে সময় সেনাবাহিনী প্রধান সরকারের প্রতি স্বাভাবিকভাবে অনুগত ছিলেন; কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা তার কানকে গরম করেছিলেন। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু ব্যক্তিও তাকে কানপড়া দিয়েছিলেন এই মর্মে যে, দেশ গোল্লায় গেল, রসাতলে গেল, ধ্বংস হয়ে গেল, আপনারা সেনাবাহিনী বসে বসে মজা দেখছেন, কিছুই করছেন না, আপনাদের চুপচাপ বসে থাকলে চলবে কিভাবে ইত্যাদি। এসব কথাবার্তা বলে তার মাথা গরম করে দিয়েছিলেন। এসবকিছুই সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে সরকারের কানে যাওয়ার কথা। গত পনের বছরে শুনেছি এবং ধারণা পেয়েছি এই ঘটনাগুলো ঘটেছিল। পাশাপাশি আরও একটি কথা কানে এসেছে; সেটা হল একই বছর ফেব্র“য়ারির শেষে মার্চের শুরুতে আসলেই সেনাবাহিনীর কয়েকজনের পক্ষ থেকে একটি ‘সেনা অভ্যুত্থান’ ঘটানোর প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করা হচ্ছিল। তাই এমন একটি প্রশ্ন অনেকেরই মনে জেগেছিল, সে সময়ের বিরোধীদলীয় কিছু রাজনীতিবিদ কি এই সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য কোন ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন? প্রশ্নের উত্তরে বলতে হচ্ছে, আমি স্বাভাবিকভাবে অনুভব করি, সে সময়ের বিরোধী (বর্তমান ক্ষমতাসীন) দলের কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ওই ধরনের প্রচেষ্টা বা পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এগুলো এমন স্পর্শকাতর বিষয় যে প্রমাণ করার জন্য আদালতে উপস্থাপন করা যাবে না। আর এটি এমন একটি বিষয় যেটি আদালত পর্যন্ত নেয়াও সমীচীন নয় বলে আমি মনে করি। রাজপথে দাবি আদায়ের আন্দোলনটি যেহেতু কঠিন থেকে কঠিনতম হয়ে উঠেছিল, তাই সেই সময়ের বিরোধী দল যদি চিন্তা করে থাকে, দেশ বাঁচানোর জন্য সামরিক বাহিনী এগিয়ে আসে তবে মন্দ কী (!) এবং তাদের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়া এলেও তো আসতে পারে!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূলধারা দুটি। একটি ধারা বলে, তারা অবশ্যই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু অপর অংশটি বলে, তারা লিপ্ত ছিলেন না। মেজর জেনারেল হেলাল মোরশেদ ও ব্রিগেডিয়ার মিরানকে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৮ মে অকালীন অবসর দেন। নিয়ম বা প্রথা লংঘন করে অবসর দেয়ার কারণে সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম প্রতিবাদ করেন। ফলে তিনি এবং আরও ৭ জন অফিসার চাকরি থেকে বরখাস্ত হন; অন্য আটজনকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর দেয়া হয়। ক্ষমতায় আসার বারো মাস শেষ হওয়ার আগেই সরকারের সিদ্ধান্তে সাতজন অফিসারকে বরখাস্তের বদলে অবসর প্রদান করা হয়। উপকারপ্রাপ্ত সাতজন অফিসার খুশি। আমরাও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ এ মর্মে যে, আমাদেরই সহকর্মী মুক্তিযোদ্ধা অফিসার সম্মান ফেরত পেয়েছেন; কিন্তু কিছু যুক্তির কথা তবুও থেকে যায়।

প্রথম যুক্তি – ১৯৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম আড়াই বছরের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত থেকে মনে হয়েছিল, ওই সরকারের মতে জেনারেল নাসিম ও তার সঙ্গী যারা বরখাস্ত হয়েছিলেন তারা অবশ্যই দোষী; কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দয়াপরবশত তাদের শাস্তি কমিয়ে বরখাস্তের জায়গায় অবসর প্রদান করেছেন।

দ্বিতীয় যুক্তি – ওই সময়ের রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের মতে, যে সাতজন অফিসার বেশি দোষী ছিলেন (২০ মে ১৯৯৬ এর ঘটনায়) তাদের বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং যে আটজন কম দোষী ছিলেন তাদের বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছিল। বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান ছোট শাস্তি এবং বরখাস্ত হওয়া একটি বড় শাস্তি। কিন্তু ১৯৯৬-এর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের মতে, সবাই সমানভাবে দোষী। অতএব সমান শাস্তি দেয়া হোক। আর সে শাস্তি হল সবার জন্য বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান। অনেকটা গণশাস্তি যেমন হয় তেমন।

তৃতীয় যুক্তি – ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকার কাগজে-কলমে এ ১৫ জনকে দোষী মনে করলেও দোষী ব্যক্তিদের একজনকে কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের নিরাপত্তা বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা এনএসআই বা জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। দুগ্ধবতী ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো আমরা এ ভেবে আনন্দিত হয়েছিলাম যে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপ্রকাশিত বা অনুল্লেখিত অভিযোগে চাকরি থেকে অবসর পেলেও আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্বাস করা যায়!

চতুর্থ যুক্তি – যে দু’জন অফিসারের প্রসঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত অনুরক্তির কারণে লে. জেনারেল নাসিম ঘটনাবহুল নাটকের অবতারণা করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম তৎকালীন মেজর জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খান। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জেনারেল মোরশেদ বিএনপি সরকারের অনুরক্ত ছিলেন। তারপর অনানুষ্ঠানিক আনুগত্য বদলাতে থাকে। সেই মেজর জেনারেল মোরশেদ ২০১০ সালে বিদ্যমান আওয়ামী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছেন; নিযুক্ত হওয়ার কয়েক মাস পর নির্বাচিত হয়েছেন। একই সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হচ্ছেন ১৯৬৮ সালের জুলাই থেকে যতদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম ততদিন আমার সহপাঠী, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩নং সেক্টরের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের ব্যর্থ সেনা বিদ্রোহের অন্যতম (নায়ক না হলেও) সংগঠক, ১৯৯৬-এর ১২ জুনের নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং প্রতিমন্ত্রী, কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুরের সন্তান, অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম।