জীবনের ঘানি ঘরে “ইছোব তেলী”

0

অশীতিপর বৃদ্ধ ইউসুফ আলী। কুড়িগ্রামের হলোখানা ইউনিয়নের চর কাগজিপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। ‘ইছোব তেলী’ এই নামে তাকে সাত গ্রামের মানুষ চেনে।
পাকিস্থান আমল থেকেই তিনি তেলের ঘানিতে সরিষা ভেঙ্গে খাটি তেলের ব্যবসা করতেন। সামান্য কিছু জমিজিরাতও ছিল এক সময়। নদীর ক্ষুধা ও সন্তানদের ক্ষুধায় কামড়ে নিঃশেষ হয়েছে সে জমি। তখনও শরীরে সামর্থ ছিল, মনে ছিল সাহস। তাই তিনি মনোবল হারাননি।


আর এক জোড়া তাগড়া বলদও ছিল সেসময় ঘানি টানার। দিনের একবেলা সরিষা ভাঙ্গতেন, অন্য বেলায় তেল ফেরী করে বাড়ি বাড়ি বেচে বাজার-সদাই নিয়ে ঘরে ফিরতেন।এভাবেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধি বড় ছেলে শাহাবুলের (৫০) বিয়ে দিয়েছেন, বড় মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন। সে সময় অভাবে পড়ে একটা বলদ বেচে দিতে হয়েছিল তাকে। অন্য বলদটি দিয়ে তার রোজগারের পথটুকু খোলাই ছিল বলে তিনি তখনও কোন ভয় পাননি। কিন্তু ৭ বছর আগে যখন ছোট মেয়ে ফজিলার বিয়ের যোগ্যতা হিসেবে একমাত্র বলদটিই তার সামর্থ হল। তাই বলদটি দিয়ে কন্যার দায় মুক্ত হন তখন তিনি।

কিন্তু খাবেন কি? যুগ যুগ ধরে চালিয়ে আসা পেশা বন্ধ হলে রোজগার করবেন কিভাবে?

নিঃসন্তান ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধি ছেলে শাহাবুল, তার স্ত্রী, তাদের মা নুরজাহানকে নিয়ে ইছোব তেলীর সংসারের চুলা আর জ্বলে না। বাধ্য হয়ে নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন সেদিন ঘানির জোয়াল।


বলদের শক্তি শরীরে নিয়ে জোয়াল টানতে যতটা না ঘানির সরিষা ভেঙ্গে তেল ঝরে, তার চেয়ে বেশি ঝরে শরীরের ঘাম। বুকের মাঝে জোয়াল চাপিয়ে দু’হাতে শক্ত করে ধরে যখন টানতে শুরু করেন জোয়াল, চোখদুটো তার সামনের দিকে বিচ্ছুরিত হয়ে ফেটে পড়তে চায় সর্বশক্তি দিয়ে। পা‘দুটোকে পিছনের মাটি শক্ত করে টেনে ধরে। কাঁধের রগ ফুলে ওঠে, চামড়া মাংস ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসতে চায়। তবুও টানতে হয় জোয়াল। তবুও ঘানি ঘোরে। তবেই তো তেল ঝরে। তবেই তো চুলা জ্বলে।


ইছোব আলী যখন আর পা ছেচড়িয়েও এগোতে পারেন না, তখন ছেলে শাহাবুল তুলে নেন জোয়াল। নুরজাহানও সাথে থেকে নেড়েচেড়ে দেন। এটা ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করেন কাজে। এভাবেই চলে গেছে জীবনের সাত সাতটি বছর।এর মধ্যে ইছোব তেলীর বাম হাতের বল একেবারেই কমে গেছে । কিন্তু মনের বল খুব একটা কমেনি আজো। নিয়তিকে খুব বেশি আপন করে নিয়ে তাকেও কোন অভিযোগ করতে চান না তিনি।খোলা আকাশের নীচে তার ঘানিঘরা। রোদ-বৃষ্টিতে কোন আড়াল করার উপায় নেই। রোদে তবুও পুড়ে পুড়ে কাজ চালানো যায়। কিন্তু বৃষ্টি হলে কাজ একেবারেই বন্ধ করে দিতে হয়। সরিষায় পানি পড়লে তেল নষ্ট হয়ে যায়। তখন পুরো পরিবার উপোস দিন কাটায়।
ইছোব তেলীর জিরজিরে ছনের ঘরে কোন জানালা না থাকলেও দিনের বেলায় যেমন সূর্যের আলো বিছানায় পড়ে বিনা বাঁধায়। তেমনি বৃষ্টি-ঝড়ে ছেঁড়া ছাতাটার নীচে দিন-রাত স্ত্রীসহ বিছানায় বসে থাকেন তিনি। ভাঙ্গা বেড়া, ভাঙ্গা চালায় বছর বছর শীতও হুমড়ি খায় তাদের বুড়া হাড়ে।

এমনি আমাদের ডিজিটাল হবার সপ্ন,,আবার কিছু আবাল,মূর্খ বলেও আমরা ডিজিটাল_এমন ডিজিটাল চাই না দেশের লহ্ম লহ্ম ডলার হ্যাক করে চুরি করে নিয়ে যাবে —আমরা বসে বসে আঙুল চুষব___?

ফজলুল করিম

অন-লাইন লেখক