গণহত্যার কবলে মিয়ানমারে মুসলিম জনগোষ্ঠী

0

জিসাফো ডেস্কঃ রোহিঙ্গা সমস্যা সব সময়ই কেন যেন আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে গেছে। ইদানিং এই সমস্যা নিয়ে নানা জায়গাতে আলোচনা হচ্ছে দেখে আমারও ইচ্ছে জাগে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস সম্পর্কে জানার। সামান্য গবেষণাতেই দেখতে পাই যে ইংরেজীতে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে অনেক ভালো লেখা থাকলেও বাংলাতে ভালো লেখার বড় অভাব। মূল লেখাটির রচয়িতা ড. হাবিব সিদ্দিকী। লেখাটি ইংরেজীতে এশিয়ান ট্রিবিউন-সহ অনেক জায়গাতেই প্রকাশিত হয় । লেখকের অনুপ্রেরণাতে তাঁর অসাধারণ লেখাটি অনুবাদের চেষ্টা করেছি এখানে। মূল লেখাটি আসে প্রায় মাসখানেক আগে – তাই এই অনুবাদটিতে দেয়া সময় রেখা পাঠকেরা সেভাবে সমন্বিত করে নেবেন আশা করি।]

পরিচ্ছদ ১: আরাকানের বর্তমান অবস্থা

মিয়ানমারের পশ্চিমা প্রদেশ আরাকান (রাখাইন) আবার জ্বলছে। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পুরোনো রাজধানী ম্রাউক-উ-তে চলছে বৌদ্ধ রাখাইনদের মিছিল। মিছিল চলছে জীপগাড়ি, মোটরসাইকেল, রিক্সা, টুক-টুক কিংবা সাইকেলে চড়ে – কিন্তু সবচেয়ে বেশী লোক চলছে পায়ে হেঁটেই। তাদের সাথে আছে বর্শা, তরবারী, ধামা, বাঁশ, গুলতি, তীর-ধনুক এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পেট্রোল বোমাও। তাদের লক্ষ্য – নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। ঐ মিছিলেই জনৈক বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকে গলা-কাটার মতো ভয়াবহ ইশারা-ইঙ্গিত করতে দেখা যায় (যুক্তরাজ্যের দি ইকনমিস্ট; ৩-রা নভেম্বর, ২০১২)।

দুঃখের বিষয় এই যে ম্রাউক-উ’ই একমাত্র শহর নয় যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পরিকল্পিত গণহত্যার মুখোমুখি। মিয়ানমারের ভেতর থেকে পাওয়া খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর মদদে রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিত ভাবে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে বার্মা (মিয়ানমার) থেকে বের করে দেয়ার অভিপ্রায়ে গণহত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। এই নির্মূলাভিযান এমনই ভয়াবহ ও নৃশংস যে, পরিকল্পিত হিংস্রতা লুকিয়ে রাখার স্বগত প্রবণতা থাকা বর্মী রাষ্ট্রপতিও শুক্রবার, ২৬-শে অক্টোবর, স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ৮টি মসজিদ সহ ২০০০ রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে (সূত্র: বার্মিজ সরকারপন্থী পত্রিকা, the New Light of Myanmar)। এই সপ্তাহে তার মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইন প্রদেশে পুরো গ্রাম কিংবা আংশিক নগর পুড়ে ভস্মীভুত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে।” বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আসল সংখ্যা ও বাস্তবতা আরো অনেক ভয়াবহ।

   

চিত্র ১: বার্মার বিভিন্ন শহরে রোহিঙ্গাদের বার্মা থেকে বের করে দেয়ার দাবীতে বৌদ্ধ জনতা ও ভিক্ষুদের মিছিল।

আশংকা করা হচ্ছে যে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ৫০০০ রোহিঙ্গার বসতি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) থেকে তোলা ছবিতে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর চিয়াউকফুর (Kyaukphyu) মুসলিম অধ্যুষিত অংশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ দেখা যায়। এই শহর থেকেই তেল ও গ্যাসের পাইপ-লাইন বার্মা থেকে চীনে যাবার কথা। সাম্প্রতিক এই গণহত্যার আগ্রাসনের সময় মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম ও শহরাংশে তাদের আঁটকে রেখে আগুনের গোলা ছোঁড়া হয়। মৃত্যু আতংকে পালাতে চেষ্টা করা মুসলিমদের উপর রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসী ও সরকারের মধ্যে তাদের পৃষ্ঠপোষকরা চালায় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। বর্ণবাদী রাখাইন রাজনীতিবিদ ও ভিক্ষুরা দিনে দিনে সেখানে গড়ে তুলছে বর্ণ ও ধর্মের ঘৃণার পরিবেশ, যাতে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরণের সহিংসতাকে অনুমোদন দেয়া যায়। অনেক রোহিঙ্গা তাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সাগরে কিংবা জঙ্গলে। কিন্তু হায়! সেখানেও রক্ষা নেই। গত সপ্তাহে শতাধিক রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। অনেকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে গেছেন বাংলাদেশে। ধরা পড়ে অনেককেই যেতে হচ্ছে সিত্তেওয়ের মানবতের জঘণ্য ক্যাম্পগুলোতে, যেখানে জুন মাস থেকেই আঁটকে আছে আরো অনেক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী। ঐদিকে রাখাইন সন্ত্রাসীরা আবার ডজন ডজন রোহিঙ্গা মেয়েদের তুলে নিয়ে করছে ধর্ষণ – আর সেইসাথে চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে যুদ্ধের বিভীষিকা।

চিত্র ২: রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ী ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় রাখাইন সন্ত্রাসীরা।

এটা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেয়ারই তৎপরতা। ২৫-শে অক্টবরের এক ইস্তেহারে মিয়ানমারে অবস্থিত জাতিসংঘের কর্মকর্তা অশোক নিগম বলেন, “জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্বাসন ও ধংসযজ্ঞের ব্যাপারে শংকিত।” তিনি বলেন ক্ষতিগ্রস্ত সকল জনগোষ্ঠীর কাছে নিরাপদ প্রবেশাধিকার অপরিহার্য; এবং সে লক্ষ্যে তিনি সরকারের প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত সবার কাছে দ্রুত ও শর্তহীনভাবে পৌঁছবার মানবিক আবেদন জানান।

আমার আগের নানা লেখা ও বক্তব্যে আমি উল্লেখ করেছিলাম যে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করা জঘন্য অপরাধগুলো লুকিয়ে রাখতে চায়, সেজন্যে তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়া, এনজিও, সাহায্য সংস্থা এমনকি জাতিসংঘকেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতে প্রবেশাধিকার দেয়না – পাছে তারা বর্বরতার মাত্রা বুঝে ফেলে। আর যেহেতু রোহিঙ্গাদের সার্বিক নির্মূল রাষ্ট্রীয় নীতিরই অংশ, তাই মুসলিম ভুক্তভোগীদের জন্যে মিয়ানমারের সরকারী সংস্থাগুলো থেকে কোনো সাহায্যই পৌঁছেনা। আরো জঘন্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ও.আই.সি কিংবা ইসলামিক রিলিফ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রীও প্রাপক রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেনি। হিসেবে দেখা গেছে, পাঠানো ত্রাণসামগ্রীর ১০ শতাংশেরও কম ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেছে। রাষ্ট্র-আয়োজিত অক্টোবরের রাখাইন সন্ত্রাসী ও ভিক্ষুদের প্রতিবাদ সভাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়; কেননা, সেই অযুহাত দেখিয়েই মিয়ানমার সরকার ও.আই.সি-সহ অন্যান্য মুসলিম সাহায্য সংস্থাকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ত্রাণ কার্যালয় খুলতে দেয়নি।

