গণতন্ত্রের পরিবর্তে উন্নয়ন

0

ভূমিকা : গণতন্ত্রের পরিবর্তে উন্নয়ন স্বৈর শাসকদের চিন্তাপ্রসূত, যা গণমানুষের জন্য কল্যাণকর নয়। এই উন্নয়ন শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন স্বার্থান্বেষী শোষক শ্রেণীর পকেট ভারী করে। বৃদ্ধি পায় বৈষম্য। ধনীর সম্পদ বৃদ্ধি পায় আর গরিবের দুর্দশা বাড়ে। অপরদিকে একটি গণতান্ত্রিক সরকারই পারে গণমানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে। একনায়কতন্ত্র সরকার যতই উন্নয়নের ধোয়া তুলুক না কেন, এটা সর্বজনবিদিত যে, সেই উন্নয়ন শুধু তাদের নিজেদের জন্যই কল্যাণকর। গণতান্ত্রিক সরকারের দায়বদ্ধতা থাকে জনগণের প্রতি, থাকে জবাবদিহিতা। ফলে চাইলেও তারা উন্নয়নের নামে দুর্নীতি করতে পারে না, জনগণের কাছে ভোটের জন্য ফিরে যাওয়ার এবং জবাবদিহির স্বার্থেই তাদের আর্থিক সততা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয়। অন্যদিকে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে উন্নয়নের নামে আর্থিক দুর্নীতি, সেই দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাচারের জন্য কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা থাকে না, ফলে একটি অগণতান্ত্রিক বা সীমিত গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় উন্নয়নের নামে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, যেটা এখন বাংলাদেশে ঘটছে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে বলে দাবি করছে তার সামান্য অংশও সাধারণ জনমানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। উন্নয়নের নামে জনগণের যে সম্পদ ব্যয় হচ্ছে এর একমাত্র সুফল বা সুবিধা ভোগ করছে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা বলয়ের সুবিধাভোগী একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। কারণ বর্তমান একনায়কতন্ত্র সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য জনগণের কোনো অবদান নেই। সরকার টিকে রয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং পেশিশক্তিতে। ফলে জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েও সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নয়। ফলশ্রুতিতে দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজেদের আখের গোছানোই হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়ার মূল উদ্দেশ্য। যত বেশি উন্নয়ন প্রকল্প তত বেশি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পথ তৈরি হচ্ছে। তাই গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়নের গন্তব্য কেমন হয়, তা দেশবাসী দেখেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উন্নয়নের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন গণতান্ত্রিক সরকার। একটা গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং তাদের কাছেই দায়বদ্ধ। তাই সেই সরকারের ওপর এই বাধ্যবাধকতা থাকে যে, জনগণ যেন উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে। গণতান্ত্রিক সরকার পেশিশক্তি থেকে জনগণের শক্তিতেই বলীয়ান, তাই নিজের শক্তির জায়গাটি ধরে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক সরকারই করে থাকে।

আওয়ামী লীগের উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র : দুর্নীতি বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো সমস্যা না। স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি আমাদের দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। যার জন্য তখন ব্যাপক দুর্নীতিকেই দায়ী করা হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকেও এই একই সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে এবং তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কারণে সেই সময় দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল।

রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের আড়ালে লুটপাটের মহোৎসব : আজ সরকার তার পরিকল্পনার বাস্তবায়নে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার কূটকৌশল সুনিপুণভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকারের এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীন দল এবং তার সদস্যরা যারপরনাই লাভবান হয়েছেন। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন দল এবং তার সুবিধাভোগীরা লাভের ভাগ পাচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাতে দেশের এবং দেশের মানুষের লাভ কী হচ্ছে? আমরা কি আসলেই অনেক সমৃদ্ধির পথে আছি? ক্ষমতাসীন দল দাবি করে, দেশ আজ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ উন্নয়ন প্রকল্প তাদের এই শাসন আমলেই হাতে নেয়া হয়েছে। উন্নয়নের জোয়ারে দেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপরে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ আজ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের রেকর্ডের পর রেকর্ড তৈরি করছে। যদিও রিজার্ভের টাকা কোথায় কোথায় হারিয়ে যায় তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

