জীবনটা তো সংগ্রামে সংগ্রামেই কেটে গেল- এবার হচ্ছে চূড়ান্ত লড়াই

0

আটাশে মার্চের (২০১৪) সন্ধ্যা। পরদিন ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন। প্রধান অতিথি বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গুলশান কার্যালয়ে গেছি দাওয়াত পাক্কা করতে। তার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসও আছেন। সাংবাদিকদের সাথে তার রাজনৈতিক জীবনের নানা স্মৃতির কথা বলছিলেন বেগম জিয়া। হঠাৎ করেই অন্যমনস্ক হয়ে স্বগতোক্তির মতো বললেন, ‘দেশের জন্যে মানুষের জন্যে জীবনটা তো সংগ্রামে সংগ্রামেই কেটে গেল। এবার হচ্ছে চূড়ান্ত লড়াই।’ চমকে উঠলাম- তাই তো? ১৯৮২তে বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সামরিক শাসনের কশাঘাতে ন্যুব্জ বিএনপিকে নিয়ে বেগম জিয়া রাজপথে। তার রাজনৈতিক অভিযাত্রায় সাংবাদিক হিসেবে আমি হাঁটছি। ৩২ বছরের রাজনীতিতে ১০ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব। বাকিটা সময় আন্দোলনে আন্দোলনে- রাজপথে না হয় কারাবন্দিত্বে। এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার, এক-এগারোতে মইনুদ্দিনের ছদ্মবেশী সামরিক শাসন আর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার চরম দুঃশাসনের বছরগুলো গোনায় ধরলে বেগম জিয়ার স্বগতোক্তি তো সত্য। কিন্তু বিরাশি থেকে খালেদা জিয়ার জীবনের পেছনে একাত্তর থেকে আরেক জীবনের যে রাজনৈতিক ঐশ্বর্য, স্বামীর স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদানের গৌরব, বন্দিত্বের বেদনা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার সাথে থেকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব প্রত্যক্ষ করা এবং রাষ্ট্র গঠনের অসাধারণ লড়াই, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বুনিয়াদি কর্মযজ্ঞ- এসব থেকে গবেষক চোখ সরিয়ে নিতে পারেন না।

ziaur_rahman1বর্তমান কালের বেগম খালেদা জিয়ার কী এক জীবন-পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মঈনুল রোডের গৃহহীনতা, দুই সন্তানের ওপর অকথ্য নিপীড়নের দুঃসহ যন্ত্রণা, একজন একা মানুষের বাঁচা এবং বেঁচে থাকার সঙ্কটকে সমষ্টির অন্তর্গত করে নিয়ে তীব্রতম দুঃখ-কষ্টেও এই নেত্রী দুঃশাসনকিষ্ট দেশবাসী এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সর্বদা সান্ত্বনা, প্রেরণা এবং সুদিনের স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছেন। বিবর্তনের পরতে পরতে রাজনৈতিক সম্বন্ধের চেহারা আর তাৎপর্য কতই না ঘোরানো হয়েছে ও হচ্ছে। হালের বিশ্ব ও বাংলাদেশের কথা ভাবুন। অদ্ভুত এক বৈরী সময়। মনে হয় বিশ্ব ও বাংলাদেশের ইতিহাসের চালচলন যেন একনায়কতন্ত্র, দুঃশাসন আর গুম-খুন তথা সভ্যতাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলার দিকেই। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বিস্তারের অনুকূলেই বিশদীভূত হচ্ছে সিভিলাইজেশন। সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন, মিসর, ভারত, মিয়ানমার- সর্বত্র একই পরিস্থিতি। আর বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টানের ওপর চেপে বসেছে ফ্যাসিবাদ। কিন্তু কোথাও কোনো ভরসার একক সত্তা নেই, প্রতিবাদের বজ্র-হুঙ্কার নেই। শুধু বাংলাদেশে আছেন বেগম খালেদা জিয়া। জনগণ যাকে দেশনেত্রী বলে বুকে বল পায়। স্বীকৃত বিশ্ব-সভ্যতার প্রেক্ষাপটে ইসলাম, গণতন্ত্র এবং জনগণের প্রত্যাশাকে এক অন্বিত কাঠামোয় দাঁড় করিয়ে বাংলাদেশ ও আপন পরিচয়কে শহীদ জিয়ার মতোই গোটা দুনিয়ায় সমীহ ও সম্ভ্রমযোগ্য করে তুলেছেন।