চিত্র ৩: অহিংস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অহিংসার প্রকাশ। ও.আই.সি’র কোনো রকমের উপস্থিতি ভিক্ষুরা মিয়ানমারে চাননা – এমনকি দূর্যোগপূর্ণ স্থানে তাদের ত্রাণ তৎপরতা চালানোও।

মুসলিমদের ভয়াবহ হত্যার জন্যে একজন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীকেও শাস্তি দেয়া হয়নি। থেইন সেইনের সরকার থেকে আমরা কেবল সহিংসতার হোতাদের চিহ্নিত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ফাঁকা বুলি শুনেছি। কিন্তু এসব প্রতিজ্ঞা কখনো ন্যায়বিচারে পর্যবসিত হয়না, যেমনটা আমরা দেখেছি ৩-রা জুনে ১০ বর্মী মুসলিমদের বিনা বিচারে মেরে ফেলার ঘটনায়। এই যখন বাস্তবতা – তখন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের জান-মাল রক্ষার কথা না হয় বাদই দিলাম।

বুঝতে কষ্ট হয়না যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে থেইন সেইনের সরকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলছে; একদিকে যেমন উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি থেকে অপরাধগুলোকে আর লুকিয়ে রাখা যায়না তখন তারা সবাইকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়া শান্ত করে – আর অন্যদিকে যখন বহির্শক্তির চাপ কিছুটা কমে আসে, সাথে সাথেই বেড়ে যায় জঘন্য অপরাধগুলোর মাত্রা। তাই ৩-রা জুনে শুরু হওয়া সংঘবদ্ধ হত্যা ও নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট এক লক্ষ আভ্যন্তরীন শরণার্থীর সাথে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসের ফলে আরো কয়েক অযুত বাস্তুহারা শরণার্থী যোগ দিলে সার্বিক অবস্থার অবনতি ঘটে অনেকখানি। এক সময়ের সমৃদ্ধ মুসলিম জনপদ এখন যেন বোমার আঘাতে ধ্বংস হওয়া অঞ্চল! কোনো রোহিঙ্গাকেই তাদের এলাকাতে ফিরে গিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি পূনর্গঠন করতে দেয়া হয়নি। নাৎসি কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আদলে গড়ে ওঠা ক্যাম্পে তাদের আঁটকে রাখা হয়েছে। ঐ বীভৎস ছাউনিগুলো থেকে বের হয়ে জীবিকা আহরণের চেষ্টা করলে রাখাইন বৌদ্ধ নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হবার সমূহ ঝুঁকি থাকে। ঐ ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে যাতে তারা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

চিত্র ৪: শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের দূর্বিষহ জীবন।

নিরস্ত্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা যেন রাখাইনদের জাতীয় চেতনাতে পরিণত হয়েছে। সীমান্তরক্ষীরা (NASAKA) বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে আরাকান হচ্ছে রাখাইন রাজ্য – যেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের কোনো স্থান নেই। রোহিঙ্গাদের বলা হয় তারা যেন আরাকান থেকে চলে যায়, না হলে তাদের মেরে ফেলা হবে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে নির্মূল করার তালিকায় একে একে যুক্ত হচ্ছে মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলো। পাঁচের বেশী লোকের সমাবেশ ঘটানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা ১৪৪ ধারা কেবল রোহিঙ্গাদের উপরই প্রয়োগ করা হয়। নিরাপত্তারক্ষীদের আশীর্বাদ পওয়া রাখাইন সন্ত্রাসীদের হাতে ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট, মসজিদ, স্কুল কিংবা গ্রাম লুট হওয়া অগ্নিদগ্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতেও বাইরে যেতে পারেনা রোহিঙ্গারা।

 

চিত্র ৫: জ্বলছে রোহিঙ্গাদের বসত বাড়ি ও জন…

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী রাখাইনরা সরকারের সহযোগিতা পায়। চিয়াউকফু শহরের ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, বৌদ্ধ অগ্নি-নির্বাপক দল পানির বদলে আগুনের উপর জ্বালানী ছিটিয়েছে, যাতে ধ্বংসলীলা সম্পূর্ণ হয়! পিট প্যাটিসন নামের একজন স্থানীয় শিক্ষক, যিনি যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার জন্যেও কাজ করে থাকেন বলেন,

দমকলের বাহিনীর লোকজন আগুনের উপর আদতে ঢেলেছে পেট্রোল – কিন্তু ভান দেখাচ্ছে যেন তারা পানি ছিটাচ্ছে! কর্তৃপক্ষ আসলেই একপেশে। আমরা তাদের বিশ্বাস করতে পারিনা।

গত বুধবার চিয়াউকফু শহরের তাবৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী হত্যা কিংবা জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা পড়ার হাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্যে অন্যদের মতো মাছ ধরার নৌকাতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পাউক-ত শহরের প্রাক্তন মুসলিম অধিবাসীরা ইন্ডিপেন্ডেন্টকে জানান যে, সরকারী এক ফেরীযান সাগরে পালিয়ে আসা লোকদের মাছ ধরার নৌকাতে ধাক্কা মারে – ফলে ডুবে মারা যায় কয়েক ডজন লোক। আর যারা সেই যাত্রা বেঁচে গিয়ে কোনোমতে উপকূলে আসতে পেরেছে, তাদের সরকারী কর্তৃপক্ষ আর মাটিতে নামতে দেয়নি।

  

চিত্র ৬: প্রাণভয়ে সাগরপথে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা। এমনি এক নৌকাকে মিয়ানমার সরকারের এক ফেরীযান সাগরে গিয়ে ধাক্কা মারলে কয়েক ডজন রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয় বঙ্গোপসাগরে।

সপ্তাহান্তে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃক প্রকাশিত উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে চিয়াউকফু ও পার্শ্ববর্তী উপকূল অঞ্চলের ধ্বংসের চিহ্ন স্পষ্ট। অজস্র ঘরবাড়ি আর অসংখ্য নোঙ্গর করা বজরা আর নৌকার শহর আজ যেন পোড়ো ধ্বংসস্তুপ – যার মধ্যে আছে পুরোপুরি ধ্বংস হওয়া ৮১১টি বাড়ীসহ অন্যান্য স্থাপনা।

চিত্র ৭: চিয়াউকফু শহরে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল রাখাইন সন্ত্রাসীরা আগুন জ্বালিয়ে ভস্মীভুত করে ফেলে। অজস্র ঘরবাড়ি আর অসংখ্য নোঙ্গর করা বজরা আর নৌকার শহর আজ যেন পোড়ো ধ্বংসস্তুপ।   

