নারী উন্নয়ন ও শহীদ জিয়া

0

নারী উন্নয়ন ও শহীদ জিয়া
-অধ্যাপিকা ড. তাসমেরী এস. এ. ইসলাম

মহান রাষ্ট্রনায়ক, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদৎ বার্ষিকী সমাগত। তাঁর সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বা লিখতে বসলে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন অতিবাহিত হবে, কিন্তু শেষ হবে না। তাঁর কর্মময় জীবন ছিল এতটাই সমৃদ্ধ। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে কাজ করেছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এমন কোন সেক্টর নাই, যেখানে তিনি কাজ করেন নাই। সব সেক্টর নিয়ে লিখলে শেষ করা যাবে না। আমি আজ শুধুমাত্র নারী উন্নয়নে শহীদ জিয়ার অবদানের কথাই বলবো।

প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশ নিয়ে যখন ভাবতে শুরু করলেন, কিভাবে দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি আনা যায়- তানিয়ে কাজ করা শুরু করলেন, তখন তিনি অনুধাবন করলেন, একটি জাতির একটি অংশ যদি অবহেলিত থাকে, অনুন্নত থাকে, তাদের কর্মক্ষমতা যদি কাজে না লাগানো যায়, তাহলে সেই জাতির অগ্রগতি সম্ভব না। বাংলাদেশর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারী সমাজকে অবহেলিত করে রাখলে, চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখলে, শুধুমাত্র পুরুষকে কাজে লাগিয়ে কখনই জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। ১৯৭৬ সালের কথা বলছি। তখন কিন্তু সমাজ এত অগ্রগতি হয়নি। নারীদেরকে তখন ঘর, গৃহস্থালির কাজেই নিয়োজিত রাখা হত। সামাজিক বিধি-বিধান এবং কুসংস্কারে সবাই, বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ আচ্ছন্ন থাকতো। সেই সময় নারীদেরকে জাগ্রত করে তাদেরকে স্বাবলম্বী করা, শিক্ষিত করা, সংসারে এবং জাতীয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় শামিল করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়া সেই কাজটি অত্যন্ত সফল ভাবে, কঠোর হাতে করতে পেরেছিলেন। আজকে বাংলাদেশে অনেক বড় বড় নারী উদ্যোক্তা দেখা যায়, কিন্তু এটা কি ১৯৭৬ সালে সম্ভব ছিল? সেই সময় জিয়াউর রহমান যদি নারী সমাজকে ব্যবসা-বাণিজ্যে, চাকরী বা অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা না দিতেন, তবে আজ বড় বড় নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হতো না। তিনি গ্রাম ও শহরের নারীদেরকে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে লাগিয়েছেন। গ্রামের নারীদেরকে সংসারের কাজ-কর্মের পাশাপশি নিজের বাড়িতে বসে বা কয়েক বাড়ীর নারী একসাথে একজায়গায় বসে যাতে কাজ করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণের (যা প্রথমে ছিল সুদ মুক্ত, পরে স্বল্প সুদে) ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে। তার সময়ই বেসরকারী সংস্থার (এনজিও)’র বিস্তার ঘঠে। তাদেরকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছিলেন এবং একই সাথে এনজিও গুলো যাতে বেশী সুদ না নিতে পারে মহিলাদের কাছ থেকে, তাও কঠোরভাবে নজরদারী করতেন। শহীদ জিয়ার আমলে কুটির শিল্পের যে ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছিলেন, সেই কুটির শিল্পের সাথে সিংহভাগ দেশের গ্রামাঞ্চলের নারী সমাজকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। গ্রামের নারীদেও দ্বারা কুটির শিল্পের পণ্যসমূহ শুধুমাত্র দেশেই নয়, বিদেশেও বাজারজাত করতে শহীদ জিয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। শহরের মহিলাদের উন্নয়নেও তিনি সমভাবে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ঋণের ব্যবস্থা করে তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত করেছিলেন। নারীদেরকে প্রশাসনে সম্পৃক্ত করতে সরকারী চাকুরীতে নারী কোটা বৃদ্ধি করেছিলেন, শিক্ষকতা পেশায় অধিকহারে নারী নিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, নারী শিক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্য আজ যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়, তার উদ্যোগ কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়াই নিয়েছিলেন, তিনি যখন নারী পুলিশ নেয়ার সিন্ধান্ত নিলেন, তখন অনেক সমালোচনা হলো, বাধা আসলো, ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে। তিনি ধর্মীয় নেতাদের সাথে নিজে বসে আলাপ-আলোচনা করে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, এটা ধর্ম বিরোধী নয়, অনৈসালামিক নয়। তারা সেদিন প্রেসিডেন্ট জিয়ার কথায় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সে সময় তিনি শুধু পুলিশেই নয়, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ব্যাপক নারী সদস্য নিয়েছিলেন, এই গ্রাম প্রতি রক্ষা বাহিনী বা ভিডিপি তারই সৃষ্টি। তিনি স্বশস্ত্র বাহিনীতেও মহিলা নিতে চেয়েছিলেন, তিনি যদি আর ২/৩ বছরও বেচে থাকতেন, তবে তখনই তা বাস্তবায়ন হতো। শহীদ জিয়া নারী উন্নয়নে পৃথক মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে সেই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিয়োগ করে মহিলাদের উন্নয়নে কাজ শুরু করেছিলেন।

জাতীয় উন্নয়নে মহিলাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে শক্তিশালী করেছিলেন। রাজনীতিতে মহিলারা যাতে অধিকহারে সম্পৃক্ত হতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিজ দলে করেছিলেন। ধনী-গরীব সকল মহিলাদেরকেই তিনি জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করেছিলেন। মহিলাদের মধ্যে তিনি সাহস যুগিয়েছিলেন, আত্নবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে তখনই মহিলারা আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করেছিলেন, তারা নিজরো কাজ করে, অর্থ উপার্জন করে স্বাবলম্বী হতে পারবেন, তা দিয়ে সংসারেরও আদান রাখতে পারবেন, নিজেরা জমাতে পারবেন, ছেলে-মেয়েদেরকে উন্নত শিক্ষা, জীবন যাপনে সহয়তা করতে পারবেন। স্বামীর সাথে স্ত্রীরাও সংসারে অবদান রাখতে পারবেন। এত করে ক্ষমতায়ন যেমন হবে, তেমনি সমর্যাদাও বাড়বে। জিয়াউর রহমান সেই কাজটিই করেছিলেন। আরেকটি কাজ তিনি করেছিলেন নারী সমাজের জন্য। তা হচ্ছে বাল্য বিবাহ বন্ধ, যৌতক বন্ধ, নারী নির্যাতন বন্ধ। এ কাজে তিনি তখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, গ্রাম সরকারকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। ঢাকায় তাদেরকে ঢেকে এন বলেছিলেন, ইউনিয়নে এসব চলতে থাকলে তাদের চেয়ারম্যান ক্ষমতা থাকবে না। সেজন্য তখন স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা নিজ নিজ ইউনিয়নে বাল্য বিবাহ বন্ধে, যৌতক প্রথা বন্ধে, নারী নির্যাতন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তখন এসব অনেক কমে এসেছিল। আজ আরেকটি ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা আমার মনে পড়ছে, আপনারা হয়তো অনেকে জানেন, নতুন প্রজন্ম হয়তো জানেনা, তাদেরকে জানতে দেয়া হচ্ছেনা,একজন রাষ্ট্র নায়ক হয়েও তিনি প্রায় প্রতিদিন গ্রামে যেতেন, মাইলের পর মাইল হাটতেন, খাল কাটতেন, গ্রামে নারী-পুরুষের সাথে উঠান বৈঠক করতেন, তাদের সমস্যার কথা শুনতেন, সেখানে উপস্থিত সরকারী কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধিদের তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলতেন। তিনি যখন গ্রামের পর গ্রাম হেটে বেড়াতেন, তখন তার সাথে কিন্তু সাধারণ মানুষ থাকতেন, নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদেরকে নিতেন না। সাধারণ মানুষের প্রতি তার আস্থা বিশ্বাস এতই প্রবল ছিল।

