তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল চেয়ে রিট

0

ঢাকা: নানা আলোচনা সমালোচনার মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল/ সংশোধনী/বিলুপ্তি চেয়ে শিক্ষক, লেখক, আইনজীবীর আইনি নোটিশ এবং বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছেন এক ভ‍ুক্তভোগী।

এ নিয়ে কথা বলেছেন সরকারের আইনমন্ত্রীও। তাদের মতে, যৌক্তিক হলে সংশোধন করা হবে এ আইন।

তথ্য প্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার ও পরে জামিন পাওয়া এক ব্যক্তির রিটে বলা হয়, তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে অপরাধ একইরকম হলেও দণ্ড রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন।

এ আইনে সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছর এবং জরিমানা এক কোটি টাকা হলেও পর্নোগ্রাফি আইনে এ ধরনের অপরাধের সাজা সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং জরিমানা ‍দুই লাখ টাকা।

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’

‘(২) কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

এদিকে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এর  ৮  (৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইট বা মোবাইল ফোন বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি সরবরাহ করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বৎসর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

অপরাধের সাজার এ ‘ভিন্নতাকে’ রিটকারীর আইনজীবী শিশির মনির  বৈষম্য মনে করছেন। এছাড়া সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে এ আইনের ওই ধারাকে সাংঘর্ষিক মনে করছেন। এবং ওই ধারাকে সংবিধান পরিপন্থি বলে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ করলে কোন আইনে মামলা হবে তা নির্ধারণ করবে পুলিশ। এখন পুলিশ যদি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে তাহলে তার সাজা হবে কম। আর আইসিটি আইনে সর্বোচ্চ সাজা হবে ১৪ বছর। এখানে ভুক্তভোগীর‍া বৈষম্যের শিকার হতে পারেন।

অপরদিকে সরকারকে আইনি নোটিশ দেয়‍া শিক্ষক ও লেখকদের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়‍ার মতে,  ৫৭ ধারাকে বিরুদ্ধ মত দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই অপব্যবহার রোধে ধারাটির বিলুপ্তি ঘটাতে হবে।

আর আইনজীবী ইউনুচ আলী আকন্দ এ ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল চেয়ে সরকারের চার সচিবকে নোটিশ দিয়েছেন।

এ সব প্রশ্ন ওঠার পর সরকারের আইনমন্ত্রী বক্তব্য এমন, ‘যদি যৌক্তিক হয় তাহলে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সংশোধন করব’।

সংবিধানের ৩৯ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘৩৯। (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং  (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’

আইনজীবীদের মতে, সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদের ২ (ক) এর সঙ্গে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সাংঘর্ষিক। সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়‍া হয়েছে। কিন্তু আইসিটি আইনে তাতে বাধা দেয়‍া হয়েছে।

এর আগে ২০১০ সালের ২৬ জুলাই এ আইন সংশোধনের আগে ৪৬ ও ৫৭ ধারা কেন অবৈধ নয়, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। তিন আইনজীবী আরাফাত হোসেন খান, কাজী আতাউল আল ওসমান ও রোকেয়া চৌধুরীর রিটে এ রুল জারি করা হয়।

ওই রিট আবেদনে আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, আইনের ৫৭ ধারায় ইলেকট্রনিক ফর্মে লেখা অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়ে বলা আছে।

এ ধারা মতে, ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ইলেকট্রনিক বিন্যাসে কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা, অশ্লীল বা যে প্রকাশনা দেখলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ উদ্দেশ্য মনে জাগতে পারে, তার জন্য জরিমানার বিধান আছে। কিন্তু ব্যক্তি যে নীতিভ্রষ্ট বা তার মনে যে অসৎ উদ্দেশ্য জেগেছে, তা মাপার কোনো মানদণ্ড নেই।

প্রায় ৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ রিটের রুল শুনানি হয়নি।

আইনজীবীদের দেয়া তথ্য মতে, এ আইনে ২০১৩ সালে তিনটি, ২০১৪ সালে ৩৩টি এবং ২০১৫ সালে ৩৫টি মামলা হয়েছে।