চলছে সম্পূর্ণ রঙিন ‘ক্রসফায়ার পালা’

0

শামীম রুনা

বাংলাদেশে দুইজন জঙ্গি ধরা পড়েছে। ওদের মাঝে এক জঙ্গি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রচুর আগ্রহ হওয়ার কথা, কিন্তু তা হচ্ছে না। আমরা এই জঙ্গি ধরা পড়ার মধ্যে খুব বেশি পুলিশ বা গোয়েন্দাদের সফলতা দেখছি না।

তার মানে এই নয় যে, এই দুই বাহিনীর দক্ষতার ওপর আমাদের আস্থা নেই, বরং আমাদের আস্থাটা অনেক বেশি বলা চলে। আমাদের মতো দেশে অধিকাংশ নাগরিকই মনে করে, দেশে যা কিছুই ঘটছে তা সব কিছুই পুলিশ বা সরকারের গোচরে আছে।

Crossfire 2সরকার পক্ষ আন্তরিক হলে বহু আগে জঙ্গি নির্মূল করা সম্ভব ছিল এবং সিরিয়াল কিলিং বন্ধ হতো অনেক আগেই। এতে করে প্রাণে বেঁচে যেত আরও কিছু তরতাজা মুক্তপ্রাণ মানুষ। কিন্তু তা হয়নি, বরং পুলিশের নিস্পৃহতা এবং উদাসীনতার সুযোগে জঙ্গিবাদ আরও মাথা চাড়া দিয়েছে এবং সিরিয়াল কিলিং এমন পর্যায়ে পৌছেঁছে, এখন আর তা সমাজের কোনো শ্রেনী বা গোষ্ঠীর মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে জঙ্গীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে সমাজের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া ভ্যানচালক আর মন্দিরের নিরীহ সেবক পর্যন্ত।

এই পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ মানুষ দু’একজন সন্ত্রাসীকে ধরে ফেলে আমরা তখন একবার হলেও ভাবি, এবার হয়তো কোনো ক্লু পাওয়া যাবে। হয়তো মূল হোতাদের ধরা সম্ভব হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবই শুভঙ্করের ফাঁকি। বাবু হত্যার আসামীদের হাতেনাতে ধরার পরও এখন পর্যন্ত তাদের দিয়ে অনুসন্ধান কতোটুকু হয়েছে সাধারণ মানুষ জানে না। বরং যারা এসব সন্ত্রাসীদের ধরেছে, সেই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ক’জন পরবর্তীতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে, এমনকি শুনেছি তাদেরকে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে হয়েছে।

জুলহাস আর তনয়কে হত্যা করে ভীড়ের রাস্তা দিয়ে খুনিরা পালিয়ে গেছে, সিসিটিভি ক্যামেরায় সব পরিস্কার ছিল। পুলিশ বলেছে, জনগণ ওদের আটকাতে পারতো। আবার এটাও জেনেছি যে, পুলিশ নাকি একজনকে জাপটেও ধরেছিল এবং তার কাছ থেকে কিছু কাগজপত্রও নিতে পেরেছে। কিন্তু খুনিকে ধরতে পারেনি। হাস্যকর লাগছে কেমন জানি।


এবার মাদারীপুরে জনগণ জঙ্গীদের একজনকে আটকিয়েছিল। পুলিশ বলেছে, এই জঙ্গির কাছে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। এবং মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়াও গেছে। কিন্তু ১০ দিন রিমান্ডের একদিন পরই কেন তথ্যে ভরপুর এমন জঙ্গিকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হলো?

তথ্য নির্ভরযোগ্য আসামীদের নিয়ে পুলিশ বার বারই তথ্য উদ্ধারের নামে গিয়ে ওদের ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করে। পুলিশ কার নির্দেশে রিমান্ডের আসামীদের এমন অরক্ষিত অবস্থায় নিয়ে বেরোয়? আর কার নির্দেশেই বা ক্রসফায়ার ক্রসফায়ার খেলে?

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডে সন্দেহে জড়িত শিবিরের কর্মীটিও জেলে মারা গেল। জঙ্গি-সন্ত্রাসী-খুনী এরা যখন কোনো জেল বা পুলিশের আওতাধীন থেকে এইভাবে খুন হয়, তখন সে জেল বা পুলিশদের কি কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না? ওদের কি এই অনৈতিক, খেয়ালিপনা হত্যাকাণ্ড জন্য কোনো বিচার বা শাস্তি পেতে হয় না? ওদের চাকরি কি এতোটাই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে?

