জিয়া জীবিত থাকলে দলটির ব্যাপ্তি দেখে অনেক খুশি হতেন!

0

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

সাবেক রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমানের ৩৬তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ। জাতি আজ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। দিবসটি পালনে বিএনপি ও এর অঙ্গন সংগঠনসমূহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দিনব্যাপী পালন করা হবে নানা কর্মসূচি।

সেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া হয় তাকে। সে সময়কার কথা তেমন কিছুই স্মরণ নেই, তখন আমি খুবই ছোটছিলাম, ফলে ছোট একটি ঘটনা ছাড়া তার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করার মতোও আমার ঝুড়িতে আর তেমন কোনো কিছু নেই। এরপরও লেখার ক্ষেত্র যেখানে দিন দিন সংকোচিত হয়ে আসছে সেখানে আবার শহীদ জিয়া সম্পর্কে লেখা! তবে বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকেই আজ দু’কলম লিখতে বসলাম। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে নিজের কিছু কথা দিয়ে শুরু করি।

সেই আশির দশকের গোড়ার দিকের কথা, একেবারেই অবুঝ ছোটবেলা, আমার ৬-৭ বছর, ক্লাশ প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি। আমাদের বাড়িতে তখন অনেক গরু-ছাগল পালন করা হতো। যতদূর মনে পড়ে বছর চুক্তি কাজের লোকের পাশাপাশি আমাদের দুই ভাইয়ের অন্যতম কাজ ছিলো গরু ছাগলের দেখাশোনা করা।

ফলে স্কুল থেকে ফিরেই খাওয়া সেরে আমরা গরু-ছাগল চড়াতে যেতাম। স্মরণে আছে তখন গ্রামবাংলার প্রতিটি এলাকায় খাল খনন কাজছিল। ওইসব খালের পানি সেচ দিয়ে শুষ্ক মওসুমে ফসল আবাদ করতেন কৃষকরা। সম্ভবত এর মাধ্যমেই জিয়াউর রহমান বাংলার কৃষকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। যে কারণে বেশী বয়স্ক কৃষকদের মুখে সেই জিয়ার প্রশংসা আজো শুনতে পাওয়া যায়।

যা বলছিলাম, তেমনি আমাদের এলাকায় একটি বড় খাল ছিল। ওই খাল পাড়েই আমাদের অনেক জমিজমা ছিল, মূলত সেই খালপাড়ে আমরা গরু-ছাগল চড়াতে যেতাম, গরুর জন্য ঘাস কাটতাম, সেখানে খেলাধূলাও করতাম। যতদূর মনে পড়ে ৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের গ্রামের এক প্রান্ত দিয়ে অপর একটি খাল খননকাজের উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেদিন আমাদের এলাকার আবাল-বৃদ্ধ, বনিতা নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর এক কথায় সবাই জিয়াকে একনজর দেখার জন্য সেই খালপাড়ে ভিড় জমিয়েছিলেন।

সেদিন অন্যদের সাথে জিয়াকে দেখতে আমিও গিয়েছিলাম। সম্ভবত: তিনি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হেলিকপ্টার থেকে নেমে খাল খনন কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। যা দেখেছি তাতে এখনকার মতো রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী-এমপিদের মত জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এতটা নিরাপত্তা বলয় ছিল না, তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে নিজের হাতে কুদাল নিয়ে খাল খনন কাজ করতেন। যা অনেক ছবি থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, আমার এক মামা, যিনি জিয়ার খুব ভক্ত ও তার দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এখানে নামটি উল্লেখ না করলেই নয়, ময়মনসিংহ ত্রিশালের সেই সবার প্রিয় দেশপ্রেমিক বরেণ্য রাজনৈতিক মরহুম আবুল মুনসুর আহমেদের শিষ্য জালাল উদ্দিন আহমেদ, তিনিও আজ জীবিত নেই, তবে দলমত নির্বিশেষে ত্রিশালের মানুষ তাকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ।

আমাদের গ্রামে রাজা এসেছে তাই আমরা শিশুরা মহাখুশি, দলবেধে মিছিল করতে করতে সেখানে যাই। ছোটকাল থেকেই আমি একটু দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম, আমার মামা জালাল উদ্দিন আহমেদ জিয়াউর রহমানের সাথেই ছিলেন। তাই দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে মামা মামা বলে একেবারে জিয়ার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম, আমাকে অনেকে যখন ধরে আটকানোর চেষ্টা করছিলেন তখন জিয়াই আমাকে ডেকে নিয়ে পিঠে হাতবুলিয়ে আদর করেছিলেন। সে ঘটনায় তখন আমি বেশ আলোচিত হয়েছিলাম।

