জিয়াউর রহমান দেশকে স্বনির্ভর করতে চেয়েছিলেন

0

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জাতির ক্রান্তিলগ্নে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতায় বসানো হয়। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’। অর্থাৎ গণতন্ত্র একমাত্র পথ। তিনি ছিলেন ভাগ্যের বরপুত্র। তাই প্রেসিডেন্ট হয়ে বলেছিলেন, ‘পরিস্থিতি আমাকে টেনে আনে।’
বাংলাদেশের মানুষ দেখল ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তার কণ্ঠে যে রকম বেজে উঠেছিল ‘আমি মেজর জিয়া’, ঠিক তেমনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আবার ইথারে বেজে উঠল ‘আমি জেনারেল জিয়া বলছি…’।
জেনারেল জিয়াউর রহমান সবার অনুরোধে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতিতে তিনি স্বপদে ফিরে যেতে পারেননি। স্বাধীনতা-উত্তর মানুষের চাওয়া-পাওয়া ছিল অনেক। কিন্তু স্বাধীনতার পর সরকার মানুষকে নিরাশ করে। গুম, হত্যা, ব্যাংক ডাকাতি, রাহাজানি, দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি, দুঃশাসনের স্টিমরোলার চলতে থাকে। কয়েক হাজার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী গুম এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করা হয়। গণতন্ত্রের পথ হয় রুদ্ধ, সৃষ্টি হয় বাকশাল। মাত্র চারটি পত্রিকা রাখা হয়। ওই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। স্বনামধন্য সাংবাদিক নির্মল সেন লিখলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেহ স্বাধীনতার এক বছর পর লিখলেন, ‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা। রক্ত দিয়ে পেলাম শালার আজব স্বাধীনতা’। ’৭৪ সালে দুর্ভিক্ষে বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য আসার পরও লাখো মানুষ না খেয়ে মারা গেল। কবি রফিক আজাদ লিখলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো’। দেশজুড়ে ছিল হতাশা আর ক্ষোভ। সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। অতঃপর উন্নয়ন আর উৎপাদন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশকে স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
জিয়া গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ উত্তরণে ১৯৭৭ সালে গণভোট করলেন। তিনি ১৯৭৮ সালে ৩ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক কোটি ১০ লাখ ভোটের বিপুল ব্যবধানে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী মোর্চার প্রার্থীকে পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জনগণের সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরাজিত জেনারেল ওসমানী পরাজয় মেনে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে অভিনন্দন জানান। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২২০টি আসন লাভ করে বিএনপি।
রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নতুন। তাই রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার জন্য এ সাধারণ নির্বাচন ছিল কঠিন পরীক্ষা। তিনি সে কঠিন পরীক্ষায় মহাগৌরবে উত্তীর্ণ হন। রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবীণ রাজনীতিবিদেরাও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। তার সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া চারটিসহ ৪৪৪টি কাগজ চালু হলো। শুরু হলো বহুদলীয় গণতন্ত্র। ৬২টি দল তাদের কাজ শুরু করল। প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশের জন্য দিলেন ১৯ দফা কর্মসূচি। তিনি লক্ষ্য এবং কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন। মেধা ও শ্রম দিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’কে পরিণত করলেন তলাপূর্ণ ঝুড়িতে।
জিয়া মনোনিবেশ করলেন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্য খাতে মানুষকে স্বাবলম্বী করে শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে তিনি ডাক দিয়েছেন স্বনির্ভরতার। সর্বপ্রথম জোর দিলেন খাদ্য উৎপাদনে। বছরে তিনটি ফসল উৎপাদনের জন্য তিনি সারা দেশে উল্কার মতো ছুটে চলতে লাগলেন। বিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা, ট্রাক্টর ও কৃষি লোনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি ১২ হাজার খাল পুনঃখনন করেছেন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। নিজ হাতে কোদাল ধরেছেন। ১৯৭৯ সাল থেকে মাত্র দুই বছরের মধ্যে ১০১০টি খাল খননের কাজ সমাপ্ত হয়। তিনি সবুজ বিপ্লবের সূচনা করেন। ১৯৮০-৮১ সালে দুই হাজার আটশ মাইল দীর্ঘ খাল খননের কাজ হাতে নিয়েছিলেন। তিনি কৃষি ও খাদ্যকে দলীয় ও গোষ্ঠীগত রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে সবার কাছে অনুরোধ করেছেন। তার শাসনের আগে ও প্রথম দিকে ১০-১৫ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। উৎপাদন বাড়িয়ে দুই বছরের মধ্যেই ঘানায় চাল ও চিনি রফতানি করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াই প্রথম উপলব্ধি করলেন, নিরক্ষরতা নিমজ্জিত মানুষ নিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। চালু করলেন গণশিক্ষা। নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য ছাপালেন এক কোটি বই। দেড় বছরে ৪০ লাখ বয়স্ক লোক নতুন করে লেখাপড়া শিখলেন। সৃষ্টি করা হলো ২৭ হাজার পল্লী চিকিৎসক। ‘গ্রামসরকার সৃষ্টি’ করা হলো ৬৫ হাজার গ্রামে। সৃষ্টি করলেন ৮০ লাখ গ্রাম প্রতিরক্ষা কর্মী। জিয়া প্রশাসন ঢেলে সাজান। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকারি কলকারখানায় তিন শিফটে কাজ শুরু করলেন। শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো এবং বছরে দু’টি বোনাসের ব্যবস্থা করা হলো। তার সময়ে মোট জাতীয় উৎপাদন ১৯৮১ সালে শতকরা ৭.৫ ভাগ বাড়ে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি হলো।
