গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, শিক্ষাক্রম: সরকার কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে দেশকে???

0

এক. পৃথিবীতে এমন কোন সরকার আছে, যে নিজের দেশের জনগনের পকেট কাটে? বিশ্ববাজারে দাম অবিশ্বাস্য রকমভাবে পড়ে গেলেও তেলের দাম কমায় না। ‘ভন্ডামী’ করে জনগনের গাঁটের অর্থ শুষে নেয়! যখন খুশি গ্যাসের দাম বাড়ায়; এমনকি এক বছরে দু’বার। বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। আর এক্ষেত্রে ভন্ডামীটি হচ্ছে- দাম বাড়ানোর আগে একটি কথিত ‘গণশুনানী’র আয়োজন করে। তারপর প্রায় সব সুপারিশ উপেক্ষা করে জ্বালানী-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েই চলে।

২০১৫ সালে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গড়ে ২৬.২৯ শতাংশ। ওই বছরের শেষের দিকে আরেক দফা দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে পিছিয়ে আসে, কারন বিইআরসি আইনে বছরে দু’বার মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেই। কিন্তু ২০১৭ সালে সেই আইন তারা আর তোয়াক্কা করেনি। মার্চ ও জুনে দু’দফায় বাড়িয়ে দিয়েছে সাড়ে বাইশ শতাংশ। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত কোন গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে গ্যাস কোম্পানীগুলোর আব্দার, যাদের রাজস্ব ঘাটতিই নেই, বরং আছে লাভ।

জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী বলেছেন- ‘মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক’। অর্থমন্ত্রী বলেছেন- ‘এর প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়বে না’। একেবারেই নির্ভার তারা; এসব বলতে পারছেন, কারন জ্বালানী ক্ষেত্রে যে কোন সিদ্ধান্তে দায়মুক্তি আইন রয়েছে সরকারের পক্ষে। ক্ষমতায় এসে দ্রুত জ্বালানী ও বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করার নামে ওই ‘দায়মুক্তি’ জনগনের বিপক্ষে সরকারের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। ফলে এই খাতে গত অর্ধযুগ কোন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যা দাবি করা হচ্ছে, জনগনকে তাই মেনে নিচ্ছে হচ্ছে।

এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, জ্বালানী খাতে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা অর্জনের চেয়ে এই খাতকে ব্যবহার করে মুনাফা ও জনগনের পকেট খালি করার দিকেই সরকারের আগ্রহ বেশি। এর কারন হচ্ছে বর্তমান সরকারের কোথাও কোন জবাবদিহিতা নেই। সংসদে-রাজপথে কোন চ্যালেঞ্জ নেই। ফলে জ্বালানী খাতে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ জনবান্ধব না হলেও বিশেষ গোষ্ঠিবান্ধব। এই বিশেষ গোষ্ঠি জ্বালানি খাতকে ব্যবহার করে মাত্র কয়েকবছরে অপরিমেয় অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম সাতশো টাকা। অথচ বিশেষজ্ঞরা ভারতে এর দাম বিবেচনায় এনে বাংলাদেশে নানা সূচক হিসেব করে দেখিয়েছিলেন, এখানে এর দাম হওয়া উচিত সাড়ে চারশো টাকা। বেসরকারী উদ্যোগে এলপিজি উৎপাদন দেখভালের জন্য সরকারের কোন নীতিমালা নেই। বাজারে কৃত্রিম সংকট জিইয়ে রাখতে উৎপাদকরা সরবরাহ কমিয়ে কালোবাজার তৈরী করে। এভাবে প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রি হয় এক হাজার থেকে ১২’শ টাকায়।

সরকারের এই কালোবাজার, কৃত্রিম সংকট ও সিলিন্ডার প্রতি অবৈধ মুনাফার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং এই দামের সাথে সমন্বয়ের জন্য আবাসিক গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে, গ্যাস কোম্পানীগুলোর মুনাফার খাই মেটাতে। এর মাধ্যমে কালোবাজারকে বৈধতা দেবার পাশাপাশি ‘একচেটিয়া ব্যবস্থা’ নিশ্চিত করছে সরকার। এর প্রধান কারন হচ্ছে, এই সরকারের কাছে জনস্বার্থ মুখ্য নয়, যেমনটি ছিল না অতীতের কোন সরকারের কাছে। মুখ্য হচ্ছে বিশেষ গোষ্ঠি এবং দলীয় স্বার্থ।

