চালের বাজারে আগুন সে আগুনে পুড়ছে গরিবের উদর

0

জিসাফো ডেস্কঃ সম্প্রতি ১ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করতে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। তবে চালের মজুদ যেটুকুই থাকুক, কিংবা সরকার যতই বলুক দেশে খাদ্য খাটতি নেই- বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। বছরের প্রায় শুরু থেকেই তৃণমূলের মানুষদের চাল নিয়ে হাহাকার দেখা যাচ্ছে। চালের বাজারে আগুন। সে আগুনে পুড়ছে গরিবের উদর।

দিনের পর দিন চড়া দামে চাল কিনে ফতুর অবস্থা খেটে খাওয়া মানুষদের। দিনের বেশির ভাগ শ্রমের মূল্যই দিন শেষে দিতে হয় চাল কিনতে গিয়ে। ফলে তাদের চোখে অসহায়ত্বের ছবি আর মুখে ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ফুটে উঠছে। সরকারের সংশ্লিষ্টদেরও কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে এর আগে কখনও চালের দাম এতোটা বাড়েনি।

গেল সপ্তাহে মিল মালিক, মজুতদার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কৃষিমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রীর এক বৈঠকে চালের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা কমানোর আশ্বাস দেন ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকরা। তবে সেক্ষেত্রে বেশ কিছু শত জুড়ে দিয়েছেন তারা। শর্তে সরকারের কাছে চাল আমদানি ও পরিবহনে পাটের বস্তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সেই সঙ্গে স্থলবন্দর দিয়ে চালবাহী ট্রাকগুলো যাতে দ্রুত আসতে পারে, সে ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের এ ঘোষণার ৯৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও চালের বাজারে এখনও অসহায় ক্রেতারা। যেখানে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা। আর এই চালের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দিনমজুর, নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষদের ওপর। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে নিতে সরকারের পক্ষ থেকেও নেয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। অপরদিকে দাম বৃদ্ধিকে সরকারের ব্যর্থতা দাবি করে বিষয়টিকে সমালোচনার তুঙ্গে রেখেছে বিএনপিসহ বামদলগুলোর নেতারা। তাদের দাবি, ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সরকারের কৌশলগত ত্রুটিকেই দায়ী করছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে গত রবিবার থেকে দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরে খোলাবাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলার অবৈধ মজুদদারদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কাউকে কাউকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

সরেজমিনে চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও বাজারে প্রতিকেজি মোটা চাল বিক্রি হয়েছিল ৪১-৪২ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৪ টাকায়। প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৬০-৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহ ছিল ৫২-৫৩ টাকা। ৫৮-৬০ টাকা কেজি দরের নাজিরশাইল চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭২ টাকায়। ৪৬-৪৭ টাকার বিআর-২৮ চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৪-৫৬ টাকায়।

চালের দামের এমন অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে নিম্নআয়ের মানুষেরা অনেকটা অসহায় বোধ করছেন। প্রতিদিনের আয়ের বেশির ভাগ অংশই চলে যাচ্ছে চাল কিনতে। চালের দাম না কমলে শিগগিরই তাদের চরম বিপাকে পড়তে হবে বলে মনে করছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা। চালের এমন দাম বৃদ্ধিতে কৌশলে সরকারদলীয় মন্ত্রীরা চালের মজুদ কম নেই, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে দাম বাড়ছে- এমন দাবি করে মূল সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বিরোধী দল, বিএনপি, সিপিবি-বাসদ, অন্যান্য বাম দলগুলো তথা দেশের চিন্তক ব্যক্তিরা সরকারের লুটপাটের মহড়াকেই চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রী এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈঠক শেষে চালের বাজারের অস্থিরতা নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বন্যার কারণে দেশে চালের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। এ ঘাটতি মেটাতে বিভিন্ন দেশে থেকে আমরা চাল আমদানি করছি। যেন বাজারে চালের কোনও সঙ্কট না থাকে। তবে কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। আমরা সেসব ব্যাপারে নজরদারি রাখছি।’

সচিবালয়ে চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠককালে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘দেশে চালের কোনও সংকট নেই এবং সারা দেশে প্রায় এক কোটি টন চাল আছে। ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছেন।’

এদিকে চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, চালের আমদানি শুল্ক কমাতে গিয়ে অনেক সময় নেয়া হয়েছে।

তবে এসব পদক্ষেপের পরও চালের বাজারে এখনও স্বস্তি ফেরেনি। ব্যবসায়ীরা সরকারকে চালের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজারে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। আগের দামেই কিনতে হচ্ছে চাল। খোদ সরকারের ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাওরান বাজার, বাদামতলী বাজার, শ্যামবাজার, যাত্রাবাড়ী, সেগুনবাগিচা, মিরপুর বাজারসহ অন্যান্য বাজারে সরু চাল, নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল ৬২-৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া নিম্নবিত্তের মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা, চায়না ইরির দামও ৫০ টাকার উপরে রয়েছে; পাইজাম, লতা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। তবে বাজারের চিত্র আরও খারাপ বলে জানিয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

এদিকে দেশে চালের দাম বৃদ্ধির জন্য বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ও তাদের নীতিকেই দায়ী করছে বিএনপি। এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডিকে বলেন, “এ সরকারের সময়ে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, তার কারণ দেশের ব্যাংকে কোনও টাকা নেই। সব টাকা লুটপাট এবং বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়েছে। দেশে বিনিয়োগ বন্ধ, গত বন্যায় সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই দেশের যে অর্থনীতি তা ভেঙে পড়েছে। মানুষের হাতে কাজ নেই, চাকরি নেই। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।”

চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিএনপির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, “তোফায়েল (বাণিজ্যমন্ত্রী), আব্দুর রাজ্জাক (অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি) ও কামরুল ইসলাম (খাদ্যমন্ত্রী) সরকারের এই তিন মন্ত্রী চাল ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করেছেন- কিভাবে দাম কমানো যায়, মজুতদারি রোধ করা যায়? এমন পরিস্থিতিতে মজুদদাররা বললো তারা চালের সংকট যাতে না হয় সেজন্য মজুদ করেছে। এমন হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। চালের দাম কেন বাড়ছে, কেন এই সংকট? এই ঘটনার গভীরে না যাওয়া পর্যন্ত এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সংকটের কারণ হলো ‘ডিমান্ডেড সাপ্লাই’ নিশ্চিত করতে না পারা।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি খাদ্যগুদামে যে পরিমাণ চাল মজুদ থাকার কথা বর্তমানে মজুদ তারচেয়ে অনেকগুণ কম। আজকের দিনে যেখানে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল মজুদ থাকার কথা সেখানে আছে মাত্র ২ লাখ মেট্রিক টন। সরকারি মজুদের কথা ব্যবসায়ীরা জেনে যান নানাভাবে। এবং কোন বাজারে চালের চাহিদা বেশি সেখানে সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেন এসব চালবাজ চাল ব্যবসায়ীরা। এছাড়া সরকার ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের থেকে ৩০-৩২ টাকায় চাল কিনতে চেয়েছিল। ব্যবসায়ীরা তা দেয়নি। ফলে সরকার এই প্রকল্পে ব্যর্থ হয়েছে। আর দেশজুড়ে চালের দাম বেড়েছ।”

খাদ্যের যে নিরাপত্তা দরকার এই সময়ে সরকার তা দিতে পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমদ ব্রেকিংনিউজকে বলেন, “বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরেই তো বন্যা হয়। হাওরে বন্যা হয়। এই বন্যার কথা মাথায় রেখেই তো চালের মজুদ রাখা উচিত ছিল। কিন্তু তারা (সরকার/আওয়ামী লীগ) সেটা না করে মানুষের কাছে মিথ্যাচার করছেন। তারা শুধু বিভ্রান্তিই ছড়াতে জানেন। সমাধান নয়।”

চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে অনস্কিন কথা হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবির) সাধারণ সম্পাদক কমরেড শাহ আলম এর সঙ্গে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “চালের দাম বৃদ্ধিতে একদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হাওরাঞ্চল প্লাবিত হওয়া যেমন একটা ভূমিকা রেখেছে, তাতে আরও রসদ জুগিয়েছে বাজারের কৃত্রিম সংকট। এর সাথে মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবসায়ী ও নানা সিন্ডিকেট জড়িত। সিন্ডিকেটের মধ্যে সরকারি দলের লোকেরা বেশি জড়িত। বিরোধী দলেরও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জড়িত আছেন বলে আমি মনে করি। যেহেতু তারাও ব্যবসাটা এই বাজারেই করে যাচ্ছেন।”

কিভাবে চালের দাম বৃদ্ধি রোধ করা যেতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিপিবির জেনারেল সেক্রেটারি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, “সরকারের ধান ক্রয়ের যে উদ্যোগ এটি যদি সরাসরি কৃষকের হাত থেকে ক্রয় করা হতো তাহলে একটা ব্যাপার ছিল। সরকার এমন সময় ধান ক্রয় করার উদ্যোগ নেয় যখন কৃষকদের হাতে ধান থাকে না, ধান চলে যায় মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবসায়ীদের হাতে। এই নীতি পাল্টাতে হবে। ভবিষ্যতে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে গণবণ্টন অর্থাৎ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বর্তমানে টিসিবি যা করছে তা সম্পূর্ণ লোক দেখানো। টিসিবির প্রভাব বাজারে লক্ষণীয় নয়, দামের ক্ষেত্রে একটু যে তারতম্য হবে সেটিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।”

চলমান রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিপরীত পরিস্থিতিতে মিয়ানমার থেকে চাল আমদানি কতটা যুক্তিযুক্ত- এ প্রসঙ্গে শাহ আলম বলেন, “সরকার বলছে আমরা আগেই চাল ক্রয় করেছিলাম। পরবর্তীতে ঘটনাগুলো ঘটছে। জাতিগত নিধনের অংশ হিসেবে মুসলিম রোহিঙ্গাতের ওপর বর্বরোচিত হামলা গণহত্যা চালিয়ে, তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে আমাদের দেশে পাঠিয়ে মিয়ানমার যে অমানবিক কাজ করছে এমন সময় সে দেশ থেকে চাল আনা আমার কাছে খু্বই দৃষ্টিকটু মনে হয়। এটা কিছু দিনের জন্য বন্ধ রাখা উচিৎ ছিল। সরকারের হাতে চাল আমদানির ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বিকল্পও ছিল।”

চালের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডিকে বলেন, “হঠাৎ চালের দাম বৃদ্ধির ফলে লাখ লাখ শ্রমজীবী মেহনতি জনগণের ওপর নেমে এসেছে নিদারুণ অর্থনৈতিক চাপ। সরকারের লুটপাটের রাজনীতির কারণেই চালের দাম এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।” এ অবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে না পারলে দেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলেও মনে করেন এই বাম রাজনীতিক।

এ বিষয়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু বলেন, “লুটপাটের সরকার অযৌক্তিকভাবে চালের দাম বৃদ্ধি করে জনগণকেই জিম্মি করতে চাইছে। সরকারের এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। জনগণ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই।”