আর এভাবেই জিয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমার পিঠে জিয়ার সেই হাত বুলানোর ছুঁয়া কেন জানি আজোও অনুভব করতে পাই। এছাড়া খাল খননের জন্যই গ্রামবাংলায় জিয়ার খুব সুনাম-সুখ্যাতি ছিল। বাপ-দাদাদের কাছে থেকে জিয়ার অনেক গুণের গল্প শুনেছি।

আজ জিয়া নেই, তার স্ত্রী, সন্তান-সন্তুতি আছে, তার গড়ে যাওয়া দল আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি আজ দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল, যাদের সারা দেশে মোট জনগোষ্ঠীর গড়ে ৫০ থেকে ৬০ ভাগেরও বেশী কর্মী-সমর্থক রয়েছে। এই হিসাবে দেশের ১৬-১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৮-৯ কোটি মানুষ কম-বেশি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অথবা দলটিকে সমর্থন ও সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। এটা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য কম ব্যাপার নয়।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বাংলাদেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দল প্রতিষ্ঠা করেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান তার শাসনকে বেসামরিক করার উদ্দেশ্য ১৯ দফা কর্মসূচি শুরু করেন। দেশের প্রয়োজনে জিয়া যখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি রাষ্ট্রপতির পদের জন্য নির্বাচন করবেন তখন তার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। জাগদলকে বিএনপির সাথে একীভূত করা হয়।

রাষ্ট্রপতি জিয়া এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন এবং এই দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন। জিয়ার এই দলে বাম, ডান, মধ্যপন্থি সকল প্রকার লোক এসেছিলেন। বিএনপির সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি। প্রায় ৪৫ শতাংশ সদস্য শুধুমাত্র রাজনীতিতে যে নতুন ছিলেন তাই নয়, তারা ছিলেন তরুণ।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন। সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথমে ১৮ জন সদস্যের নাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ওই ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। সেই থেকে যাত্রা এই দলটির।

এরপর দলটি মোট চারবার ক্ষমতায় আসে। আজ দলের ব্যাপ্তি অনেক দূর। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে ৮০-৯০ বছরের বৃদ্ধও নিজেকে এই দলের কর্মী কিংবা সমর্থক বলে দাবি করতে দেখা যায়। এটা কম কথা নয়।

তবে এই দলের বিশালতা সত্ত্বেও ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দলটি বর্তমান সময়ের মতো এতটা সঙ্কটে ইতোপূর্বে কখনো পড়েছিল বলে আমার জানা নেই। অন্যদিকে সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে বর্তমান সময়ের মতো তাদের এত সমর্থনও কোনোকালে ছিল বলে মনে হয় না। এমন কি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশাতেও নয়।

ফলে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যদি আজ জীবিত থাকতেন তবে নিশ্চয়ই তিনি তার দলটির বিশাল ব্যাপ্তি ও অগণিত কর্মী-সমর্থক দেখে সত্যিই অনেক খুশি হতেন, আনন্দিত হতেন। রাজনীতিকে উপভোগ করতেন অন্যভাবে। অন্যদিকে বর্তমান সঙ্কটের জন্য ব্যথিত না হয়ে এর পেছনের কারণ জানার চেষ্টা করতেন। এবং সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পথ খুঁজতেন। দেশপ্রেমিক বিচক্ষণ জিয়া হয়তো বা একটা সুন্দর মসৃণ পথ পেয়েও যেতেন দেশকে গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে আনতে।

কেননা, জিয়া সেই ব্যক্তি, যখন ১৯৭১ সালে জাতীয় ইতিহাসের চরম দুর্যোগময় কাল। যখন সকলেই ২৫ মার্চ মধ্যরাত ইতিহাসের পৈশাচিক গণহত্যার ভয়াবহতায় হয়ে পড়েছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আক্রান্ত অসহায় দেশবাসী হতবিহবল এবং অনেকে আত্মসমর্পণ কিংবা দালালির মাধ্যমে বেছে নিয়েছিলেন আত্মরক্ষার পথ। সেই সময় কালুরঘাটের বেতার কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার সেই কন্ঠস্বর ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’।

