ধু-ধু বালুচরে ‘ঘোড়ার গাড়ির রাস্তা’!

0

জিসাফো ডেস্কঃ যেখানে মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তা নেই । সেখানে ঘোড়া পরিবহন বা অন্যান্য যানবাহনের জন্য রাস্তার কথা ভাবতেই পারে না বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষ।

উত্তরজনপদের তিস্তা যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর ধু-ধু বালুচরে মানুষের হাঁটাপথ নেই। নেই নির্দিষ্ট কোনো যানবাহন চলাচলের রাস্তা। ঘাড়ে করে মালামাল বহন করতে হয় মাইলের পর মাইল ধু-ধু বালুচরে। সে কারণে চরাঞ্চলের মানুষ তাদের কষ্টের লাঘব করতে এবার নিজ উদ্যোগে বালুচরে স্থানীয় পদ্ধতিতে রাস্তা তৈরি করেছে।

যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চল মোল্লার চরের চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান সরকার জানান, কোনো কোনো চরে সরকারি টাকায় বালুচরে রাস্তা তৈরি করলেও তা প্রতিবন্যায় ধ্বসে যায়। আর রাস্তাও তৈরি করা হয় অস্থায়ী ভিত্তিতে। যে কারণে চরাঞ্চলে পায়েচলা পথ বলতে বালুচর আর জমির আইল। বন্যার চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের চলাচলের একমাত্র বাহন নৌকা। কিন্তু পানি শুকিয়ে গেলে এ এলাকার মানুষ পড়ে চরম বিপাকে। চারিদিকে ধু-ধু বালুচরে যানবাহন তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটে চলাও দুস্কর হয়ে পড়ে।
স্থানীয় উদ্যোগে কাশিয়া ও ভুট্টার পরিত্যক্ত ডাটাসহ স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে করা হয়েছে এক ব্যতিক্রম রাস্তা। নাম দেয়া হয়েছে ঘোড়া পরিবহন সড়ক। তবে ঘোড়ার গাড়িসহ সাইকেল, মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন যানবাহন চলাচল অনেকটা সহজ হয়েছে।

উত্তর জনপদের রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অন্তত ৬৫ হেক্টর এলাকাজুড়ে বালুচর। শুধুমাত্র গাইবান্ধার ১শ ৩০টি চরাঞ্চলে অন্তত তিন লাখ মানুষের বসবাস। আছে হাটবাজার দোকানপাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্ষায় সহজে নৌকা চলাচল করা যায়। বর্ষায় নদীপথে সহজেই ও সস্তায় যাতায়াত করা যায় রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে চরাঞ্চলের মানুষের দুর্বিসহ জীবন যাপন করতে হয়। দীর্ঘদিন থেকে মাইলের পর মাইল উত্তপ্ত বালু চর দিয়ে হেটে যেতে হয়। প্রখর রোদ আর পায়ে হেটে মাইলের পর হেটে চলার কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পরে। ব্যবসা বাণিজ্যে ভাটা পরে। ফলে চরাঞ্চল থেকে দুধসহ বিভিন্ন পণ্য শহরে আসতে পারে না। চরাঞ্চলের মিষ্টি কুমড়া, মসুর ডাল, মরিচ, ভুট্টাসহ নানা কৃষিপণ্য ঘাড়ে করে বহন করে নিয়ে আসতে হয়। বিরান বালুচরে গরুর গাড়িও চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বাধ্য হয়েই স্থানীয় বাসিন্দারা চরে ঘোড়ার গাড়ি প্রচলন করেন তিন বছর আগে। ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল ও মালবহন করা হয় এসব চরে। ফলে পণ্যের দামও হয়ে যায় চড়া। তাই চলতি শুকনো মৌসুমে রংপুর, কুড়িগ্রামের রৌমারী-রাজিবপুর যোগাযোগের জন্য ঘোড়ারগাড়ি চলাচলের রাস্তা তৈরি করেন।

এদিকে গাইবান্ধার চরাঞ্চলে চরবাসীরা নিজ উদ্যোগে রাস্তা তৈরি করেছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার চর গজারিয়া থেকে ট্যাংড়াকান্দির চর হয়ে দীর্ঘ ৭ কিলোমিটার চাঁদা তুলে ঘোড়ার গাড়ি চলার জন্য রাস্তা তৈরি করেন। তবে রাস্তায় চলাচলের জন্য যানবাহনের প্রকার ভেদে নেয়া হয় নামমাত্র টাকা। আর এই টাকায় চলে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ।

ফুলছড়ির আয়েন উদ্দিন ও মোজাম্মেল হক জানান, রাস্তা তৈরি করতে কাশিয়া, খড় ও ভুট্টার ডাটা বিছানোর কাজ করে আমরা রাস্তা তৈরি করেছি। চরাঞ্চলের মানুষের অনেক কষ্ট দূর হয়েছে। সহজে কম পয়সায় ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল আনা-নেয়া করা যায়। নিয়মিত পানি দেয়ার জন্য শ্রমিক রাখা হয়েছে, তারা তদারকি করেন। সেজন্য টোল হিসাবে কিছু টাকা আদায় করা হয়।

ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানান, মানুষের চাহিদার কারণে তারা নিজেরাই চাঁদা তুলে ঘোড়া পরিবহনের জন্য রাস্তা তৈরি করেছেন। কিন্তু সে রাস্তা দিয়ে শুধু ঘোড়া পরিবহনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে না। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শ শ মোটরসাইকেল চলাচল করছে। তাতে করে চরাঞ্চলের চাকরিজীবীরা প্রতিদিন সময়মতো কাজ করতে পারছে।