চাঁদা না দেয়ায় নারীকে বেঁধে নির্যাতন করেছে সরকার দলীয় নেতারা

0

সাতক্ষীরা:  চাঁদার  দাবি পূরণ না করায় ভুয়া স্বামী-স্ত্রীর অভিযোগ এনে জেলার কলারোয়া উপজেলার পল্লীতে প্রকাশ্যে দুই নারীসহ তিনজনকে বেঁধে আদিম যুগের বর্বরতা চালিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী সরকারি দলের নেতারা। এ ঘটনার পর নির্যাতিত পরিবারের সদস্যরা লোক-লজ্জায় ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন না।

এদিকে, ওই ঘটনায় মামলা করায় নির্যাতিত পরিবার এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশও আসামিদের গ্রেফতারে তেমন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ সুযোগে আসামিরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্যও হুমকি দিচ্ছে।

তবে পুলিশ বলেছে, ‘নির্যাতনের ওই ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ তদন্তকাজ শেষ করে এনেছে। দু-এক দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হবে। আসামিদের গ্রেফতারেও পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

প্রসঙ্গত, ২৯ আগস্ট উপজেলার কেড়াগাছি ইউনিয়নের পাঁচপোতা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তবে বিষয়টি শুক্রবার জানাজানি হয়। কারণ লোকলজ্জা আর হুমকির ভয়ে নির্যাতিত পরিবারের সদস্যরা এতদিন মুখ খোলেননি।

নির্যাতনের ছবি মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হয়। প্রত্যক্ষ ঘটনার সাক্ষী স্থানীয় কয়েকশ মানুষ। ঘটনার দুই সপ্তাহ পরে বিষয়টি নিয়ে জেলা ব্যাপি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার দিনভর টক অব দ্যা সাতক্ষীরা ছিল আলোচিত ঘটনাটি নিয়ে। স্থানীয় একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ডা. আবদুল আজিজের মেয়ে নির্যাতিতা সুমাইয়া খাতুনের  বাড়িতে ভীড় করতে থাকে। সাংবাদিকদের আশ্বাসের পরে সুমাইয়া  ঐদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ বিল্লাল হোসেন নামের একজনকে গ্রেফতার করলেও প্রভাবশালী এক আওয়ামী লীগ নেতার তদবিরে আদালত থেকে সে জামিনে মুক্তি পেয়ে এলাকায় গিয়ে ফের ত্রাস সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সুমাইয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, ১২ বছর আগে তার সঙ্গে বিয়ে হয় একই উপজেলার কেড়াগাছি ইউনিয়নের পাঁচপোতা গ্রামের হেজো মোড়লের ছেলে হাফিজুল ইসলামের। তিনি বর্তমানে মালয়েশিয়া প্রবাসী। এই সুযোগে একই গ্রামের ইব্রাহীমের ছেলে ট্রলিচালক বিল্লাল হোসেন তাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় বিল্লাল তার বিরুদ্ধে এলাকায় নানা কুৎসা প্রচার করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করে। সুমাইয়া সম্পর্কে বিল্লালের মামী।

তিনি আরও জানান, ২৭ আগস্ট মেয়ে ঈশিতা, রুপা ও তার খালাতো বোন একই উপজেলার ব্রজবাকসা গ্রামের আকরাম সরদারের মেয়ে রুমা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যান। এর এক দিন পর ২৯ আগস্ট রুমার স্বামী জাহিদুল ইসলামও আসেন সেখানে। দুপুরে সেখানে আসেন বিল্লাল, গোলাম মোস্তফার ছেলে রুহুল কুদ্দুস, ভাসুর মোস্তফা মোড়ল, জিয়া, জোহর, লাল্টু, ভোলা, ইসমাইল, ইমান মুহুরি, আশরাফুল, কওসারসহ বেশ কয়েকজন। এ সময় তারা তার বোন রুমা ও জাহিদের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তাদেরকে নিজের বোন ও বোনজামাই বলে পরিচয় করিয়ে দেন। তারা তাদের বিয়ের কাগজপত্র দেখতে চান এবং ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। এতে আপত্তি জানাতেই তারা ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন সুমাইয়া।

একপর্যায়ে তারা গরু বাঁধার রশি এনে তিনজনকে হাত ও পিঠ বেঁধে ফেলে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর বাঁশের লাঠি ও কুড়াল দিয়ে তাদের মারপিট করা হয়। পরে প্রতিবেশী পুলিশিং কমিটির সদস্য ইসমাইলের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও মারধর করার পর তাদের একশ’ বার কান ধরে ওঠ-বস করানো হয়।

সুমাইয়ার অভিযোগ, ‘আমাদের চারপাশে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাটকীয় কায়দায় মারপিট আর কান ধরে ওঠ-বস করানো হয়। কোনো দোষ ছাড়াই আমাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। আমরা দায়ীদের বিচার চাই।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফারুক নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, মারধরের কারণে সুমাইয়া অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তিনি গ্রাম্যডাক্তার বাসারকে ডেকে আনেন। ডাক্তার সুমাইয়াকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।

সুমাইয়ার ভাই ওমর শরিফ সাংবাদিকদের জানান, তিনি রাত ১২টায় জানতে পারেন তার বোনকে নির্যাতন করা হয়েছে। ওই রাতেই তার বোনকে কলারোয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কেড়াগাছি ইউপি চেয়ারম্যান ভুট্টোলাল গাইন জানান, বিষয়টি শোনার পর তিনি ঘটনাস্থলে যান। সুমাইয়াকে মামলা করার পরামর্শ দেন।

ওই ঘটনার পর ৬ সেপ্টেম্বর সুমাইয়া বাদী হয়ে কলারোয়া থানায় একটি মামলা করেন। সুমাইয়ার অভিযোগ, এসআই মোয়াজ্জেম হোসেন তার বয়ান ঠিকমতো লিপিবদ্ধ করেননি।

তিনি বলেন, ‘মামলায় নাম দিয়েছিলাম ২০ জনের। অথচ মাত্র তিনজনের নাম লিখেছেন ওই দারোগা।’

রুমার মা মমতাজ বেগম হাসপাতালে সুমাইয়াকে দেখতে এসেছিলেন ।  তিনি বলেছেন ‘ রুমা ও জাহিদ আত্মহননের চেষ্টা করছে’।  বৃদ্ধা মা মমতাজ বেগম নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দাবী করে বলেন, নির্যাতনকারী বেল্লাল ও কুদ্দুস  স্থানীয় এজন প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির ক্যাডার বাহিনীর সদস্য। ওই জনপ্রতিনিধি তাদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। আদালত থেকে আসামীদের জামিন করিয়ে এনেছেন।

এ ব্যাপারে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, এফআইআরভুক্ত আসামিরা হলেন- রুহুল কুদ্দুস, বিল্লাল ও ইসমাইল। এ ছাড়া অজ্ঞাত আসামি হিসেবে আরও ২/৩ জন রয়েছেন।

কলারোয়া থানার ওসি আবু সালেহ মো. মাসুদ করিম জানান, নির্যাতনের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। একজন আসামি গ্রেফতার হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। মামলাটির তদন্তকাজ শেষের দিকে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হবে।