গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে হামলা পূর্ব-পরিকল্পিত

0

গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে হামলা পূর্ব-পরিকল্পিত। আর সেই পরিকল্পনার নাটের গুরু গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আলম বুলবুল। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এই শাকিল আলম বুলবুল আবার ওখানকার ‘ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটি’-র সভাপতি। গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে হামলার ঘটনা ক্ষমতাসীন দলের এই ছাত্রনেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ প্রযোজনায় ঘটেছে। নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশে প্রায় প্রত্যেকটি এ ধরনের হামলার ঘটনায় হামলাকারী ও ভিকটিমদের মধ্যে একই ধরনের সাদৃশ্য দৃশ্যমান।

নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের অনেক ছাত্রনেতা খোদ মন্ত্রী পরিষদের মন্ত্রীদের চেয়েও শক্তিশালী। বাংলাদেশে পাঁচজন মন্ত্রী’র একত্রে যে ক্ষমতা তার চেয়ে একজন ছাত্রনেতার ক্ষমতা অনেক বেশী। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের প্রশাসনও খুব ভালোভাবে জানে এবং তা মেনে চলতে বাধ্য হয়। এই বাস্তবতা মেনেই বাংলাদেশের প্রশাসন জোড়াতালি দিয়ে চলে। বাংলাদেশে তাই মন্ত্রী পরিষদের বাইরে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের নিয়ে যে অদৃশ্য ছায়ামন্ত্রী পরিষদ থাকে, তারাই প্রশাসনকে সবধরনের আদেশ-নির্দেশ দেয়। এই ছায়ামন্ত্রী পরিষদের আদেশ-নির্দেশ বাংলাদেশের প্রশাসন অমান্য করতে পারে না। যদি প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা দুঃসাহস দেখিয়ে এই ছায়ামন্ত্রী পরিষদের আদেশ-নির্দেশ অমান্য করে, তাহলে সেই কর্মকর্তার চাকরি জীবনই বরং একটা নতুন বিড়ম্বনায় পরিণত হয়। এভাবেই নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতা ও প্রশাসন চলছে।

এই বাস্তবতা মেনেই বাংলাদেশের মিডিয়া চলে। এই বাস্তবতা মেনেই বাংলাদেশে টেন্ডারবাজি চলে। এই বাস্তবতা মেনেই বাংলাদেশে উন্নয়ন কার্যক্রম চলে। এই বাস্তবতা মেনেই বাংলাদেশে হামলা, মামলা, দখল, উচ্ছেদ কার্যক্রম চলে। এই বাস্তবতা মেনেই বাংলাদেশে নষ্ট রাজনীতির দুষ্টু ঘোড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা ঘটনা পরম্পরায় সওয়ার হয়। আর খোদ বাংলাদেশ সরকার এভাবে উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে সেই হামলাকারীদের ও আক্রান্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা ভিকটিমদের সঙ্গে নানান কিসিমের নেগোসিওটরের ভূমিকা পালন করে। অর্থ্যাৎ খোদ সরকার এখানে কার্যকর বিচার বা আইন প্রয়োগের বিপরীতে ভিকটিম আর হামলাকারীদের মধ্যে এক ধরনের দায়সারা গোছের ফয়সালা করতে শালিশ টাইপের নেগোসিওটরের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়।

গ্রামে একটি মারামারি হলে একজন চেয়ারম্যান ও কিছু মাতবর মিলে যেমন উভয় পক্ষকে নিয়ে শালিশ-বিচার করে একটা মৌখিক মিটমমাটের ব্যবস্থা করে। তেমনি বাংলাদেশে সরকারও এখানে এ ধরনের পূর্ব-পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলোতে ভিকটিম ও হামলাকারীদের মধ্যে একটি নেগোসিওটরের কাজ করে। মাঝখানে যেটা হয়, ওই হামলার ঘটনাটির এক ধরনের মিটমাট হয়, উভয়পক্ষ একধরনের শর্তশাপেক্ষে সেই শালিশ মেনেও নেয়। কিন্তু হামলার প্রকৃত বিচার যেমন হয় না। তেমনি ভিকটিমদের জন্য তৈরি হয় পরবর্তী সময়ের জন্য এক শর্তসাপেক্ষ নরকবাসের জীবন।

এভাবেই বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। দেশের আইন ও আদালতের বাইরে এভাবেই সরকার একটা জোড়াতালি দিয়ে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে কোনো ঘটনায় হামলাকারী থেকে যাচ্ছে ধরাছোয়ার বাইরে। কোনো কোনো ঘটনায় হামলাকারী বরং ক্ষমতা ও প্রশাসনের দাপটে উল্টো ভিকটিমকে ভিটেমাটি ছাড়া করছে। আর যদি কোনো ঘটনায় আদালতে মামলা হচ্ছে, সেই মামলাগুলো আদালতে উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে খারিজ হয়ে যাচ্ছে। হামলাকারী পক্ষ শক্তিশালী হওয়ার কারণে ভিকটিম বা বাদীপক্ষ বরং মামলা করার কারণে আসামীপক্ষ কর্তৃক দেখানো নতুন ভয়ভীতি ও আতংকের মধ্যে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দুর্বল ভিকটিম পক্ষ একসময় বাধ্য হয়ে মামলা তুলে নিচ্ছে। অথবা দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে খোদ আদালতই সেই মামলাগুলো খারিজ করে দিচ্ছে।

এভাবেই বাংলাদেশে সরকার ও প্রশাসন জেনেশুনেই একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি লালন-পালন করছে। সেই হামলার ঘটনায় নেগোসিওটরের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। যার প্রকৃত ফলাফল দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। যা হামলাকারীদের নতুন নতুন হামলা করায় উৎসাহ যোগাচ্ছে। বিচারহীনতার কারণে হামলাকারী এই ধরনের ঘটনায় লাভবান হচ্ছে বলেই তারা আবার নতুন চক্রান্ত করার জন্য তৈরি হচ্ছে। ভিকটিম এখানে চরমভাবে অবহেলিত।

বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো ক্ষমতার পেছনে পেছনে ছোটার যে নতুন সংস্কৃতি চালু করেছে, যে কারণে অধিকাংশ সময়ে এ ধরনের হামলার ঘটনা খোদ মিডিয়াগুলোতেই দু’ভাবে প্রচার হচ্ছে। কে ভিকটিম আর কে হামলাকারী এটা বুঝে ওঠার আগেই আবার নতুন কোনো ঘটনা ঘটছে। মানুষের চোখ তখন পুরাতন ঘটনা ফেলে মিডিয়ার এই অসত ক্যারিশমার কারণে নতুনের দিকে চলে যাচ্ছে। মিডিয়া এখানে প্রচ্ছন্নভাবে সরকার ও হামলাকারীদের এক ধরনের উপকার করছে। ভিকটিমের জন্য যতটুকু খবর প্রচার হওয়ার কথা, ক্ষমতা, প্রশাসন ও হামলাকারীদের দাপটের কাছে মিডিয়ার নতজানু চরিত্র এক ধরনের আপোষ করে, ঘটনাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলেও মিডিয়া সেখানে এই আপোষ চরিত্রের কারণে দায়সারা খবর প্রচার করে কম গুরুত্ব দিচ্ছে।

পুরাতন হামলার ঘটনায় মিডিয়া গুরুত্ব কম পেয়ে নতুন খবরের দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে কোনো হামলার ঘটনায় মিডিয়ার যে নিরপেক্ষ ভূমিকা থাকার কথা, মিডিয়ায় ঘটনার যেভাবে প্রচার হওয়ার কথা, সেগুলোর দুর্বলতা থেকে ফায়দা লুটছে হামলাকারী পক্ষ। অথচ মিডিয়ার খবর প্রচারের পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সুস্পষ্ট করার যে দায়িত্ব ছিল, সেই দায়িত্ব এড়িয়ে বরং মিডিয়াগুলো বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রচ্ছন্নভাবে সহায়তা করছে। ফলে ঘটনার যারা ভিকটিম তারা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরেও মিডিয়ার উদাসীনতা, প্রশাসনের নিস্ত্রিয়তা ও সরকারের উভয়পক্ষের সঙ্গে আপোষকারী চরিত্রের কারণে হামলাকারী থেকে যাচ্ছে বিচারের বাইরে। যা হামলাকারীদের নতুন হামলা ঘটানোর জন্য উৎসাহিত করছে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম এলাকায় আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা অত্যন্ত পূর্বপরিকল্পিত৷ জমি দখল করতেই পরিকল্পিতভাবেই সাঁওতালদের উপর গুলি চালানো হয়েছে। সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট চালানো হয়েছে। আর এই পুরো ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আলম বুলবুল।

মজার ব্যাপার হলো, এই শাকিল আলম বুলবুল আবার ওখানকার ‘ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটি’-র সভাপতি। চিনি কলের জন্য বরাদ্দ করা জমিতে তিনি আদিবাসী সাঁওতালদের ঘর তোলার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। সাঁওতালদের তিনি ওই জমিতে দখল নেবার জন্য প্ররোচণা দিয়েছেন। আবার স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে আদিবাসী সাঁওতালদের উপর হামলায়ও নেতৃত্ব দিয়েছেন এই শাকিল আলম বুলবুল। কিন্তু এই ঘটনায় গোটা বাংলাদেশ কী জানলো? গোটা বিশ্ব কী জানলো? সবাই জানলো যে, সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশের গুলিতে তিন আদিবাসী সাঁওতাল নিহত (শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মাড্ডি ও রমেশ টুডু) ও আহত পঞ্চাশের উপরে। গোটা বহির্বশ্ব জানলো, যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি সংখ্যালঘু আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উপর খোদ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন হামলা চালিয়েছে। বহির্বিশ্বে যে বার্তাটি গেল সেটি হলো, খোদ একটি রাষ্ট্র একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করেছে!

রংপুর চিনি কলের জন্য ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কৃষি জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তখন শর্ত ছিল আখ চাষ না করলে ওই কৃষিজমি প্রকৃত মালিকদেরকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সেই জমি বছরের পর বছর আখ চাষের বদলে বাণিজ্যিক ইজারা দিয়ে অধিগ্রহনের শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে। যার বিপরীতে ওই জমি প্রকৃত মালিকদের বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এখন ওই জমির প্রকৃত মালিক দরিদ্র আদিবাসী সাঁওতালরা ফেরত চাচ্ছেন। আর আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় যাতে ওই জমি দখল করতে যায়, সেই কাজে উৎসাহ যুগিয়েছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আলম বুলবুল। কারণ এই শাকিল আলম বুলবুল আবার ওখানকার ‘ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটি’-র সভাপতি।

রংপুর চিনিকল কার্যালয় সূত্র মতে, ১৯৫৫ সালে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নে চিনিকলটি স্থাপিত হয়। ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর, রামপুরা, ফকিরগঞ্জ এবং সাহেবগঞ্জ ও কাটাবাড়ি ইউনিয়নের কটিয়াবাড়ি এলাকায় ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তখন থেকে এসব জমিতে উৎপাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ করা হচ্ছিল। এসব জমি দেখভালের জন্য সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার গড়ে ওঠে।

অর্থ্যাৎ গাইবান্ধার ওই ঘটনার প্রকৃত পক্ষ দুটি। একটি চিনিকল কর্তৃপক্ষ এবং অপরটি আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়। আরো মজার ব্যাপার হলো, চিনিকল কর্তৃপক্ষ যে জমি অধিগ্রহন করেছে তার প্রায় ৯০ ভাগ জমির মালিক স্থানীয় সনাতন ও মুসলিম সম্প্রদায়। আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জমি সেখানে মাত্র ১০ ভাগ। আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় যেহেতু সংখ্যালঘু আবার একেবারে ক্ষদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তাই স্থানীয় ওই নেতা শাকিল আলম বুলবুল কৌশলে ‘ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটি’-র সভাপতি হিসেবে আদিবাসী সাঁওতালদের ওই জমিতে দখল করার জন্য ইন্ধন যোগান।

স্থানীয় অমোন শক্তিশালী নেতার ইন্ধনে আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় তাই গত ১ জুলাই প্রায় ১০০ একর জমি দখলে নিয়ে সেখানে একচালা ঘর নির্মাণ করেন। ওই দিন থেকেই তাঁরা তির-ধনুক নিয়ে জমি পাহারা দিচ্ছেন। তারপর ১২ জুলাই চিনিকল কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ওই জমি উদ্ধার করতে যায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। এ ঘটনায় চিনিকল কর্তৃপক্ষ ‘দখলদারদের’ বিরুদ্ধে গোবিন্দগঞ্জ থানায় চারটি মামলা করে। এরপর থেকে দুই পক্ষই মুখোমুখি অবস্থানে ছিল।