যদিও সাম্প্রতিক ঘটনাতেগুলোতে মুসলিমরা একতরফা ভুক্তভোগী – থেইন সেইন সরকার একে রাখাইন রাজ্যের আন্তঃগোত্রীয় দাঙ্গা বলে চিত্রায়িত করতে সচেষ্ট। সাদামাটা অর্থে যা হচ্ছে তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ রাখাইনদের দ্বারা হত্যা-সহ ভয় ভীতির উদ্রেক করে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকে উৎখাতের উদ্দেশ্যমূলক সরকারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুসারে এই কাজগুলোকেই বলে নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (ethnic cleansing)। রক্তপিপাসু এই সরকার কিংবা ঘরে ও বাইরে সরকারের কোনো সমর্থকই ছল-চাতুরী করে এমন ভয়াবহ অপরাধ লুকিয়ে রাখতে পারবেনা।

 

পরিচ্ছদ ২: মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নৃতাত্ত্বিক বিনাশ (Ethnic Cleansing)

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বিনাশ আসলে পূর্ব-পরিকল্পিত বিষয় (text book case)। বিষয়টি বর্মী ও রাখাইন বৌদ্ধদের আশীর্বাদে রাখাইন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বর্মী সরকারের হাতে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিকল্পনার অংশ – যেখানে সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে থাকে। স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সাধু-সন্ত ও জনতা-সহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সবাই রোহিঙ্গা সমস্যার শেষ সমাধান দেয়ার এই পরিকল্পনার উৎসুক অংশীদার।

তাই থেইন সেইন সরকারের রোহিঙ্গা উৎখাতের পরিকল্পনাকে সমর্থন করা তরুন সাধু সঙ্ঘের (Young Monks Association) বিক্ষোভ সভাতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দেখে অবাক হতে হয়না। সবচাইতে বড় এমনই এক বিক্ষোভ সভাতে সভাপতিত্ব করতে দেখা গেছে উইরাথু নামের পরম-পূজনীয় এক বৌদ্ধ শিক্ষককে। সে হচ্ছে সেই অপরাধী যে ২০০৩ সালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার প্ররোচনা দেবার জন্যে জেলে গিয়েছে। তাই অবাক হবার কিছু নেই যে আং সান সু চি আজ প্রতারণামূলক অঙ্গীকার করছেন – যেখানে তার দল NLD আসলে রোহিঙ্গা নির্মূলের রাষ্ট্রীয় অভিযানের অন্যতম সমর্থক। ‘গণতন্ত্র’র প্রতীক বলে পরিচিত এমন অনেক নেতাই আজ ফ্যাসিবাদের চাইতে কতটা ভালো তার প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন – সত্যি বলতে কি, তাদের কাজকর্ম আদতে কু ক্লাক্স ক্ল্যান (KKK) সদস্যদের চেয়েও জঘন্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

এই নির্মূল অভিযানের সবচাইতে ভয়ানক অংশ হচ্ছে রাখাইন বৌদ্ধরা, যাদের পূর্বপুরুষেরা একাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আরাকানে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য আরো শতাধিক বছর আগেই হিন্দু সাম্রাজ্য চন্দ্র’দের শাসনামলে অপেক্ষাকৃত শ্যামলা বর্ণের রোহিঙ্গাদের বংগ-ভারতীয় পূর্বপুরুষেরা আরাকানে ইতোমধ্যেই বসবাস শুরু করে দিয়েছে। চন্দ্র রাজাদের তৎকালীন বাংলার (বর্তমানের বাংলাদেশ) সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।

রাখাইন জাতির সেই তিব্বতীয়-বর্মী বৌদ্ধ পূর্বপুরুষদের অনধিকার ও সহিংস প্রবেশের ফলে আরাকানে বসবাসকারী হিন্দু ও মুসলিমরা কালক্রমে সংখ্যালঘু হয়ে যায়। কিন্তু ১৪৩০ সালে প্রায় ৫০,০০০ সদস্যের দু’টি সৈন্যদল পলায়নরত রাজা নারামেইখলা’কে যখন আরাকান রাজ্যে পুনঃঅধিষ্ঠিত করে তখন সেই সৈন্যদলের অনেককেই আরাকানে থেকে যেতে রাজা অনুরোধ করেন ; উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বর্মী আক্রমণ প্রতিহত করা। মুসলিম সেনাদলের অনেকেই নতুন রাজধানী ম্রোহাংগ (ম্রাউক-উ)-এ থেকে গেলে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের সংখ্যা আরাকানে কিছুটা বাড়ে।

আরাকানের ম্রাউক-উ সাম্রাজ্য পার্শ্ববর্তী বাংলা/ভারত অঞ্চল থেকে অনেক আচার, কৃষ্টি গ্রহণ করে। তারা ইসলামী অভিলিখনে মুদ্রাও বাজারে ছাড়েন। তারা বাংলা সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতাও দেন। তারা মুসলিম নামও অধিগ্রহণ করেন, যে রীতি ষোড়শ শতাব্দীর প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত চলে। বৈচিত্র্যপূর্ণ নৃ ও জাতিগোষ্ঠীর সমাহারে সাজানো এই সাম্রাজ্যে মুসলিমরা প্রশাসন, আদালত ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বিশেষ অবদান রাখে। ১৭৮৪ সালের বর্মী রাজা বোদোপায়ার অধিগ্রহণের আগ পর্যন্ত প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরেই এই বিচিত্র ও অনন্য রাজ্য ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন।

বোদোপায়া ছিলেন উগ্রপন্থী বৌদ্ধ, যিনি মুসলিম সম্পর্কিত সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে চাইতেন। ধর্মীয় সৌহার্দপূর্ণ অঞ্চলে তিনি সংকীর্ণতাবাদী সাম্প্রদায়িকতার প্রচলন করেছিলেন। আরাকানের সৈকত জুড়ে থাকা মসজিদগুলোকে ধ্বংস করে তিনি সেখনে প্যাগোড়া ও বৌদ্ধ আশ্রম গড়ে তোলেন। আরাকান অধিগ্রহণের সময় তিনি কয়েক অযুত মুসলিমকে মারা ছাড়াও প্রায় ২০,০০০ মুসলিমকে বন্দী করে নিয়েছিলেন। তার নৃশংস রাজত্বকালে প্রায় দুই লক্ষ আরাকানবাসী পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় (আজকের বাংলাদেশ) পালিয়ে যায়। প্রায় ৪০-বছর বর্মী শাসনের পরে (১৯৮৪-১৮২৪) আরাকান ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসে। ইংরেজরা ৪-ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালের বার্মার স্বাধীনতা পর্যন্ত এই আরাকান অঞ্চল শাসন করে ( Aye Chan (2005))।

চিত্র ৮: বৌদ্ধ রাজা বোদোপায়া’র মুসলিম নির্মূলাভিযানের ২০০ বছর পরেও নির্যাতনের পরম্পরা চলছে। আরাকান থেকে পালাবার চেষ্টায় সাগরে ভাসছে রোহিঙ্গারা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বার্মা অধিগ্রহণের প্রাক্কালে বৌদ্ধ যোদ্ধারা ফ্যাসিবাদী রাজকীয় জাপানী সেনাবাহিনীর পক্ষে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ভারতীয় ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ী ও ব্যাবসাদির উপর হামলে পড়ে। এমনকি পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীও এই নির্মূলাভিযান থেকে রেহাই পায়নি। প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা ঐ বৌদ্ধ-জাপানী যৌথ অভিযানে প্রাণ হরান। রোহিঙ্গাদের তখন দক্ষিণ আরাকান থেকে বের করে দেয়া হয়। অনেকেই তখন ব্রিটিশ বাংলার প্রতিবেশী উত্তর আরাকান অঞ্চলে পালিয়ে বাঁচেন, কেননা সেখানে তখনো রোহিঙ্গাদের নিগূঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। জীবন বাঁচাতে গিয়ে আরো প্রায় ৮০ হাজার তখন সীমান্ত পেরিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলায় বসবাস শুরু করে দেয়। সে সময় ২৯৪টি রোহিঙ্গা গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বার্মা স্বাধীন হবার পরেও রোহিঙ্গা-সহ অন্যান্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গণহত্যা ও নৃশংসতা চলতেই থাকে। নৃতাত্ত্বিক বিনাশের লক্ষ্যে আমার জানা মতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিদেনপক্ষে দুই ডজন অভিযান চালানো হয়, সেগুলো হচ্ছে:

১. সামরিক অভিযান (৫ম বর্মী রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮

২. বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স (BTF) এর অভিযান – ১৯৪৮-৫০

৩. সামরিক অভিযান (দ্বিতীয় জরুরী ছিন রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮

৪. মাউ অভিযান – অক্টোবর ১৯৫২-৫৩

৫. মনে-থোন অভিযান – অক্টোবর ১৯৫৪

৬. সমন্বিত অভিবাসন ও সামরিক যৌথ অভিযান – জানুয়ারী ১৯৫৫

৭. ইউনিয়ন মিলিটারি পুলিস (UMP) অভিযান – ১৯৫৫-৫৮

৮. ক্যাপ্টেন হটিন কিয়াও অভিযান – ১৯৫৯

৯. শোয়ে কি অভিযান – অক্টোবর ১৯৬৬

১০. কি গান অভিযান – অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৬৬

১১. ঙ্গাজিঙ্কা অভিযান – ১৯৬৭-৬৯

১২. মিয়াট মোন অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯-৭১

১৩. মেজর অং থান অভিযান – ১৯৭৩

১৪. সাবি অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪-৭৮

১৫. নাগা মিন (ড্রাগন রাজা) অভিযান – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৮-৭৯ (ফলাফল: ৩ লক্ষ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus); মৃত্যু চল্লিশ হাজার)

১৬. সোয়ে হিন্থা অভিযান – অগাস্ট ১৯৭৮-৮০

১৭. গেলোন অভিযান – ১৯৭৯

১৮. ১৯৮৪’র তাউঙ্গকের গণহত্যা

১৯. মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – তাউঙ্গি (পশ্চিম বার্মা)। পিয়াই ও রেঙ্গুন সহ বার্মার অনেক অঞ্চলে এই দাঙ্গা ঘটে।

২০. পি থিয়া অভিযান – জুলাই ১৯৯১-৯২ (ফলাফল: দুই লক্ষ আটষট্টি হাজার রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অভিনিষ্ক্রমণ (exodus))

২১. না-সা-কা অভিযান – ১৯৯২ থেকে আজ পর্যন্ত

২২. মুসলিম বিরোধী সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা – মার্চ ১৯৯৭ (মান্দালয়)

২৩. সিটীওয়ে’তে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা – ফেব্রুয়ারী ২০০১

২৪. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা – মে ২০০১

২৫. মধ্য বার্মার মুসলিম বিরোধী সর্বাঙ্গীন দাঙ্গা (বিশেষত পিয়াই/প্রোম, বাগো/পেগু শহরে) – ৯/১১ এর পরবর্তী থেকে অক্টোবর ২০০১

২৬. যৌথ নির্মূলাভিযান – জুন ২০১২ থেকে চলছে

জেনারেল নে উইন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সকল মিয়ানমার সরকারই মৌলিক মানবাধিকার বন্ধ রেখে রোহিঙ্গাদের সার্বিক নৃতাত্ত্বিক বিনাশে খেলায় মত্ত। রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রবিহীন ঘোষণা করতঃ – তাদের বিরুদ্ধে করা সব ধরণের অপরাধকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কোনো অনুচ্ছেদই মানা হচ্ছেনা। এখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলো:

নাগরিকত্ব অস্বীকার

সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ ও চলাচল

নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত শিক্ষা

সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত কাজের অধিকার

জবরদস্তিমূলক শ্রমনিয়োগ

ভূমি অধিগ্রহণ

জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদ

ঘরবাড়ী, অফিস, স্কুল, মসজিদ ইত্যাদির ধ্বংস সাধন

ধর্মীয় যন্ত্রণা দান

জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ

নিয়ন্ত্রিত বিয়ে

প্রজননে বাধাপ্রদান ও জোরপূর্বক গর্ভনাশ

স্বেচ্ছাচারী কর আরোপ ও বলপ্রয়োগে কর আদায়

গবাদি পশু-সহ পরিবারের সদস্যদের জবরদস্তিমূলক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধকরণ

স্বৈরাচারী মনোভাবসূলভ গ্রেফতার, নিবর্তন ও আইন বহির্ভূতভাবে হত্যা

রোহিঙ্গা মহিলা ও বয়ষ্কদের অবমাননা ও অমর্যাদা

যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের প্রয়োগ

রোহিঙ্গা সমৃদ্ধ লোকালয়ের প্রণালীবদ্ধ উচ্ছেদ

অভিবাসন ও নাগরিকত্ব কার্ড বাজেয়াপ্তকরণ

আভ্যন্তরীণ শরনার্থী ও রাষ্ট্রহীনতা

মুসলিম পরিচিতি মুছে ফেলার লক্ষ্যে মুসলিম ঐতিহ্য সমৃদ্ধ স্থান ও প্রতীকের ধ্বংস কিংবা পরিবর্তন

 

পরিচ্ছদ ৩: আরাকান – এ যেন আরেক বসনিয়া!

তের-ই অক্টোবরে লন্ডনের ৩০ মাইল উত্তরের লুটন শহরে অনুষ্ঠিত এক সভায় (যেখানে আমাকে রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে বক্তৃতা দেবার জন্যে আমন্ত্রিত করা হয়েছিল) জনৈক ব্রিটিশ এমপি রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাকে ৯০ দশকের প্রাকভাগে বসনীয় মুসলিমদের ভাগ্যে যা ঘটেছিল তার সাথে তুলনা করেছিলেন। উনি ঠিকই বলেছেন।

ড. শুয়ে লু মং ওরফে শাহনেওয়াজ খান তার লেখা The Price of Silence: Muslim-Buddhist War of Bangladesh and Myanmar – a Social Darwinist’s Analysis বইতে জানাচ্ছেন যে আরাকান রাজ্যের চারটি জেলাতে রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধদের সংখ্যিক অনুপাত প্রায় সমানই ছিল – কিন্তু তেশরা জুন, ২০১২ থেকে শুরু হওয়া রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের নির্মূলাভিযানের কল্যাণে সেসব মুসলিম জনবসতি এখন প্রায় জনশূণ্য।

জাতিসংঘ সহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গাদের ব্যপারে সঠিকই বলেছেন – রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচাইতে বড় নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। তাদের গোত্র ও ধর্মের জন্যে তারা মিয়ানমারের সংখ্যা গরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায় দ্বারা গণহত্যার বলি হচ্ছেন।

চিত্র ৯: জাতিসংঘ-সহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত অনুসারে রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে অসহায় ও নির্যাতিত জাতি।

রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থাকে ঠিকভাবে প্রকাশ করার জন্য গণহত্যা ছাড়া আর কোনো শব্দ আছে বলে মনে হয়না। এক্ষেত্রে গণহত্যা শব্দের ব্যবহারে কারো অবাক হবার কিছু নেই, কেননা মিরিয়াম ওয়েবস্টার অভিধানে গণহত্যাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, “ইচ্ছাপ্রনোদিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কোনো নৃ, জাতি কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নির্মূল অভিযান [the deliberate and systematic destruction of a racial, political or cultural group]।” সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলছেন, হোক সার্বিক কিংবা আংশিক – নৃ, জাতি, ধর্ম কিংবা রাষ্ট্রিক গোষ্ঠীর নিয়মতান্ত্রিক নির্মূলাভিযান থাকলেই গণহত্যা’র সংজ্ঞা প্রাসঙ্গিকই থাকে। আর যেকোনো সংজ্ঞা অনুসারেই আরাকানের রোহিঙ্গারা নৃ, জাতি ও ধার্মিক আঙ্গিকে সংখ্যাগুরু রাখাইন বৌদ্ধ বর্মীদের চাইতে পুরোপুরি আলাদা।

ড. ড্যানিয়েল জোনাহ গোল্ডহ্যাগেন তার লেখা Worse than War বইতে পাঁচ ধরণের উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, সেগুলো হচ্ছে –পরিবর্তন, নিবর্তন, বিতাড়ন, জন্মনিরোধ ও সর্বাংশে নির্মূল। এখানে পরিবর্তন বলতে বোঝানো হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি-সহ সকল মৌলিক পরিচিতিগুলোকে ধীরে ধীরে পাল্টে দেয়া। আগে আমি যেভাবে বললাম, যদিও আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস স্মরণাতীত কালেই পৌঁছে – তবুও তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা নব্য বসতকারী গোষ্ঠী হিসেবে নতুন মিথ্যে পরিচিতি দেয়া হচ্ছে।

নিবর্তন হচ্ছে সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে ঘৃণিত, অননুমোদিত ও ভয়ঙ্কর মানুষদের নিজেদের কব্জায় রেখে তাদের উপর সহিংস দমননীতি চালানো যাতে সেই ভয়ানক জনগোষ্ঠী আসল কিংবা কল্পিত কোনও রকমের ক্ষতিই আর করতে না পারে। নিবর্তন মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জীবনের প্রাত্যহিক বৈশিষ্ট্য।

বিতাড়ন কিংবা বিবাসন হচ্ছে তৃতীয় উচ্ছেদের উপায়। বিতাড়নের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীকে হয় দেশের সীমানার বাইরে কিংবা দেশের মধ্যেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে তাড়িয়ে দেয়া হয়। বিতাড়নের আরেকটি উপায় অবশ্য হচ্ছে জনগোষ্ঠীকে স্বদলবলে ক্যাম্পের জীবন বেছে নিতে বাধ্য করা। আর নে উইনের আমল থেকেই মিয়ানমার সরকার এই দোষে দোষী।

উচ্ছেদের চতুর্থ উপায় হচ্ছে জন্ম নিরোধ যা মিয়ানমার সরকার অন্যান্য উপায়গুলোর সাথে ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে রোহিঙ্গা মেয়েদের বিয়েতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাড়াও ব্যবহার করা হয় জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, গর্ভপাত ও ধর্ষণ। হালে ঘটা নিবর্তনে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, শহর ও লোকালয় আক্রমণের সময় অনেক মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া বলতে গেলে নৈমিত্তিক ঘটনাতে পরিণত হয়েছে।

সর্বাংশে নির্মূল হচ্ছে উচ্ছেদের পঞ্চম উপায় যেখানে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে মেরেই ফেলা হয়। সর্বাংশে নির্মূলের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে এমন কারণও দেয়া হয় যে উল্লেখ্য গোষ্ঠীর সামান্য উপস্থিতিই যেন অন্যদের জন্য ভয়ানক হুমকির ব্যপার। এই পদ্ধতিতে সাময়িক, খণ্ডকালীন কিংবা সম্ভাব্য সমাধানের বদলে দেয়া হয় “চিরস্থায়ী সমাধান।” বুঝতে কষ্ট হয়না যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কেন রাখাইন ব্যবসায়ীরা রোহিঙ্গাদের মেরে ফেলার জন্যে বিষাক্ত তেল ও খাদ্যাদি বিক্রী করেছে। বর্ণবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু, রাখাইন সন্ত্রাসী, রক্তপিপাসু রাজনীতিবিদ ও সরকারের সাম্প্রতিক কার্যকলাপে এটা পরিষ্কার যে সার্বিক মিয়ানমার সমাজে রোহিঙ্গারা নির্মূলাভিযানের শিকার।

চিত্র ১০: কী ভিক্ষু কী বৌদ্ধ জনতা – রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি থেকে বের করে দিতে প্রায় সকল শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ আজ সংকল্পবদ্ধ।

উপরে দেয়া মিয়ানমার সরকারের অপরাধ তালিকা থেকে এটা পরিষ্কার যে রোহিঙ্গারা উল্লেখিত পাঁচ ধরণের উচ্ছেদেরই শিকার। এটা আদতে রোহিঙ্গা নির্মূলের একটি সার্বিক পরিকল্পনা।

গণহত্যার জন্য প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এটা শুরু হয় মানুষের মন থেকে, আর এজন্যে দরকার ব্যপক প্রচারাভিযান যাতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ কাজগুলো করা যায়। এক্ষেত্রে অপরাধ কিংবা হত্যাকারীদের নিঃশঙ্ক তো হতেই হবে, বরং তার উপরে বিশ্রী অপরাধগুলো চালিয়ে যাবার জন্য হতে হবে স্ব-প্রণোদিত অন্ধ সমর্থক। অনেক ক্ষেত্রেই, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আবহ তৈরীর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হয় অন্ধ বর্ণবাদী বুদ্ধিজীবীদের উপর, যারা আম-জনতাকে অসহিষ্ণুতার বিষাক্ত বড়ি বিক্রী করেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিদ্বেষী মানসিকতাসম্পন্ন হওয়া কঠিন। তবে, উৎসাহী ও উদ্যমী শব্দমালা দিয়ে একবার চালু করে দেয়া গেলে, উচ্ছেদকারী সরকারের অভিঘাতী সৈন্যদল ও সমাজের সাধারণ জনগণ সার্বাঙ্গীন উন্মাদনা নিয়ে দায়িত্ব পালনে দেহ প্রাণ সঁপে দেয়। তারা স্বপ্রনোদিত হয়েই তা করে। আর আজকে মিয়ানমারে, বিশেষত আরাকানে তা-ই আমরা দেখছি।