দুই. কোচিং সেন্টার, নোট বই, গাইড নামক বইয়ের বোঝা এবং ফি বছর পরীক্ষা ও দশ বছরে শিশু শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট অর্জনে তিনটি পরীক্ষা দেয় কোন দেশে? মূল প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তা নিয়ে গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করলে তাকে ‘গুজব’ অভিহিত করে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেন কোন দেশের শিক্ষামন্ত্রী? কোন দেশে পরীক্ষায় খাতায় পরীক্ষকদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশের হার শতভাগ করার গোপন নির্দেশ আসে? এর সবকটির উত্তর, সেই দেশ বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ এখন কতগুলি চরম ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে। বই, কোচিং এবং পরীক্ষার মত ‘সিন্দাবাদের দৈত্য’ ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে শিশুদের রোবটে পরিনত করছে। ফি-বছর পাবলিক পরীক্ষার ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র যোগাড়ে উন্মত্ততা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনোজগত করে তুলছে বিকারগ্রস্ত। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত অনাচার নিয়ে সরকারের মনোভঙ্গি জনগন গ্রহন করে ফেলেছে। মানুষ ধরে নিয়েছে ফাঁসকৃত প্রশ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেবে এবং যারা না পাবে তারা ভগ্ন হৃদয়ে মেনে নেবে নিয়তি হিসেবে।

প্রফেসর ড. জাফর ইকবাল গণমাধ্যমে সরকারকে দায়ী করে লিখেছেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার চাইলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো না। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা ভাল করে একটি পরীক্ষা নিতে পারি না, এরচেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না, তাহলে হবে না। প্রশ্নপত্র ছাপানো ও বিতরন যাদের দায়িত্ব তাদের কোন শাস্তি হচ্ছে না…’ (সূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)।

ড. ইকবালের লেখনীর অন্তর্নিহিত সত্য হচ্ছে, সরকার চায় না প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হোক। চলতি বছরে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। গত বছর কোটি টাকার লেন-দেনে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগের স্বপক্ষে তথ্য-প্রমান ছিল। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন লাঠিপেটা ও বুটের লাথিতে পিষে দমন করা হয়েছে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গেছে অনেক শিক্ষার্থীর। কিন্তু এ বছর সরকার চেয়েছে, তাই পেরেছে।

শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতে বিনামূল্যে ভুল-বিকৃত বই সরবরাহ করা হয়। পাঠ্যপুস্তক নিয়ে নজিরবিহীন নৈরাজ্য, Hurt কে Heart , ছাগলকে গাছে উঠিয়ে আম খাওয়ানো কুসুম কুমারী দাসের কবিতা সম্পাদনার নামে চার লাইন বাদ দেয়া, ড, হুমায়ুন আজাদের কবিতা মাঝখান থেকে বাদসহ ভুলে ভরা বিকৃত বই সরবরাহ করার মূল উদ্দেশ্য কি? সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন, ভবিষ্যত জঙ্গী মনোজগত গঠন নাকি শিক্ষার্থীদের মাঝে জিহাদী জোশ সৃষ্টি করা? হেফাজতে ইসলামকে খুশি-সন্তুষ্ট রাখতে সরকারের এই ব্যগ্রতা তাদের বুদ্ধিজীবিরাও মেনে নিতে পারছেন না।

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হলে স্কুল-কলেজে শিক্ষা বলতে অনিয়ম-অনৈতিকতা এক নম্বরে অবস্থান নেয়, তাহলে সেই দেশ সেতু, রাস্তা, ফ্লাইওভার বা স্কুল-কলেজভবন আর স্থাপনা দিয়ে কি করবে? বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকরা সোচ্চার হওয়ার বদলে মেতেছেন দলদাস ভূমিকায়। পাঠ্যপুস্তকের ভয়াবহ ভুলগুলিকে তারা দেখছেন, ‘সরকারের অর্জিত সাফল্য ম্লান’ হতে। এভাবে তারা রাজনীতি করছেন, দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখছেন। এজন্যই প্রাইমারী থেকে এইচএসসি পর্যন্ত নিয়মিত প্রশ্নফাঁস নিয়ে কখনও মুখ খুলছেন না। কারন চাটুকারিতা ছাড়া অন্য সব বিষয়ে তো দলদাসদের মুখ থাকে কুলুপ আঁটা।

আপনি কি এমন একটি দেশ খুঁজে পাবেন, যেখানে সুনির্দিষ্ট হত্যাকান্ডের দায়ে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ধর্মঘট, অবরোধ চালিয়ে যেতে পারে কোন সংগঠন? তার পেছনে মদত থাকে সরকারের মন্ত্রী এবং সুবিধাভোগী দুর্বৃত্ত রাজনীতিক নামধারীদের? জনগনকে জিম্মি করে নামিয়ে আনতে পারে ভয়াবহ জনদুর্ভোগ। অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বা সুন্দরবন রক্ষায় যদি নাগরিকরা সমবেত হন, সমাবেশ করেন, দেখবেন ভয়াল ও নির্দয় পুলিশি এ্যকশন।

গত ক’দিন সংবাদপত্র জুড়ে শুধু মৃত্যুর খবর। সড়ক হয়ে উঠেছে যেন মৃত্যুর উপত্যকা। দুর্ঘটনায় প্রতিদিন নানা স্থানে অকাতরে মরে যাচ্ছে মানুষ। মাত্র সাতদিনে যখন নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় অর্ধশতাধিক তখন মনে হয় এ যেন মৃত্যুর মিছিল। জীবন কি তাহলে এরকম মৃত্যুপুরী! অথচ এইসব মৃত্যু চাপিয়ে দেয়া। এর জন্য দায়ী কেউ না কেউ। সেই দোষীদের ক্ষমতার কাছে নিশ্চুপ- নিষ্ক্রিয় সরকার। রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল অংশ, জনগনের কথা তো আসছেই না। ধরে নেয়া হয়েছে এসব হননকারীরাই দুর্বলের ভাগ্যবিধাতা!

দেশটা যে দাঁড়াচ্ছে নিজের পায়ের ওপর, সেখানে সবচেয়ে বড় অবদান কৃষকের, কৃষিখাতের। কৃষক বিরতিহীন উৎপাদনে নিয়োজিত। ধান উৎপাদনে মার খাচ্ছে তো যাচ্ছে আলু, পেঁয়াজ বা সব্জি উৎপাদনে। সে অদম্য এবং সবসময় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত। কৃষকের কন্যা পোষাক শিল্পের চালিকাশক্তি। তার ছেলে প্রবাসকর্মী হিসেবে রেমিট্যান্স জোগাচ্ছে। কৃষি উৎপাদনে সার, কীটনাশকসহ কিছু উপকরন সরবরাহ সরকার নিশ্চিত করলেও কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য কখনোই নিশ্চিত করেনি। ফলে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য না পেয়ে কৃষক প্রান্তিক থেকে ভুমিহীনে পরিনত হচ্ছে।

কৃষকের যে কন্যাটি গার্মেন্টস কর্মী, সেও শ্রম শোষণের শিকার। সেই শোষণের টাকায় কানাডা, মালয়েশিয়ায় আলাদা বাংলাদেশ পল্লী গড়ে উঠছে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে বৈদেশিক মুদ্রা জোগানো প্রবাসী ছেলেটির পাশে দাঁড়ানোর মত কেউ নেই। সামগ্রিক অর্থনীতি, জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স বাড়ার ক্ষেত্রে কৃতিত্ব কৃষক ও তার পরিবারের, একেবারেই সাধারন জনগনের। তাদের সাফল্য ছিনতাই করে নিজেদের সাফল্যের প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে অহর্নিশি।

রাজনৈতিক অঙ্গন দুর্বৃত্তায়িত। আর্থিক খাতসমূহে বিশৃঙ্খলা চলমান। এরমধ্যেই ‘উন্নয়ন’ গল্প বলা হচ্ছে ছেলে ভুলানো ছড়ার মত। যে ছড়ায় উন্নয়ন বর্ণনা হচ্ছে, রাস্তা-ব্রিজ, ফ্লাইওভার নির্মানের কড়চা। মানবসম্পদ উন্নয়ন সরকারের কাছে বিবেচ্য নয়। ধরে নেয়া যায়, জেনে-বুঝে মানুষের অধঃপতন ঘটানো হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কেন এসব করবে? সহজ উত্তর, জানা নেই।

এর একটি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্র জ্ঞানচর্চাকে প্রয়োজনীয় মনে করছে না। জ্ঞানচর্চা সমাজে সীমিত হয়ে এসেছে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে পাঠকের মধ্যেও। তারাও জ্ঞানচর্চার ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। … মূলত: এরজন্য দায়ী পুজিবাদী ব্যবস্থা। পুজিবাদের সূচনায় জ্ঞানের চর্চা ছিল বটে, কিন্তু সে তার প্রয়োজনেই জ্ঞানচর্চাকে সংচুচিত করে নিয়ে এসেছে। কারন সে চায়না সমাজে অসঙ্গতিগুলি নিয়ে প্রশ্ন উঠুক…”।

যে রাষ্ট্র জ্ঞানচর্চার মত বিষয়কে পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের মধ্যে গুলিয়ে ফেলে, গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে কোটারি ও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সাথে এক করে ফেলে, সেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সূচকই হয়ে ওঠে ব্রিজ-কালভার্ট ও ফ্লাইওভার নির্মান। মানুষের সবরকম অধিকারকে সংকুচিত করে এই উন্নয়ন দর্শন অন্তিমে কোন কাজে আসেনি। অতীত-বর্তমানে এর অজস্র প্রমান থাকলেও কর্তৃত্ববাদ সেটিকে কখনই বিবেচনায় নিতে চায়নি।