চালের সরকারি মজুদ এখন প্রায় তলানিতে কৃষকের গোলাও খালি পড়ে রয়েছে

0

জিসাফো ডেস্কঃ এবার বছরের শুরুই হয়েছিল চালের দরের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দিয়ে। ধাপে ধাপে বেড়ে তা ক্রেতাদের বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কেজিপ্রতি মোটা চালের দর গিয়ে ঠেকে পঞ্চাশ টাকার উপরে। অতীতে দেশের বাজারে এর আগে চালের দাম কখনো এতটা বাড়েনি। এ সঙ্কট থেকে উত্তোরণের জন্য জরুরিভিত্তিতে রফতানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে সরকার। কিন্তু এ খবর জানতে পেরে চালের দাম টনপ্রতি প্রায় ১০০ ডলার বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াসহ রফতানিকারক  দেশগুলো। ফলে চাল আমদানি করা নিয়েই এখন চরম সঙ্কটে পড়েছে সরকার। আমদানির জন্য গ্রহণযোগ্য দামে চাল পাওয়া যাচ্ছে না।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চালের সরকারি মজুদ এখন প্রায় তলানিতে। কারণ, ১১ আগস্ট পর্যন্ত সরকারের মোট মজুদ ছিল ২ লাখ ৬৩ হাজার টন চাল। অথচ গত বছর একই সময়ে মোট মজুদ ছিল ৫ লাখ ৯০ হাজার টন চাল। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সাধারণ মানুষের ঘরে চাল না থাকাটা। সাধারণত: সরকারি মজুদের চেয়েও অনেক বেশি গুণ মজুদ থাকে এই সময় কৃষকের ঘরে। কিন্তু এবার ফলন মার খাওয়ায় কৃষকের গোলা খালি পড়ে রয়েছে। যে কৃষক খাদ্যের যোগান দেবার কথা, তাদেরই এখন বাজার থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। আর এ কারণেই চালের বাজারে চাপা বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায়, সরকারি গুদামে মজুদ কমে যাওয়ায় এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সঠিক সময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করায় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তুলেছে। পরে সরকার ব্যবসায়ীদের নানা সুবিধা দিলেও চালের দর নিয়ন্ত্রণে তা কাজে আসছে না।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ভিয়েতনাম থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির মাধ্যমে চাল কেনা হচ্ছে। এরমধ্যে দুই লাখ টন আতপ চাল টনপ্রতি ৪৩০ এবং ৫০ হাজার টন সেদ্ধ চাল প্রতিটন ৪৭০ ডলার করে আমদানি করা হচ্ছে। এ চাল দেশে আনা পর্যন্ত দেশীয় বাজারের চেয়ে বেশি দাম পড়ছে। কারণ, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরকার প্রতি কেজি চাল ক্রয় করেন সর্বোচ্চ ৩৪ টাকা দরে। এদিকে দেশের বেশির ভাগ মানুষ আতপ চাল খায় না। আর এই সুযোগ বুঝে ভারত, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াসহ অন্য দেশগুলো চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। কম্বোডিয়ার সঙ্গে চাল আমদানির চুক্তি করার পরেও নতুন শর্তে দেশটি ভারত, থাইল্যান্ডের চেয়েও ২৫ থেকে ৩০ ডলার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
এবিষয়ে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে চালের বাজার অনেক ছোট। মাত্র কয়েকটি দেশে চাল উৎপাদন হয়। তাই এক দেশে চালের সঙ্কট দেখা দিলে আর এক দেশ চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার যখন চাল আমদানির জন্য ভারত, থাইল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে তখন দাম কম ছিল। কিন্তু যোগাযোগের কয়েকদিন পরেই তারা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। একইভাবে ভারত, থাইল্যান্ডের চেয়ে কম্বোডিয়া ২৫ থেকে ৩০ ডলার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হাওর অঞ্চলে অকাল বন্যা, ব্লাস্টরোগের কারণে সারা দেশে বোরোর ফলন কম হওয়া এবং ১০ টাকা কেজি দরের সাড়ে ৭ লাখ টন চাল বিতরণের ফলে এবার চালের মজুদ তলানিতে ঠেকেছে। কিন্তু খাদ্যমন্ত্রণালয় ও অধিদফতর যথাসময়ে পদক্ষেপ নেয়নি। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে চালের এই ঘাটতি পূরণ ও দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। এর অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে মোট সাড়ে ১২ লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এজন্য প্রথমেই বেছে নেয়া হয় ভিয়েতনামকে। জিটুজি পদ্ধতিতে ইতিমধ্যে সেখান থেকে আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে চার দফায় এক লাখ ৭ হাজার টন চাল ভিয়েতনাম থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই বাকি চালও আসবে বলে খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন। তবে এ সম্পর্কে ভিন্ন তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ভিয়েতনাম থেকে যে চাল এসেছে তা সবই আতপ। আগেই বলা হয়েছে, আতপের চাহিদা আমাদের দেশে অত্যন্ত সীমিত। প্রয়োজন সিদ্ধ চালের। কিন্তু সিদ্ধ চাল এ পর্যন্ত এক ছটাকও আসেনি জিটুজি পদ্ধতির এ ক্রয়ে। ওদিকে সরাসরি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চাল কেনার প্রক্রিয়ায়ও মিলছে না কাঙ্খিত সাড়া।
ভিয়েতনামের পর ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে চাল আমদানির বিষয়ে কথা বলেছে সরকার। কিন্তু হতাশ করে দেশ দুটি। বাংলাদেশে চালের সংকটের সুযোগ বুঝে তারা প্রতি টন চালের রফতানিমূল্য ১০০ ডলার বেশি দাবি করেছে। কয়েক মাস ধরে তারা ৩৮০-৪০০ ডলারে বিভিন্ন দেশে চাল রফতানি করলেও বাংলাদেশের কাছে দাবি করছে ৫০০ ডলার করে। বাংলাদেশ ৪৫৫ ডলার পর্যন্ত দিতে রাজি হলেও মন গলেনি দেশ দুটির। এরপর হতাশ হয়ে চাল আমদানির জন্য খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম যান কম্বোডিয়াতে। তবে কম্বোডিয়া সরকার ভারত ও থাইল্যান্ডের চেয়েও বেশি হতাশ করেছে।
এরমধ্যে গত ১০ আগস্ট চাহিদা মেটাতে এখন থেকে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন চাল আমদানি করতে থাইল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। কম্বোডিয়া থেকে সরকারি গ্রীন ট্রেড নামের একটি কোম্পানি চাল আমদানির বিষয়ে গত ১৩ আগস্ট কথা বলেছে। এদিকে নাফেদা ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ অব ইন্ডিয়া নামে একটি কোম্পানি ৪৫০ ডলার ধরে প্রতি টন চাল বিক্রির জন্য ১৭ আগস্ট বাংলাদেশে আসতে পারে। মায়ানমার সরকারও আসার জন্য চিঠি দিয়েছে। কিন্তু, এখন পর্যন্ত এ সবই কথার কথা মাত্র। চালের বাজারের সংকট কাটানোর মতো কিছু একটা বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। থাইল্যান্ডের সঙ্গে ১০ লাখ টনের যে চুক্তি হয়েছে তা এ বছরের জন্য নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো মূল্যে সরকার চালের মজুদ বাড়াতে চায়। দরদাম যাই হোক, চাল আমদানি করতেই হবে। চাল আমদানি বাড়াতে সব ধরনের শুল্ক তুলে দেয়ার জন্য এনবিআরকে চিঠিও দেয়া হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ নিতে অনেক বিলম্ব করে ফেলেছে সরকার। যে কারণে কোন পদক্ষেপই এখন আর কাজে আসছে না। দেশের খাদ্য পরিস্থিতি এখন জটিল পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। এর পরিণতিতে কী দাঁড়ায় তা নিয়ে আশংকিত খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
এবিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, থাইল্যান্ড, ভারত ও কম্বোডিয়া প্রতি টন চাল ৫০০ ডলারের মতো চাইছে। আমরা এই দামে চাল কিনব কি না সে বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে আলোচনা চলছে যে দেশ থেকে কম দামে পাওয়া যাবে সেখান থেকে চাল কেনা হবে বলে জানান তিনি।
সেদ্ধ চালের প্রধান উৎস ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশের প্রায় সমান পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। প্রতি কেজি চাল ওই সব দেশ থেকে এনে বাজারজাত করলে পাইকারিতেই দাম পড়ছে ৪৫ টাকার বেশি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য প্রতিবেদনে অনুযায়ী জাহাজভাড়াসহ প্রতি টন চালের আমদানি মূল্য হিসাব করে দেখা গেছে, ভারত প্রতি টন ৫১৩ ডলার, থাইল্যান্ড ৫০৪ ডলার এবং ভিয়েতনাম ৫০০ ডলারে চাল বিক্রি করছে বাংলাদেশের কাছে। প্রসঙ্গত, সাধারণত ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশ চাল রফতানি করে থাকে।
(তথ্যঃসাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট )