গার্মেন্টস ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা “রানা প্লাজা ট্রাজেডি” এর তৃতীয় বার্ষিকী আজ

0

জিসাফো ডেস্কঃ আজ ২৪ এপ্রিল। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ট্রাজেডি সাভারের “রানা প্লাজা” ধসের তৃতীয় বার্ষিকী। রানা প্লাজা ধস বিশ্বের ইতিহাসে ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনাও হিসেবে পরিচিত।

ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আজও  নিহত অনেক শ্রমিকে লাশের খোঁজ পায়নি স্বজনেরা। আজও মেলেনি নিহত-নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা।

রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর নাজুক অবস্থার মুখোমুখি হয় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প। এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি চাপে পড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত।

তিন বছর আগের সেই দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া অনেক শ্রমিকের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তাও পায়নি তাদের স্বজনরা। মোট কতজন এখনো নিখোঁজ- সুনির্দিষ্টভাবে এই সংখ্যাটি নিশ্চিত হওয়া না গেলেও গত বছরের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫৯ জন শ্রমিক নিখোঁজ ছিল বলে খবর বেরিয়েছিল।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ৩০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার, বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রাইমার্ক ৬ দশমিক ৯  মিলিয়ন ডলার, যা তারা নিজেরাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়েছে। এছাড়া রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে অন্যান্য ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ২০ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট অন্য সূত্র জানায়, হতাহতদের ক্ষতিপূরণের জন্য ৪০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি মিললেও শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৩০ মিলিয়ন ডলার, টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় ২৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে দুই হাজার ৮৩৫ জন হতাহত শ্রমিক ও স্বজনদের মধ্যে ১৮২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এখনো ফান্ডে জমা পড়ে আছে ৫৩ কোটি টাকারও বেশি।

বিজিএমইএ ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে  প্রায় ২৮ শতাংশ। ২০১১ থেকে ২০১৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭৩৯ কোটি ডলার। ২০১১-১২ অর্থবছরে যেখানে পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ছিল এক হাজার ৯২১ কোটি ডলার, সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি হয়েছে দুই হাজার ৬৬০ কোটি ডলার।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রানা প্লাজা নামের ভবনটি ধসে পড়ে। ভবনটিতে নিউওয়েভ বটম, প্যানথম এ্যাপারেল, প্যানথম ট্যাক, আর্থ ট্যাক এবং নিউওয়েব স্টাইল নামের পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল।

শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবমতে, ওই পাঁচ কারখানায় শ্রমিক ছিল তিন হাজার ৯৪১ জন। এর মধ্যে জীবিত ও আহত শ্রমিক উদ্ধার করা হয় দুই হাজার ৪৩৮ জনকে। নিহত হয় এক হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক। নিখোঁজ হয় ৩৬৫ জন শ্রমিক। এর মধ্যে ডিএনএ টেস্ট করে ২৬৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।

সেই সময় শ্রমিকদের অসহায় মৃত্যুর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় সারাবিশ্ব। আর এসব কারণে সরকার ও গার্মেন্ট মালিকরা বাধ্য হয়েই বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজ শুরু করে।

আন্তর্জাতিক চাপে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে গঠিত হয় অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। তারা কারখানা ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক ত্রুটির বিষয়টি পরীক্ষা করে কী ধরনের সংশোধন কার্যক্রম চালাতে হবে তা ঠিক করে দেয়।

কারখানা সংস্কারের অগ্রগতির বিষয়ে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহমেদ বলেন, গত দুই বছরে সবচেয়ে বড় কাজ হয়েছে ত্রিপক্ষীয় কর্মসূচির আওতায় তিন হাজার ৭৪৬টি কারখানার পরিদর্শনের মাধ্যমে কারখানাগুলোর ত্রুটি সংশোধনে করণীয় ঠিক করে দেওয়া। এর মধ্যে জাতীয় কর্মসূচির আওতায় এক হাজার ৫৪৯টি, অ্যাকর্ডের এক হাজার ৩৬৮টি  এবং অ্যালায়েন্স থেকে ৮২৯টি। এ ছাড়া ৩৯টি কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অ্যাকর্ডের ২৬টি কারখানা, অ্যালায়েন্সের ৯টি এবং জাতীয় কর্মসূচির আওতায় চারটি।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে ২১৯ শতাংশ এবং প্রতিবছর শ্রমিকদের বেতন বাড়ছে কমপক্ষে ৫ শতাংশ হারে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে কাজটি হয়েছে একটি শ্রম অধিদপ্তর করা হয়েছে। রানা প্লাজা ধসের আগে এর জনবল ছিল মাত্র ৩১৪ জন। কারখানা পরিদর্শক ছিলেন ৪২ জন এবং দোকান পরিদর্শক ছিলেন ৫২ জন। এখন সরকার এখানে জনবল দিয়েছে ৯৯৩ জন। এর মধ্যে ৫৭৫ জনই কারখানা পরিদর্শক।