প্রথম পর্ব : বিএনপির ভিশন ২০৩০ পররাষ্ট্র নীতি এবং অভিমত

0

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে বিএনপি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বিএনপি অন্য কোন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং অন্য কোন রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করবে না। একইভাবে বিএনপি দৃঢ় অঙ্গীকার করছে যে অন্য কোন রাষ্ট্রও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করলে শক্ত প্রতিরোধ (resistance) গড়ে তোলা হবে। বিএনপি বিশ্বাস করে, আমাদের সীমান্তের বাইরে বাংলাদেশের বন্ধু রয়েছে, কোন প্রভু নেই। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে। বিএনপি মুসলিম উম্মাহ ও প্রতিবেশি দেশসমূহের সাথে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলবে

ভূমিকা: বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক রক্তাক্ত অভ্যুদয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে স্থান করে নিয়েছে স্বাধীন এবং স্বার্বভোম হিসেবে। বহু মুক্তিকামী জনগণের আত্নদানের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা, যে দেশ এতো ত্যাগ তিতিক্ষার মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করতে পাড়ে সে দেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে আত্নমর্যাদার, সমতার ভিত্তিতে, বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়কে সর্ব প্রথম প্রাধান্যদান করা হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রায় চার দশক পাড় হয়েছে। শুরুটা খুব কঠিনীকৃত ছিলো, সেই দশক পৃথিবী বিভিক্ত হয়ে পড়েছিলো দুই শিবিরে পূর্ব ব্লক এবং পশ্চিম ব্লক। স্নায়ুযুদ্ধের সেই কোপানলে পড়েছিলো সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ কার ব্লকে থাকবে এই কঠিন সময়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই পূর্ব ব্লকই মুক্তিযুদ্ধকালীন সেই কঠিন সময়ে সর্মথন করেছে বাঙ্গালীকে পশ্চিমা যে করে নাই সেটাও না কিন্তু সরকারী পর্যায়ে তা ছিলো না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৬ ডিসেম্বর আত্নসমর্পনের পর সব সমীকরণ বদলে যায়। বাংলাদেশের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা হয়, সাথে যুক্ত হয় বর্হির বিশ্বের সাথে বাংলাদেশকে সংযুক্ত করার প্রকিয়া। বাংলাদেশ এক অদ্ভুত সমীকরণ পড়ে যায় কাকে বাছাই করবে, কাকে বাছাই করলে কি পাওয়া যাবে তা স্নায়ুযুদ্ধের সহজ হিসাব একটাকে ছাড়লে আরেকটা কে ধরলে কি পাওয়া যাবে আর কি হারানো হবে এটারও একটি হিসাব বিধ্যমান থাকে। বাংলাদেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের পূর্ব ব্লকে যোগদান করে এটার জন্য বাংলাদেশকে মুল্য পরিশোধ করতে হয়। পররাষ্ট্র নীতি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অনেকাংশ ভূমিকা পালন করে। জাসদ, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। ১৯৭৫ য়ের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাস পরিবর্তন করে দেয় চিরদিনের জন্য সাথে পরিবর্তন আসে পররাষ্ট্র নীতিতেও। ১৯৭২ – ৭৫ সময়টা একরোখা পররাষ্ট্র নীতি অনুসৃত হয়। বাকশাল পরবর্তী সময়টা অনেকাংশ ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি সরকার অনুসরণ করেন। ১/ ১১ এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উপর ভারতের খবরদারী বহু গুনে বেড়ে যায় সেনা সমর্থিত তত্বাবধয়াক সরকারকে ভারত কূটনৈতিকভাবে সমর্থিত করেছে। সেনাশাসিত সরকার এক সময় পরিস্থিতির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সেনাশাসিত সরকার এমন একজনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিলেন যারা এই সময়ের মধ্যে সব অবৈধ কাজগুলাকে বৈধ্যতা দিবেন এবং তাদের আইনগত ভাবে শাস্তি প্রদান করবেনা এই ক্ষেত্রেও ভারত হস্তক্ষেপ করে তারা চেয়েছিলো ভারতপন্থী সরকার যাতে করে তাদের মতো করে বাংলাদেশে শাসিত হয়। আওয়ামীলীগ এই সময়ে সমঝোতা জন্য একমত পোষন করে এবং তারা ওয়াদা করে তারা সেনাশাসিত সরকারের কাউকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসবেন না। এক প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন করা হয় ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ সালে সেখানে আওয়ামীলীগ ২/৩ অংশ সংসদীয় আসন লাভ করে। আওয়ামীলীগ সরকার আসার পর একের পর এক অপকর্ম চলতে থাকে সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অধিকারটুকু তারা হরন করে। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারনে ভারতকে করিডোর, ভারতীয় পণ্য বিনা শুল্কে অবাদে প্রবেশকরনের সুযোগ দান করে, তালপট্টি কে ভারতের কাছে হস্তান্তর করে দেয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ছিলো ভারত কেন্দ্রিক তারা বিশ্বে কারো সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পাড়ে নাই। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তাদের গডফাদার ভারতকে তুস্ট করতে বেশী ব্যাস্ত ছিলো।

