জিয়াউর রহমান : শাহাদতের প্রেক্ষাপট এবং আনুষঙ্গিক কথা

0

দুইজন প্রেসিডেন্টের মৃত্যু : মিল ও অমিল

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ তারিখে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত তথা শহীদ হয়েছেন (যদিও সরকারিভাবে তাকে শহীদ বলা হয় না)। আক্রমণকারী আততায়ীরা ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থানকারী সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের অফিসার ও সৈনিক। বঙ্গবন্ধু প্রাণ দেন ধানমন্ডিতে তার নিজ বাড়ির দোতলায় সিঁড়ির প্রান্তে। সময়টি ছিল ফজরের নামাজের আগে-পরে। ৩০ মে ১৯৮১ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম নিহত তথা শহীদ হয়েছেন (তাকে বিএনপি এবং শান্তিকামী জনগণ শহীদ বিশেষণে আখ্যায়িত করেন)। আক্রমণকারী আততায়ীরা চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানকারী সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের অফিসার ও সৈনিক। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গোপালগঞ্জ হলেও, কর্মক্ষেত্র বৃহত্তর বাংলাদেশ হলেও, তার কর্মের কেন্দ্র ছিল ঢাকা এবং বিশেষত ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি। ধানমন্ডির ওই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু নিহত হন। জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের বাড়ি কোথায় এটা কোনো দিনই মুখ্য প্রশ্ন ছিল না; তার কর্মক্ষেত্র ছিল বৃহত্তর বাংলাদেশ এবং তার ঐতিহাসিক পরিচিতি শুরু হয় চট্টগ্রাম মহানগরের ষোলশহর থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২৫ তারিখ দিনের শেষে, ২৬ মার্চ তারিখের প্রথম প্রহরের প্রথম লগ্নে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের এপ্রিল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জিয়ার পারিবারিক বাসস্থান ছিল ২০১১ সালের আগেকার ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের পাঁচ নম্বর বাড়ি; কিন্তু এ বাড়িটি থেকেও বেশি স্মৃতিময় হলো চট্টগ্রাম। সেই মহানগরেই জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ১৯৮০ সালের ৩০ মে ফজরের নামাজের আগে-পরের সময়ে, সার্কিট হাউজের দোতলায় সিঁড়ির গোড়ায় প্রাণ দেন। উভয়ের প্রাণদান বা শাহাদতে পরিবেশগত, কারণগত অনেক মিল আছে এটা যেমন সত্য, খুবই কম আলোচিত একটি মিল হলো বঙ্গবন্ধু এবং জিয়া উভয়ের নামের শেষ শব্দটি হলো রহমান। ‘রহমান’ শব্দটি মহান আল্লাহ তায়ালার খুবই গুরুত্বপূর্ণ গুণবাচক অনন্য বিশেষণ; যার অর্থ পরম করুণাময়।

আনুষঙ্গিক গবেষণা ও লেখালেখিঃ

২৯ মে ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। তার মূল কাজ ছিল রাজনৈতিক; প্রধানত বিএনপি দলীয় রাজনৈতিক কর্ম। তিনি চট্টগ্রাম মহানগরের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী সরকারি সার্কিট হাউজে রাত কাটান। এটা কোনোমতেই প্রথমবার ছিল না যে, তিনি সার্কিট হাউজে রাত কাটাচ্ছেন; কিন্তু এবারের রাতটি তার জীবনের জন্য কালরাত্রি। তাকে হত্যা করার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে যারা ষড়যন্ত্র করছিল, তারা এই রাতটিকে কাজে লাগায়। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট যে চট্টগ্রামে থেকে গেলেন, এটাকে সুযোগ বানিয়ে সেই সুযোগটি কাজে লাগানো হলো। সুযোগটি কী? উত্তর : প্রেসিডেন্টকে হাতের নাগালে পাওয়া। সুযোগটি কী কাজে লাগানো হয়? উত্তর : তাকে হত্যা করা। ৩০ মে ১৯৮১ সালের আগের দিনগুলোতে ষড়যন্ত্রকারীরা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল বা কী কী প্রস্তুতি অথবা কেনই বা তাদের একাধিক ষড়যন্ত্র সফল হয়নি, এ কথাগুলো বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তি তাদের পুস্তকে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নালে লিখেছেন। শুধু দু’টি বইয়ের রেফারেন্স এখানে দিচ্ছি। প্রথম বইটির নাম : ‘মিশ্র কথন’; লেখকের নাম : মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক; প্রকাশক : অনন্যা; প্রকাশকাল : একুশের বইমেলা ২০১১। দ্বিতীয় বইটি ইংরেজি ভাষায়, নাম : ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ : অ্যা পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি’; লেখকের নাম : মাহফুজ উল্লাহ; প্রকাশক : অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬। প্রথম বইটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আছে জিয়াউর রহমানের মৃত্যু প্রসঙ্গে; দ্বিতীয় বইটি পুরোটাই জিয়াউর রহমানের জীবনী।

৩০ মে’র ঘটনা প্রসঙ্গে জানার সুযোগ ও অছিলাঃ

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু ছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ কর্তৃক পরিচালিত বিদ্রোহের পরিণাম (ইংরেজি পরিভাষায় : আফটার ইফেক্ট অব অ্যা মিউটিনি কন্ডাক্টেড বাই পার্ট অব দ্য বাংলাদেশ আর্মি লোকেটেড ইন চিটাগং ক্যান্টনমেন্ট)। বিদ্রোহকে সামরিক ইংরেজি পরিভাষায় মিউটিনি বলা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে সংঘটিত চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহের বা মিউটিনির বিচার হয়েছিল; কিন্তু আজ অবধি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার কোনো বিচার হয়নি। বিদ্রোহের বিচার হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইনে ৩১ ধারা মোতাবেক। আইন মোতাবেক অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনজীবী অথবা সেটা সম্ভব না হলে সামরিক অফিসারদের মধ্য থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা পাওয়ার অধিকার রাখতেন। ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে ২৫ জনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার বা জুনিয়র কমিশনড অফিসার। অতএব, স্বাভাবিকভাবেই ওই ২৯ জনের আবেদন ছিল, সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্য থেকে ১২ জনকে আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা হিসেবে যেন নিযুক্তি দেয়া হয়। ওই ২৯ জন ১২ জন বা তার থেকেও দু-একজন বেশি মুক্তিযোদ্ধা সেনাকর্মকর্তার নাম দাখিল করেছিলেন। ১৯৮১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ মোট তিনজন আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা (ইংরেজি সামরিক পরিভাষায় : ডিফেন্ডিং অফিসার) নিযুক্ত করতে সম্মত হয়। ১৯৮১ সালের জুন মাসের জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে ওই তিনজন হচ্ছেন : (এক) পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত আর্টিলারি কোরের অফিসার, ব্রিগেডিয়ার আনোয়ার হোসেন, যিনি পরবর্তীকালে এনএসআই বা ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স বা গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা বাহিনীর মহাপরিচালক হয়েছিলেন। (দুই) মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল মোহাম্মদ আইনুদ্দিন বীর প্রতীক, যিনি পরে মেজর জেনারেল এবং একটি পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হয়েছিলেন। (তিন) মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, যিনি পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন, তথা এই কলামের লেখক। পাঠক যেন মনে করেন না যে, এই তিন ব্যক্তির দায়িত্ব ছিল প্রেসিডেন্ট হত্যাকে সমর্থন করা। এই তিনজন অফিসারের দায়িত্ব ছিল ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থন করা; এটা প্রমাণে সহায়তা করা যে, তারা বিদ্রোহের জন্য দায়ী নন বা তারা বিদ্রোহ করেননি। কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচার হয়েছিল; সেনাবাহিনী আইন মোতাবেক কোর্ট মার্শালের রায় বাস্তবায়ন হয়েছিল; কিন্তু সেই কোর্ট মার্শাল সম্পর্কে সেই কোর্ট মার্শালের পরিচালনা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আমার ব্যতিক্রমী মতামত আছে, যা ‘মিশ্র কথন’-এ লিখেছি। ওই ২৯ জনের বাইরে আরো তিনজন ছিলেন যাদের বিচার করা সম্ভব হয়নি; কারণ তারা ৩০ মে ১৯৮১ তারিখের পরপরই পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যেকেই নিহত হয়েছিলেন রহস্যময় পরিস্থিতিতে। তাদের নাম হলো তৎকালীন মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম, তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান এবং তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুবুর রহমান বীর উত্তম। কোর্ট মার্শাল (তথা আদালতটি) বসেছিলেন চট্টগ্রাম মহানগরীর লালদীঘির পাড়ে অবস্থিত কারাগারের অভ্যন্তরে। ওই কারাগারেই অভিযুক্ত ২৯ জন বন্দী ছিলেন। তাদের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হলে ঘটনা সম্পর্কে জানতেই হবে। জানার নিমিত্তে ওই ২৯ জন অভিযুক্তের সাথে আমরা তিনজন আলাপ করেছিলাম। ২৯ জনের মধ্যে বেশির ভাগেরই পিতামাতা, স্ত্রী, ভাইবোন প্রমুখের সাথেও আমরা তিনজন কথা বলেছিলাম। তিনজনের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার আনোয়ার একটু কম জড়িত ছিলেন; কর্নেল আইনুদ্দিন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইবরাহিম বেশি জড়িত হয়েছিলেন; বেশি কথা শুনেছিলেন; বেশি খবর জেনেছিলেন। আলাপের কারণে তাৎক্ষণিক ঘটনা এবং তার আগেরও অনেক ঘটনা প্রসঙ্গে আমাদের জানার সুযোগ হয়েছিল। এটি ছিল অত্যন্ত বিরল সুযোগ। আশ্চর্যজনক মনে হলেও বাস্তবতা হলো, ভীতিকর পরিস্থিতিতে আমরা কোনো লিখিত নোট রাখতে পারিনি, যা কিছু জমা রাখার সেটা রেখেছিলাম স্মৃতির মণিকোঠায়। অপ্রিয় বাস্তবতা হলো, কালের পরিক্রমায় অনেক কিছু স্মৃতিশক্তি থেকে হারিয়ে যায়।

