পুলিশ আসলো,তারাই গুলি করল,পোড়ালো আবার তারাই আসামী করলো!

0

জিসাফো ডেস্কঃ হাসপাতালে কক্ষটা বড়ই। ভেতরে ঢুকে তাকাতেই দেখা গেল সারি সারি রোগীদের বিছানা। এক কোণে ঠাঁই হয়েছে পুলিশের গুলিতে আহত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সদস্য দ্বিজেন টুডুর। পাশেই বসে আছেন দ্বিজেনের বোন চরণ সরেণ। প্রথম কথা হলো তার সঙ্গেই। জানালেন, বুলেটের যন্ত্রণায় খুব কষ্ট পাচ্ছে দাদা। কথা বলছেন। কিন্তু খুব কষ্ট নিয়েই। চোখের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। চোখে রক্ত জমাট বেঁধেছে। ভেতর থেকে বের হওয়া পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।

গত ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে পুলিশ ও চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। এতে তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। আহত হন আরো অনেকেই। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন চরণ সরেন, বিমিল কিছকু ও দিনজেন টুডু। দ্বিজেন টুডু ঢাকায় চিকিৎসা নিতে এলেও অন্য দুজনকে রংপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তিনজনকেই পুলিশ গ্রেফতার দেখায়।

ব্যথা কোথায় জিঞ্জেস করলে ইশারায় দ্বিজেন কপালে হাত দিয়ে দেখান। চরণ জানালেন, চোখের ঠিক পরে সেখানে তিনটি বুলেট। মাথাতেও অনেক আছে।

দ্বিজেনকে প্রথমদিন থেকেই আটক করে হাতকড়া পরিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গণমাধ্যমে এই খবর প্রচার হলে আদালতে রিট আবেদন করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। পরে ১৪ নভেম্বর আদালতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটক তিন সাঁওতালের হাতকড়া খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশে গতকাল সন্ধ্যায় দ্বিজেনের হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়েছে। এজন্য ভালো লাগলেও ব্যথায় কাতরাচ্ছেন তিনি।

জমি নিয়ে কী ভাবছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই জমি আমাদের বাপ-দাদার। দীর্ঘদিন আমরা জমি ছাড়া থেকেছি। এভাবে আর নয়। আমরা আমাদের জমিতে ঘর করেছিলাম। সব ঠিক-ঠাক চলছিল। হঠাৎ করেই অরা আমাদের মারল, গুলি করল, পোড়াল। পুলিশ আমাদের মেরে আমাদেরই আসামি করল। মরে গেলেও ওই জমি ছাড়ব না।’

দ্বিজেন টুডু আরও বলেন, ‘মাথায় ও চোখে কয়েকটা গুলি লেগেছে। খুব ব্যথা লাগছে।’

সোমবার সন্ধ্যায় হাতকড়া খোলার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আগুন নই, পানি। ছোট থেকেই নির্যাতন দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। আমরা রাগ দেখেছি কিন্তু কখনো রাগ করিনি। কিন্তু এখন আমাদের সব কেড়ে নেওয়া হলো।

চরণ বলেন, অনেক বড় বড় লোক দাদাকে দেখতে আসছেন। দাদার জন্য তিনজন পুলিশ পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।

আহত দ্বিজেন টুডুর তিন সন্তান। ছোট সন্তানদের বাড়িতে রেখে স্ত্রী আসতে পারেননি। দ্বিজেন বলেন, তিনি একজন খেতমজুর। বাড়িতে স্ত্রী উলিবিয়া হেমব্রম এবং তিন সন্তান ইলিয় টুডু (১১), মারফিলি টুডু (৭) ও জিসায়েল টুডু (আড়াই বছর) রয়েছে। এছাড়া আছেন বাবা-মা। অন্যের কৃষি জমিতে কাজ করে এই সাত জনের সংসার চালান একমাত্র উপার্জনক্ষম দ্বিজেন।

গুলি লাগায় বাঁ চোখে আর দেখতে পাবেন না জানিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দ্বিজেন। তিনি বলেন, ‘ভাই ডান চোখটা যদি টিকে তাহলে হয়তো দেখতে পাব, কাজ করে সংসারটা চালাতে পারব। এখন ঝাপসা দেখছি।’

ডান চোখে দেখতে না পেলে তার সংসারে দুর্যোগ নেমে আসবে বলে কেঁদে ফেলেন দ্বিজেন।

চরণ বলেন, ‘আমাদের কাছে টাকা নাই। পেটে খাবারও নাই।’ কয়েকদিন আগে একজনের কাছ থেকে ধার করেছেন, দুজন কিছু চিকিৎসার খরচও দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

চরণ আরও বলেন, দাদাকে হাসপাতাল থেকে যে ভাত দেয় সেটাই ভাগ করে তারা দুজন খান।

দ্বিজেনের চিকিৎসার জন্য ডা. গোলাম হায়দারের নেতৃত্বে একটি পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট। বোর্ডের অন্যতম সদস্য এবং দ্বিজেনের চিকিৎসার দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. সাইফুদ্দিন আহমেদ পিন্টু বলেন, দ্বিজেন টুডুর বাঁ-চোখ ছররা গুলিবিদ্ধ হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবস্থা গুরুতর হওয়ার কারণেই মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা চলছে। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে তার চোখটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’