 801A2157গোটা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের পরিচিতি হচ্ছে ‘এক উদারনৈতিক মুসলিম সমাজ’। এ পরিচয়কে শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া রাজনীতি দিয়ে, সংস্কৃতি দিয়ে সাফল্যের সাথে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ হচ্ছে এ মাটির ইতিহাসেরই এক নিরবচ্ছিন্ন ঝর্ণাধারা। যে ভূখণ্ড  নিয়ে আজকের বাংলাদেশ, মূলত সেই জনপদই ইতিহাসের বঙ্গ। সাড়ে ৬০০ বছরের মুসলিম শাসনে এ মাটিতে সুশাসন এবং অসাম্প্রদায়িকতার যে কৃষ্টি এবং শিল্প-বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতির যে প্রগতি সূচিত হয়েছিল, তারই যোগসূত্রতা এবং স্বকীয়তায় আমাদের এ পরিচয়। এর দৃঢ় বজ্র-ফলক এঁটেছেন শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মানুষের সাথে স্বাভাবিক, মানবিক, কল্যাণকর ও আত্মীয়জনোচিত সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশ সস্নেহে তাকে কবুল করেছে হৃদয়ের মণিকোঠায়। সে জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী থাকুন বা না থাকুন, সব সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে এবং আলোচনার প্রাণকেন্দ্রে বেগম জিয়া ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। এভাবে খালেদা জিয়া স্বীকৃতি পেয়েছেন এক জাতীয় আত্মা হিসেবে। ‘টাইম’ ম্যাগাজিন ১৯৯১-এর নির্বাচনে বিজয়ের পর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিল- ‘খালেদা জিয়া যেমনি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তেমনি তার আছে অভাবনীয় কিছু করার ক্ষমতা। বাংলাদেশী সমাজে খোলাবাজার অর্থনীতি চালু করা এবং ইসলামের উদারনীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার জনগণকে আকৃষ্ট করেছিল।’ indexবাংলাদেশের ভাগ্যে শুভ-অশুভ এর লড়াই ছিল এবং থাকবে। অশুভকে ঠেকাতে পরম করুণাময় আল্লাহই ঠিক করে দেন সব কিছু। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কবি জালালউদ্দিন রুমির কবিতায় সে আভাস স্পষ্ট : ‘তোমার মধ্যে খেলছে কেবল/ দুই রকমের দুই আমি/ একটা চলে আঁধার পথে/ অন্যটা যে ঊর্ধ্বগামী/ আঁধার পথের বন্যটারে/ রেখে দাও ওই এক পাশে/ চালাও এবার স্বর্গ-শকট/ উড়ুক তা আজ আকাশে।’
988458_10202896076021926_6259058393395283778_nমূলত ঐশী ইশারা না হলে শহীদ জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন না, সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরে ক্ষমতার মূল মঞ্চে আসতেন না, বিএনপি গড়তেন না, বাংলাদেশকে উন্নয়নের এক সঠিক দিশায় স্থিত করতেন না। একইভাবে বেগম জিয়া বিএনপির দায়িত্ব নিয়ে রাজপথে থেকে এক সংগ্রামী, বলিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপিকে নতুন ছাঁচে গড়তে পারতেন না। আমার স্পষ্ট বিশ্বাস, আল্লাহর রহমতই তাকে এখনো সজীবদীপ্ত করে রেখেছে বাংলাদেশ ও জনগণ, তাদের ধর্ম-বিশ্বাস ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। বেগম জিয়ার নেতৃত্ব হচ্ছে gifted leadership। জেমস ম্যাকগ্রেগর বার্নস নামে আমেরিকার একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, যার বিখ্যাত গবেষণামূলক গ্রন্থ Leadership  এ বলছেন, mobilized and shaped by gifted leadership. sharpened by conflict, values can be the source of vital change। আমি খালেদা জিয়ার নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতি এবং সূচিত মৌলিক পরিবর্তন সম্পর্কে আলোকপাত করব। ziaur_rahman5তার আগে কতকগুলো প্রশ্ন। আমার অত্যন্ত ঠিকঠাক আন্দাজে এসবের উত্তরও পরিষ্কার। ১. বাংলাদেশ ও বিশ্বে কতজন রাজনৈতিক নেতানেত্রী আছেন যিনি সুদীর্ঘ ৩২ বছর ধরে শীর্ষ জনপ্রিয়তায় সক্রিয় রাজনীতি করেছেন বা করছেন? তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সর্বোচ্চসংখ্যক আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে? চারবার পাঁচটি করে আসনে জিতেছেন! কোন্ নেতা আছেন যিনি গর্ব করে বলতে পারেন- দু’টি সামরিক শাসনকে আপসহীন আন্দোলনে বিদায় দিয়েছি। রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসার কৃতিত্ব বেগম জিয়া ছাড়া আর কাকে দেয়া যায়? ২০০৮ সালে ভোটের আগে তিনি শর্ত দিয়েছিলেন ইমার্জেন্সি না তুললে ভোটে যাব না। অথচ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, জেনারেল মইনের অবৈধ সরকারকে যিনি বলেছিলেন তাদের আন্দোলনের ফসল, সেই শেখ হাসিনা তখন জরুরি অবস্থা রেখে দেয়ার পক্ষে। তারপরও বেগম জিয়ার কারণে ইমার্জেন্সি তুলতে বাধ্য হন মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন। জনগণের পক্ষে নৈতিক অবস্থান গ্রহণের পক্ষে বেগম জিয়া বরাবরই অগ্রগামী। স্রেফ সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর থেকে জনগণ মুক্তি পাক- এ লক্ষ্যেই তিনি ২০০৮ সালের সাজানো ভোটে গেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলের নেত্রী হোন- এই বিবেচনা তার উপলব্ধিতেই আসেনি।

