নতুন বেতন কাঠামো: দুর্ভোগে সিংহভাগ মানুষ

0

জিসাফো ডেস্কঃ বেতন বেড়েছে সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তার। কিন্তু দুর্ভোগে পড়েছে দেশের সিংহভাগ মানুষ। মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষকরা। একইভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বেতনবৈষম্য দূরিকরণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করায় ক্ষুব্ধ রয়েছেন কর্মচারীরাও। বেতন বৃদ্ধির খবরে ইতোমধ্যে বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যদিও নতুন বেতনের টাকা চাকরিজীবীদের হাতে এখনও আসেনি। এর আগেই বাড়ানো হয়েছে পরিবহন ভাড়া। এছাড়া, ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় বেড়ে গেছে বাড়িভাড়া। এর প্রভাবে বাড়তে শুরু করেছে মূল্যস্ফীতির হারও। বেতন বৃদ্ধির গ্যাড়াকলে পড়েছেন শিক্ষার্থীরাও। এ ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো: দুর্ভোগে সিংহভাগ মানুষ

সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর থেকে এমপিওভুক্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বেতন প্রায় অর্ধেকেরও বেশি বৃদ্ধি করেছে রাজধানীর উইলস লিট্ল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাই স্কুলসহ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ঘটনায় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০১৬ শিক্ষাবর্ষে ধার্যকৃত অতিরিক্ত বেতন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অভিভাবক ফোরাম।

কেবল উইলস লিট্ল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজই নয়, নতুন বেতন কাঠামোর কারণে দেশের অধিকাংশ স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অতিরিক্ত বেতন গুনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা। আবার শুধু যে, শিক্ষার্থীদের বেতন বেড়েছে, তাও নয়। সরকারি বিভিন্ন সেবার ফি ও কমিশনের পরিমাণ ও হারও বাড়ানো হয়েছে। গত বছর বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে যেখানে লেগেছে ৮ হাজার টাকা, এবার লাগছে ১৫ হাজার টাকা। স্কুলে বাচ্চার যাতায়াতের জন্য মাইক্রোবাসের ভাড়া ছিল ৩ হাজার টাকা। নতুন বছরে দিতে হচ্ছে ৪ হাজার টাকা। বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার খরচ আরও বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে চিকিৎসা খরচও। নতুন বছরে এ খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো কিছু ওষুধের দাম বাড়ানোর জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে আবেদন করেছে।


বেতন বৃদ্ধির খবরে ইতোমধ্যে বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে

নতুন বছর শুরুর আগেই বাসা ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়াদের দিয়েছেন। এলাকাভেদে ভাড়া বাড়ছে ১ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। কোনও-কোনও এলাকায় তা আরও বেশি। শুধু রাজধানীই নয়, বিভাগীয় শহর ও থানা এলাকায় বাড়িভাড়াও বেড়েছে। গতবছরই গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। যা পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে বর্ধিত মূল্য সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে পানির বিলও বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার নৈশ্যপ্রহরীর বেতন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ডিশ লাইনের ফিও বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে পরিবহন ব্যয়সহ প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে। জিনিসপত্রের দামও বেড়ে গেছে। এই ভরা শীতের সময়ও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের নিত্যপণ্য। জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বমুখীর সঙ্গে এর আগেই বেড়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। সব মিলিয়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গিয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নভেম্বর মাসের তুলনায় ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ডিসেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা নভেম্বরের চেয়ে দশমিক ০৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, শুধু নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার কারণেই ২০১৫ সালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, নতুন পে-স্কেলের কারণে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ওপর প্রভাব পড়ে। এ কারণে ওইসব জিনিসপত্রের দামও বেড়ে গেছে। এছাড়া হাতে নগদ টাকা বেশি থাকলে একটু স্বাচ্ছন্দে থাকতে পছন্দ করেন অনেকে। এ কারণে বাড়িভাড়াও বেড়ে যায়।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ সরকারি চাকরিজীবী নতুন কাঠামোতে বেতন পাবেন। এই সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা বাড়লেও বেসরকারি খাতের কর্মকর্তাদের তেমন বাড়ছে না। বরং বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো না থাকা ও ব্যবসায়িক মন্দার কারণে নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না অনেকে। কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন-ভাতা কমিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমাতে গিয়ে কিছু কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতও করেছে।

