গোবিন্দগঞ্জে চরম খাদ্য সংকটে ৬০০ সাঁওতাল পরিবার

0

জিসাফো ডেস্কঃ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের সাঁওতাল আদিবাসীদের উচ্ছেদের ১০ দিন পরেও জয়পুর ও মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ইক্ষু খামার কর্তৃপক্ষ তাদের পৈত্রিক দাবিকৃত জমি দখলে নিয়ে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে আদিবাসীদের স্বাভাবিক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা করায় এই ক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আতঙ্ক, ক্ষোভ আর কর্মহীন অবস্থায় অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে তাদের। এতদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি বা সাঁওতালদের চলমান দাবি-দাওয়ারও কোনো সুরাহা হয়নি।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের জয়পুর ও মাদারপুর গ্রামের সাঁওতাল পল্লীর ৬০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্য সংকট বিরাজ করছে বলে সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে। অর্থ-যোগানের ব্যবস্থা না থাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও কিনতে পারছেন না। এছাড়া কাজের সুযোগ না থাকায় শ্রমজীবী সাঁওতাল পরিবারের লোকজন সারাদিনে একবেলা মাত্র রাতে ভাত খাচ্ছে।

সাঁওতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাঁওতাল পরিবারগুলো অত্যন্ত সংঘবদ্ধ এবং বিক্ষুব্ধ। তাদের একটাই কথা ‘একই কথা কতবার বলবো, বার বার একই কথা বলতে বলতে আমাদের গলা তো শুকিয়ে গেছে। কিন্তু কোনো কাজ তো হচ্ছে না।

তারা বলেন, ‘আগে হামারগুলার দাবি-দাওয়াগুলো পূরণ করেন, বাপ-দাদার জমি ফিরাইয়া দেন। তারপর অন্য কথা। হামার বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিলো, বাড়ির পালিত একটি ছোট্ট শুয়োরের বাচ্চা পর্যন্ত লুট করে নিয়া গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোন বিচার হইল না।’

এদিকে বর্তমান ইস্যুটি ব্যাপক আলোচিত হওয়ায় সাঁওতালেরা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এজন্য তারা গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছে।

সাঁওতাল পল্লীর মানুষের মাঝে ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন থাকলেও ক্ষোভে প্রশাসনের দেয়া কোনো ধরনের ত্রাণ তারা গ্রহণ করেনি। সোমবার স্থানীয় প্রশাসন খাদ্যসামগ্রীসহ এক ট্রাক ত্রাণ সামগ্রী সাঁওতাল পল্লীতে পাঠালেও দিন শেষে তা ফেরত পাঠানো হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি টিম ১৩ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার সংলগ্ন জয়পুর ও মাদারপুর সাঁওতাল পল্লী পরিদর্শন করে। তারা সাঁওতালদের ঘরে ঘরে যান, তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সাঁওতালদের এক সমাবেশে বক্তব্যও দেন। এসময় সাঁওতালরা আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে সহিংসতা এবং তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি ফিরে পাওয়াসহ সুনির্দিষ্ট দাবি দাওয়া উত্থাপন করেন। এছাড়াও এ পর্যন্ত বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও মানবাধিকার কমিশনের পরিচালকসহ জাতীয় পর্যায়ের লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু তাদের সবার কাছে সাঁওতালদের উত্থাপিত এসব দাবি-দাওয়া সম্পর্কে কোনো পক্ষ থেকেই কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এতে সাঁওতাল পরিবারগুলো চরম হতাশায় দিনাতিপাত করছে।

এ ব্যাপারে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাসকে, পাওলুস মাস্টার ও মাদারপুর গ্রামের ইলিখা মার্ডির সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। মিল কর্তৃপক্ষ দ্রুত কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে জমিগুলো ঘেরাও করে ফেলছে, যা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। সুতরাং তাদের অন্যতম দাবি হচ্ছে অবিলম্বে কাঁটা তারের বেড়া তুলে ফেলা এবং যে জমি থেকে জোরপূর্বক তাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে সেই জমিই তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক।

গোবিন্দগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে গত ৬ নভেম্বর রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ও সাঁওতালদের সংঘর্ষ থামাতে গুলি চালাতে বাধ্য হয় পুলিশ। তিনি বলেন, ঘটনার দিন জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে একটি আবেদন করা হয় পুলিশ সুপারের বিশেষ শাখা থেকে। তখন ওই ম্যাজিস্ট্রেটদের ওই স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছ থেকে এক হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ওইসব জমিতে মিল কর্তৃপক্ষ আখ চাষ না করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কাছে লিজ দেয়। তারা লিজ নেয়ার পর ওই জমিতে তামাক, ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করতে থাকে। এছাড়া এসব জমিতে ১২টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছে প্রভাবশালীরা। এদিকে মিলের জমিতে আখ চাষ না হওয়ায় দুই বছর আগে প্রভাবশালী নেতারা এসব জমি ফেরত দেয়ার কথা বলে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজনকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে। চলতি মাসের ৬ তারিখে পুলিশ-ইক্ষু শ্রমিক ও সাঁওতালদের সঙ্গে ত্রিমুখি সংঘর্ষে দুই সাঁওতালের মৃত্যু হয়। আহত হয় পুলিশসহ ৩০ জন। তবে সাঁওতালদের মতে নিহত তিন এবং নিখোঁজ আটজন।