আগে ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হতেন নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনারদের ভোটে, তাদের মধ্যে একজন। কিন্তু বেগম জিয়া ১৯৯৩ সালে মেয়র পদে সরাসরি অর্থাৎ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের নির্বাচন দিলেন। তার প্রার্থী হারল, কিন্তু জনগণকে মেয়র বাছাইয়ের অধিকার দিয়ে তিনি ইতিহাস হলেন। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সাথে তার পর্বতপ্রমাণ পার্থক্য হলো, ভোটে হেরে যাওয়ার ভয়ে শেখ হাসিনা এখনো ঢাকার নাগরিকদের দীর্ঘ দিন ভোট প্রয়োগের অধিকার দিচ্ছেন না। বেগম জিয়ার প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা, দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক ঔদার্য সর্বোপরি জিয়া পরিবারের দেশগঠনমূলক সুকীর্তির সমারোহে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জে গিয়ে সাত খুনের শহীদদের পরিবারদের সান্ত্বনা দিতে যেতে পারবেন না। কিন্তু বেগম জিয়াকেও সেখানে যেতে দেবেন না, এমনকি ডেমরাতেও জনসভা করতে বাধা দিলেন। খ্যাতির মানদণ্ডে তিনি অনেক পিছিয়ে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এদের সম্পর্কে বলেছিলেন ‘… খ্যাতির কথা থাক। ওটার অনেকখানিই অবাস্তবের বাষ্পে পরিস্ফীত। তার সঙ্কোচন-প্রসারণ নিয়ে যে মানুষ অতিমাত্রায় ক্ষুব্ধ হতে থাকে সে অভিশপ্ত… যে খ্যাতির সম্বল অল্প তার সমারোহ যতই বেশি হয়, ততই তার দেউলে হওয়া দ্রুত ঘটে। ভুল মস্ত হয়েই দেখা দেয়, চুকে যায় অতি ক্ষুদ্র হয়ে। আতশবাজির অভ্রবিদায়ক আলোটাই তার নির্বাণের উজ্জ্বল সঙ্কেত।’

আসলে বেগম খালেদা জিয়ার তুলনা আর কেউ নন। তবে তার রাজনৈতিক অভিযাত্রা বিশ্লেষণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনার কিছু প্রসঙ্গ না এলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উদারতা দেখিয়েই শহীদ জিয়া শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার অনুমতি দিয়েছিলেন। এক-এগারোর সময় শেখ হাসিনা যখন দেশে ফিরতে পারছিলেন না, তখন বেগম জিয়া তাকে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেন। জেনারেল মইনের তল্পিবাহক আর্মি অফিসাররা খালেদা জিয়াকে জোর করে বিদেশে পাঠাতে চাইছিল। কিন্তু বেগম জিয়া বিপদে দেশকে ফেলে যেতে চাইলেন না। এর দরুন মাইনাস টু ফর্মুলা অকার্যকর হয়ে গেল। হাসিনার দেশে ফিরতে আর বাধা রইল না। শেখ হাসিনার মানসিক অবস্থা আজ এমন পর্যায়ে যে, বেগম জিয়াকে ঘরছাড়া, সন্তানছাড়া করেও তিনি শান্তি পাচ্ছেন না। তাকে জেলে পাঠানোসহ আর কত ক্ষতি করা যায়, সে কুচিন্তায় মশগুল। আজকে অবস্থা এমন, যারা বেগম জিয়াকে যত গাল দেবেন, তাদের গ্রহণযোগ্যতা অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তত বেশি।

কেন জানি মনে হয়, শেখ হাসিনার মধ্যে এমন হিংসাত্মক কুবৃত্তির তাড়না ১৯৭১ সাল থেকেই। স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকারী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তৎসময়ের পাকিস্তানিদের কাছে রাষ্ট্রদ্রোহী মেজর জিয়ার স্ত্রী হিসেবে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী ছিলেন। অন্য তরফে শেখ মুজিব পাকিস্তানের কাছে রাষ্ট্রদ্রোহী হতে চাননি, স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে চাননি (সূত্র : বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমদের মন্তব্য নিয়ে নানা গ্রন্থ)। বরং আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানিদের কাছে নিজ পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গেছেন। তাই শেখ হাসিনার বন্দিত্ব ছিল পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের মর্যাদার মতোই। বেগম জিয়া একজন জননির্বাচিত রাষ্ট্রপতির স্ত্রী ছিলেন। অন্য দিকে শেখ হাসিনা ছিলেন অনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কন্যা। কন্যার শরিকানা স্ত্রীর চেয়ে কম। স্বামীর ঘরে গেলে কন্যার সম্পূর্ণতা এবং উত্তরাধিকার নিশ্চিত হয়। এসব বিশ্লেষণে কেউ যেন মনে না করেন, হাসিনার অপূর্ণাঙ্গতা যেখানে, খালেদার সম্পূর্ণতা সেখানে। হাসিনার রাজনৈতিক উত্থান না ঘটলেও বেগম খালেদা জিয়া নিজ গুণাবলিতে ভাস্বর হতেন, কেননা ঐশী-ইশারার ভিত্তি কখনো তুলনামূলক হয় না।

বেগম জিয়ার সারাটা জীবন সংগ্রামেই গেল- এ কথার আখ্যান ও ব্যাখ্যায় পর্যালোচনা প্রয়োজন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি কারাবরণ করেছেন। শহীদ জিয়া সিনিয়র হয়েও সেনাপ্রধান হতে পারেননি। এ কষ্টও সেনানিবাসের নিয়ন্ত্রিত জীবনে সয়েছেন। পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর জিয়ার সাথে গৃহবন্দী হন। রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে ফার্স্ট লেডির খেতাব নেননি। রওশন এরশাদ যা নিয়েছিলেন। স্বামীর অত্যন্ত কঠিন কঠোর জীবন, সততা আর নিয়মানুবর্তিতায় তিনি সংসার আগলে রাখেন। স্বামীর রাষ্ট্রীয় কর্মভারকে মোটেও সাংসারিক বিষয়ে বিঘিœত করেননি। তারপর মর্মান্তিক ৩০ মে স্বামীর লাশের সামনে স্তব্ধ, নির্বাক। এরপর দলের অনুরোধে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জেনারেল মইনুদ্দিনের হাতে বন্দী বেগম জিয়া আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিতে আসতে চাইনি। কিন্তু জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর দেশের মা-বোন ও ছাত্র-জনতা দেশের স্বার্থে বিএনপির স্বার্থে আমাকে রাজনীতিতে আসতে উদ্বুদ্ধ করেন। দেশের কথা ভেবে, দলের কথা ভেবে ও লক্ষ কোটি মানুষের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমি রাজনীতিতে আসি।’ ১৯৮২ সালের বিএনপি তখন সামরিক শাসনের যাঁতাকলে ভঙ্গুর। রাজপথে থেকেই এক নতুন বিএনপি গড়ে তুলেছেন। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ক্যান্টনমেন্টের নিয়ম বাধা জীবনে কী করে গণতন্ত্রের এমন অধ্যাত্মবোধে দেশনেত্রী উদ্বোধিত হলেন? স্বাধীনতার যুদ্ধকে যিনি কাছ থেকে দেখেছেন, স্বাধীনতার ঘোষকের সহধর্মিণী হিসেবে তিক্ত অভিজ্ঞতা সয়েছেন, সিপাহি জনতার বিপ্লবকে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন, যার চোখের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবিধানে বিসমিল্লাহর অধিষ্ঠান এবং মুক্ত অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ ঘটেছে, গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটেছে, তার রাজনৈতিক চেতনা কত প্রসারী, সে বিশ্লেষণ গবেষকদেরই দায়িত্ব। আমার কৈশোর থেকেই এ পরিবারকে মাঝে মধ্যে দেখার সুযোগ হয়েছে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা আমার খালু মেজর (অব:) গণিকে শহীদ জিয়া অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। খালাম্মার সাথে তাদের বাসায় বেশ কয়েকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। শহীদ জিয়া গণি পরিবারকে খুবই সহায়তা করেছেন। বাংলাদেশ নিয়ে জিয়ার রূপকল্পই ছিল আলাদা, তা প্রত্যেক সাক্ষাতেই আমি উপলব্ধি করেছি। আমার চেতনায় জিয়ার অধিষ্ঠান তখন থেকে দৃঢ় হতে শুরু করে।