যুবসমাজকে কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত করার জন্য যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। জেলায় জেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে ট্রেনিং নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমিকরা চাকরি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে চলেছে। সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্যসহ বহির্বিশ্বে শ্রমবাজার প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমানই। মহিলা ও নারীদের উন্নয়নে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মহিলা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মহিলা সংস্থা। ১৯৭৭ সালে ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠা করেন শিশু একাডেমি। প্রতিষ্ঠা করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। শিল্পকলা একাডেমির মতো জেলায় জেলায় শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে জিয়া ছিলেন সফল। মধ্যপ্রাচ্য ও চীনসহ বহির্বিশ্বে বন্ধুত্বের পরিধি বাড়ালেন। সৌদি বাদশা ফাহাদের আমন্ত্রণে সফরে যান। উপহার হিসেবে নিয়ে যান কিছু নিম গাছের চারা! আবেগে আপ্লুত বাদশা জড়িয়ে ধরেন জিয়াকে। তিনি বলেন, আজ হতে সৌদি আরব এবং বাংলাদেশ পরস্পর অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি বাংলাদেশে অর্থ সাহায্য দিতে চান। জিয়া বলেন, আমাদের দেশের মানুষ গরিব, কিন্তু তারা পরিশ্রম করতে জানে। আপনার দেশে উন্নয়ন কাজের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক দরকার। একটি নব্য স্বাধীন মুসলিম দেশের জন্য যদি আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চান, আমার দেশের বেকার মানুষদের কাজ দিন। বাদশা রাজি হলেন। খুলে গেল নতুন দিগন্ত। আর জিয়ার দেয়া সেই নিমের চারাগুলো আজ মহীরুহ। আরাফাতের ময়দানে তারা শীতল ছায়া দিয়ে চলছে। তবে সৌদি নাগরিকেরা এই গাছগুলোকে চেনে Zia Tree হিসেবে।
জিয়ার গতিশীল নেতৃত্বের কারণেই প্রাচ্যের সবচেয়ে শিল্পোন্নত ও শক্তিশালী দেশ জাপানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়। দেশবাসীর জন্য এটা ছিল বিরল সম্মান। প্রেসিডেন্ট জিয়া ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে তিন সদস্যবিশিষ্ট ‘আল কুদস’ কমিটির একজন সদস্য হওয়ার দুর্লভ সম্মান লাভ করেন। ইরাক-ইরান যুদ্ধাবসানের প্রচেষ্টায় ইসলামি সম্মেলনে গঠিত ৯ সদস্যের শান্তি মিশনে শীর্ষ নেতার ভূমিকা পালন করেছিলেন। সার্কের প্রতিষ্ঠাতাও জিয়া।
মাসের ২০ দিনই গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন। দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। জিয়া দেখতে চেয়েছেন স্বনির্ভর বাংলাদেশের মানুষের মুখের হাসি।
জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সৎ, আদর্শবান, মহৎ ও ধার্মিক মানুষ। ছিলেন স্বল্পভাষী ও নিরহঙ্কার। সাদাসিধা জীবনযাপন করতেন।
‘মওলানা ভাসানীকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, হুজুর আপনাকে তো সবসময় সরকারবিরোধী ভূমিকায় দেখা যায়। এমনকি যখন আপনার নিজের দল মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল, তখনো আপনি একই জনসভায় দাঁড়িয়ে আপনার পাশে বসা মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার উচ্চারণ করে বক্তৃতা দিয়েছেন। অথচ দেখা যায়, আপনি জিয়াউর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল। জিয়ার প্রতি এই দুর্বলতার কারণ কী?’ মওলানা জবাবে বলেছিলেন, ‘তোমরা তো রাজনীতি দেখছ বহু দিন ধরে। আমার রাজনীতির জীবনও বহু দিনের। এমন একটা লোক দেখলাম না, যে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে নিজেকে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে রাখতে পেরেছে; আমাকে একটামাত্র উদাহরণ দেখাও।’
তার শাহাদতবরণের পর জানা যায়, জিয়ার ব্যক্তিগত মালামালের মধ্যে নিম্নলিখিত জিনিসগুলো পাওয়া যায়। একটা পুরাতন চামড়ার সুটকেস। তা এত পুরান যে, এর তালাও সঠিক কাজ করে না। একটি পুরান অতি সাধারণ টু-ইন-ওয়ান, তালাবদ্ধ একটি পুরান ইকোলাক জাতীয় ব্রিফকেস, গায়ের আধা ছেঁড়া গেঞ্জি, দু-তিনটি সাফারি শার্ট, একটি প্যান্ট, একটি ফাউন্টেন পেন, একটি সানগ্লাস। মৃতের মাথার কাছে পড়েছিল কয়েকটি ক্যাসেট, তার বিছানার পাশেই পড়েছিল জায়নামাজ ও সাদা গোল টুপি (ইত্তেফাক, ৪ জুন ১৯৮১)।
জনৈক বিদেশী সাংবাদিক বলেছেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সততা শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিকদের জন্যই অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাজনীতিকদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত (বাংলাদেশ টাইমস, ৯ নভেম্বর, ১৯৮১)’।

৩০ মে ১৯৮১ সালে তার মৃত্যুর পর মানিক মিয়া এভিনিউতে লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল।

ইতিহাস নিজস্ব গতিতে চলে। কিন্তু বর্তমান সরকার ইতিহাস বিকৃত করে গায়ের জোরে শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদানকে অস্বীকার এবং বিকৃত উপস্থাপন করেছে। ইতিহাস একদিন তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। সময়মতো সঠিক ইতিহাস রচিত হবে। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে তত দিন ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে স্বাধীনতার ঘোষক, সফল রাষ্ট্রনায়ক ও জাতির গৌরব জিয়া থাকবেন স্মরণীয় হয়ে।