গণহত্যা আর যেসব জায়গাতে ঘটেছে সেখান থেকে দীক্ষা নিয়ে আজকের সবচেয়ে বড় অপরাধের হোতারা – অর্থাৎ, মিয়ানমার সরকার, স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সাধারণ জনতার মস্তক ধোলাইকল্পে রোহিঙ্গা-সহ অ-বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অহর্নিশি বিকৃত ইতিহাস দিয়ে চালাচ্ছে প্রোপাগাণ্ডা ও প্রাতারণা – উদ্দেশ্য হচ্ছে মিয়ানমার ও আরাকানের মাটিকে ‘অন্য’ লোকদের থেকে দখলমুক্ত করে ‘পবিত্র’ করা। আয়ে চ্যান, (বিগত) আয়ে কিয়াও, খিন মং স ও অন্যান্য উৎকট স্বদেশপ্রেমী রাখাইন লেখকদের বিষাক্ত লেখাগুলোকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় – কেননা তাদের লেখার কল্যানেই আজ মুসলিম জনগোষ্ঠী – বিশেষত রোহিঙ্গাদেরকে, বানানো হয়েছে ‘বহিরাগত ভাইরাস,’ যা বৌদ্ধ স্বকীয়তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। তাই আজকাল মিডিয়ার বদৌলতে – ‘রাখাইন লোকজনদের পক্ষে আর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বসবাস করা সম্ভব নয়’ – এমনতরো শ্লোগান প্রায়শই শোনা যাচ্ছে। আর ব্যপক এই হত্যাযজ্ঞের একমাত্র বলি যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী – এই সমস্ত একপেশে রিপোর্টে তা পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছে। আদতে উল্টো রোহিঙ্গারাই কিন্তু বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে দিশেহারা।

চিত্র ১১: যুদ্ধ তরবারী হাতে রাখাইন সন্ত্রাসী।

ব্যাপক হারে হত্যাযজ্ঞের কারণ খুঁজে পাওয়া যায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার নীতিমালায়। সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক গঠনই হচ্ছে সেই বিভাজনকারী রেখা – যেখান থেকে সাধারণত এসব উচ্ছেদ প্রকল্প শুরু হয়। অন্য জায়গাতে আমি যেভাবে বলেছি, মিয়ানমার সরকার নব্য মিয়ানমারবাদকে সমর্থন জানায় – যেখানে বর্ণবাদ ও গোঁড়ামি হচ্ছে আদর্শিক সূতিকা – যার উপর ভিত্তি করে সকল অ-বৌদ্ধ ও অ-মোঙ্গল জাতির নাগপাশ থেকে মিয়ানমারের মাটিকে পবিত্র করার শপথ আছে। নৃ-তাত্ত্বিক, জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির বৈচিত্র্য যেখানে মহান শক্তিতে পরিণত হতে পারতো, সেখানে এই বিষাক্ত ভাবাদর্শের কল্যাণে তাকেই দেখা হচ্ছে সবচাইতে বড় দুর্বলতা হিসেবে।

ইহুদি হলোকস্টের অনেক আগে ১৯৩৫ সালে জার্মানীর নুরেমবার্গ শহরে ইহুদিদের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ করে ইহুদি-বিরোধী বর্ণবাদী ও বিদ্বেষপূর্ণ এক আইন জারী করা হয়। ইহুদিরা ভোটাধিকার সহ চাকুরি করার যোগ্যতা হারায়। পরবর্তী ৮ বছর ধরে রাইখ (reich) নাগরিকত্ব আইন বলবৎ রাখার জন্যে ১৩টি আনুষঙ্গিক অধ্যাদেশ জারী করা হয় – যেখানে পর্যায়ক্রমে জার্মানির ইহুদিদের গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়। এই আইন ভঙ্গকারীদের কঠিন কায়িক শ্রম, জেল কিংবা জরিমানা করা হতো। এই আইনের সুযোগ নিয়ে নাৎসি’রা ভুক্তভোগীদের সম্পত্তি ধ্বংস করতো। ইহুদি হলোকস্টের মতো ঘটনার সূত্রপাত যে নুরেমবার্গের সেই ইহুদি-বিদ্বেষী আইনে, তা বুঝতে কষ্ট হয়না। আর সম্প্রতি বিশেষত রোহিঙ্গা মুসলিম ও সার্বিক ভাবে সকল মুসলিমদের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদকারী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জারী করা ধর্মীয় ডিক্রি সার্বিক বার্মায় এবং বিশেষত আরাকানে এক সম্ভাব্য ভয়াবহ গণহত্যার আভাস দিচ্ছে।

চিত্র ১২: রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে সদর্পে চলেছেন এক রাখাইন সন্ত্রাসী।

আমি সম্প্রতি ব্যাংককে “বার্মার রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত – মীমাংসা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার” বিষয়ের উপর এক সম্মেলনে প্রধান বক্তার বক্তব্যে বলেছি , মিয়ানমারের বৌদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্বের গড়ে ওঠা নব্য মিয়ানমারবাদ, নব্য-নাতসীবাদের মতোই একটি সামগ্রিক ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারা। এই চিন্তাধারার নেতা ও অনুসারীরা রাষ্ট্র ও ধর্মের পার্থক্য মুছে ফেলে তাদের বর্ণ ও ফ্যাসীবাদী রাজনীতির সাথে থেরাভাদা বৌদ্ধ মতবাদকে একীভুত করে ফেলতে চায়। আর থেরাভাদা বৌদ্ধ মতবাদ নিজেদের ছাড়া অন্য সব ধর্মমতের প্রতি গোঁড়া, মৌলবাদী, বর্ণবাদী, হিংস্র ও অসহিষ্ণু। মুসলিম, খৃষ্টান, শিখ ও হিন্দুদের মতো ১৪০টি নৃ-গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত মিয়ানমারের প্রায় ১৫ শতাংশের এই সংখ্যালঘুদের জন্যে এই মতবাদ একটা সর্বনাশা বিষাক্ত প্রণালী। এটা অসহিষ্ণুতা উৎপাদন করে আর হিংস্রতা প্রতিপালন করে। তদুপরি বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থনসহ সরকারীভাবে এই নীতিকে রাষ্ট্রীয় প্রকল্প হিসেবে অনুমোদনও দেয়া হয়। বর্মী বর্ণবাদের এই জগাখিচুড়ি-মার্কা আত্মম্ভরী নীতি ও অসহিষ্ণু বৌদ্ধ মতবাদ সংখ্যালঘু সহ সামগ্রিক অঞ্চলের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

চিত্র ১৩: রোহিঙ্গা উৎখাতের রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে উৎসুক অংশীদার বার্মার নিরাপত্তা রক্ষীরাও।

দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে মিয়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর পশ্চিমা আকাঙ্ক্ষার জন্য রাখাইন ও মিয়ানমার সরকারের অপরাধগুলোকে এড়িয়ে চলা হয়। মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড তাই সম্প্রতি প্রতারণামূলক ভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর চলা বর্বরতার মূল কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার অভাব বলে জানিয়েছেন।

তবে এই নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে যদিও মিয়ানমার খনিজ সমৃদ্ধ একটি দেশ, এটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে সবচাইতে দরিদ্র। কিন্তু দারিদ্রই এই গণহত্যার মূল কারণ – যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এমন মতামত আসলে ভাষিক ছদ্মাবরণে থেকে ঘাতক মিয়ানমার সরকারের অপরাধগুলোর ভয়াবহতাকে চেপে যাবার নামান্তর। বসনিয়া আর রুয়ান্ডার ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের অজুহাত শুনেছি। পৃথিবীতে অনেক দরিদ্র দেশই আছে – তাই বলে সেসব দেশে শক্তিশালী সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের উপর গণহত্যার প্রকল্প নেয়না। গণহত্যা ঘটাতে হলে চাই রাষ্ট্রিক পৃষ্ঠপোষকতা, যেখানে সমাজের প্রায় সকল স্তরের লোকই অংশগ্রহণ করে – আর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সাথে তাই-ই হচ্ছে।

অনেককাল ধরেই চীন, ভারত-সহ অন্যান্য এশীয় ও প্রশান্ত অঞ্চলের দেশগুলো মিয়ানমারের নির্দয় সামরিক সরকারের সাথে ব্যবসা করে আসছে। এখানে মানবাধিকার কখনো অগ্রাধিকার পায়নি। অনেকদিন ধরেই ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো মিয়ানমারে ব্যবসা করতে পারেনি। তাদের অংশগ্রহণের জন্য মিয়ানমারের পরিচায়ক মুখের পরিবর্তন ছিল অপরিহার্য। এই বিকৃত পদ্ধতি শুরু হয় যোগ্যতাহীন সু চি’কে নোবেল পুরষ্কার দেয়ার মাধ্যমে – আর তার ধারাবাহিকতায় আসে সেনা সদস্যদের অসামরিক পোষাক পড়ে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে পরিচিতি দেয়ার নাটকের দৃশ্যায়নে। ওটা যেন ছিল বার্মার গ্লাসনস্ত মুহুর্ত – যখন বার্মার নাম পাল্টে মিয়ানমার রাখা হয়। এই দাবীর ধারাবাহিকতায় আসে ২০১০ সালের নির্বাচন ও এর পরের উপনির্বাচন, যেখানে সু চি’র NLD পার্টি সদ্যোমে অংশ নেয় – উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, মিয়ানমার ফ্যাসিবাদী সামরিক গোষ্ঠীশাসন থেকে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রে উত্তীর্ণ হচ্ছে। এরপরে আসে থেইন সেইনের অলিখিত দূত হিসেবে সু চি’র পশ্চিমা বিশ্ব সফর – যেখানে তিনি বার্মার সাথে বহির্বিশ্বের ব্যবসা বাণিজ্য পুনঃস্থাপনের অনুরোধ জানান। সম্পর্কে স্বাভাবিকীকরণের শেষ অঙ্কে আসে থেইন সেইনের জাতিসংঘে সফরের নাটক, যেখানে তিনি বান-কি-মুন সহ অন্যান্য পশ্চিমা নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাত করেন।

চিত্র ১৪: বর্মী রাষ্ট্রপতি থেইন সেইন মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত চান।

এরপরে শুরু হয় অপরাধী বর্মী সরকারের উপর আরোপিত পুরোনো সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার পশ্চিমা সরকারগুলোর প্রতিযোগিতা – উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন বাজারে আগেভাগে ঢুকে নিজের ভাগের অংশ ঠিক রাখা। তারা মিয়ানমারে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেয়। এমন উদ্যোগের মহড়া দেখে থেইন সেইন সরকারের সাহস বেড়ে যায় আরো অনেকগুণ – আর তারা ভাবতে থাকে যে বিশ্ববাসীর কাছে দেয়া আগের প্রতিশ্রুতিগুলো মানতে তারা আর বাধ্য নয়। জাতিসংঘের সফরের অব্যবহিত পরেই, বর্ণবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিক্ষোভের সাজানো নাটক করে বর্মী সরকারের কাছে মুসলিমদের জোরপূর্বক অন্যত্র স্থানান্তরিত করার আর্জি জানায়। সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলোতে তারা ঘোষণা দেয় যে মুসলিমদের সাথে কোনোরকমের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেউ রাখলে তাকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। আগে যেভাবে বলা হলো, এটা নাৎসি নীতিরই ছায়া। এটা হচ্ছে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা সহ সকল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার সার্বিক ব্যবস্থা। মিয়ানমারের এই বৌদ্ধ ফ্যাসিবাদ এমনই অনিষ্টকর যে, আরাকানের ভেতরে ও বাইরে বসবাসরত রাখাইন বৌদ্ধরা মিয়ানমারের অন্য সব বৌদ্ধদের আশীর্বাদে মিয়ানমারে, বিশেষত রাখাইন রাজ্যে একজন মুসলিমও অবশিষ্ট রাখতে চায়না।

আগে আমি অন্যখানেও বলেছি যে, রোহিঙ্গাদের নির্মূল করা এখন একটা মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে পরিণত হয়েছে – যেখানে তথাকথিত গণতন্ত্রের প্রতীক আং সান সু চি সহ মিয়ানমারের অধিকাংশ বৌদ্ধরা কোন-না-কোন ভাবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী। অনেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলেও হন্তক রাখাইন বৌদ্ধ ও সরকারের গণহত্যার প্রকল্পের ব্যাপারে রহস্যজনক নিরবতা কিংবা মৌন সম্মতি তাদেরকে এই অপরাধের সহযোগী হিসেবেই চিত্রিত করেছে। রাখাইন বৌদ্ধরা এখন তাদের নিজস্ব ধাঁচের কৃস্টালনাক্সট খুঁজে পেয়েছে। তারা ১৯৩৮ সালের নাৎসি পার্টির ধারাবাহিক নির্যাতন, হত্যা ও লুণ্ঠনকে অনুকরণ করছে, যখন একের পর এক ইহুদি লোকালয় আক্রমণ করা হয়েছিল। এই হারে চলতে থাকলে নিজ মাতৃভুমি আরাকানেই মুসলিমদের কোনো চিহ্ন ভবষ্যতে অবশিষ্ট থাকবে না।

তেসরা জুন থেকে ঘটা আক্রমণগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন, অপরিকল্পিত কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক আইনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের আওতায় ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রহীন হওয়া রোহিঙ্গাদের উপর মিথ্যাভাবে সকল অপরাধের দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে ফ্যাসিবাদী রাখাইন রাজনীতিকরা অবশিষ্ট বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে উত্তেজিত করে ক্রম-অগ্রসরমান “বর্ণ বিশুদ্ধিকরণ” প্রকল্পের প্রতি বাকীদের সমর্থন ও অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে। আয়ে মং এর ফ্যাসিবাদী দল, RNDP ও অন্যান্য বর্ণবাদী রাখাইন রাজনীতিক সহ লোভী ব্যবসায়িরা বিনা বিচারে রোহিঙ্গাদের মেরে, ঘরবাড়ী, মসজিদ পুড়িয়ে তাদের সম্পত্তি ও ব্যবসা লুট করছে। রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তও করা হচ্ছে। এই কাজে রাখাইন সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশও উৎসুক অংশীদার। ফলে রোহিঙ্গারা আজ হয় কন্সেন্ট্রেশন-ক্যাম্পের আদলে গড়ে ওঠা ছাউনি কিংবা বস্তিতে বন্দী কিংবা তাদেরকে দেশের বাইরে নির্বাসিত। গণহত্যার প্রকল্প এগিয়ে চলছে পূর্ণ উদ্যমে যাতে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করে সমস্যাটির “শেষ সমাধান” দেয়া যায়।

  

চিত্র ১৬: বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা কাটাচ্ছে বীভৎস জীবন।