যে কথাটি বলা জরুরি, তা হলো- বিরোধী দলে থেকে সংগ্রামের অবর্ণনীয় কষ্ট তো সয়েছেন, সরকারে থেকেও দু’দণ্ড শান্তি পাননি বেগম জিয়া। ক্ষমতার লোভে উন্মত্ত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি দেয়নি প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াকে। ১৭৩ দিন হরতালই করেছে প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বকালে। বিদেশী সাহায্যদাতাদের সাহায্য বন্ধের জন্য চিঠি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বীভৎস আন্দোলন, সামরিক ও পার্লামেন্টারি ক্যু ঘটানোর অপচেষ্টা, সংখ্যালঘু নির্যাতনের অমূলক অভিযোগে খালেদা জিয়াকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। কিন্তু চমৎকার রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় গণতন্ত্রের পথ ধরেই তিনি সমাধান দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোট করেছিলেন শুধু সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করতে। ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন মিলিটারি ক্যু। এমন সব রাজনৈতিক ঝঞ্ঝার মুখে বেগম জিয়া কিন্তু উন্নয়নের গতিকে মোটেও শ্লথ করেননি। ১৯৯১-এর নির্বাচনে তার বিজয় ছিল নৈতিক রাজনীতির বিজয়। নিরাপস নৈতিকতায় বর্জন করেছিলেন ’৮৬তে এরশাদের সাজানো নির্বাচন, যাতে অংশ নিয়ে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী শেখ হাসিনা তার নিজের কথিত জাতীয় বেঈমানে পরিণত হন। সেই দুর্গন্ধময় শিরোপা এবার খালেদা জিয়া মাথায় চাপিয়ে দেয়ার দুরভিসন্ধি ছিল শেখ হাসিনার। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বেগম খালেদাকে আনার অপচেষ্টা। বেগম জিয়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় শেখ হাসিনার চেয়ে অনেক শাণিত। যিনি বারবার বলেছেন, হাসিনার অধীনে ভোটে যাবোই না। নির্দলীয় সরকার চাই। দেশনেত্রী চাইলে ৫ জানুয়ারির ভোটে যেতে পারতেন, শত চক্রান্ত, বাধা, কারচুপির জাল ছিন্ন করে প্রধানমন্ত্রী হলে হতেও পারতেন, বিসমিল্লাহ বর্জিত ও শেখ মুজিবুরকে জাতির পিতা বানানোর সংবিধানের অধীনে সরকারও গঠন করতে পারতেন। তারেক রহমান, আরাফাত রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাগুলো তুলে নিতেও পারতেন। আর অন্য দিকে ভোটে গিয়ে হাসিনার চক্রান্তে হারলে আগামী পাঁচটি বছর প্রতিবাদহীন দাসত্ব। এতে দেশনেত্রীর শুভ্র নৈতিকতায় কালো আঁচড় পড়ত, জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাফ হতো। কী জবাব দিতেন সেসব আত্মাকে যারা নির্দলীয় সরকারের জন্য আত্মাহূতি দিয়েছেন, গুম হয়েছেন। তাদের কী হতো, যারা সংগ্রামের জন্য মিথ্যা মামলায় এখনো দুঃসহ কারাগারে রয়েছেন? হ্যাঁ, আরো কিছু সময় বৈরী যাবে। বৈরী সময় তো লেগেই আছে সাত বছর ধরে। না হয় আরো এক বছর। তৃতীয় পর্যায় থেকে উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে নচ্ছার-নগ্ন কারচুপি করেছে, তাতে করে সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার দ্বিধায় ৫ জানুয়ারির আগে যারা নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন, তারাও এখন বলছেন, খালেদা জিয়া সঠিক ছিলেন।

এ সত্য বেগম জিয়ার নিন্দুকেরাও মানতে প্রস্তুত, হাসিনা সরকারকে অবৈধতার এক চরম সঙ্কটে ফেলে দিয়েছেন বেগম জিয়া। ওই বিতর্কিত প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ও শেখ হাসিনা মিলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ফাঁসি দিলেও বেগম জিয়া দেশের ৯০ ভাগ মানুষকে তার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তার ডাকে সারা দেশে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা স্বাধীনতার পর আর হয়নি। রাজধানীর চিত্র ছিল বেশ খানিকটা পৃথক। গ্রামের মেঠোপথে দাঁড়িয়ে মানুষ হরতাল করেছে। গণহত্যা চালিয়েও গ্রামবাংলার এই আন্দোলন দমাতে পারেনি ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা। বেগম জিয়ার ডাকে দেশের ৯৫ ভাগ ভোটার ৫ জানুয়ারি ভোটকেন্দ্রে যাননি। ৫০টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। ভারত বাদে গোটা বিশ্ব এখন মনে করছে ওই নির্বাচন একটা তামাশা ও অতি দ্রুত নির্দলীয় প্রশাসনের অধীনে সত্যিকারের সংসদ নির্বাচন হতে হবে। এই জনমত হচ্ছে বেগম জিয়ার ঈমানদারির রাজনীতির বিজয় ও বাংলাদেশের জনগণের আত্মাকেই তিনি ধারণ করেছেন। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ জারির ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারকে ভারতের কংগ্রেস সরকার সর্বত্র মদদ জুগিয়েছে। এ কথা বিশ্ব খ্যাত ‘ইকোনমিস্ট’ সাময়িকীর। নির্বাচনে কংগ্রেস সরকারের ভরাডুবির পেছনে বাংলাদেশের মানুষের বদ-দোয়া কতখানি কাজে লেগেছে, সে বিচার সৃষ্টিকর্তার দরবার থেকেই এক সময় জানা যাবে।

বেগম জিয়ার মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতি ও আপসহীন রাজনীতির কথা বলতে বলতে এতগুলো কথা কওয়া হয়ে গেল। এসব না উল্লেখ করলে তার রাজনীতির গভীরতা বোঝা অসম্ভব। বলছিলাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অবদানের কথা।

ডাল-ভাত ও শিক্ষা
বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেশট ‘থ্রি পেনি অপেরা’য় বলেছিলেন Fist comes the belly, then morality অর্থাৎ আগে ভাত তারপর নৈতিকতা। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে, The First and greatest necessity is food, which is the condition of life and existence.

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণের পর দেশনেত্রী ডাল-ভাত ও খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা এবং বিনাবেতনে নারী শিক্ষার কর্মসূচি চালু করলেন। বেগম জিয়া কৃষির ফলন বাড়ালেন এবং চালের উৎপাদন কোটি টনেরও ওপর নিয়ে গেলেন। সাধারণ মানুষের জন্য দুই বেলা অন্তত ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করলে কোটি কোটি মানুষের পুষ্টির সমস্যা হবে না। শিক্ষার ওপর দারুণ গুরুত্ব দিলেন। দারিদ্র্যের জন্য যেসব শিশু মাঝপথে স্কুল ছেড়ে দেয়, তাদের আহারের ব্যবস্থা করে লেখাপড়ার মধ্যে যুক্ত রাখলেন। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন বিপ্লব ঘটল যে, বিয়ের জন্য গ্রামাঞ্চলে এখন সমান শিক্ষার ছেলেই খুঁজে পায় না মেয়েরা। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের বিনাবেতনে লেখাপড়া। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ খাদ্য ও শিক্ষার এমনি বিপ্লবের ফলে দেশ থেকে আজ দুর্ভিক্ষাবস্থা দূর হয়ে গেছে। বেগম জিয়ার উন্নয়ন মডেলের বড় গুণ হচ্ছে, অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন অর্থাৎ নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ভাষায় development with freedom অর্থাৎ চাপিয়ে দেয়া উন্নয়ন নয়; জনগণকে অধিকার দিয়ে তাদের চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন। মৌলিক অধিকার, বাক-ব্যক্তি-চিন্তার স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তার সাথে জনপ্রত্যাশাভিত্তিক উন্নয়ন। বেগম জিয়া তথা জিয়া পরিবার যে কত বড় মিডিয়াবান্ধব, যেসবের উদাহরণ প্রচুর। শহীদ জিয়া যেমনিভাবে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পাশাপাশি মিডিয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, তেমনি বেগম জিয়া ক্ষমতায় এসে সংবাদপত্র বন্ধে সরকারের ক্ষমতা প্রত্যাহারের আইন করলেন। স্যাটেলাইট টিভির অগ্রযাত্রা সূচনা করলেন। বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কত পত্রিকায় কত না বিষোদগার হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু তারা কখনো মিডিয়ার গলা টিপে ধরেননি, সাংবাদিক নির্যাতন করেননি। বাংলাদেশের মানদণ্ডে এ এক বিরল পরমত সহিষ্ণুতা। মুজিব পরিবারের সাথে পার্থক্য হলো, তারা মিডিয়ার টুঁটি টিপে ধরে বারবার এবং জিয়া পরিবার উল্টো বন্ধ মিডিয়ার দরজা খোলে। আরেকটি বিষয়, জাতীয় প্রেস কাবসহ সাংবাদিকদের আবাসনের ক্ষেত্রে দেশনেত্রী অতুলনীয় ভূমিকা রেখেছেন। উল্টো তরফে শেখ হাসিনার উন্নয়ন মডেলে আছে চাপিয়ে দেয়া প্রকল্প আর মানুষের অধিকারহীনতা। মানুষের কথা বলা বা প্রতিবাদ করার অধিকার থাকবে না। চরমপর্যায়ে মিডিয়া পীড়ন ও সাংবাদিক নির্যাতন। সংবিধানের সমালোচনা করা যাবে না। করলে মিথ্যা মামলা, নইলে গুম, নইলে অপমান, তা নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস হোক অথবা প্রবীণ সাংবাদিক মরহুম এবিএম মূসা বা মরহুম আতাউস সামাদ হোক। শেখ হাসিনার উন্নয়ন মানে জনগণের আপত্তি সত্ত্বেও আড়িয়াল বিল ভরে অপ্রয়োজনীয় বিমানবন্দর বানানো। শত শত কোটি টাকা খরচ করে বিলবোর্ডে নির্লজ্জ আত্মপ্রচার।

ziaur_rahman6
প্রথম পর্যায়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে ডাল-ভাত আর শিক্ষার ব্যাপক জোগানে ও ভগ্ন অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার সফল প্রক্রিয়ায় জাতিকে স্বয়ম্ভর করার পর দ্বিতীয় মেয়াদের সময় তিনি মন দিলেন শিল্পের উন্নয়নে। নেতৃত্বের বড় গুণই হচ্ছে জাতির পর্যায়ক্রমিক সমৃদ্ধির দূরদর্শী পরিকল্পনা। আওয়ামী লীগ ও এরশাদের শাসনামলে, যেই সৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণী এক সময় জাতীয় চেতনা, মূল্যবোধ ও সমৃদ্ধির ইঞ্জিন ছিল, তাদের দুর্নীতি ও অনৈতিকতা দিয়ে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস ঘটেছে। শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদভিত্তিক স্বচ্ছ এবং নৈতিক রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য এই মধ্যবিত্তের পুনর্জাগরণ ঘটানো ও গরিব মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন। আজকে রাজধানী ঢাকা শহর থেকে গাজীপুর হয়ে সাভার হয়ে নরসিংদী বা কাঁচপুর যে দিকেই বেরোতে চাইবেন, শুধু চোখে পড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অগুনতি উপস্থিতিতে হ্ইাওয়েগুলো চাপা পড়ে গেছে। গার্মেন্ট, পোলট্রি, কাগজ, রডের কত না শিল্প। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার। শিল্পের জন্য এমন প্রণোদনা আর দেখিনি। বিদেশী বিনিয়োগ করার মতো লগ্নী হতে থাকে। উন্নয়ন বাজেটে দেশী সম্পদের জোগান সর্বোচ্চ পর্যায়ে যায়। এর সাথে ক্ষুদ্র ঋণের প্রসারে সাপ্তাহিক হাটের বদলে প্রতি গ্রামেই রোজকার বাজার বসতে শুরু করে। এটি বাংলাদেশের জনগণকে সর্বোচ্চ উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার মধ্যবর্তী ধাপ। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পর্যায়ক্রমিক ছন্দিত যাত্রা।

আমেরিকার মার্চেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের ২০০৬-এর রিপোর্ট বলা হয়, চীন, ইন্ডিয়া, ব্রাজিল ও রাশিয়ার মতো সাফল্য অর্জনের দিকে আরো যে ১১টি উন্নয়নশীল দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের অন্যতম বাংলাদেশ। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাময়িকীয় ‘টাইম’ ২০০৬-এর এপ্রিল প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম দেয় ‘রিবিল্ডিং বাংলাদেশ’। এতে জানানো হয়, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ এবং এই সাফল্য যে বাংলাদেশ অর্জন করবে, তা কয়েক বছর আগে খুব কম বিদেশী, এমনকি খুব কম বাংলাদেশীর ধারণায় ছিল। এর মধ্যে একবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার পৌনে সাত ভাগে উঠে যায় এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭০ হাজার কোটি টাকায়।

বেগম জিয়ার বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পরিকল্পনায় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। খাদ্য, শিক্ষা, আবাস, বস্ত্র ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পর মানুষকে পরবর্তী স্তরে উন্নীত করার জন্য তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। আর এতে নৈতিক রাজনীতির সংযোগ-সহযোগ তো ছিলই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই পর্যবেক্ষণে একমত যে, The leader’s fundamental act is to induce people to be aware or conscious of what they feel- to feel their true needs as strongly to define their values so meaningfully, that they can be moved to purposeful action’.
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব তাই transformational leadership বা রূপান্তরের নেতৃত্ব। বাংলাদেশকে মূল্যবোধ এবং অধিকারভিত্তিক রাজনীতি দিয়ে জন প্রত্যাশিত পরিকল্পনা ও সেসবের বাস্তবায়ন দ্বারা ক্রমাগত উন্নয়নের ধাপে ধাপে নিয়ে চলেছেন বেগম জিয়া। রূপান্তরের নেতৃত্ব, নৈতিক নেতৃত্ব ও দলীয় নেতৃত্বের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে তার মধ্যে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য স্বকীয়সত্তা গড়ে তুলেছেন। ধর্মপ্রাণ, মিতভাষী, দেশ-দরদি, জন-অধিকারে বিশ্বাসী, মূল্যবোধে অটল অথচ গোঁড়ামি মুক্তÑ এসব গুণের জন্য মানুষ তাকে কবুল করেছেন ও তিনি পরিণত হয়েছেন জাতীয় আত্মায়। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- প্রত্যেক মানুষেরই কিছু কিছু স্বপ্ন আছে। আমার স্বপ্ন তাদের চেয়ে আলাদা নয়। যে দিন দেখব, এই দেশের উন্নতি হয়েছে, মানুষগুলো সুখী হয়েছে, সে দিন তাদের স্বপ্নের অংশীদার হতে পারব আমি।