নভেম্বরের ৮ তারিখ আবার চিনিকল কর্তৃপক্ষ ওই জমি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নিয়ে উদ্ধার করতে গেলে আবারো উভয়পক্ষ সংর্ঘষে জড়িয়ে পড়ে। এবার আবার সেই স্থানীয় নেতা চিনিকলের পক্ষে পুলিশের সঙ্গে হামলায় নেতৃত্ব দেন। ফলাফল তিন আদিবাসী সাঁওতাল নিহত (শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মাড্ডি ও রমেশ টুডু) আর উভয় পক্ষে মোট প্রায় ৫০ জনের মত আহত। এবারের হামলার ঘটনায় দুইজন নিহত হওয়ার কারণে ঘটনা অন্যদিকে মোর নিয়েছে। গোটা রাষ্ট্র যেন এই ঘটনায় এখন কেবল দর্শকের ভূমিকায়। কিন্তু ঘটনার নেপথ্যে যে ওই স্থানীয় নেতা শাকিল আলম বুলবুল, যিনি উভয় পক্ষে দখল ও হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার আসল অর্থ হলো, আদিবাসী সাঁওতালদের আরেকটু একঘরে করে দেয়া। যা সাঁওতাল পল্লী’র মানুষজন ইতিমধ্যেই টের পাচ্ছেন।

গাইবান্ধার এই ঘটনায় চিনিকল ও আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় পক্ষ-বিপক্ষ হলেও স্থানীয় রাজনীতির কৌশলের কারণে এখানে সবচেয়ে লাভবান পক্ষটি হলো ওই নেতা শাকিল আলম বুলবুল। আর এই ঘটনায় খোদ রাষ্ট্র বা বর্তমান সরকার ওই ঘটনায় নিজের দলের স্থানীয় নেতা সম্পৃক্ত থাকার কারণে এখন হয়তো আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে চিনিকল কর্তৃপক্ষকে দিয়ে একটা শালিশ করাবেন। কিছু রিলিফ বণ্টন হবে। সেই রিলিফ বণ্টনে হয়তো আবারো ওই নেতাকেই সবার সামনে দেখা যাবে। কিন্তু মাঝখান থেকে দুই আদিবাসী সাঁওতাল লাশ হয়ে গেছে।

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে কোনো বিচার হয় না। কোনো হামলার ঘটনায় যদি মামলা হয়, তখন দেখা যায় আদালতে উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে মামলাও টেকে না। সাক্ষী খুঁজলে ভয়ে কেউ নাম বলতে চায় না। আবার এ ধরনের মামলায় যদি কোনো আসামী গ্রেফতার হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই আসামী কয়েকদিন পরেই জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। আসামী জামিনে মুক্ত হয়ে আবার বাদীকে মামলা তুলে নেবার জন্য নানান কিসিমের হুমকি ও চাপ প্রয়োগ করে। বাদীর ওপর সারাক্ষণ চাপ থাকে মামলা থেকে নাম কাটানোর। একসময় এই মামলাগুলো কেবল কাগুজে আবর্জনায় পরিণত হয়। অপরাধীদের কিচ্ছু হয় না। তারা প্রকাশ্যে খুব দম্ভের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। মামলার বাদীকে হুমকি প্রদানসহ নতুন করে হামলা করারও ভয় দেখানো হয়। শেষপর্যন্ত এভাবে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার মামলাগুলো নিয়ে আদালত বা প্রশাসনেরও আর কোনো আগ্রহ থাকে না। যা বাংলাদেশে এক ভয়ংকর বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেব অনুযায়ী, বিগত ৫ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ের ওপর ২৮০৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। আর বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যমতে, এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ২৭৩টি। অর্থ্যাৎ, হামলার ঘটনা প্রায় তিন হাজার, সেখানে মামলার ঘটনা মাত্র প্রায় তিনশো। অনুপাত হিসেবে প্রতি হাজার হামলায় একশো মামলা। সেই মামলাগুলো থেকে আবার কোনো বিচার হয় না। একবার ভাবুন, কী ভয়ংকর বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে উঠছে বাংলাদেশ।

এখন আমরা সবাই জানি, গাইবান্ধার আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উপর এই হামলারও কোনো বিচার বাংলাদেশে হবে না। স্থানীয় প্রশাসন, চিনিকল কর্তৃপক্ষ এবং ভিকটিম আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়কে কিছু নতুন শর্ত দিয়ে সরকার একধরনের শালিশ মাধ্যমে ঘটনার একটা মিমাংসা করবে। যা প্রকৃত অর্থে বিচারহীনতা। যা আবার কয়েক মাস পর শাকিলদের মত কোনো নেতার উসকানিতে আবার নতুন ঘটনার জন্ম দেবে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাবে। যা সত্যি সত্যিই মাল্টি-কালচার চর্চার জন্য বাংলাদেশের জন্য এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ!