পৌর নির্বাচনকে ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি

0

ঢাকা : সরকারের প্রভাব বিস্তারের কথা মাথায় রেখেই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচনকে ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে বিএনপি।

প্রতিকূল পরিবেশেও কীভাবে সর্বোচ্চ ফল ঘরে তুলে নেওয়া যায় সেজন্য চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ আর কৌশল নির্ধারণ। সে জন্য প্রার্থীদের সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে সমন্বয় করতে কাজ করছে দলটির বেশ কয়েকটি টিম।

এদিকে নির্বাচনের আগে প্রচারণায় নামতে পারেন স্বয়ং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও। তবে বিষয়টি নির্ভর করছে পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

দেশের ২৩৬ পৌরসভায় ৩০ ডিসেম্বর ভোটের তারিখ রেখে নির্বাচনের তফসিল গত মঙ্গলবার ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। আগ্রহী প্রার্থীরা ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর। বৈধ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৩ ডিসেম্বর। প্রার্থীদের নিয়ে ভোট হবে ৩০ ডিসেম্বর।

এই প্রথম দলীয় প্রতীকে পৌরসভায় নির্বাচন হচ্ছে। এক্ষেত্রে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নের সুযোগ রাখা হলেও কাউন্সিলর পদে স্বতন্ত্রভাবে আগের নিয়মে হবে।

জানাগেছে, এবারই প্রথম পৌরসভার মেয়র পদটি দলীয় প্রতীকে হওয়ার কারণে বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। বিশেষ করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পৌর নির্বাচনে দলের জনপ্রিয়তা কোন পর্যায়ে আছে তা বিশ্লেষণ করতে চাইছে বিএনপি। এর ওপরই ভিত্তি করে পরবর্তী সরকার বিরোধী আন্দোলনের কথা ভাবতে চাইছেন দলটির নেতারা।

তাদের ধারণা, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের ৭০ ভাগেরও বেশি জয়ী হতে পারেন।

এদিকে কাঙ্খিত ফল নিজেদের পক্ষে নিতে এরই মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে বেশ কয়েকটি টিম কাজ শুরু করেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান রয়েছেন এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে। জেলার নেতাদের কাছে এরই মধ্যে যে কোনো তথ্য দ্রুত কেন্দ্রে পাঠাতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যাতে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরা যায়। এজন্য কাজ করছে দলের দফতরের আলাদা একটি টিম।

দলীয় সূত্র বলছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কৌশল ঠিক করছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে পৌর ভোটের আগে নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। আর প্রার্থীদেরও কৌশলী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি এরই মধ্যে ২৩৬টি পৌরসভায় তাদের প্রার্থী চুড়ান্ত করে ফেলেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে দু’একদিনের মধ্যেই তালিকা গণমাধ্যমে জানানো হতে পারে।

দলের কেন্দ্রীয় দু’জন নেতা জানিয়েছেন, পৌর নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম কৌশল হচ্ছে দলটির নেত্রী খালেদা জিয়াকে প্রচারণায় নামানো। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রচারণায় নামার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। পৌর নির্বাচনে তিনি প্রচারনায় নামলে তা দলের প্রার্থীদের অনুকুলে জাগরণ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন নেতারা। তবে সার্বিক বিষয়ই নির্ভর করছে পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। কারণ, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে গিয়ে রাজধানীতেই কয়েক দফায় হামলা শিকার হয়েছের খালেদা জিয়া। এই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

আশঙ্কা স্বত্ত্বেও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির প্রার্থীদের ব্যাপক জয় হবে। একই সঙ্গে সরকারের জনপ্রিয়তা নেই বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তাও প্রমাণিত হবে। অপরদিকে সরকার কারচুপি করলে আবারও প্রমাণিত হবে এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তারা মনে করেন, বিএনপির হারানোর কিছু নেই, সে জন্য দু’দিক দিয়েই তারা লাভবান হবেন।

তবে নির্বাচনের আগে ধরপাকড়ে বেশ চিন্তিতও দলটির হাইকমান্ড। কারণ, সরকারের দমন-পীড়নের কৌশলে দলের হাজার-হাজার কর্মী ঘরছাড়া, কারারুদ্ধ। দলের নেতাদের ধারণা, বিরোধী রাজনীতিকে ন্যুনতম ডেমোক্রেটিক স্পেস বর্তমান সরকার দেয় না, এমন এক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলের পক্ষে সমান সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুরুহ হয়ে উঠবে। সরকার সেই সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে চাইবে।

এদিকে, যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন ‘কার্যকর ভুমিকা’ নিতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ড. রিপন বলেন, ‘সরকার সম্প্রতি বিরোধী রাজনীতিকে দমনের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থী ও দলীয় কর্মীরা গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরছাড়া হয়ে পড়েছেন। সারাদেশ কারাগারে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বাস্তবে নেই। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান কোন ভূমিকা এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে আমাদের দলের প্রার্থীদের দূরে রাখাই হচ্ছে বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। এই ধরনের কর্মকা- বন্ধ করা, গ্রেফতারকৃতদের নামে হওয়া মামলা প্রত্যাহার এবং তাদের মুক্তি দেওয়া না হলে পৌর নির্বাচন অবাধ হওয়ার সুযোগ নেই।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এম ওসমান ফারুক বলেছেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার করা হচ্ছে এবং প্রতিনিয়িতই এটি বেড়ে চলেছে। এ অবস্থায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকছে না। দলের মহাসচিবকে মুক্তি না দিলে, নেতাকর্মীদের মুক্তি না দিলে আমরা নির্বাচন করতে পারব না। এভাবে ধরপাকড় হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তাদের মুক্তি দিয়ে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।