shovokhan007_1369498647_3-3আমার মতো, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র ও জনগণকে আজ যেভাবে মেরে-কেটে ক্রীতদাস বানাতে চাইছে, বেগম জিয়া তা থেকে আমাদের মুক্ত করবেনই এবং তিনি পারবেনও। আমরা অপেক্ষা করছি দুঃশাসনকে এ দেশ থেকে চিরতরে তিনি বিদায় দেবেন, তার নৈতিক রাজনীতির বিজয় পতাকা অনেক দিনের জন্য উড্ডীন হবে। জেমস ম্যাকগ্রেগর বার্নস তার লিডারশিপ গ্রন্থে চার জাতির (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, যুগোশ্লাভিয়া, পোল্যান্ড) ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষার দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছেন, The appeal may be more potent when a polity faces danger from outside, as from an invasion, or from inside, as in social breakdown, civil war, or natural catastrophe. If inefficiencies and corruption of governmental and social leadership go beyond normal, if demands are constantly frustrated by incapacities, in all of this is compounded by a rising consciousness of discrimination and sense of justice then people can experience great and often very sudden transformation of values or those values that were subdued can become the basis for vigorous action.
জীবনের চূড়ান্ত সংগ্রামের সাফল্যের জন্য তিনি আজ অপেক্ষমাণ। পদানত করবেন অশুভ শক্তিকে। রাজনৈতিক নৈতিকতার মাধ্যমে একটা গণবিপ্লব ঘটাবেন।

বেগম খালেদা জিয়াকে গত তিন দশকে বাংলাদেশের জন্য যে ভূমিকা পালন করতে দেখি, সেই বিবেচনায় আমি তাকে ‘জাতীয় আত্মা’ হিসেবেই গণ্য করি। উপমহাদেশের বিশিষ্ট লেখক, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিশ্লেষক আবুল মনসুর আহমদ তার বাংলাদেশের কালচার বইয়ে জাতীয় আত্মার ধারণাটি প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক নেশনের একটা স্পিরিচুয়াল অস্তিত্ব বা আত্মা থাকার কথা। এই ধারণা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি বস্তুনিষ্ঠ। ইন্ডিভিজুয়াল বা ব্যাষ্টির ব্যক্তিত্বের বা পার্সন্যালিটি ও জাতীয় স্বকীয়তা বা ন্যাশনাল আইডেন্টিটি আছে… কোনো নেশনের জাতীয় আত্মা কী ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে বিধৃত ও বিকশিত হইতে পারে না? নিশ্চয়ই পারে। তা হইতেই হয়। ব্যক্তি-আত্মা ও ধর্মীয় আত্মার মতোই জাতীয় আত্মাকে ইমেজে মূর্ত হইতেই হইবে। ইন্দ্রিয়ে না হইলেও উপলব্ধিতে হইবেই ও জাতি মাত্রেরই আত্মা আছে। রবীন্দ্রনাথও জাতিকসত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ কথার দ্বারা জাতীয় স্বকীয়তা বা জাতীয় ব্যক্তিত্বের চেয়ে ‘জাতীয় আত্মা’ বুঝিয়েছেন। জনাব আহমদ শেরেবাংলা এ কে এম ফজলুল হককেও তার ভূমিকার জন্য তাকে ‘জাতীয় আত্মা’ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে বাংলা আইন পরিষদে হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে দেশময় যখন হইচই তখন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র অনাস্থা প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন- ফজলুল হক বাংলার হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক, আমি কংগ্রেসের ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম বুঝি না। আমি বুঝি, বাঙালিরা নিজেরাই একটা নেশন। ফজলুল হকই এই ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতীয়তার প্রতীক। ফজলুল হক মাথায় চুল হইতে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি। আর সেই সাথে মাথার চুল হইতে পায়ের নখ পর্যন্ত মুসলমান। খাঁটি বাঙালিত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতীয়তার প্রতীক।

বেগম জিয়া আজ বাংলাদেশের জাতিসত্তা অর্থাৎ জাতীয় আত্মায় রূপান্তরিত হয়েছেন। বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টানসহ সবার উপলব্ধির একক কেন্দ্রবিন্দু তিনি। সব ধর্মের মানুষ তার কাছে সমান। দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও- এই স্লোগান একমাত্র বেগম জিয়ার কণ্ঠেই শোভা পায়। তার ধর্মবোধ, গণতন্ত্রবোধ ও দেশপ্রেমে আমাদের আস্থা অবিচল। পরীক্ষিত ও প্রমাণিত। বাংলাদেশ আজ দায়হীন নচ্ছারদের কবলে। গল্প বানিয়ে, গল্প ছড়িয়ে, সাঙ্কেতিক করে, সঙ্কেত মুছে, অবরুদ্ধতা বিষিয়ে তুলে তারা গুম-খুনকে দিনানুদৈনিকের ঘটনা করে ফেলেছে। জাতীয় আত্মা হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া এই কুশক্তিকে পরাজিত করবেনই।

শওকত মাহমুদ
সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।