নূর হোসেন ফেরায় চিন্তিত শামীম ওসমান!

0

নারায়ণগঞ্জ : আলোচিত সাত হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জে ফিরিয়ে আনার পর তার কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন নিহতদের স্বজনরা। তার ফাঁসি দাবি করেছেন সবাই।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর নূর হোসেনকে হাজির করা হয় আদালতে। আদালত তাকে ১১ মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে সরাসরি জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে তাকে ঢাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে পেট্রাপোল সীমান্তে নূর হোসেনকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে ভারত। এরপর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে নিয়ে আসা হয় নারায়ণগঞ্জে। সকালে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছার পর থেকেই হৈচৈ পড়ে যায়। তখন থেকেই নিহতদের পরিবারের স্বজনরা ভিড় করতে থাকে আদালতপাড়ায়। কখন নূর হোসেনকে আনা হবে, কখন তার মুখ থেকে জানা যাবে হত্যার মূল কাহিনী- এ নিয়ে কৌতুহল বাড়তে থাকে সবার মাঝে।

একই সঙ্গে স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। তার ফাঁসি দাবি করে আদালতপাড়ায় নিহতদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা স্লোগান দেয়। ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, নূর হোসেনের ফাঁসি চাই। নূর হোসেনের দুই গালে, জুতা মারো তালে তালে’- এ রকম স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আদালতপাড়া। শুধু স্লোগান দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বিক্ষোভকারীরা, তারা নূর হোসেনের দিকে জুতাও নিক্ষেপ করে।

এদিকে নূর হোসেনকে ফিরিয়ে আনার পর থেকে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিহতদের লাশ উদ্ধারের দিন ২৯ এপ্রিল তার ভারতে পালিয়ে যাওয়া, দেশত্যাগের আগে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে ফোনালাপ- এসব বিষয় নিয়ে সে সময় নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নূর হোসেন ভারতে বন্দি থাকায় চাপা পড়ে গেছে সেসব প্রশ্ন। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে তার দেশে ফেরার পর সেগুলো নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। আর সে কারণে শামীম ওসমান অনেকটাই চিন্তিত বলে জানা গেছে তার কাছের লোকজনের কাছ থেকে।

গেল বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। ২৯ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাদের লাশ উদ্ধার হয়। গোয়েন্দা তথ্যমতে, সাতজনকে অপহরণ করার আগের দিন ২৮ এপ্রিল গভীর রাতে ঢাকার গুলশানে অবস্থান করছিলেন নূর হোসেন। পরদিন ২৯ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে ধানমণ্ডিতে অবস্থান করার সময় কথা বলেন এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে। তারপর থেকেই ফোন বন্ধ ছিল তার। গোয়েন্দাদের ধারণা, ওই রাতেই ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন নূর হোসেন।

একপর্যায়ে ভারতে পালানোর আগে শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনের কথোপকথোনের অডিও ফাঁস হয়। সাতজনকে অপহরণ ও খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে শামীম ওসমান সাহায্য করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। গণমাধ্যমে এসব খবর প্রকাশিতও হয়।

শামীম ওসমান ওই সময় নূর হোসেনের ফোন ধরে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘খবরটা পৌঁছাই দিছিলাম, পাইছিলা?’ জবাবে নূর হোসেন বলেন, ‘পাইছি, ভাই।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘তুমি অত চিন্তা করো না।’ নূর হোসেন এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শামীম ওসমানকে বলেন, ‘ভাই, আমি লেখাপড়া করিনি। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন। আপনারে আমি অনেক ভালোবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।’ জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘এখন আর কোনো সমস্যা হবে না।’ শামীম ওসমান ‘গৌর দা’ বলে এক লোকের সঙ্গে নূর হোসেনকে দেখা করতে বলেন।

ফোনালাপের এই পর্যায়ে নূর হোসেনের কাছে শামীম ওসমান জানতে চান, কোনো সিল (সম্ভবত ভিসা) আছে কি না। সিল থাকার কথা জানিয়ে নূর হোসেন বলেন, ‘আছে আছে, সিল আছে, কিন্তু যামু ক্যামনে? যেভাবে বলল অ্যালার্ট (রেড অ্যালার্ট)।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘তুমি আগাইতে থাক।’ নূর হোসেন তখন বলেন, ‘ভাই, তাহলে একটু খবর নেন। আমি আবার ফোন দেই।’

নূর হোসেনকে অভয় দিয়ে ফোনে শামীম ওসমান বলেন, ‘তুমি কোনো অপরাধ করো নাই। আমি জানি, ঘটনা অন্য কেউ ঘটাইয়া এক ঢিলে দুই পাখি মারতেছে।’ এ সময় শামীম ওসমান নূর হোসেনের কাছে জানতে চান, এই নম্বরটি (ফোন) নতুন কি না। নূর হোসেন ‘হ্যাঁ সূচক’ জবাব দেন। শামীম ওসমান বলেন, তিনি নূর হোসেনকে তার আরেকটি নম্বর পাঠাবেন যোগাযোগের জন্য।

গেল বছরের ২২ মে গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সরকারদলীয় এমপি শামীম ওসমান। বেসরকারি বিভিন্ন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাতখুনের আসামি নূর হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার কথা স্বীকার করেন। তবে তাকে ভারতে পালাতে সাহায্য করার কথা অস্বীকার করেন।

