দুই সাহসী ও দেশপ্রেমিক সৈনিক: কাজী নজরুল ইসলাম ও মেজর জিয়া

0

বিশ্ব মানবতার কবি নজরুল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনেক কিছুই আমাদের অজান্তেই ভাগ্য একই সুত্রে গ্রথিত করে রেখেছে। দুজনই সৈনিক।দুজনেই করাচীতে বেংগল রেজিমেন্টের মাধ্যমে সৈনিক জীবনের যাত্রা শুরু করেছেন। একজন শুরু করেছেন ১৯১৭ সালে, আরেকজন শুরু করেছেন ১৯৫৩ সালে। দুজনেরই প্রথম কর্মস্থল করাচী। আর দুজনই শেষ জীবনে ঢাকায় ছিলেন। দুজনেরই পূর্বপূরুষ ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত।

১৮৯৯ সালের ২৪শে মে (১৩০৬ বাংলা সালের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) নজরুল বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামের পীরপুকুর পাড়ে জন্মগ্রহন করেন। কাজীবাড়ীর পূর্বপার্শ্বে ছিল নরোত্তম সিংহের গড়।পশ্চিমপার্শে ছিলো হাজী পাহলোয়ান শাহের পুকুর। পীরের মাজার ছিলো পশ্চিম পাড়ে। ১৭৬৫ সালে পাটনার পতন হলে কাজী কেফায়েত উল্লাহ,যিনি নবাবের প্রধান কাজী ছিলেন পীরপুকুর পাড়ে বসতি স্থাপন করেন। তখন থেকেই কাজী পরিবার মসজিদ ও মক্তবের খাদেম হিসাবে জীবন যাপন করতে শুরু করেন। তাঁরা কখনই নিজদের পূর্ব পরিচয় জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করেননি। রাজনৈতিক কারণেই আত্মগোপন করেছিলেন।

কাজী পরিবারে আধ্যাত্ববাদ ও পীরাকী ধারার শুরু হয়েছে হজরত গোলাম নকশবন্দ থেকে। জন্মসূত্রেই নজরুল আরবী ফার্শী উর্দু চর্চার সুযোগ লাভ করেছেন। কবি এই ভাষাগুলো সাবলীল ভাবে লিখতে ও পড়তে পারতেন। তাঁর নিজ হাতের হিন্দি লেখাও আমরা দেখেছি।

জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯শে জানুয়ারী বগুড়ার বাগবাড়ী গ্রামে একটি শিক্ষিত সংস্কৃতিবান পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবা মনসুর রহমান ছিলেন সরকারে সিনিয়র কেমিস্ট। মা জাহানারা খাতুন রাণী ছিলেন জলপাইগুড়ির বিখ্যাত চা বাগানের মালিক আবুল কাশেমের কন্যা। তিনি একজন সুকন্ঠী নজরুল সংগীত শিল্পী। করাচী বেতারে তিনি নিয়মিত গাণ পরিবেশন করতেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দাদা ছিলেন মৌলভী কামাল উদ্দীন। তিনি একজন আধ্যাত্ববাদী পুরুষ ছিলেন। তিনি খুবই সাদাসিধে পীরের জীবন যাপন করতেন। দাদার এই জীবনযাত্রা ছিল জিয়ার ব্যাক্তিগত জীবনের আদর্শ। মেজর জিয়ার ডাকনাম ছিল কমল। শিশু কমলের হাতেখড়ি হয়েছিল কোলকাতার হেয়ার স্কুলে। বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁদের পরিবার বগুড়ার গ্রামের বাড়ী চলে আসে। প্রায় দু’বছর তাঁরা গ্রামে ছিলেন। এ সময় জিয়া গ্রামের স্কুলেই লেখাপড়া করেন।পাকিস্তান হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে মনসুর রহমান করাচীতে কেন্দ্রীয় সরকারেরঅধীনে সিনিয়র কেমিস্ট হিসাবে যোগদেন। ওই বছরই জিয়া করাচী একাডেমী স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলটি বর্তমানে তৈয়ব আলী আলভী একাডেমী নামে পরিচিত। এই স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং করাচীর ডি জে কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।

কে বলে বাংগালী যোদ্ধা নয়? কে বলে বাংগালী ভীতু? প্রশ্নগুলো ছিল দেয়ালের লিখন। সতেরো বছরের তরুন নজরুলের রক্তে আগুন জ্বলে উঠলো দেয়ালের লেখা দেখে। ৪৯ নম্বর বাংগালী পল্টনে সৈনিক নিয়োগের পোস্টার ছিল ওই দেয়ালের লিখন। সালটি ছিল ১৯১৭।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তৃতীয় বছর। নজরুল নবগঠিত বেংগল যোগ দিয়ে চলে গেলেন নৌশেরা। তিনমাস ট্রেনিংয়ের পর করাচী বন্দরে এলেন গানজা লাইনের ব্যারাকে। সাত হাজার বাংগালী যুবক নিয়ে গঠিত হলো বেংগল রেজিমেন্ট। অল্প সময়ের মধ্যেই নজরুল সৈনিক হিসাবে যোগ্যতার পরিচয় দিলেন। হয়ে গেলেন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার। করাচীতেই নজরুলের পূর্ণাংগ কবি জীবনে প্রবেশ ঘটে। এখনেই বাংলার বিপ্লবী বিদ্রোহী কবির সাথে পরিচয় ঘটে জগত বিখ্যাত সুফী কবি রুমী হাফিজ সা’দীর সৃস্টির সাথে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর খোদার প্রেমের নতুন সবক নিয়ে কবি ফিরে আসেন বাংলার মানুষের কাছে ১৯২০ সালে। বাংলার মানুষ দেখলো সম্পূর্ণ এক নতুন নজরুলকে। কোলকাতায় দেখা হলো শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের
সাথে। কবি দায়িত্ব নিলেন দৈনিক নবযুগের। পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি নিয়ে হক সাহেবের সাথে দ্বিমত হলে নজরুল পদত্যাগ করেন।

দেশের স্বাধীনতা আর মানুষের মুক্তির জন্যে তখন কবির মনেপ্রাণেদেহে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। কোথাও কবি স্থিতু হতে পারছিলেন না। ১৯২২ সালের ১১ই আগস্ট তিনি ধুমকেতু প্রকাশ করলেন। ধুমকেতুর ২২শে সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ী’কবিতার জন্যে রাজরোষে পড়েন এবং ২৩শে নবেম্বর গ্রেফতার হন। বিচারে কবির এক বছর সশ্রম কারাদন্ড হয়। রাজবন্দীদের সাথে দূর্ব্যবহারের প্রতিবাদে কবি জেলখানায় ৩৯ দিন অনশন করেন। এ বছরই রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত নাটকটি নজরুলকে উত্সর্গ করেন। ১৯২৪ সালে কবির ‘ভাংগার গাণ’ ও ‘বিষের বাঁশী’ প্রকাশিত হয় এবং ১১ই নবেম্বর বই দুটি সরকার বাজেয়াপ্ত করে।

 ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে ‘প্রলয়শিখা’ প্রকাশিত হলে দখলদার সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে কবিকে ছ’মাসের কারাদন্ড দেয়। গান্ধী-আরউইন চুক্তির ফলে কবি মুক্তি পান। আবার ৬ই নভেম্বর কবি গ্রেফতার হন।

স্বাধীনতার মহান কবি দারিদ্র ও সরকারের অত্যাচারে মানসিকভাবে ভেংগে পড়েন এবং ১৯৪২ সালের ১০ই জুলাই কঠিনরোগে আক্রান্ত হন। তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। কবি আর সুস্থ হয়ে উঠেন নি। ওই অবস্থায় ১৯৬০ সালে ভারত সরকার কবিকে পদ্মভূষণ উপাধি প্রদান করেন। পদ্মভূষণ উপাধিতে সম্মানিত হলেও কবির থাকা খাওয়া ও চিকিত্সার তেমন কোন সুব্যবস্থা সেখানে হয়নি।

১৯৭৩ সালের ২৪শে মে কবিকে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন জন্মভুমি বাংলাদেশে নিয়ে  আসা হয় সরকারী উদ্যোগে। ১৯৭৫ সালে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে স্বাধীন বাংলার মাটিতে মিলন হয় স্বাধীনতা ও মুক্তির দুই মহান সৈনিকের। একজন রাস্ট্রনায়ক আর অপরজন বিপ্লবী কবি ও সৈনিক। পিজি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থাকা কালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও মহান সৈনিক জিয়াউর রহমান কবিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্রেস্ট প্রদান করেন।

Bnp (135)

 ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলে এদেশের সাধারণ মানুষের নেমে আসে সীমাহীন শোষণ ও অত্যাচার। এ শোষণের প্রধানতম শিকার বাংলার মুসলমান। এ দেশে বিদেশী শাসন কখনই মেনে নেয়নি ধনী গরীব মুসলমান সমাজ। শুরু থাকেই তারা বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে এসেছে। সে বিদ্রোহ অবিরাম একশ বছর ধরে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত চলেছে। সুফীবাদ ও গজলের একচ্ছত্র সম্রাট গালিব তাঁর ডায়েরীতে বলেছেন, মহানগরী দিল্লীর পতনের সময় রাজধানীতে একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমানও জীবিত ছিলেন না। রাতের অন্ধকারে বাড়ী বাড়ী ঘেরাও করে তাঁদের আটক করে নিয়ে ফাঁসী দেয়া হয়। সকালবেলা নগরবাসী গাছে গাছে নামীদামী মুসলমানদের লাশ দেখতে পেতো।