আমরা এখনো এই নির্মূলাভিযান থামাতে পারি, যদি পশ্চিমা সরকারগুলো এখনই ব্যবস্থা নেয়। তারা জাতিসংঘের মাধ্যমে থেইন সেইন সরকারকে চাপ দিতে পারে – যাতে করে এই জাতি-বিনাশী প্রকল্প থামানো যায় আর সেই সাথে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পূনর্বহাল করা যায়। পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করতে হবে যাতে রোহিঙ্গারা তাদের হারানো জান ও মালের জন্য ক্ষতিপূরণ পান ও কালাদান নদীর পশ্চিম পাশে যাতে তারা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্ভয়ে বসবাস করতে পারেন। সরকার যদি এমন বাস্তবমুখী পরিবর্তনকে বিরোধিতা করে তাহলে নিরাপত্তা পরিষদে অর্থনৈতিক অবরোধ সহ অপরাধী মিয়ানমার ও রাখাইন সরকারের নেতৃবৃন্দকে নুরেমবার্গের মতো বিচারসভায় নিয়ে যেতে হবে – যাতে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য তাদের বিচার করা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, রোহিঙ্গা সমস্যার প্রতি পশ্চিমা শক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি নাৎসি আমলের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়; তারা স্পষ্ট সত্য দেখতে কিংবা শুনতে নারাজ। সহজ কথায় এটা অনৈতিক ও অমার্জনীয়। তারা কেবল মিয়ানমার সরকারের ভাষ্যকেই পুনরাবৃত্তি করছে – যেন সংঘর্ষটা দ্বিপাক্ষিক, অর্থাৎ বড় দুটো গোষ্ঠী একে অপরকে আক্রমণ করছে। এটা অবজ্ঞাপূর্ণ মিথ্যা সাযুষ্যের প্রয়াস বৈ কিছু নয়। যখন কেবল রোহিঙ্গাদের শহরগুলোই জ্বলছে, যখন সকল শরণার্থীই রোহিঙ্গা, যখন প্রথিতযশা কর্মী থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ভিক্ষু, স্থানীয় রাখাইন রাজনীতিক ও ছাত্রদের আর্তনাদ নাৎসি আমলের স্মারক – তখন এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে রোহিঙ্গা সমস্যার “শেষ অঙ্ক” মঞ্চস্থ করার ভয়াবহ মহড়া চলছে। এই বীভৎস সত্য কেউই লুকিয়ে রাখতে পারবেনা।

চিত্র ১৭: গণহত্যার বিভৎসতার বিমূর্ত প্রতিচ্ছবি।

রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইন (আরাকান) রাজ্য যেন একটা বিশালাকায় কারাগার। রোহিঙ্গা ঘরবাড়ীগুলোতে এখন দেয়া হয়েছে লৌহবেষ্টনী আর তাদের পুড়ে যাওয়া দালান-কোঠা হয়েছে সামরিক চেকপয়েন্ট। রাজধানী সিত্তওয়ে (আকিয়াব) এর বাইরে প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গা বাস করছে শরণার্থী শিবিরের অস্বস্তিকর পরিবেশে – যেখানে অপুষ্টি ও রোগব্যধি সুবিস্তৃত আর যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় রাখাইন লোকবল ত্রাণকর্মীদের অবাধ চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি করছে। বহুকালের নিবর্তন ও ধীরলয়ে এগিয়ে যাওয়া গণহত্যার তৎপরতায় ইতোমধ্যেই অর্ধেক রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বের করে দেয়া গেছে। যারা এখনো দেশের মধ্যে জীবিত আছেন তারা জীবন্ত নরক থেকে পালাবার দিন গুনছেন। আমাদের প্রজন্ম কি পুরো একটা জাতিকে এভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেবে?

আর কতো রোহিঙ্গার মৃত্যু ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সাম্প্রতিক এই ভয়ানক বর্ণবাদী নৃশংশতা রোধে এগিয়ে আসবে? বর্ণবাদী প্রতিহিংসা, ধর্মীয় গোঁড়ামী, সন্ত্রাস ও নৃশংসতা এবং সেইসাথে ঔদ্ধত্য ও শক্তির নিষ্ঠুরতার ইঙ্গিতবাহী এই পরিকল্পিত, ক্ষতিকর ও বিধ্বংসী অপরাধকে আর কতদিন আমরা উপেক্ষা করে যাব?

চিত্র ১৮: জীবন্ত নরক থেকে প্রাণ হাতে পালাবার চেষ্টা।

দুঃখের বিষয় এই যে আমরা অতীতের গণহত্যা থেকে কিছুই শিখিনি – না হিটলারের জার্মানী থেকে, না হালের বসনিয়া, কসভো কিংবা রুয়ান্ডা থেকে। ভাষিক কূটাবরণে আজো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর ঘটা অপরাধের মাত্রাকে খাটো করে দেখানোর অপচেষ্টা চলছে। অনেক সাংবাদিক ঘটনার বর্ণনা দেবার আগে “অভিযোগ আছে যে” (“alleged”) এর মতো পূর্বপদ ব্যবহার করছেন, যাতে আসলেই কী ঘটেছে সে সম্পর্কে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা যায়। অনেক স্থানীয় সাংবাদিক নিঃসন্দেহে পক্ষপাতদুষ্ট যারা সরকারী প্রচারণাকেই বিতরন করার দোষে দোষী।

১৯৪৬ সালে নুরেমবার্গ বিচারসভার মার্কিন প্রধান কৌসুলী রবার্ট জ্যাকসন আন্তর্জাতিক সামরিক বিচার-পরিষদের সামনে দেয়া সমাপনী বক্তব্যে বলেছিলেন,

বাস্তবতা এই যে ইতিহাসের দীর্ঘ পদচারণায় বর্তমান শতাব্দী প্রশংসিত অবস্থানে থাকবে না, যদিনা এর দ্বিতীয় ভাগ প্রথম ভাগের কালিমা মুছে ফেলে। বিংশ শতাব্দীর এই দুটি ঘটনা ইতিহাসের বইগুলোতে সবচাইতে রক্তাক্ত ঘটনা হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশ্বযুদ্ধ দুটোতে হতের সংখ্যা প্রাচীণ ও মধ্যযুগের সকল যুদ্ধে নিহতের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশী। ইতিহাসের কোনও অর্ধ-শতাব্দী কখনো এই মাত্রার হত্যাযজ্ঞ দেখেনি। দেখেনি এমন নিষ্ঠুরতা, এমন অমানবতা, এমন পাইকারি হারে মানুষকে দাসত্বের শৃংখলে বাঁধা, এমন মাত্রার সংখ্যালঘুর পূর্ণবিলয়। তর্কেমাদার সন্ত্রাসও নাৎসি বিভৎসতার কাছে ফ্যাকাশে লাগে। ভবিষ্যত প্রজন্ম এই দশকগুলোতে ঘটা অনন্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্মরণে রাখবে। আমরা যদি এই বর্বরতার পেছনের কারণগুলোকে দূরীভূত করে এর পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করতে না পারি, তাহলে এটা কোনো অতিরঞ্জিত ভবিষ্যত বাণী হবেনা যদি বলা হয় যে বিংশ শতাব্দী হয়ত সভ্যতারই পরিসমাপ্তি টানবে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘটা এই গণহত্যার মহড়া দেখে এটা অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে আমরা দুভাবে ব্যর্থ – প্রথমত “কারণ” গুলোকে দূরীভূত না করতে পারা, আর দ্বিতীয়ত, “বর্বর ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি” প্রতিরোধ না করতে পারা।