প্রধান বিচারপতিকে ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ বলে মন্তব্য করলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা

0

প্রধান বিচারপতিকে ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ বলে মন্তব্য করলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যারা স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ চায়নি, তাদের প্রেতাত্মা এখনও এদেশে রয়ে গেছে। তারা সুযোগ পেলে ছোবল মারে।’ বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী ও সম্পাদকমণ্ডলীর যৌথসভায় বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতা এদেশের মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। স্বকীয়তা নিয়ে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। সেই স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলতে পারে, ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নাম যাতে একেবারেই মুছে ফেলা হয়, সেজন্য অনেক চক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু সত্য যেটা, তা প্রকাশ হবেই, সত্য উদ্ভাসিত হবেই।’

প্রধানমন্ত্রী এমন বক্তব্য এমন সময় দিলেন যখন ষোড়শ সংশোধনী বাতিল বিষয়ে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে সরকার ও আদালতের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। আদালতের রায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে পরোক্ষভাবে প্রধান বিচারপতির করা কিছু মন্তব্যও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বেশ ক্ষুব্ধ করেছে।

প্রধান বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালে আমরা যে অলঙ্ঘনীয় ঐক্য গড়েছিলাম, তা শত্রুরা নস্যাৎ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আজ আমরা একটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে বাস করি। অথচ আজ ঔদ্ধত্য এবং অজ্ঞতাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে চলছি। কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা কোনো একটি দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি। আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নে সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে এই আমিত্বর আসক্তি এবং আত্মঘাতী উচ্চাভিলাষ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। এই আমিত্ব হলো কেবল এক ব্যক্তি বা একজন মানুষ সবকিছুই করতে পারেন এমন ভাবনা।’

প্রধান বিচারপতি আরো বলেছিলেন, এটা একটা ভাইরাস এবং দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সংস্কৃতিকে তা এমন বিস্তৃতভাবে সংক্রমিত করেছে যে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে বা কল্পনা করতেও পারছেন না যে ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরো জাতি, কোনো একজন ব্যক্তি নন।’

প্রধান বিচারপতির এমন মন্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এসব মন্তব্য করেছেন। শেখ হাসিনা আরো বলেছেন, ‘পঁচিশ বছর ধরে ইতিহাস থেকে জাতির জনকের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছেন, একক নেতৃত্বে স্বাধীনতা আসেনি। একক চেষ্টায় কোনও কিছু হয় না। কিন্তু সব কিছুর পেছনে লক্ষ্য থাকে, আদর্শ থাকে, স্বপ্ন থাকে, প্রেরণা থাকে, নেতৃত্ব থাকে, শক্তি থাকে; সেই শক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধু।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার প্রহসনমূলক বিচার করে তার (শেখ মুজিবুর রহমান) ফাঁসির রায়ে পর্যন্ত সই করে দিয়েছিলেন। কই ইয়াহিয়া তো জিয়াকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেননি? তার কথাও বলেননি। তিনি শুধু একজনের কথা বলেছিলেন। সেটা হলো শেখ মুজিবুর রহমান। সেসময় বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করে পাকিস্তানের শত্রু হিসাবে ঘোষণা করেছিল ইয়াহিয়া। কাজেই এই সত্যটা যে উপলব্ধি করতে পারবে না; সে আদৌ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে কিনা, আমার সন্দেহ আছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসেছে। তবে কাউকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। কিছু কিছু লোক থাকে, তারা সুযোগ পেলে বিকৃত ইতিহাস সামনে তুলে নিয়ে আসে। কিন্তু বিকৃত ইতিহাস এখন আর কেউ বিশ্বাস করাতে পারে না। ইতিহাস চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। একুশ বছর ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অনেক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করা হয়েছে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও পরবর্তীতে দলটির নেতাদের আচরণের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে গিয়েছিল তাকে তো বাঙালিরা ব্যারিকেড দিয়ে আটকও করেছিল। একজন সেনাসদস্যকে দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করানোর প্রয়োজন অনুভব করে (আওয়ামী লীগের তদানীন্তন নেতা) জহুর হোসেন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ যাকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো ঘোষণাটি পাঠ করান, পরবর্তীতে তাকেই হিরো বানানোর চেষ্টা করা হয়।’

উল্লেখ্য, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাঁর পর্যবেক্ষণে গণতন্ত্র, রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, সুশাসন, দুর্নীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন বিষয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। এনিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে ব্যপক তোলপাড় শুরু হয়। তবে বিএনপিসহ পুরো বিরোধী পক্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণের সাথে একমত পোষণ করে।