এহেন দুর্দিনেই চারিদিক আলো করে,নতুনের জয়কেতন উড়িয়ে ,আকাশ কাঁপিয়ে নিষ্পেষিত নির্যাতিত পরাধীন জাতির মুক্তির জন্যে খোদায়ী নকীব হিসাবে উল্কার মতো আবির্ভুত হন বিদ্রোহী বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে গাইলেন-

“বল ভাই মাভৈ মাভৈ
নবযুগ ঐ এলো ঐ
এলো ঐ রক্ত-যুগান্তর-রে।”

কালজয়ী সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন, এটা অবধারিত সত্য যে,নজরুলের আবির্ভাব না হলে বাংলাভাষা একশ বছর পিছিয়ে থাকতো। নজরুল একদিন বিনা নোটিশেই ‘আল্লাহু আকবর’ তকবীরের হায়দরী হাঁক মেরে আকাশ কাঁপিয়ে ঝড়ের বেগে এসে বাংলা সাহিত্যের দুর্গ জয় করে নিলেন। পরাধীন বাংলার ভাংগা কিল্লায় বিজয় নিশান উড়িয়ে দিলেন। বাংলা ভাষার ভাব ও প্রকাশের হীনমন্যতাকে তাড়িয়ে দূর করলেন এক পলকে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটা ছিল এক মহাবিপ্লব।

প্রখ্যাত ভাষা বিজ্ঞানী ড: এনামুল হক বলেছেন, নজরুলের আবির্ভাব বাংলা রাবিন্দ্রক যুগের অবসান ঘোষনা করিল। সত্যিই বাংলা সাহিত্যে নজরুল এক নতুন যুগের সুচনা করেছেন, যা এখনও জারী আছে। বাংলা সাহিত্য ও কাব্যে বিদ্রোহ ও আধ্যাত্ববাদের বিকাশ ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

 ‘ দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
  লংগিতে হবে রাত্রি নিশীতে যাত্রীরা হুঁশিয়ার’

১৯২৬ সালে কোলকাতার হিন্দু-মুসলিম মিলন সভায় নেতাজী সুভাস বসুর অনুরোধে নজরুল এ গাণটি রচনা করেন ও সুর দেন। নজরুল সম্পর্কে নেতাজী বলেন, কারাগারে আমরা অনেকেই যাই, কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে সেই জেল জীবনের প্রভাব খুব কমই দেখতে পাই। এর কারণ অনুভুতি কম। কিন্তু নজরুলের লেখায়  বন্দী জীবনের ছবি পাওয়া যায়। এতে বুঝা যায় তিনি একজন জ্যান্ত মানুষ। তাঁর লেখার প্রভাব অসাধারন। তাঁর গাণ শুনে আমার মতো বেরসিক লোকেরও জেলে বসে গাইবার ইচ্ছে হতো। আমাদের প্রাণ নেই, তাই প্রাণময় কবিতা লিখতে পারিনা।

রক্তে স্বাধীনতা ও বিদ্রোহের বীজ ছিল বলেই ১৯৭১ সালে সৈনিক জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতার ডাক
দিয়েছিলেন। একাজটি তাঁর করার কথা ছিলনা, তবুও তিনি করেছেন। এটাই ছিল তাঁর নিয়তি ও ভাগ্য। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা তাঁকে দিয়ে
বাংগালী জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার পথ সুগম করেছিলেন। ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করার মাঝেই সাফল্য লুকিয়ে থাকে। সমগ্র জাতির চিন্তা ও কল্পনার জিয়া সে কাজটিই করেছিলেন।

৭১ সালেই জিয়া নামটি বাংলাদেশ ও বাংগালী ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গেছে। জাতির ক্রান্তিলগ্নে সময় তাঁকে বার বার সামনে টেনে
এনেছে। এমনি করেই একদিন তিনি জাতি ও দেশের হাল ধরেছেন এবং দেশের প্রাণ দিয়েছেন। বাংলার এই দুই মহান পুরুষ রাজধানী ঢাকার মাটিতেই শায়িত আছেন। একজন শেরে বাংলা নগরের ক্রিসেন্ট লেকে, আরেকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে। নজরুলের শেষ ইচ্ছা অনুসারেই তাঁকে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়েছে।

কবি তাঁর কবিতায় তিনি বলেছিলেন:
  ‘ মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
  যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্বিনের আজান শুনতে পাই।’

  শহীদ জিয়া সম্পর্কে দেশের মানুষ বলে:
  ‘এক জিয়া লোকান্তরে
  লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে।’