কারণ তিনি জানতেন, তিনি কোন অন্যায়-অবিচার করছেন না, তাহলে ভয় কোথায়? আজকের এই কাজ কোন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান করতে পারবেন? তিনি যখন হাটতেন, রাস্তার পাশে, কিংবা গাছের ফাকে গ্রামের মহিলার দাড়িয়ে থাকতেন, তাঁকে দেখার জন্য। জিয়া এগিয়ে যেতেন তাদের দিকে, তাদের সাথে অতি সাধারণ মানুষের মত কথা বলতেন, সুখ-দু:খের কথা জানতে চাইতেন। অনেক সময়ের সাথের লোকজনদের রাস্তায় রেখে তিনি একা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তেন, মহিলাদের বলতেন, খুব পিপাসা লেগেছে, একটিু লেবু পানি খাওয়ান বা পেপে বা ডাব খাওয়ান। মহিলারা লজ্জায় মুখ লুকাতেন। এত বড় জায়গায় কেন তারা লেবু গাছ, ডাব গাছ, পেপে গাছ বা অন্যান্য ফল-ফুলের গাছ লাগান নাই-সব্জির গাছ লাগান নাই, তা জিজ্ঞাসা করতেন। তিনি বলতেন, এসব গাছ লাগালে, বাড়ীতে মেহমান আসলে বাজার থেকে অর্থ খরচ করে নাস্তা কিনে না এন গাছের ফল দিয়েই তাদেরকে আপ্যায়ন করতে পারবেন, ফল নিজেরাও খেয়ে শরীওে পুষ্টি আনতে পারবেন, আবার অতিরিক্ত ফল, সবজি বাজারে বিক্রয় করে কিছু বাড়তি অর্থ উপার্জন করতে পারবেন। তিনি বলে আসতেন, আগামী বছর আবার আসব, তখন কিন্তু গাছের ফল না খেয়ে যাব না। ঐ এলাকা ত্যাগের আগে স্থানীয় সরকারী কর্মকর্তা এবং চেয়ারম্যান, মেম্বারদের বলে আসতেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে প্রত্যেক বাড়ীতে খালি জায়গায় বাড়ির লোকজন ফল, ফুল, সবজি বাগান করে এবং ছোট পুকুর বা ডোবার মধ্যে মাছের চাষ করে, হাস-মুরগী পালন করে, তা তদারকী করে তাকে যেন জানানো হয়। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি রাতে গিয়ে নিজের ডায়রীতে টুকে রাখতেন, ৬ মাস পর হয়তো ঐ কর্মকর্তা বা চেয়ারম্যান সেই কথা ভুলেই যেতেন, তিনি কিন্তু ভুলতেন না। কোন কোন সময় তিনি নিজে তাদেরকে ফোন করে বা তার সচিব, একান্ত সচিবদেরকে দিয়ে ফোন করিয়ে কাজের অগ্রগতি জানতে চাইতেন। ফোন পেয়ে স্থানীয় কর্মকর্তারা ছুটতেন ঐ এলাকায়, ৬মাস আগে যেখানে প্রেসিডেন্ট জিয়া ঘুরে এসেছেন, গ্রামবাসীকে গাছ লাগানোর, হাস-মুরগী পালন করা বা পুকুর-ডোবায় মাছ চাষ করা গরু-ছাগল পালার পরামর্শ দিয়ে এসেছিলেন। তারা গিয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখতেন গ্রামবাসী তাদের প্রিয় প্রেসিডেন্টের পারামর্শ ভুলে যান নাই, তারা তাদের প্রেসিডেন্টের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। এই হলো আমাদের প্রিয় নেতা জিয়াউর রহমান। এমন রাষ্ট্রপ্রধান কি আমরা আর দেখতে পাবো? আজ তার শাহাদৎ বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালবাসা।

(২০১৬ সালে বিএনপিবিডি.ওআরজি’র বিশেষ আয়োজন “শহীদ জিয়ার কর্মময় জীবন ভিত্তিক আলোচনায়” প্রদত্ত বক্তব্য হতে সংক্ষেপিত।)