‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হত্যার পরিকল্পনার কথা আগে জানত পুলিশ!

0

ঢাকা : দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এ কথা বিদেশি হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগেই জানত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত মে মাসে একটি মামলায় পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রেই এমন পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছিল।

ওই অভিযোগপত্র দাখিলের প্রায় চার মাস পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর গুলশানে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে তাবেলা সিজার নামের এক ইতালি নাগরিককে।

এর এক সপ্তাহের মধ্যেই ৩ অক্টোবর সকালে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আলুপারী গ্রামে জাপানি নাগরিক হোসি কোনিওকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৮ নভেম্বর দিনাজপুরে ডা. পিয়েরে নামে আরেক ইতালির নাগরিককে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

এ ছাড়া গত ৫ অক্টোবর ঢাকার মধ্য বাড্ডায় নিজ বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও কথিত পীর খিজির খানকে। একই মাসের শেষ দিনে রাজধানীর লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে আহত করে ব্লগার ও লেখক রণদীপম বসু, কবি তারেক রহিম ও প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলকে।

একই দিন মাত্র চার ঘণ্টা পর রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

গত ১৫ মে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পরিদর্শক এ কে এম কামরুল আহসান ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে ওইদিন অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে গোপনে অর্থ ও কর্মী সংগ্রহ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করে হত্যার পরিকল্পনা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো,

দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর হামলা করে ক্ষতিসাধন ও হুমকির সৃষ্টি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও যোগদানের অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।’

অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ জব্দকৃত আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে যে, উল্লেখিত আসামিরা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সক্রিয় সদস্য। এক নম্বর আসামি সাখাওয়াতুল জেএমবির আঞ্চলিক সমন্বয়ক।

তিনি পাকিস্তান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে জেএমবির পাশাপাশি আইএসের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। তারা জেএমবি ও আইএসের মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে পরস্পর যোগসাজশে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গোপনে বিভিন্ন ভিডিও প্রদর্শন ও জিহাদি লিফলেট বিতরণ করেছেন।’

এ বিষয়ে গত ১৪ অক্টোবর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহসান বলেন, ‘গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূলত জেএমবির সদস্য। একই সঙ্গে তারা আইএসেরও অনুসারী।

এদের মধ্যে একজন সাখাওয়াতুল কবীর যে আইএসের সমন্বয়কের কাজ করতেন, তা অভিযোগপত্রেই উল্লেখ করেছি। তবে তারা বেশিদূর অগ্রসর হওয়ার আগেই আমরা তাদের গ্রেপ্তার করি।’

গ্রেপ্তার হওয়া সাখাওয়াতুল কবীর পাকিস্তানে গেছেন এমন প্রমাণ তাঁর পাসপোর্টেই পাওয়া গেছে উল্লেখ করে কামরুল আহসান বলেন, ‘সাখাওয়াত নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি পাকিস্তানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাখাওয়াতুল কবীর পাকিস্তান থেকে আইএসআইএসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন।’

এ ছাড়া পাকিস্তানে পুলিশের সঙ্গে আইএস সদস্যদের গুলিবিনিময়ে সাখাওয়াতুল কবীরের দুই আত্মীয় নিহত হন বলেও জানান কামরুল আহসান। এ ছাড়া এর আগে সাখাওয়াত জেএমবি সদস্য হিসেবে একটি মামলায় কারাদ-ও ভোগ করেছেন বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

গত ১৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬ (১) (ক) ৭, ৮, ৯, ১১ ও ১৩ ধারায় মামলাটি করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. নজরুল ইসলাম।

মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানার খানবাড়ী চৌরাস্তায় মৃত মো. খানের বাড়িতে জেএমবির আঞ্চলিক সমন্বয়ক সাখায়াতুল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএসআইএসের দিকনির্দেশনা মোতাবেক সদস্য সংগ্রহের জন্য গোপনে বৈঠক করছিলেন।

ওই বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে আইএসআইএস-সম্পর্কিত জিহাদি প্রচারপত্র, তার ল্যাপটপে আইএসআইএস-সংক্রান্ত প্রচুর ভিডিও জব্দ করা হয়।

মঙ্গলবার ‘আইএসের সমন্বয়ক’ সাখাওয়াতুল কবীরসহ ওই সংগঠনের চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রুহুল আমিন এ অভিযোগ গঠন করেন।

আর এই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলো। সাখাওয়াতুল কবীর ছাড়া মামলার বাকি তিন আসামি হলেন, আনোয়ার হোসেন, মো. রবিউল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম।

এ মামলায় আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেছেন বিচারক।