বেতন বৃদ্ধির খবরে বেড়েছে পরিবহন ভাড়া


এ প্রসঙ্গে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বেতন বাড়ছে সরকারি কর্মকর্তাদের। কিন্তু বাসা ভাড়া বাড়ছে সবার। এর সঙ্গে সবাইকে অতিরিক্ত ফি দিয়ে বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গত বছর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সব সেক্টরেই পড়েছে। তিনি বলেন, বাসা ভাড়া, পণ্যমূল্য বাড়ার প্রভাব সবার ওপরই পড়বে। এ কারণে বেসরকারি খাতেও বেতন বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকারের নজর রাখা উচিত।

এদিকে, যেসব কর্মকর্তার বেতন বেড়েছে, তারারও সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। সরকারের ঘোষিত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলকে বৈষম্যমূলক, হতাশাজনক ও অপমানমূলক আখ্যায়িত করে আন্দোলনে নেমেছেন সরকারের বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিশেষ করে নতুন পে-স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করায় কর্মচারীরা বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে। বেতন বৈষম্যদূরিকরণ ও পদমর্যাদা সম্মানজন করতে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন ২৬টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা।

সোমবার থেকে ৫ দফা দাবিতে ৩৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। এ কারণে এদিন থেকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মবিরতি কর্মসূচি চলবে। শিগগিরই দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষকদের লাগাতার আন্দোলনের কারণে প্রায় সোয়া দুই লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। আন্দোলন প্রলম্বিত হলে শিক্ষার্থীরা নতুন করে সেশনজটে পড়বেন। এতে দীর্ঘায়িত হবে শিক্ষাজীবন।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, দাবি না মানা পর্যন্ত শিক্ষকদের এই কর্মবিরতি চলবে। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্দোলন চলাকালে নতুন করে কোনো পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হবে না।

ইতোমধ্যেই বেড়ে গেছে বাসা ভাড়া


সরকারি কলেজ শিক্ষরা এ কর্মসূচি পালন করেছেন। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, এও, পিওসহ কর্মচারীরাও নেমেছেন আন্দোলনে। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করার প্রতিবাদে আন্দোলন চলছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিরা।

এ প্রসঙ্গে সিজিএ কর্মচারী সমিতি ও অডিটরস ওয়েলফেয়ারে অ্যাসোসিয়েশনর সভাপতি এ কে এম শাহজালাল মিঞা বলেন, নতুন পে-স্কেল বাজারে অরাজকতা সৃষ্টি করা ছাড়া তেমন কোনও কাজে আসবে না। সরকারের ইমেজ নষ্ট করার জন্যই কিছু আমলা এমন বৈষম্যমূলক বেতনের সুপারিশ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে, সরকারি কলেজের ১৫ হাজার শিকক্ষ লাগাতার কর্মবিরতি পালন করেছেন। এর ফলেই সরকারি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমে এ স্থবিরতা নেমে এসেছে। ঘোষিত অষ্টম বেতন স্কেলে অধ্যাপকদের পদমর্যাদা ও বেতনক্রম অবনমন, পদ আপগ্রেড, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বহাল, বৈষম্য নিরসনে সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে পদোন্নতি নিশ্চিত করার দাবিতে সরকারি কলেজ শিক্ষকরা এ কর্মসূচি পালন করেছেন।

অন্যদিকে পে-স্কেলে বৈষম্য ও গ্রেড অবনমনের প্রতিবাদে ২২ ডিসেম্বর থেকে আন্দোলন করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। অবশ্য আগামী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এই আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। আগের সব বেতন স্কেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক, বিসিএস ক্যাডার ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা একই গ্রেভুক্ত ছিলেন। কিন্তু নতুন বেতন স্কেলে সহকারী পরিচালক পদ এক ধাপ নিচে নামিয়ে নবম গ্রেডে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংককে অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে একই ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। এই পদাবনমনের প্রতিবাদে কর্মকর্তারা আন্দোলন করে আসছিলেন।

এ প্রসঙ্গে আন্দোলনের প্রধান আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান মোল্লা বলেন, এই আন্দোলন বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন। একটি চক্র বাংলাদেশ ব্যাংককে মেধাশূন্য করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছে।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর ড. ফরাসউদ্দিন কমিশন অষ্টম পে-স্কেলের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। এ নিয়ে পরে কাজ করে সচিব কমিটি। এ কমিটি গত বছরের ১৪ মে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনের অসঙ্গতি নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তা আমলে না নিয়ে ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভায় পে-স্কেল অনুমোদন হয়। প্রজ্ঞাপন জারি হয় ১৫ ডিসেম্বর।