আর যদি ওদেরও কোনো কৈফিয়ত দিতে হয়, তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো উদাহরণ দেখি নাই কেন? আমরা সাধারণ মানুষও এসব জঙ্গি খুনিদের শাস্তি চাই, তবে এমনভাবে চাই না যাতে করে এদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খুনের মূল হোতারা নিরাপদে বসে আরও অসংখ্য হত্যার প্ল্যান করতে পারবে।

টুটুলকে তিনটি কোপ দিয়েছিল বলে উদ্ধত ঘোষণা দিচ্ছে যে ছেলেটি, আমারও ইচ্ছে করে ওর গলা চেপে ধরি। কিন্তু এও জানি, এ কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মানবিক কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এমন নির্মম হওয়া। একজন মানুষের ঘাড়ে কোপ দিয়ে নিজের আখেরাতের সওয়াব কামানোর লালসা মানসিক বৈকল্য ছাড়া কিছুই না, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। তারপরও শিহাব বা সুমনদের আমি কোনো ক্রসফায়ার বা জেলে অস্বাভাবিক মৃত্যু চাইনা, ওকে নিরাপদে রাখা হোক, পুলিশ যদি আন্তরিক হয়; ওর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে প্রকৃত জঙ্গিদের ধরা হোক। তারপর ওদের গড ফাদারসহ সবাইকে প্রকৃত বিচারের সম্মুখীন করা হোক।

ওরা যে আদর্শের নামে মানুষ হত্যার এই দুষ্কর্ম শুরু করেছে, সেই আদর্শ যে অমানবিক ফ্যাসিজম ছাড়া আর কিছু নয়, সেটাও বুঝিয়ে দেয়া দরকার। দু’একজনকে ধরলো আর ক্রসফায়ার খেলায় হত্যা করা হলো এটা কোনো বিচার নয়, এটা বরং সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদকে জিইয়ে রাখারই আরেক প্রক্রিয়া বলা যায়। সাধারণ নাগরিকরা এমনিতেই বোকা বনে গেছে সরকারের কাণ্ড কারখানায়, এঁদের আর বেকুব না বানালেও পারে।

পরশু রাতে উপরের লেখাটুকু লিখেছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, ফাহিমের পর এবার কার পালা? বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি, সকালেই জানতে পারলাম; পুরষ্কার-ঘোষিত আরেক খুনি শরীফও তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত।

এইবারের গল্প আরও কাঁচা, বোঝা যাচ্ছে পুলিশ বন্দুকযুদ্ধে যতোই পারদর্শী হোক না কেন, স্ক্রিপ্ট রাইটিং-এ এখনও পারদর্শী হতে পারেনি। যাই হোক, এই শরীফ শুদ্ধস্বরের অফিসে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই শরীফ অভিজিৎ রায় খুনেরও মূল হোতা (এতোদিন জানতাম রানার নাম)। বোঝা যাচ্ছে, পুলিশও আর বন্দুকযুদ্ধ খেলতে চাইছে না, তাই হয়তো একের ভেতর তিন চার ফর্মূলায় নিহত শরীফকে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের হোতা হিসাবে দেখানো হচ্ছে।

নিহত শরীফ একটা কেনো দশটা বা একশোটা হত্যাকাণ্ডের হোতা হলেও আমি ওর এমন মৃত্যু চাই না, কেননা আমি এবং আমরা অনেকেই নিশ্চিত যে, ও আসল খুনী নয়। আসল খুনীরা এবারও আড়ালে থেকে যাচ্ছে, আর নতুন নতুন খুনের পরিকল্পনা করে আরও কিছু তরুণ যুবকের ব্রেন ওয়াশ করে ওদের আবারও লেলিয়ে দেওয়া হবে কিছু নিরীহ মানুষ খুন করার জন্য। আরও শরীফ, সুমন, ফাহিম তৈরি হবে। এদের তৈরি করার কারখানাটাকে ‘ক্রসফায়ার’ এর আওতায় আনা হোক।