জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসঃ ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য

0

আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। মহান জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী-জনতার মিলিত প্রতিরোধে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যায়। সেদিনের জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের মিলিত সংগ্রাম আমাদেরকে জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার দুর্বার প্রেরণা যুগিয়েছিল। বছর ঘুরে আমাদের মাঝে আবারো গভীরতর তাৎপর্য নিয়ে ফিরে এসেছে ঐতিহাসিক ৭ নবেম্বর। ৭ নবেম্বরের ঘটনা এক বিরল ও অনন্যসাধারণ ঘটনা। স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথে দৃপ্ত কোটি মানুষের মিছিলের দিন ৭ নবেম্বর। সশস্ত্রবাহিনী ও জনগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এদিন অভূতপূর্ব বিপ্লব সংঘটিত করতে না পারলে অপশক্তিকে পরাস্ত করা সম্ভব হতো না। ঐতিহাসিক বিপ্লব না হলে জাতি হিসেবে আমরা আবার পরাধীন হতাম। তাই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে জাতি গত ৩৪ বছর ধরে এ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করে আসছে।

যদিও ’৯৬ সালে এক গভীর ষড়যন্ত্র ও নীল-নকশার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পরের বছর ১৯৯৭ সালে আকস্মিকভাবে ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি বাতিল করে দেয়। ওই সময় দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সেই প্রতিবাদ একদলীয় বাকশালী ভাবাদর্শের সরকার আমলে নেয়নি। বরং ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর পালনের জন্য প্রধান ও সর্ববৃহৎ একটি বিরোধী দল-বিএনপি ’৯৮ সালে ঢাকার পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভার আয়োজন করলে সরকারের নির্দেশে পুলিশ বেপরোয়া টিয়ার গ্যাস চালিয়ে ওই জনসভা ভেঙে দেয়। সরকারের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কানায়-কানায় ভর্তি পল্টন ময়দানে উপস্থিত লাখো মানুষের উদ্দেশে বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ভাষণ দেয়ার উদ্দেশে মাইকের সামনে দাঁড়াতেই এই নোংরা খেলায় মেতে উঠে বাকশালী প্রেতাত্মা শাসকগোষ্ঠী। ওইদিন সরকার দলীয় গুণ্ডাবাহিনী ও পুলিশ দিয়ে সন্ত্রাসের তাণ্ডব চালিয়ে জনসভা ভেঙে দেয়ার পাশাপাশি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাণনাশের চেষ্টা চালানো হয়। দেশবাসী ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপের সমুচিত জবাব দিয়েছিল ব্যালটের মাধ্যমে। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনার সমুজ্জ্বল ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি পুনর্বহাল করে। কিন্তু দেশের স্বাধীনতাকামী জনতার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের কালো থাবা গোপনে বিস্তার করতেই থাকে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জরুরি আইনের নামে তাদের দোসরদের ক্ষমতায় বসানো হয়। দেশের সম্পদ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে শুরু হয় নতুন চক্রান্ত। ওই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে ও ২০১৪ সালে ৫ই জানুয়ারি বিনা ভোটে  ক্ষমতায় আসীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার।

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ভারতীয় চরেরা ইতিহাসের চাকাকে পিছনের দিকে ঘুরাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। তারই অংশ হিসেবে ২ নবেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থান ভারতমুখী অভ্যুত্থান হিসেবে সর্বমহলে চিহ্নিত হয়ে যায়। এ সময় বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ, বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় এজেন্টদের নাশকতামূলক তৎপরতা অল্প সময়ের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের দেশপ্রেমকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে ৭ নবেম্বর সিপাহী-জনতার মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। ৩ থেকে ৬ নবেম্বর গভীর রাত পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এক কথায় ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়। সৃষ্টি হয় এক অরাজক-নাজুক পরিস্থিতি। ৩ নবেম্বর থেকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।

আধিপত্যবাদী শক্তির দোসররা নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে তাদের হত্যার এক জঘন্য নীল-নকশার অংশ হিসেবে মুহূর্তের মধ্যে সন্ত্রাস ও আতংক ছড়িয়ে দেয়া হয় ক্যান্টনমেন্টগুলোয়। বহু সেনা অফিসার এই অরাজকতার শিকার হন। আইন-শৃংখলা ও সেনা শৃংখলা ভেঙে পড়ে। সশস্ত্র বাহিনীকে পঙ্গু করে দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানোই ছিল এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু দেশপ্রেমিক সাধারণ সৈনিকদের সংহতি এতোটাই সুদৃঢ় ছিল যে, অপশক্তির কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে পারেনি। সকল সিপাহী অফিসার-জনতার কাছে তখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, রণাঙ্গনের সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। অবশেষে ৭ নবেম্বর ভোর বেলা দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী ও জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অভ্যুত্থানকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন। সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে অপশক্তির ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সিপাহী-জনতার মিলিত প্রতিরোধের নেতৃত্বে এসে দাঁড়ান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি ক্ষিপ্রতা ও দ্রুততার সাথে সেনাছাউনিসমূহে শৃংখলা ফিরিয়ে আনেন। রক্ষা করেন দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে। সকলেই তাঁর গতিশীল নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। তিনিও সাফল্যের সঙ্গে তাঁর সেই দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন।

খুরশীদ আলম

দৈনিক দিনকাল