‘পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে’

0

বাংলাদেশে দিনে দুপুরে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের খুন করাটা রুটিনে পরিণত হয়েছে। ৩১ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় একটি অফিসে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। চাপাতি দিয়ে খুনিরা সেখানে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করে। একই দিনে আরেক প্রকাশক ও তার পাশে উপস্থিত আরও দু’জনকে গুরুতরভাবে আহত করা হয়েছে। আল কায়েদা থেকে অনুপ্রাণিত নিষিদ্ধ সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (আনসার-আল-ইসলাম) এ হত্যা সহ বাংলাদেশে বেশির ভাগ ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তাদের ‘হিট লিস্টে’ নাম রয়েছে, তাদের দৃষ্টিতে ইসলামের সমালোচকদের। সংগঠনটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ‘যারাই নাস্তিকদের সমর্থন দেবে, তাদের কাউকেই ছাড়া হবে না’।

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান নামে যখন পরিচিত ছিল বাংলাদেশ, তখন থেকেই উগ্র ইসলামপন্থিদের একটি ক্ষুদ্র অংশ রাজনীতিতে টিকে ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ চলাকালে এ ক্ষুদ্র অংশটিরই শক্তিসমেত বাড়তে থাকে। শাসকদল আওয়ামী লীগ এখনও দেশের একমাত্র মূলধারার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে বহাল রয়েছে। কিন্তু দলটির নেতা শেখ হাসিনা তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও এর ইসলামপন্থি শরিক জামায়াতে ইসলামী দ্বারা গঠিত বিরোধী জোট ধ্বংস করতে হন্য হয়ে আছেন। এটিই বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও সহিষ্ণু ঐতিহ্যকে দুর্বল করছে।

আইএস-এর মতো আন্তর্জাতিক সংন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশীয় ইসলামপন্থি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি একত্রিত হয়েছে, এ দাবি শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং, তার দল বিএনপি ও জামায়াতকে সামপ্রতিক খুনাখুনির নেপথ্য শক্তি হিসেবে অভিহিত করেছে।

কিন্তু দৃশ্যত আওয়ামী লীগও কিছু ইসলামী মৌলবাদীদের শক্তিশালী করছে। সমালোচকরা বলছেন, বিরোধী রাজনীতিক ও অন্য বিরোধীদের ওপর সরকারের ধরপাকড় অনেককে আরও বেশি চরমপন্থি গোষ্ঠীর দিকে ঠেলছে। এ ছাড়া নিজেদের ধর্মবিরোধী অক্ষ হিসেবে না দেখাতে, যার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর আন্দোলন সৃষ্টি হতে পারে, আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ আইন পাস না করার দাবির প্রতি নতি স্বীকার করে ইসলামী রক্ষণশীলদের তুষ্ট করছে। এ ছাড়া যারা ইসলামের ও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করছে, বেছে বেছে তাদেরই টার্গেট করতে মানহানি সংক্রান্ত আইন ব্যবহার করা হচ্ছে।

এক ইতালিয়ান সাহায্য কর্মী ও এক জাপানি খামারি সহ দুই বিদেশীকে গুলি করে হত্যার দায় আইএস স্বীকার করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সর্বশেষ চাপাতি হামলার ঘটনা ঘটল। ঢাকার কূটনীতিক এলাকাকে হাই-সিকিউরিটি জোনে পরিণত করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ প্রকাশকদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিদেশী হত্যার বিষয়টি হয়তো সমপর্কহীন। কিন্তু নিম্নমানের ও রাজনীতি-আচ্ছন্ন পুলিশি পদক্ষেপের মানে হলো, বিদেশী কিংবা স্থানীয়- কেউই কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করে না। নিজেদের ক্রিকেট  দলকে ঢাকায় ক্রিকেট সফরে পাঠানো নিরাপদ হবে কিনা এ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যখন সংশয়ে ছিল, তখনই ইতালিয়ান লোকটিকে হত্যা করা হলো। এ হত্যাকাণ্ড সফরটি বাতিলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

অন্য হত্যাকাণ্ডগুলো এক ধরনের ত্রাসের পরিবেশ নতুন ব্যাপ্তি যোগ করেছে। ২৪ অক্টোবর, পুরান ঢাকায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র শিয়া সমপ্রদায়ের ওপর বোমা হামলায় দুই জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। এ হামলাটি ছিল শিয়া সমপ্রদায়ের ওপর স্মরণকালের একমাত্র হামলা। উদারপন্থি অংশ সুফি ইসলামের অনুসারীরাও হামলার মুখে পড়েছে। লেখক, ব্লগার ও নারী সাংবাদিক, যাদের কেউ কেউ টেলিভিশনে পর্দা ছাড়া হাজির হয়েছেন, তাদেরকেও হুমকি দেয়া হয়েছে।

এ পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে। শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রেখেছেন, যার উদ্দেশ্য স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে ফায়দা অর্জন। নিজস্ব-ঘরানার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিটি) দণ্ডিত হয়েছেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। আরও দুই জ্যেষ্ঠ ইসলামী নেতা ফাঁসির জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।

আলি আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, যিনি জামায়াতে ইসলামির সাধারণ সমপাদক, খুন সহ পাকিস্তানপন্থি আধা-সামরিক গোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। সরকারি কৌঁসুলিরা বলছেন, এসবের জন্য মুজাহিদ দায়ী।

আরেকজন হলেন ধনাঢ্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, যিনি বেগম জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা ও পাকিস্তানের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সমপর্ক রয়েছে। বিচার চলাকালে তিনি তাকে দণ্ড প্রদানকারী বিচারকদের বিদ্রূপ করেছেন, বক্তব্যে ব্যাঘাত ঘটিয়েছেন। ১৭ই নভেম্বর এ দু’জনের একটি রিভিউ আবেদন শুনানির কথা রয়েছে। যদি আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, তবে এ বছরের শেষের দিকে হয়তো তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হতে পারে। এর ফলে সারা দেশে শহরগুলোতে অস্থিরতা ছড়াতে পারে।

সব শঙ্কার মধ্যেও যুদ্ধং  দেহী দুই বেগম (ব্যাটলিং বেগমস) একে অপরকে আক্রমণ দাগিয়েই যাচ্ছেন। লন্ডনে দীর্ঘ সফরে বেগম জিয়া সমপ্রতি শেখ হাসিনাকে ‘লেডি হিটলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলস্তম্ভ- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এর মধ্যে সর্বশেষ তিনটিই দৃশ্যত ধসে পড়ছে কিংবা হুমকির মুখে। স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশকে নিয়ে যে চিন্তা করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের অধীনে দেশটি সে লক্ষ্য থেকে ক্রমেই দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।