ফ্লাইওভার নির্মাণে দুর্নীতি : উন্নয়ন প্রকল্পের একটি উদাহরণ হচ্ছে, ‘মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প।’ ৮ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘মগবাজার-মৌচাক (সমন্বিত) ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প’-এর অনুমোদিত ব্যয় শুরুতে ছিল ৩৪৩ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের সময় ছিল ২০১১ থেকে ডিসেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত। পরবর্তীকালে দুর্নীতির সুবিধার্থে ফ্লাইওভারের পরিধি সামান্য বাড়ানো হয়। কিন্তু ওই অজুহাতে ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিগুণেরও বেশি করা হয়। এই সময় ব্যয় ধরা হয় ৭৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে সৌদি উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (এসএফডি) ৩৭৫ কোটি টাকা এবং ওপেক ইন্টারন্যাশনাল উন্নয়ন ফান্ড ১৯৬ কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি ২০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের। সর্বশেষ এখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের দুর্নীতির তথ্য বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকসহ সংবাদমাধ্যমগুলোতে অনুসন্ধানী ও সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং দুর্নীতিবাজরা তাদের অপকর্ম ও দুর্নীতির প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছে। এই হচ্ছে সব উন্নয়ন প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ চিত্র। এতে একদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রকল্পের ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা আর অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বলয়ের সুবিধাভোগীদের পকেট ভারী হচ্ছে। একটা ব্যাপার এখানে লক্ষ্য করা যায়, সরকারের দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উপর আগ্রহ বেশি। যেমন : পদ্মা সেতু, ফ্লাইওভার, চার লেন হাইওয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষের চোখে রঙিন চশমা পরানোর অপচেষ্টা চলছে। সরকারের ভাবখানা এমন, গণতন্ত্র দিতে পারিনি তো কি হয়েছে? উন্নয়ন নাও। উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভেসে যাবে আর গণতন্ত্রের দাবি মানুষ ভুলে যাবে।

মহাসড়ক নির্মাণে দুর্নীতি : ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ২৮ কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশের তিনটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হচ্ছে কিলোমিটারপ্রতি গড়ে ৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। ফলে মহাসড়ক নির্মাণ বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ এখন বাংলাদেশ। বলাবাহুল্য, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরোটাই উন্নয়নের নামে সরকারি দলের লোকজন দুর্নীতি করবে এবং টাকাটা বিদেশে পাচার করবে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে জেনেভায় ইউএন-ইসিই (ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপ) আয়োজিত এক সেমিনারে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মহাসড়ক নির্মাণের তুলনামূলক ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন গ্রিসের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অধ্যাপক দিমিত্রিয়স স্যামবুলাস। ‘এস্টিমেটিং অ্যান্ড বেঞ্চমার্কিং ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার কস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ৩৫ লাখ ডলার বা ২৮ কোটি টাকা। আর দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২৫ লাখ ডলার বা ২০ কোটি টাকা।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয়-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ২২ লাখ ডলার বা ১৭ কোটি টাকা। আর দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেন করতে এ ব্যয়ের পরিমাণ সাড়ে ১৪ লাখ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১১ কোটি টাকা। ৪০টি দেশের নির্মাণ ব্যয়ের ভিত্তিতে ইকোনমেট্রিক মডেল প্রয়োগ করে গড় ব্যয় নির্ণয় করা হয়। ‘দ্য কস্ট অব রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন লো অ্যান্ড মিডল ইনকাম কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেন অক্সফোর্ড, কলাম্বিয়া ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ৮-৯ কোটি রুপি, বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ৯ থেকে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আর জমি অধিগ্রহণ করা না হলে ব্যয় অর্ধেকে নেমে যাবে। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি ৫ কোটি রুপি বা ৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। দেশটির ১২তম (২০১২-১৭) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে। চীনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটিতে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ১৬-১৭ লাখ ডলার, বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি পড়বে ১০ কোটি টাকার কম। দেশটির ১২তম (২০১০-১৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ তথ্য উল্লেখ আছে।

এদিকে বাংলাদেশের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের তিন প্রকল্পের মধ্যে রংপুর-হাটিকুমরুল অংশ ২০১৬ সালে শুরু হয়েছে। এ মহাসড়কের ১৫৭ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীতকরণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ৫২ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর ঢাকা-সিলেট ২২৬ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৬৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি শুরু করার কথা। দুটি প্রকল্পই বাস্তবায়ন হবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে। ২০১৬ সালে হয়েছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন প্রকল্পের কাজ। দুটি প্যাকেজে ঢাকার বাবুবাজার লিংক রোড থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও মাদারীপুরের পাচ্চর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত চার লেন করা হবে। ৫৩ কিলোমিটার চার লেন করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে প্রায় ৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে। ২০০৫ সালে নির্মাণ করা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের সড়ক। হাওরের ভেতর দিয়ে হওয়ায় সেখানে নয় মিটার পুরু মাটির স্তর তৈরি করতে হয়। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। সেটাই ছিল বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণে সর্বোচ্চ ব্যয়ের উদাহরণ। ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনও রয়েছে এতে। গত ১০ বছরে এ ব্যয় বাড়লেও ১০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোয় খুব বেশি জমিরও প্রয়োজন হবে না। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণ করতে প্রকল্পটির আওতায় মাত্র ২৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়বে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ৯৭ কোটি টাকা। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ১০৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন। আর বাংলাদেশের নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরিও ভারত বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে গড়ে ব্যয় হয় ৫-৬ কোটি টাকা। ফলে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ১০-১২ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা।

বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট নির্মাণে দুর্নীতি : যানজট নিরসনে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এক ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি গড়ে তুলতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিআরটির জন্য কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৩১ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ১০২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে ২০ কিলোমিটার এ ব্যবস্থায় ব্যয় হবে ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ২৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার। সে ক্ষেত্রে এটাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিআরটি। বিশ্বে প্রথম বিআরটি চালু হয় ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে ১৯৭৪ সালে। ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যবস্থাটি চালু করতে সে সময় ব্যয় হয় ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয়ের পরিমাণ ১৫ লাখ ডলার। ২০১১ সালে একই শহরে নতুন আরেকটি বিআরটি চালু করা হয়। এতে ব্যয় হয় কিলোমিটারপ্রতি ২৫ লাখ ডলার। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয় ২০০০ সালে। ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পে ব্যয় হয় ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা কিলোমিটারপ্রতি ৫৩ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসে ২০০৪ সালে চালু করা সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বিআরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ডলার। ব্রাজিলের আরেক শহর সাওপাওলোয় ২০০৫ সালে ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩৪ কোটি ২০ লাখ ডলার, কিলোমিটার হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ লাখ ডলার।

বিআরটি ব্যবস্থা চালুতে খুব বেশি কাজের প্রয়োজন হয় না। বিদ্যমান সড়কের দুই পাশে ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) দিয়ে বাসের জন্য পৃথক লেন করলেই চলে। আর বাসে ওঠানামার জন্য কিছু স্টপেজ তৈরি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভূমি থেকে দু-তিন ফুট উঁচুতে ছাউনির ব্যবস্থা করতে হয়। বাস স্টপেজের সামনে থামার পর সোজা হেঁটে তাতে উঠে যায় যাত্রীরা। আর চলাচলের রুটের মধ্যে কোনো জংশন (মোড়) থাকলে সেখানে বিআরটির বাসকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। মোড়ের কাছাকাছি বাস আসার পর সিগন্যাল বাতি জ্বলে। এতে মোড়ে অন্যান্য যানবাহন বন্ধ করে বিআরটির বাসকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় বিআরটি সবচেয়ে কম ব্যয়সম্পন্ন পদ্ধতি। খুব বেশি জটিলতা না থাকায় দ্রুতই এটি চালু করা যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। তবে বাংলাদেশে এটা অনেক বেশি হচ্ছে। মূলত, অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থায় বিআরটি চালু করার কারণেই ব্যয় বেশি পড়ছে। ২০০৮ সালে ইকুয়েডরের কুইটো শহরে ৩৭ কিলোমিটার বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় ২ কোটি ২২ লাখ ডলার, কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ডলার। এ ছাড়া ২০১০ সালে তাইওয়ানের তাইপে শহরে বিআরটি চালু হয়। ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ব্যবস্থা নির্মাণে ব্যয় হয় ২ কোটি ৮৫ লাখ ডলার বা কিলোমিটারপ্রতি ৫ লাখ ডলার। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০১২ সালে আহমেদাবাদে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি চালু করেন। এতে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশটিতেও এ ব্যবস্থা চালু করতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ১৯ লাখ ৩১ হাজার ডলার। আর ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্রাজিলের পোর্তো অ্যালেগ্রে শহরে ৩৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার বিআরটি চালু হয় ২০১৪ সালের ১৪ মার্চ। এটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ ১০ লাখ ডলার। অথচ বাংলাদেশে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর সড়ক পর্যন্ত চার লেনবিশিষ্ট ২০ কিলোমিটার বিআরটি সব মিলিয়ে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মোট ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ২৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার। সে ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াবে ১ কোটি ৩১ লাখ ডলার।