বিএনপির ভিশন ২০৩০ এবং পররাষ্ট্র নীতি: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল ( বিএনপি) দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। এই দলটি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ভিশন ২০৩০ প্রদান করলো যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বৈরি পরিবেশে তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালিত করছেন। এই রকম একটি ভিশন দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক ঘটনা। বিএনপির এই ভিশনে খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ তার সীমানার বাইরে কোনো প্রভুর উপর নির্ভর থাকতে চায় না বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে বহু ত্যাগের মাধ্যমে। এই মুক্তিযুদ্ধ কাউর তাবেদারী করার প্রশয় প্রদান করে না এই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের মাথা উঁচু করে কাধেকাধ মিলিয়ে চলার সাহস দেয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি কখনো অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর নীতিতে বিশ্বাস করে না। বিশ্বের যেকোন দেশের সাথে বন্ধুত্ব্ব হবে সমতার ভিত্তিতে, দেশের স্বার্থকে আগে প্রাধান্যদান করতে হবে, বাংলাদেশ কাউর সেবাদাস হতে চায়না। বাংলাদেশে যা কিছু তা দেশের মানুষের ইচ্ছে অনুযায়ী হবে কাউর নগ্ন হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। বাংলাদেশের স্বাধীন, স্বার্বভোমত্ব যদি কেউ খর্ব করার চেষ্টা করে কঠোর হস্তে তা দমন করা হবে এটা যে কেউ হউক দেশের ভিতরের কেউ বা দেশের বাইরের বহিরাগত। আওয়ামী সরকার পররাষ্ট্র নীতিতে যে শূন্যতা রেখে গেছে তা পুড়ন করতে সময় লাগবে। আওয়ামীলীগ মুসলমান দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ কোনো ভূমিকা পালন করতে পাড়ে নাই যার প্রভাব পড়েছে দেশের শ্রমশক্তি বাজারে।

বাংলাদেশের প্রধান শ্রমশক্তি বাজার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশি শ্রমবাজার ক্রমে ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে নতুন শ্রমিক সেখানে পাঠাতে অক্ষমতা প্রকাশ করেছে। নতুন শ্রমবাজার খুজতে নিজেদের কূটনৈতিক বিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট করে প্রকাশ পেয়েছে। আওয়ামীলীগ সরকারের বিরাট একটা ভুল করেছে তার পররাষ্ট্র নীতির বাস্তবতায় ২০২২ সালের ওয়াল্ড এক্সপো কোথায় অনুষ্ঠিত হবে তার ভেন্যুর জন্য দুই শহর মস্কো এবং দুবাই এর মধ্যে ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কে হবে আয়োজক। বাংলাদেশ মস্কো কে ভোট দিয়ে সবাইকে অবাক করে দেয়, আর আরব আমিরাত সরকার খুব ক্ষুদ্ধ হয় বাংলাদেশের উপর অবশ্যই দুবাইয়ের জিততে কোনো সমস্যাদি হয় নাই কিন্ত প্রাগ্যতার অভাবে বাংলাদেশ কে সেটা ভালো ভাবে ভোগ করতে হয় আরব আমিরাত সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া নিষিদ্ধ করে। আওয়ামীলীগ আফ্রিকা মহাদেশীয় দেশসমূহের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার চোখে পড়ার মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। বাংলাদেশ আফ্রিকায় একটা অতি পরিচিত নাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ কবলিত দেশে শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে দায়িত্বপালন করেছে। সেখানে দায়িত্ব পালন কালে সে দেশের সরকার এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশি সেনাবাহিনীর ভুয়শী প্রশংসা করেছে। সেই সুনামের কারনে বাংলাদেশি সরকার যদি তার বিচক্ষণতা দেখাতো কূটনৈতিক ফ্রন্টে তাহলে আফ্রিকাতে বাংলাদেশ ব্যবসা বাণিজ্য বহু গুনে বাড়তো সাথে সাথে সেখানে দেশের বহু সেবা প্রতিষ্ঠান সেখানে ব্যবসা বাণিজ্য করে লাভবান হতেন।

বিএনপির করনীয় পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে:

১। ১৯৪৬ থেকে যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করেছে তার সমাপ্তি ঘটেছে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র সুপারপাওয়ার হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে এবং তারাই স্নায়ুযুদ্ধের বিজয়ী। স্নায়ুযুদ্ধের শেষের ২৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর পৃথিবী অনেক বদলে গিয়েছিলো সেই বাস্তবতার আলোকে বিভিন্ন দেশের নীতি পরিবর্তন করতে হয়েছিলো। আজ ২০১৭ সালে সেই স্নায়ুযুদ্ধের ধামাধোল আবার বেজে উঠেছে অবশ্যই কোনো পক্ষই তারা স্বীকার করছে না স্নায়ুযুদ্ধ আবারো শুরু হয়ে গেছে। বিএনপি কে এই বাস্তবতার আলোকে একটা ভারসাম্যতা বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

২। লুক ইস্ট নীতি কে অগ্রাধিকার দিতে হবে নিজের নিকট প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে সচেষ্টতা দেখাতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কানেক্টভিটি, সংঘাতকে যতোদূর এড়িয়ে চলা উচিৎ।

৩। পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি থিংক ট্যাংক তৈরি করতে হবে এই কমিটি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকবে উক্ত উপদেষ্টাগণ বিভিন্ন দেশের বিষয়ে উপদেশ এবং পরামর্শ প্রদান করবেন কিভাবে তাদের সাথে কি রকম পররাষ্ট্র নীতি দিয়ে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালিত হবে।

৪। পরাশক্তি, আঞ্চলিক শক্তিবর্গ দেশসমূহের সাথে ভারসাম্য পূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট হতে হবে তাদের অভ্যন্তরীণ এবং রাজনৈতিল ব্যাপারে নাগ গলানোই দেশের জন্য মঙ্গল হবে।

৫। বাংলাদেশের বিপক্ষে যাতে কোনো গোষ্ঠী বিধব্বংসীপূর্ন কার্যকলাপ না চালাতে পাড়ে প্রতিবেশী দেশের ভূ -খন্ড ব্যবহার করে আর বাংলাদেশ কেউ সচেতন থাকা লাগবে বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার কোনো জঙ্গী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যাতে না ব্যবহার করতে না পাড়ে।

৬। মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। সম্পর্কের পরিধ বাড়াতে হবে সাংস্কৃতিক, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে। বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং নীতি গ্রহণ করতে হবে।

৭। আফ্রিকা মহাদেশীয় এঞ্চলের দেশসমূহের সাথে সম্পর্ক তৈরি এবং উন্নতকরণ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

ব্যাখ্যা

আমিনুর রহমান (Aminur Rahman)