শামীম ওসমান ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘ওটা একটি গোয়েন্দা সংস্থার রেকর্ড করা ফোনালাপ। কারণ, টেলিফোন ট্র্যাকিং সাংবাদিকরা করেন না, এটা করেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা। আমার ফোনও সব সময় ট্র্যাকিং করা হয়। এটা জেনেও আমি ফোনে কথা বলি।’

তিনি দাবি করেন, ‘প্রকাশিত ফোনালাপের পুরো কথা এখানে নেই। আংশিক আছে, আংশিক নেই।’

সংবাদ সম্মেলনে সরকারদলীয় এই সংসদ সদস্য প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে ফোনে নূর হোসেন কথা বলছেন, গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা জানতেন ওই সময় নূর হোসেন ধানমণ্ডি-৪ নম্বর রোডে আছেন। তারা (গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা) যদি জানতেন নূর হোসেন ধানমণ্ডিতে আছেন, তাহলে তারা নূর হোসেনকে ধরলেন না কেন?’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর র‌্যাবের এক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল শামীম ওসমানের। সেদিন সেই কর্তকর্তা এমপিকে বলেছিলেন, ‘আমরা না বাঁচলে আপনিও বাঁচবেন না।’ এ বিষয়টি উল্লেখ করেন সরকারদলীয় এই এমপি।

ওই সময় তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের আগে ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত নূর হোসেন ভারতের বিভিন্ন নম্বরে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছিলেন। আর অপহরণের দিন বিকেল ৪টা পর্যন্ত তিনি সিদ্ধিরগঞ্জেই ছিলেন। ৫টার দিকে চলে যান চাষাঢ়া এলাকায়। ২৮ এপ্রিল সারাদিন ছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জে। ২৮ এপ্রিল গভীর রাতে চলে আসেন ঢাকায়। অবস্থান করছিলেন গুলশান এলাকায়। ২৯ এপ্রিল রাত ৯টায় ধানমণ্ডিতে অবস্থান করার সময় ফোন দিয়েছিলেন শামীম ওসমানকে।

এদিকে ২৭ এপ্রিল সাতজনকে অপহরণ করার পরপরই নজরুলের পরিবার নূর হোসেনের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ তোলে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তখন নারায়ণগঞ্জের রাইফেল ক্লাবে নূর হোসেনকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন শামীম ওসমান। ২৮ এপ্রিল নূর হোসেনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় মামলা করেন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম। ৩০ এপ্রিল লাশ উদ্ধারের পর নূর হোসেনকে আর দেখা যায়নি নারায়ণগঞ্জে।

চাঞ্চল্যকর এ সাত খুনের ঘটনার পরে হাইকোর্টের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতেৃত্বে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। গেল বছরের ১২ আগস্ট এ কমিটি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠান নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানকে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও তদন্ত কমিটির প্রধান শাহজাহান আলী মোল্লার নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা তাকে সচিবালয়ের ছয় নম্বর ভবনের ১৪০৫ নম্বর কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

যদিও আগের দিন তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হন নারায়ণঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে আইভী বলেছিলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের গডফাদাররা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের সঙ্গে জড়িত।’ তিনি নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবিও জানিয়েছিলেন তখন।

১২ নভেম্বর দিনগত রাতে নূর হোসেনকে দেশে আনার পর নিহতদের স্বজনরা নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন। তারা সাত খুন মামলার পুনঃতদন্ত দাবি করেছেন। তারা নূর হোসেনের সঙ্গে শামীম ওসমানের ফোনালাপের সতত্যর বিষয়টিও নিশ্চিত হতে চান।

এ প্রসঙ্গে নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনায় দেশের ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সাত খুনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহানুভুতি পেয়েছি। আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। নূর হোসেনকে আনার পর আমরা তার মুখ থেকে শুনতে চাই খুনের সঙ্গে আরও কে কে জড়িত।’

তিনি বলেন, ‘যে ছয় কোটি টাকা লেনদেনের কথা ওঠেছে সেই টাকা লেনদেনে নূর হোসেন একাই ছিলেন নাকি আরো কেউ ছিলেন সেটাও জানতে চাই। কেন সাতটা মানুষকে এতো নিষ্ঠুরভাবে খুন করা হলো। মামলার পুনরায় তদন্ত করা হোক। পুনরায় তদন্ত করে নূর হোসেনকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হোক।’

নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের ছোট ভাই মিজানুর রহমান রিপন বলেন, ‘নূর হোসেনের টাকায় র‌্যাব ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। নূর হোসেনই জানেন তার পেছনে কে কে আছে। আমরা চাই বিচারের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নারায়ণগঞ্জবাসী তথা সারাদেশের জনগণকে জানতে দেয়া হোক।’

নূর হোসেনের সঙ্গে ফোনালাপ, তাকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় সহায়তা করার গুজব আর শেষ অবধি তার ফিরে আসা বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়ার জন্য এমপি শামীম ওসমানের ফোনে বার বার যোগাযোগ করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি তার ফোনে এসএমএস পাঠালেও তার জবাব দেননি তিনি।

তবে এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘সাত খুনের ঘটনায় শামীম ওসমানের সম্পৃক্ততা পেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’