পৌর নির্বাচনের কারচুপিনামার কিছু খতিয়ান

0

জিসাফো ডেস্কঃ সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রেকর্ড পরিমাণ ভোট পেয়েছে। আর বিএনপি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছে। ভোট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩১টি পৌরসভায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। এর মধ্যে ১৪টিতে পেয়েছে ৯০ শতাংশের ওপরে। এ গুলোসহ ২০৭টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ গড় ভোট পেয়েছে ৫৩.৫৪ শতাংশ। আর ২০৪টি পৌরসভায় বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের হার ২৭.৬৭ শতাংশ। এ ছাড়া ২৮ পৌরসভায় বিএনপি ১০ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছে। নির্বাচন বিশ্লেষকেরা এই ফলকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় ভোট গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে সাতটিতে আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে। আর নানা অনিয়মের কারণে ২০টি পৌরসভায় ফল প্রকাশ স্থগিত করেছে কমিশন। এই প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের ফলাফল বিবরণীতে প্রাপ্ত ২০৭টি পৌরসভার ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।এবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের অতীত পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করে কমিশন সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই নির্বাচনের এই ফলকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করছেন।

২০০৮ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পেয়েছিল যথাক্রমে ৪৮.০৪ ও ৩২.৫০ শতাংশ ভোট। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭২.৫৯ শতাংশ ভোট পেলেও এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। বিএনপি ইতিমধ্যে এই পৌর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, তথ্য-উপাত্তই বলে দিচ্ছে ভোটের দিন বাস্তবে কী ঘটেছিল। বিশেষ বিশেষ পৌরসভায় ক্ষমতাসীন দল যে ৯০ শতাংশের ওপরে ভোট পেয়েছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। এ বিষয়ে জানতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে ফোন করে পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, এসব তথ্য-উপাত্ত এখনো তিনি দেখেননি। দেখে-শুনে পরে মন্তব্য করতে পারবেন বলে তিনি জানান।

৮০ শতাংশের ওপরে আওয়ামী লীগের ভোট: নির্বাচন কমিশনের ফলাফল বিবরণী অনুযায়ী, যে ১৪টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছে সেগুলো হলো: সন্দ্বীপ (৯৭.৮১), কাজীপুর (৯৬.৮২), গফরগাঁও (৯৫.৫৭), বারইয়ারহাট (৯৫.৫১), মিরসরাই (৯৩.৪৮), রাউজান (৯০.৩৫), গৌরনদী (৯৪.৮০), মুলাদি (৯০.২৭), বানারীপাড়া (৯০.৪৬), রায়পুর (৯২.৭২), নলছিটি (৯১.৬৫), ভোলা (৯০ শতাংশ), বোরহানউদ্দিন (৯০.৪০) ও দৌলতখান (৯১.১৩)।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ৯০ শতাংশের বেশি আর বিএনপি ৩ শতাংশের কম ভোট পাবে, এটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে কখনোই এমন হওয়ার কথা নয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলছেন, এ ধরনের তথ্য প্রমাণ করে এ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা ৮০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পেয়েছেন মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, রাঙ্গুনিয়া, সাতকানিয়া, চান্দিনা, দাউদকান্দি, দাগনভূঞা, দেওয়ানগঞ্জ, জামালপুর, রামগঞ্জ, রামগতি, মুন্সিগঞ্জ, কলাপাড়া, স্বরূপকাঠি, পাংশা, গোপালপুর ও মাধবপুরে

ভোটের এ পরিসংখ্যান সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা এখনো সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেননি। বিশ্লেষণের পর এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।

বিএনপি ৫০-এর ওপরে ও ১০-এর নিচে: বিএনপি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে বগুড়ার গাবতলী, দিনাজপুর, শ্রীপুর, সৈয়দপুরপঞ্চগড়ে। ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিএনপির প্রার্থীরা ২৪টি পৌরসভায় এক হাজারের কম ভোট পেয়েছেন। এর মধ্যে ১১টি পৌরসভায় বিএনপির ভোট পাঁচ শরও কম।

বিএনপির প্রার্থীরা ১০ শতাংশের নিচে ভোট পেয়েছেন এমন পৌরসভার মধ্যে আছে কেশরহাট (শূন্য দশমিক ৯০), কাজীপুর (১.০৪), চৌদ্দগ্রাম (১.৬৮), গোয়ালন্দ (১.৮৮), জাজিরা (১.৯০), সন্দ্বীপ (২.১০), হাতিয়া (২.১৯), কালিয়া (২.৯২) ও করিমগঞ্জ (২.৯৭)।

দলের এই ফল সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির পৌর নির্বাচন মনিটরিং সেলের সদস্যসচিব ও দলের যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, যে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নেই, সেই নির্বাচনে কে কত ভোট পেল তাতে কোনো কিছু যায় আসে না। সব জয় আনন্দের নয়, সব পরাজয়ও বেদনার নয়। . প্রতিদ্বন্দ্বিতা: তিনটি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে এক শর কম ভোটে। এর মধ্যে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বিএনপি ১৪ ভোটে হারিয়েছে আওয়ামী লীগকে। সিলেটের শায়েস্তাগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ৮৩। রাজশাহীর তানোরে এ পার্থক্য মাত্র ১৩ ভোট।

ছয়টিতে দুই দলের ভোটের ব্যবধান ছিল ১০০ থেকে ৫০০। এগুলো হলো: ধামরাই, নজিপুর, পুঠিয়া, রায়গঞ্জ, শেরপুর ও ভূঞাপুর।

১৩টি পৌরসভায় জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ভোটের মধ্যে। এর মধ্যে বিএনপি জিতেছে তিনটি পৌরসভায়। এগুলো হলো: বগুড়ার সান্তাহার, ময়মনসিংহের ফুলপুর ও নাটোরের গোপালপুর।

অন্য দলের হিসাব: ফলাফল থেকে দেখা যায়, ২০৭টি পৌরসভায় ভোট পড়েছে ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৮। জাতীয় পার্টির (জাপা) ৭০টি পৌরসভায় প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ ভোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৫১টি পৌরসভায় প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এ ছাড়া জাসদ ১৯টি পৌরসভায় ৩ দশমিক ৩০, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬টি পৌরসভায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৪টি পৌরসভায় শূন্য দশমিক ৭১ শতাংশ এবং এনপিপি ১৭টি পৌরসভায় শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

আ.লীগ যেখানে ৯০%–এর বেশি ভোট পেয়েছে:

রাউজান:আ.লীগ(২৮,১৬২)বিএনপি (২,১২০),

সন্দ্বীপ:আ.লীগ(২০,৬৯০) বিএনপি (৪৬৪)

নলছিটি:আ.লীগ( ১৩,০৪৬) বিএনপি (৬২৬)

রায়পুর : আ.লীগ (১৩,৮৪৬) বিএনপি (৬৯০)

কাজীপুর: আ.লীগ(৭,৮২৫) বিএনপি (৮৪)

গৌরনদী :আ.লীগ(১৮,৯৫৯) বিএনপি (৭৭৬)

বানারীপাড়া:আ.লীগ (৫,৩৫৫) বিএনপি (৪৪৩)

গফরগাঁও:আ.লীগ (১২,৭১২) বিএনপি (৫৮৯)

বারইয়ারহাট:আ.লীগ (৫,০৬৬) বিএনপি (২৩৮)

মুলাদী :আ.লীগ(৯,৩৫৮) বিএনপি (৫৯৬)

মিরসরাই:আ.লীগ (৭,২৯৭) বিএনপি (৪৭৫)

দৌলতখান:আ.লীগ (৬৯৭৪) বিএনপি (৬৭৯)