দেশের রাজনৈতিক বিভাজনে এ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বির্তক যাই করা হোক না কেন, সবকিছু উপেক্ষা করে সেদিন যে জীবন বাজি রেখে জাতির পক্ষে জিয়াউর রহমান মহান স্বাধীনতার যুগান্তকারী দুঃসাহসী ঘোষণা দিয়েছিলেন এটা অস্বীকার করার মতো কারো সুযোগ নেই। কেবল ঘোষণার মধ্যেই নিজের কর্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। স্বাধীনতাকামী সৈনিক জনতাকে সংগঠিত করে বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের লড়াইকে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে উন্নীত করেছিলেন।

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অবশেষে ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসলে সবাই তাকে বরণ করে নেন। যতদূর জানি, জিয়ার অকৃত্রিম দেশপ্রেম আর মহান মুক্তিযুদ্ধে দুঃসাহসিকতার জন্যই বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করেছিলেন। এ থেকেই বুঝা যায় বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে সম্পর্ক কতটা সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিলো।

কিন্তু আজ দেশের রাজনৈতিক দৈন্যতায় পরস্পর বিরোধী দু’পক্ষের লোকজনের কাছ থেকে যখন বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান সম্পর্কে নানা কথা, নানা নতুন তথ্য শুনি তখন মনোকষ্ট পাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার থাকে না।

অবশ্য পরে সশস্ত্র বাহিনীর বিপথগামী একটি অংশের ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ এর মধ্য-আগস্টে রক্তক্ষয়ী এক সশস্ত্র সেনাঅভ্যুত্থানে ঘটে যায় রাষ্ট্রক্ষমতার পটবদল। খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশজুড়ে সামরিক শাসন বলবৎ ও শাসনতন্ত্র স্থগিত করে রেখে তার নিজস্ব মর্জি মাফিক শাসন চালাতে থাকেন। সবমিলেই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগুচ্ছিল জাতি।

যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, রাজনীতিহীন ওই সময়ে জাতীর ঐক্য ও আশা-আকঙ্ক্ষার প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীতে সৃষ্টি করা হচ্ছিল নানা দল-উপদল, ভেঙ্গে পড়ছিল শৃংখলা ও সংহতি। এরই মধ্যে কতিপয় উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসার ৩ নভেম্বর ঘটিয়ে দেয় আরেকটি স্বল্পমেয়াদী ক্যু। তদানীন্তন সেনাপ্রধান জিয়া তাদের হাতে বন্দী হন। তবে সেটা বেশীদূর এগুতে পারেনি।

৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহর থেকেই সারাদেশের সেনা ছাউনিগুলোর চেহারা বদলে যায়, ওইদিন ভোরে সেনা সদস্যরা ভোরে রাস্তায় নামলে তাদের প্রতি স্বত:স্ফুর্ত সমর্থন জানাতে সারাদেশের সাধারণ মানুষও বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। যেটাকে আমরা জাতীয় বিপ্লব বা সংহতি দিবস বলে থাকি। বির্তক থাকলেও ওই সময়ে জিয়ার ক্ষমতায় আসার বিষয়টি ছিল অনেকটাই দেশবাসীর বহুল কাঙ্খিত বিষয়। মুরুব্বিদের ভাষ্যমতে, ওই জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ না করলে হয়তো দেশে বিশৃঙখলা ও রক্তপাত আরো দীর্ঘ হতে পারতো। শুধু তাই নয়, জিয়া সেই ব্যক্তি যিনি বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে যে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে দেশকে রক্ষাই করেননি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও উত্তরণ করেছিলেন।

জিয়া দেশ শাসন করেন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশের জন্য অনেক কিছুই করেন, তবে সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারী বিষয় ছিল- বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে ফেরা। কেননা, দেশ স্বাধীনের স্বল্প সময়ের ব্যাবধানেই জনগণের রাজনৈতিক অধিকার শৃঙ্খলিত হয়ে পড়েছিল। এরপর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা।

জিয়ার মৃত্যুর পর নদীর ঘাটের জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ৩৬ বছর বয়সে বিধবা খালেদা জিয়া অবুঝ দুই ছেলেকে নিয়ে পথচলা শুরু করেন। এরপর নিয়তিই ডাকেই রাজনীতিতে আসা। দলে স্বামীর শূন্যতা পূরণে সেই দশকের গোড়ার দিকে রাজনীতির মাঠে আসেন। স্বামীর হত্যাকারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্বেই ’৯০-এর পটপরিবর্তন ঘটে। তার আপোষহীন অসাধারণ নেতৃ্ত্বের আকৃষ্ট হয়ে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। এরপর আরো দুইবার ক্ষমতায় বসেন বেগম জিয়া।

সেই সময়টাই খালেদা জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত’। এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে তিনবার ক্ষমতায় আরোহণের সময়টি যদি বেগম জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সময়’ হয়ে থাকে তবে পরবর্তীতে শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনটি তার জীবনের সবচেয়ে ‘অন্ধকার সময়’।

কেননা, সেই আপসহীন নেত্রী বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনভাবে চিন্তার মাধ্যমে পরিস্থিতির মূল্যায়ন, দ্রুত সমন্বয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেখাতে পারেননি বলেই মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বোদ্ধারা। এমনকি ১৯৯১ থেকে ৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার চালানোর সময় নিজের অভিজ্ঞতাকে পর্যালোচনা করে নতুনভাবে এগুতে পারেননি। যার ফলে আজ দেশের এই দৈন্যতা বলে অনেকে মনে করেন।

কেননা, তিনবার ক্ষমতা থাকাকালীন অনেক অপার সুযোগ ছিল- দেশ, দল ও জনগণের স্বার্থে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দলকে জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়ার, দেশকে নতুনভাবে সাজাবার, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর শক্তি ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর। যাতে অগণতান্ত্রিক শক্তি পুনরায় ক্ষমতায় না আসতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগটা সেভাবে ব্যবহার করা হয়নি।

১৯৮১ থেকে ২০১৭ এই ৩৬ বছরে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জিয়া পরিবারকে। চড়াই-উৎরাই পাড় করতে হয়েছে তাদের। এরশাদের শাসনামলে ’৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় বেগম জিয়াকে চরম জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়। অতঃপর ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়। দুই ছেলেকেও পাঠানো হয় কারাগারে। ছেলেদের উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

এরপর শেখ হাসিনার আমল শুরু হয়, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে চলছে ১০ বছর ধরে হাসিনাবিরোধী আন্দোলন। আন্দালনের মধ্যেই গেল ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসনে থাকাবস্থায় মারা যান। আর বড় ছেলে তারেক রহমান সেই ২০০৮ সাল থেকেই স্বপরিবারে নির্বাসনে রয়েছেন। ২০০৯ সালের মে মাসে ৪০ বছরের স্বামীর স্মৃতি বিজরিত বাড়ি ছাড়া হয়ে উঠেছেন ভাড়া বাসায়।

এখানেই শেষ নয়, খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে অর্ধশতাধিক মামলা ঝুঁলছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও বেশ কিছুসংখ্যক মামলা চলছে। কোকোর মৃত্যুর পর তার নাবালিকা দুই কন্যাকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। সবমিলেই এখন চরম দুর্দিন। সামনের দিনগুলো আরো বেশী চ্যালেঞ্জের মুখে এই পরিবারটি।

তবে দুর্দিনেও ভেঙ্গে পড়েননি বেগম জিয়া। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আবারো দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তার অর্জন একেবারেই কম নয়। এরই মধ্যে তিনি দেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তনের আবহাওয়া তৈরি করতে সক্ষমত হয়েছেন। সাম্প্রতিককালে রাজনীতিতে তার ইতিবাচক ভূমিকা এবং ভিশন ২০৩০ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।

সেই সঙ্গে জাতির ভাগ্যাকাশে নতুন স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে। নানা বাধার মধ্যেও চারদিকে সম্ভাবনার হাতছানি। ‘রাত যত গভীর হয় ভোরের সূর্যোদয়ের ক্ষণ তত বেশি নিকটতম হয়’ তেমনি বিশ্লেষকদের মতে, শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে বেগম জিয়া জাতির সামনে যে উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছেন তাতে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তাই আজ ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘জিয়া’ তোমাকে অনেক মনে পড়ে।

লেখক: গবেষক ও কলামলেখক

ই-মেইল: drsarderanis77@gmail.com