গাসিক ভারপ্রাপ্ত মেয়রের সহযোগীতায় কাউন্সিলর এর দূর্নীতি

0

জিসাফো ডেস্কঃগাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) জোন-১-এর (টঙ্গী) সভাপতি হচ্ছেন ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. হেলাল উদ্দিন। তিনি গাজীপুর মহানগর কৃষক লীগের সভাপতিও।

ওই জোনের ১৫টি ওয়ার্ডের উন্নয়ন বরাদ্দ বণ্টন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদোন্নতি, এমনকি নিয়োগসহ সব কিছুতে হস্তক্ষেপ করতেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাসিকের একজন কর্মকর্তা জানান, গত আড়াই বছরে টঙ্গী জোনের ১৫টি ওয়ার্ডে ২৪৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে। এর মধ্যে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৮ কোটি ১৭ লাখ টাকার কাজ হয়েছে। ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে হয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি টাকার কাজ। বাকি ১৩ ওয়ার্ডের কোনোটিতে অর্ধেক, কোনোটি তিন ভাগের এক ভাগ আর কোনোটি তারও কম টাকা পেয়েছে। বৈষম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার ২৫ হাজার। বরাদ্দ পেয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি। অন্যদিকে ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৫০ হাজার ভোটার বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। দু-একটি ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডের বরাদ্দের চিত্র এ রকম।আর এর জন্য দায়ি ভারপ্রাপ্ত মেয়র কিরণ সাহেব বলে জানা যায়।

আরো জানা যায়, কিরণ ভারপ্রাপ্ত মেয়র থাকাকালীন যে কোন এলাকার রাস্তা ঘাট বা উন্নয়ন কাজে বরাদ্ধের জন্য ১০% ভাগ দিতে হতো।উন্নয়নের কথা বলে টাকা নিয়ে গাসিক এলাকায়ই চোখে পরার মতো উন্নয়ন হয়নী।একজন বলেন গাজীপুরবাসী বিএনপি কে ভোট দিয়েছে বিধায় আওয়ামী লীগ গাজীপুর মহানগর বাসীকে শিক্ষা দিচ্ছেন।


নাম না প্রকাশের শর্তে আরেক কর্মকর্তা জানান, কাউন্সিলর হেলালের ভগ্নিপতি মো. রুহুল আমিন ছিলেন পানি শাখার সহকারী পাম্প অপারেটর। কাউন্সিলর হেলাল সভাপতি হওয়ার পর তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে লাইসেন্স পরিদর্শক করেন। একইভাবে ভাগ্নে স্বাস্থ্য বিভাগের টিকাদানকারী সাইফুল ইসলামকে পদোন্নতি দিয়ে টিকাদান সুপারভাইজার, ভাতিজা অফিস সহকারী সোহেল রানাকে পদোন্নতি দিয়ে কর আদায়কারী, আরেক ভাতিজা পাম্প অপারেটর সোহেলকে হিসাব শাখায়, ভাগ্নি জামাই আবদুল মান্নানকে নিম্নমান সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর থেকে উপকর নির্ধারণ কর্মকর্তা, আরেক ভাগ্নিজামাই ফয়েজ উদ্দিনকে কসাইখানা পরিদর্শক-কাম-সিলম্যান থেকে রাজস্ব কর্মকর্তা করেছেন। কাছের লোক বলে পরিচিত স্টোরকিপার আবদুল বাতেনকে চেইনম্যান থেকে স্টোরকিপার, বাবুলকে পানি শাখার পাইপলাইন মেকানিক থেকে ওই শাখার সব কাজের দায়িত্ব, সহকারী পাম্প অপারেটর মিন্টুকে কনজারভেন্সি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দিয়েছেন। তাঁর আরেক ভাতিজা হিসাব শাখার আনোয়ার হোসেন অফিসে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন। কথামতো কাজ না করায় এলএমএসএস মো. হাসানকে জোন-৫ (কোনাবাড়ী), কম্পিউটার অপারেটর আজমল হোসেনকে ২ নম্বর জোনে বদলি করেছেন।

আরেকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত আড়াই বছরে মাস্টাররোলে (চুক্তিভিত্তিক) বিভিন্ন জোনে কয়েক শ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ পেয়েছেন কাউন্সিলর হেলাল মনোনীতরা।

অবৈধ গাড়ি ও শিশুমৃত্যুর দায় এড়ানোর চেষ্টা

এদিকে গাসিক টঙ্গী জোনের একটি গাড়ি দখলে নিয়ে অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। গাড়িটি (গাজীপুর-ক-২) জোনের নির্বাহী প্রকৌশলীর নামে বরাদ্দ। তবে তিন মাস আগে কাউন্সিলর হেলালকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় ওই গাড়িচাপায় এক শিশুর মৃত্যুর পর মামলা হলে পুলিশ গাড়িটি জব্দ করে। এখন কাউন্সিলর হেলাল দুর্ঘটনার দায় নিতে চাচ্ছেন না।

গাসিক সূত্রে জানা গেছে, টঙ্গী জোনের নির্বাহী প্রকৌশলীর নামে বরাদ্দ হলেও গত আড়াই বছরে তিনি এক দিনের জন্যও গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পাননি। কাউন্সিলর হেলাল চালকসহ গাড়িটি সার্বক্ষণিক ব্যবহার করতেন। গত আড়াই বছরে গাড়ির জ্বালানি বাবদ সিটি করপোরেশনকে পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ জুন কাউন্সিলর হেলাল মরকুনের বাসা থেকে টঙ্গী আঞ্চলিক কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন। পথে আমতলী এলাকায় ওই গাড়ির নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায় দুই বছরের শিশু সামিয়া আক্তার। গুরুতর আহত হয় শিশুটির মা সাথী বেগম (২৩) ও চাচা সুজন মিয়া (১০)। সাথী কেরানীর টেক থেকে ব্যাংকের মাঠ বস্তি এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার পর ইজি বাইকচালক অপু মিয়া গাড়িটি আটক করেন এবং মোবাইল ফোনে ছবি তোলেন। এ সময় গাড়ি থেকে নেমে হেলাল মোবাইল কেড়ে নিয়ে ছবি মুছে ফেলেন। আশাপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে গাড়ি ফেলে সটকে পড়েন হেলাল ও চালক মো. মাসুদ। পরে অন্য একজন চালক গাড়িটি চালিয়ে টঙ্গী আঞ্চলিক কার্যালয়ে নিয়ে রাখেন।

এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা জীবন মিয়া বাদী হয়ে টঙ্গী থানায় মামলা করেন। পরদিন পুলিশ গাড়িটি জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর চালক মাসুদ মিয়াকে টঙ্গী থেকে জোন-২-এ (গাছা) বদলি করা হয়।

টঙ্গী জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘গাড়িটি আমার নামে না, প্রকৌশল শাখার নামে বরাদ্দ ছিল। জোনের সভাপতি হিসেবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিদর্শনের জন্য কাউন্সিলর হেলাল উদ্দিন মাঝেমধ্যে গাড়িটি ব্যবহার করতেন। দুর্ঘটনার পর হেলাল ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আবুল হোসেন শিশুর পরিবারের সঙ্গে বসে আপস মীমাংসা করেছেন বলে শুনেছি। ’

নিহত শিশুর বাবা জীবন মিয়া বলেন, ‘ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হোসেনের পরামর্শে আপস মীমাংসা করেছি। এক লাখ টাকা পেয়েছি। আরো এক লাখ টাকা দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে আবুল কথা দিয়েছেন। ’

গাসিক টঙ্গী অঞ্চলের যানবাহন শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গাসিক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গত বুধবার গাড়ি ছাড়ার জন্য টঙ্গী থানার ওসিকে ফোন করেছিলেন। ’

অভিযুক্ত কাউন্সিলর হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় আমি ওই গাড়িতে ছিলাম না। তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। যেহেতু গাড়ির মালিক গাসিক, তাই কাউন্সিলর আবুল হোসেন আপস মীমাংসা করেছেন। মানবিক কারণে ওই শিশুর পরিবারকে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে। টাকাও গাসিক থেকে দেওয়া হয়েছে। আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। ’

মামলার তদন্তকারী টঙ্গী থানার এসআই আশরাফুল হাসান বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় কাউন্সিলর হেলাল ওই গাড়িতে ছিলেন। মামলার পর গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে। ’

গাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের অর্গানোগ্রামে জোন সভাপতি বলে কোনো পদ নেই। কিভাবে এটি করা হয়েছে, তা জানা নেই। ’ তিনি আরো বলেন, ‘করপোরেশনের গাড়ি কোনো কাউন্সিলরের ব্যবহারের নিয়ম নেই। কাউন্সিলর হেলাল গাড়িটি ব্যবহার করতেন কি না, খোঁজ নিয়ে জানব। আপাতত গাড়িটি ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে সিটি করপোরেশন থেকে টাকা দেওয়ার ঘটনা জানা নেই। ’