মহা দুর্ঘটনার দায়ঃ

সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কারণে চাকরি জীবনে, এই ধরনের মিউটিনি ও কোর্ট মার্শালের মতো বিষয়ে লেখালেখি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত ছিল; কিন্তু ঘটনার তিরিশ বছর পর ‘মিশ্র কথন’ নামের বইটি লিখেছি। লেখার সময় অনেক কথা যেগুলো অভিযুক্তদের কাছ থেকে জেনেছিলাম, সেগুলো উল্লেখ করতে পারিনি। কারণ সেগুলো গবেষকের বা আইনজীবীর দৃষ্টিতে প্রমাণযোগ্য নয়; কিন্তু আমার কাছে খুব বিশ্বাসযোগ্য। প্রখ্যাত সাংবাদিক জনাব মাহফুজ উল্লাহ দীর্ঘ দিন গভীর ও বিস্তৃত গবেষণার পর তার বই লিখেছেন। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক ঘটনা আমার বইয়ে আলোচনায় আনিনি; জনাব মাহফুজ উল্লøাহ তার বইয়ে এনেছেন। সারমর্ম : চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পদাতিক ডিভিশনের জিওসি তৎকালীন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম চাচ্ছিলেন জিয়াউর রহমানকে কাবু করতে। জেনারেল মঞ্জুরকে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও সুনির্দিষ্ট ও পরোক্ষভাবে উৎসাহ জোগাচ্ছিলেন ঢাকায় অবস্থানকারী কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের বাইরের কেউ না কেউ। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দু-একটি পত্রিকায় এবং অন্যান্য দেশের পত্রিকায় প্রকাশিত বিশ্লেষণমূলক সংবাদে এবং অনেক বাংলাদেশী লেখকের পুস্তকে এ ধরনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং ১৯৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ইমাম উদ্দিন চৌধুরী তার আত্মজীবনীমূলক পুস্তকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সরকারি সহকর্মী কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম, বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং আরো কেউ কেউ তাদের লেখা পুস্তকে বা কলামে বা ইন্টারভিউতে এ ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মঞ্জুরের নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম ছিল ষড়যন্ত্রের সূতিকাগারঃ