দৃশ্যমান প্রকল্পে অতি আগ্রহ কিন্তু অন্যান্য প্রকল্পে অনাগ্রহ : কৃষি এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। যেখানে দৃশ্যমান প্রকল্প নিয়ে সরকারের এত তোড়জোড় সেখানে কৃষির উন্নয়নে ততটা সচেষ্ট দেখা যায় না। কৃষির জন্য অতি প্রয়োজনীয় পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকার ততটাই ব্যর্থ যতটা সচেষ্ট তারা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার কূটকৌশলে। একদিকে কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে আর অন্যদিকে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। ফলে কৃষক থেকে যাচ্ছে অবহেলিত এবং অনুন্নত। বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ভাটা পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছিল আমাদের জন্য বড় বাজার। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া ক্রমে বন্ধ করে দিচ্ছে। একদিকে যেমন শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে অন্যদিকে অন্যান্য দেশের বাজারেও তা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং প্রচেষ্টার অভাবে বৈদেশিক শ্রমবাজার ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। আবার ইউরোপ এবং আমেরিকা থেকে উল্টো শ্রমিক ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই হচ্ছে সরকারের উন্নয়নের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। গার্মেন্টস শিল্প আজ নিদারুণ ক্ষতির সম্মুখীন। ক্রেতারা ক্রমে বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের বাজারকে আজ ভারতের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়া প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন কাঁচামালের সহজলভ্যতা, শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, জিএসপি সুবিধা, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষা করা ইত্যাদি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্লিপ্ততা, কূটনৈতিক ব্যর্থতা, সদিচ্ছা এবং যথাযথ পদক্ষেপের অভাব পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হয়।

ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বৃহৎ শিল্পের প্রসার ঘটছে না বাংলাদেশে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগে ভাটা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা, জমির দুষ্প্রাপ্ততা ইত্যাদি শিল্প প্রসারের প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতা নিরসন করে শিল্পের প্রসারের জন্য সরকারের কোনো আগ্রহ কিংবা পরিকল্পনা দৃশ্যমান হয় না। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা তো দূরের কথা বরং পুরনো দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও উল্টো রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হচ্ছে। দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে না। ভারতীয় পণ্যে বাজার সয়লাব হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ভারতীয় পণ্যের প্রসার হচ্ছে অন্যদিকে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং সরকার গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব হারাচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র যদি এমন হয় যেখানে কৃষি, গার্মেন্টস শিল্প, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনমুখী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে তা একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করে। এগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রধান খাত। কৃষি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা দেয়, বৈদেশিক শ্রমিকদের অবদানের কারণে আজ রিজার্ভের রেকর্ড সৃষ্টি হয়। গার্মেন্টস এবং উৎপাদনমুখী শিল্প আমাদের মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। তাই এই প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আপামর জনগণ এবং দেশ। সরকারের উন্নয়নের জোয়ারে যদি মানুষের ক্ষতি দূর করতে না পারে তাহলে বলতেই হয়, এই উন্নয়ন শুধু দলীয় কর্মীদের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য নয়।

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ভৌত অবকাঠামোকেন্দ্রিক : সরকারের অধিকাংশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখে এটাই প্রতীয়মান হয়, সব কর্মকাণ্ড উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দুর্নীতির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার সুযোগ না থাকলে কোনো প্রকল্প হাতে নেয়া হয় না। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে দলীয় লোকজনের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। আমরা যদি একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখি তবে আমরা দেখতে পাব সেই সব ভৌত অবকাঠামোগুলো খুব দ্রুত এগিয়ে চলেছে, যেগুলোর উপর দিয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ট্রানজিট এবং বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। এর মধ্যে আছে পদ্মা সেতু, চার লেনবিশিষ্ট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, সম্প্রসারিত রেল লাইন প্রকল্প ইত্যাদি। অবশ্যই প্রকল্পগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পগুলোর অবদান সুদূূর প্রসারী। কিন্তু বর্তমানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলোর সমাধান না করে প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে প্রকল্পগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। এসব প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগও বেশি। সেই ধরনের প্রকল্পগুলো আলোর মুখই দেখে না যাতে দুর্নীতির সুযোগ নেই কিন্তু জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা হয়।
লুটপাটের সমসাময়িক চিত্র : ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিনেন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফটি)-এর তথ্যমতে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচারের ঘটনা শাসক সরকারকে জাতীয় সম্পদ লুটের সূচক হিসেবে প্রমাণিত। অথচ এই লুটের ঘটনা দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে আমাদের মিডিয়া ব্যর্থ হয়েছে কিংবা প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছে। এভাবে প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে, বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট হতে টাকা সরানো হচ্ছে, সর্বনাশা চুক্তির মাধ্যেমে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে, বৈদিশিক সাহায্যের অর্থ তছরুফ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের গত সাত বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিনেন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফটি)-এর তথ্যমতে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার অর্থাৎ ৭৬ হাজার ৩৬১ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাচার হয়েছে। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

এ ছাড়া ২০১৪ সালে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের কয়েকজন নাগরিকের জমাকৃত টাকার পরিমাণ বিগত বছরগুলোর চেয়ে ৬২% বেশি। মাত্র ওই এক বছরে বাংলাদেশি কয়েকজন নাগরিক সুইস ব্যাংকে মোট তিন হাজার ২৩৬ কোটি টাকা জমা করেছেন, যা স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এক বছরে জমাকৃত টাকার মধ্যে সর্বাধিক জমার একটি রেকর্ড। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর সুইস ব্যাংগুলোতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের আমানত যখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে ঠিক সেই সময়ে কেবলমাত্র বাংলাদেশ থেকে এত টাকা সেখানে জমা হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেন। ২০১২ সালে হলমার্ক গ্রুপ ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় এই কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটায়। আওয়ামী লীগের একজন নেতার যোগসাজশে হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংক থেকে ৪০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। একই বছরের ২৪ এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এক নেতার সহযোগিতায় বিসমিল্লাহ গ্রুপ দেশের পাঁচটি ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এমএলএম কোম্পানি ইউনিপেটুইউ মাত্র ১০ মাসে বিনিয়োগের দ্বিগুণ লাভ দেয়ার কথা বলে জনসাধারণের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন ৪ জন গ্রাহক। ১৯৯৬ সালের মতো ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমে লুট করা হয় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ৭ জন বিনিয়োগকারী। সরকার জ্বালানি তেলভিত্তিক ১৯টি কুইক রেন্টাল দিয়ে ভর্তুকি দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেখানে সরকার টাকার অভাবে ও দাতাসংস্থা না পেয়ে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬টি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে পারছে না, সেখানে কুইক রেন্টালের জন্যই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা। অধিকাংশ কেন্দ্রের মালিকানার সঙ্গে সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতাকর্মী আর মন্ত্রী-এমপি জড়িত থাকায় সরকার তাদের কাছে একদিকে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করে টাকা গচ্চা দিচ্ছে অপরদিকে রেন্টালদের কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে তা গ্রাহকদের কাছে কম দামে বিক্রি করে রাজস্ব হারাচ্ছে। এ ছাড়া ভর্তুকির নামে ছাড় করা অর্থ পিডিবির নামে ঋণ হিসেবে দেখিয়েও প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকার বেশি গচ্চা দিচ্ছে সরকার। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই রেন্টাল, কুইক রেন্টালগুলো জিইয়ে রাখতে গিয়ে যথাসময়ে সরকারের বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসতে দিচ্ছে না। বর্তমানে দেশে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩টি। আর তেলভিত্তিক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের সংখ্যা হচ্ছে ৪টি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে খরচ হতো চার টাকা ২৬ পয়সা। কিন্তু ২০১০-১১ অর্থবছরে এসে এই খরচ বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৫ পয়সা। ২০০৯ সালের ২১ জুলাইয়ে শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট দফতর। এরপর বিশেষ গ্যাস সংযোগ প্রদানের নামে জনগণ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কেটে সরকার মুনাফা করছে।

উপসংহার : বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। ‘গণতন্ত্রের পরিবর্তে উন্নয়ন’ হচ্ছে সরকারের কূটকৌশল আড়াল করার একটি মাধ্যম মাত্র। গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন জনমানুষ এবং দেশের কল্যাণ বয়ে আনে না। তা শুধুমাত্র ক্ষমতাবলয়ের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর উদর পূর্তির উপলক্ষ মাত্র। যখন জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থাকে না তখন দুর্নীতি, লুটপাট এবং নৈরাজ্য বাধাহীন হয়ে পড়ে। সেটির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ বর্তমান সময়ের বাংলাদেশ। জনগণের প্রকৃত কল্যাণের জন্য প্রয়োজন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকার ব্যবস্থা। সেই ধরনের একটি সরকার যার দায়বদ্ধতা থাকবে জনগণের প্রতি এবং যার অস্তিত্ব নির্ভর করবে জনগণের ইচ্ছার উপর। তবেই প্রকৃতভাবে উন্নয়নের সুফলভোগী হতে পারবে সাধারণ মানুষ। তাই সাধারণ মানুষ এবং দেশের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য চাই একটি সত্যিকারের গণতন্ত্র।

লেখকঃ জনাব শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী

shimul

তথ্য সুত্রঃ দৈনিক দিনকাল, ২৪ এপ্রিল ২০১৬

লিংকঃhttp://www.dailydinkal.net/epaper/share.php?q=2016%2F04%2F24%2F4%2Fdetails%2F4_r3_c3.jpg&d=2016%2F04%2F24%2F