১৯৮১ সালের ৩০ মে আগ্রহী বিদ্রোহীরা সফল হয়েছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানকে হত্যা করতে; কিন্তু এর আগেও একাধিকবার চট্টগ্রাম অঞ্চলেই জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীর উত্তমের নেতৃত্বে বা মঞ্জুরের অবগতিতে বা উৎসাহে বা উদ্যোগে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার জন্য নিদেনপক্ষে জিয়াকে কব্জা করে দাবি আদায়ের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। স্থানের অভাবে সংক্ষিপ্ত কলামে সব ঘটনা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। শুধু একটি ঘটনা উল্লেøখ করছি। ঘটনাটি ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরের এবং বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি বা বিএমএকে কেন্দ্র করে। আমি বিএমএর পরিচয়সহ ঘটনা-পরিকল্পনার পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটসহ অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করছি। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে কুমিল্লা সেনানিবাসে অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি যাত্রা শুরু করেছিল, তখন একাডেমি স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল না; তাই স্বতন্ত্র একজন কমান্ড্যান্ট দেয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৭৫-এর আগস্টে পটপরিবর্তনের পর জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে বিলুপ্ত এবং সেনাবাহিনীতে একীভূত বা আত্তীকৃত করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম মহানগর থেকে ১০ মাইল উত্তরে ভাটিয়ারিতে রক্ষীবাহিনীর একটি ক্যাম্প ছিল। সেখানে পাকিস্তানি আমলের কিছু বিল্ডিং এবং দু-একটি বাংলাদেশে নতুনভাবে বানানো বিল্ডিং ছিল। ভাটিয়ারির সাবেক রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পটিকে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির জন্য স্থায়ী নিবাস হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে বিএমএ কুমিল্লা থেকে ভাটিয়ারিতে আসে। প্রতিষ্ঠালগ্নে বিএমএ’র কমান্ড্যান্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন (মুক্তিযোদ্ধা) কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা। মূলত তিনি কুমিল্লøা সেনানিবাসে অবস্থিত ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন; অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি ছিলেন বিএমএ’র কমান্ড্যান্ট। এর পরে ১৯৯৩ সালে আমি দায়িত্ব নিই; কর্নেল হুদা এবং আমার মাঝখানে অন্য কোনো মুক্তিযোদ্ধা অফিসার কমান্ড্যান্ট ছিলেন না। মিলিটারি একাডেমিতে ছয় মাস পরপর একটি কোর্সের প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠান বা প্রশিক্ষার্থীরা যে সেনাবাহিনীর অফিসার হলেন তার অনুষ্ঠান হতো। এই অনুষ্ঠানকে পাসিং আউট প্যারেড বলা হয়। যেহেতু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে সামরিক বাহিনীগুলোর সর্বাধিনায়ক, তাই তরুণ প্রশিক্ষার্থীরা সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে যোগদানের প্রক্রিয়া তথা কমিশন পাওয়ার কাজটি রাষ্ট্রপতির সুবাদে বা রাষ্ট্রপতির সৌজন্যে হতো। এ জন্য ওই আনুষ্ঠানিক প্যারেডের অপর নাম হলো প্রেসিডেন্টস প্যারেড। কমান্ড্যান্ট হিসেবে একাডেমির পরিচালনা প্রক্রিয়া, পাসিং আউট প্যারেডের প্রক্রিয়া, প্যারেডের আগে-পরে নিরাপত্তা প্রক্রিয়া, প্যারেডের জন্য মেহমানদের আগমন-নির্গমন প্রক্রিয়া ও মেহমানদের নিরাপত্তা এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থিত পদাতিক ডিভিশনের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন ইত্যাদি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। তবে ১৯৮০ ও ১৯৯৩-৯৪ এর মধ্যে হালকা কিছু তফাত তো হবেই।

ডিসেম্বর ’৮০-এর প্যারেডকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রঃ

সাধারণত জুন ও ডিসেম্বরে অর্থাৎ বছরে দুইবার পাসিং আউট প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসের প্যারেডটির তারিখ স্থির হয়েছিল ২০ ডিসেম্বর। শীতকালীন প্যারেডে সাধারণত দেশের প্রেসিডেন্ট নিজেই উপস্থিত থাকতেন এবং সালাম গ্রহণ করতেন। ২০ ডিসেম্বর ১৯৮০ আয়োজিত প্যারেডেও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সালাম গ্রহণ করবেনÑ এমনটিই নিশ্চিত ছিল। শীতকালে খুব সকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার জন্য আকাশপথ অবলম্বন করা অনিশ্চিত হতো। কারণ কুয়াশার কারণে বিমান বা হেলিকপ্টার চলাচল হতো বিঘিœত। তাই প্রেসিডেন্ট অনেক সময় আগের রাতে চট্টগ্রামে এসে থাকতেন। এবারেও (২০ ডিসেম্বর ১৯৮০) এ রকমই বন্দোবস্ত ছিল। যেহেতু ফাংশনটি সামরিক, রাত্রিবেলা আরেকটি সামরিক অনুষ্ঠান বা সামরিক ডিনার বা সামরিক নৈশভোজ ইত্যাদি আয়োজন করা খুব স্বাভাবিক ছিল। ২০ ডিসেম্বর ১৯৮০-কে কেন্দ্র করে যে হত্যা পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই পরিকল্পনার মূল উপলক্ষ ছিল ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮০-এর রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একটি সামরিক নৈশভোজ। ১৯ ডিসেম্বর পরিকল্পিত সামরিক নৈশভোজের স্থান ছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার (ইবিআরসি) অফিসার্স মেস। নৈশভোজের স্বাগতিক বা হোস্ট জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম। প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রাম মহানগরীর সার্কিট হাউজ থেকে আসার কথা। যখন সামরিক নৈশভোজ চলমান থাকবে, গোপন পরিকল্পনা মোতাবেক বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়নের সৈনিকেরা অফিসার্স মেস ঘেরাও করবেন। ঘেরাও করার পর প্রেসিডেন্টকে জিম্মি করা হবে এবং চাপের মুখে বা জীবনের হুমকির মুখে তার কাছ থেকে কয়েকটি দাবি আদায় করা হবে। প্রেসিডেন্ট যদি রাজি না হন বা সহযোগিতা না করেন তাহলে একমাত্র পথ খোলা থাকবে, তাকে হত্যা। যদি প্রেসিডেন্ট কোনো অজ্ঞাত কারণবশত সার্কিট হাউজ থেকে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তাহলে ওই সুনির্দিষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নের সৈনিকেরা সার্কিট হাউজ ঘেরাও করবে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবে, প্রেসিডেন্টকে বন্দী করবে, তাকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসবে, জিওসির নেতৃত্বে প্রেসিডেন্টকে জিম্মি করে দাবি আদায় করা হবে। এ ক্ষেত্রেও যদি প্রেসিডেন্ট অসহযোগিতা বা অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করেন তাহলে একমাত্র রাস্তা খোলা থাকবে, হত্যা। সৌভাগ্যবশত বা ঘটনা পরম্পরায়, দায়িত্ব দেয়া বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নটি পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের অবস্থান থেকে সময়মতো চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এসে পৌঁছতে পারেনি। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হয়নি; কিন্তু বাস্তবায়ন না হলেও পরিকল্পনাটির অসমর্থিতভাবে গোয়েন্দাদের কানে খবর চলে আসে।

শহীদ জিয়ার মূল্যায়নঃ

মানুষ মরণশীল; রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও মরণশীল ছিলেন। জীবন ও মৃত্যু মহান আল্লাহ তায়ালার হাতে; এখানে বান্দার হাত রাখার কোনো উপায় নেই। মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কোনো-না-কোনো দিন মারা যেতেন। পৃথিবীর বহু দেশের বহু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বা জাতীয় নেতা দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন। আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পরিবেশগত কারণে শাহাদত বরণ করেছেন; কিন্তু স্মৃতিতে অমর তিনি। চট্টগ্রাম মহানগরের ষোলশহরে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর প্রথম প্রহরেই তিনি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজের নামে এবং নিজের দায়িত্বে পরে বঙ্গবন্ধুর নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস যাবৎ সেক্টর কমান্ডার এবং ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন শৃঙ্খলামুখী অফিসার হিসেবে ১৯৭৫-এর ২৪ আগস্ট সকাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে চাকরি করেন। এরপর সেনাবাহিনী প্রধান হন। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব টলটলায়মান ছিল, তখন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সুদৃঢ়ভাবে, প্রত্যক্ষভাবে সেনাবাহিনীর এবং পরোক্ষভাবে পুরো জাতির হাল ধরেন। তিনি ছিলেন জনগণের হৃদয়ের মানুষ। তিনি ছিলেন কাজের মানুষ। সামরিক শৃঙ্খলাকে, সামরিক আবেগকে তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়ে আসেন। তার দূরদৃষ্টিমূলক, রাষ্ট্রনায়কোচিত কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রথম পা রাখে; বাংলাদেশ পৃথিবীর জাতিগুলোর মিলনমেলায় নিজের নাম উজ্জ্বলভাবে প্রস্ফুটিত করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো, প্রতিবেশী অমুসলমান দেশগুলো এবং বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদানকারী পাশ্চাত্যের দেশগুলো সর্বোপরি সবে উদীয়মান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি চীনের সাথে যুগপৎ ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান। তার রাজনৈতিক বিরোধীরা তার সমালোচনা করতেই পারেন; কিন্তু বিশ্লেষণকারী ব্যক্তিরা বিনাদ্বিধায় বলবেন যে, জিয়াউর রহমান সমন্বয়ের রাজনীতি, সহনশীলতার রাজনীতি, সমঝোতার রাজনীতি এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। গবেষকেরা স্বীকার করেন, তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তৃণমূল মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্বাস করতেন, কঠোর শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করতেন এবং নিজেকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রাখায় বিশ্বাস করতেন। তিনি তরুণ ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আগ্রহী করে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। সব কিছু মিলিয়ে তিনি সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন; তিনি বন্দুকের যোদ্ধা থেকে কোদালের কর্মী হয়ে দেশ গড়ার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিলেন। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর এবং তার সঙ্গীরা, নিজেদের প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, তারা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে ভুল করেছিলেন।শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি