গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন স্বৈরশাসকদের চিন্তা প্রসূত- এ্যাডঃ শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস

0

এ্যাডঃ শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস :
গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন স্বৈরশাসকদের চিন্তা প্রসূত। এই উন্নয়ন শুধু ক্ষমতাসীন স্বার্থান্বেষী শোষক শ্রেণীর পকেট ভারী করে। বাড়ে বৈষম্য। ধনীর সম্পদ বাড়ে, গরিবের দুর্দশা বাড়ে। অন্য দিকে একটি গণতান্ত্রিক সরকারই পারে গণমানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে। একনায়কতন্ত্র সরকার যতই উন্নয়নের ধোয়া তুলুক না কেন, এটা সর্বজন বিদিত যে, সেই উন্নয়ন শুধু তাদের নিজেদের জন্যই কল্যাণকর।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, উন্নয়নের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন গণতান্ত্রিক সরকার। একটা গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের ম্যানডেট নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং তাদের কাছেই দায়বদ্ধ। তাই সেই সরকারের ওপর এই বাধ্যবাধকতা থাকে যে জনগণ যেন উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে। গণতান্ত্রিক সরকার পেশিশক্তি থেকে জনগণের শক্তিতেই বলীয়ান, তাই নিজের শক্তির জায়গাটি ধরে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক সরকারই করে থাকে।

দুর্নীতি বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো সমস্যা নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি আমাদের দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। যার জন্য তখন ব্যাপক দুর্নীতিকেই দায়ী করা হয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকেও এই একই সমস্যার  বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কারণে সেই সময় দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল।

ক্ষমতাসীন দল দাবি করে দেশ আজ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ উন্নয়ন প্রকল্প তাদের এই শাসন আমলেই হাতে নেয়া হয়েছে। উন্নয়নের জোয়ারে দেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে। দেশ আজ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের রেকর্ডের পর রেকর্ড তৈরি করছে। যদিও রিজার্ভের টাকা কোথায় কোথায় হারিয়ে যায় তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

উন্নয়ন প্রকল্পের একটি উদাহরণ হচ্ছে ‘মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প’। ৮ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘মগবাজার-মৌচাক (সমন্বিত) ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প’-এর অনুমোদিত ব্যয় শুরুতে ছিল ৩৪৩ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের সময় ছিল ২০১১ থেকে ডিসেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত। পরবর্তীকালে দুর্নীতির সুবিধার্থে ফ্লাইওভারের পরিধি সামান্য বাড়ানো হয়।

কিন্তু ওই অজুহাতে ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিগুণেরও বেশি করা হয়। এই সময় ব্যয় ধরা হয় ৭৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে সৌদি উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (এসএফডি) ৩৭৫ কোটি টাকা এবং ওপেক ইন্টারন্যাশনাল উন্নয়ন ফান্ড ১৯৬ কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি ২০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের। সর্বশেষ এখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

এ প্রকল্পের দুর্নীতির তথ্য বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকসহ সংবাদ মাধ্যমগুলোতে অনুসন্ধানী ও সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং দুর্নীতিবাজরা তাদের অপকর্ম ও দুর্নীতির প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছে। এই হচ্ছে সব উন্নয়ন প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ চিত্র। এতে এক দিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রকল্পের ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা আর অন্য দিকে ক্ষমতাসীন বলয়ের সুবিধাভোগীদের পকেট ভারী হচ্ছে।

ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ২৮ কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশের তিনটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হচ্ছে কিলোমিটার প্রতি গড়ে ৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। ফলে মহাসড়ক নির্মাণ বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ এখন বাংলাদেশ। বলাবাহুল্য এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরোটাই উন্নয়নের নামে সরকারি দলের লোকজন দুর্নীতি করবে এবং টাকাটা বিদেশে পাচার করবে।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে জেনেভায় ইউএন-ইসিই (ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপ) আয়োজিত এক সেমিনারে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মহাসড়ক নির্মাণের তুলনামূলক ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন গ্রিসের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অধ্যাপক দিমিত্রিয়স স্যামবুলাস।

‘এস্টিমেটিং অ্যান্ড বেঞ্চমার্কিং ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার কস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ৩৫ লাখ ডলার বা ২৮ কোটি টাকা। আর দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২৫ লাখ ডলার বা ২০ কোটি টাকা।

২০০৫ সালে নির্মাণ করা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের সড়ক। হাওরের ভেতর দিয়ে হওয়ায় সেখানে ৯ মিটার পুরু মাটির স্তর তৈরি করতে হয়। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। সেটাই ছিল বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণে সর্বোচ্চ ব্যয়ের উদাহরণ। ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনও রয়েছে এতে। গত ১০ বছরে এ ব্যয় বাড়লেও ১০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোয় খুব বেশি জমিরও প্রয়োজন হবে না।

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণ করতে প্রকল্পটির আওতায় মাত্র ২৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়বে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ৯৭ কোটি টাকা। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন- প্রকল্পে ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ১০৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন। আর বাংলাদেশের নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরিও ভারত বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চেয়ে অনেক কম।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে গড়ে ব্যয় হয় ৫-৬ কোটি টাকা। ফলে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটার প্রতি ১০-১২ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা।

যানজট নিরসনে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এক ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি গড়ে তুলতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিআরটির জন্য কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ৩১ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ১০২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে ২০ কিলোমিটার এ ব্যবস্থায় ব্যয় হবে দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ২৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার। সে ক্ষেত্রে এটিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিআরটি।
বিশ্বে প্রথম বিআরটি চালু হয় ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে ১৯৭৪ সালে। ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যবস্থাটি চালু করতে সে সময় ব্যয় হয় আট কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয়ের পরিমাণ ১৫ লাখ ডলার। ২০১১ সালে একই শহরে নতুন আরেকটি বিআরটি চালু করা হয়। এতে ব্যয় হয় কিলোমিটারপ্রতি ২৫ লাখ ডলার।

কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয় ২০০০ সালে। ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পে ব্যয় হয় ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা কিলোমিটারপ্রতি ৫৩ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে ২০০৪ সালে চালু করা সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বিআরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার।

এতে ব্যয় হয় প্রায় এক কোটি ৮৭ লাখ ডলার, কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ডলার। ব্রাজিলের আরেক শহর সাওপাওলোয় ২০০৫ সালে ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩৪ কোটি ২০ লাখ ডলার; কিলোমিটার হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ লাখ ডলার।

বিআরটি ব্যবস্থা চালুতে খুব বেশি কাজের প্রয়োজন হয় না। বিদ্যমান সড়কের দুই পাশে ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) দিয়ে বাসের জন্য পৃথক লেন করলেই চলে। আর বাসে ওঠানামার জন্য কিছু স্টপেজ তৈরি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভূমি থেকে দু-তিন ফুট উঁচুতে ছাউনির ব্যবস্থা করতে হয়। বাস স্টপেজের সামনে থামার পর সোজা হেঁটে তাতে উঠে যায় যাত্রীরা। আর চলাচলের রুটের মধ্যে কোনো জংশন (মোড়) থাকলে সেখানে বিআরটির বাসকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। মোড়ের কাছাকাছি বাস আসার পর সিগন্যাল বাতি জ্বলে। এতে মোড়ে অন্যান্য যানবাহন বন্ধ করে বিআরটির বাসকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

আধুনিক পরিবহনব্যবস্থায় বিআরটি সবচেয়ে কম ব্যয়সম্পন্ন পদ্ধতি। খুব বেশি জটিলতা না থাকায় দ্রুতই এটি চালু করা যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। তবে বাংলাদেশে এটা অনেক বেশি হচ্ছে। মূলত অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থায় বিআরটি চালু করার কারণেই ব্যয় বেশি পড়ছে।

লুটপাটের সমসাময়িক চিত্র :

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফটি) তথ্যমতে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচারের ঘটনা শাসক সরকারকে জাতীয় সম্পদ লুটের সূচক হিসেবে প্রমাণিত। অথচ এ লুটের ঘটনা দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে আমাদের মিডিয়া ব্যর্থ হয়েছে কিংবা প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছে। এভাবে প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে, বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট হতে টাকা সরানো হচ্ছে, সর্বনাশা চুক্তির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে, বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ তসরুপ করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের গত সাত বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফটি) তথ্যমতে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার অর্থাৎ ৭৬ হাজার ৩৬১ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাচার হয়েছে : ২০১২ সালে এ পরিমাণ ছিল-৭২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১১ সালে-৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০১০ সালে-৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০০৯ সালে-৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০০৮ সালে-৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার এবং ২০০৭ সালে-৪০৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

এ ছাড়াও ২০১৪ সালে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ২০১৩ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের কয়েকজন নাগরিকের জমাকৃত টাকার পরিমাণ বিগত বছরগুলোর চেয়ে ৬২ শতাংশ বেশি! মাত্র ওই এক বছরে বাংলাদেশী কয়েকজন নাগরিক সুইস ব্যাংকে মোট তিন হাজার ২৩৬ কোটি টাকা জমা করেছেন, যা স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এক বছরে জমাকৃত টাকার মধ্যে সর্বাধিক জমার একটি রেকর্ড!

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর সুইস ব্যাংকগুলোতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের আমানত যখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে, ঠিক সেই সময়ে কেবল বাংলাদেশ থেকে এত টাকা সেখানে জমা হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেন।

২০১২ সালে হলমার্ক গ্রুপ ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় এ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটায়। আওয়ামী লীগের একজন নেতার যোগসাজশে হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংক থেকে ৪০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। একই বছরের ২৪ এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র চার মাসের ব্যবধানে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এক নেতার সহযোগিতায় বিসমিল্লাহ গ্রুপ দেশের পাঁচটি ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এমএলএম কোম্পানি ইউনিপেটুইউ মাত্র ১০ মাসে বিনিয়োগের দ্বিগুণ লাভ দেয়ার কথা বলে জনসাধারণের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন চারজন গ্রাহক।

১৯৯৬ সালের মতো ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শেয়ার বাজারে কারসাজির মাধ্যমে লুট করা হয় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে সাতজন বিনিয়োগকারী।

সরকার জ্বালানি তেলভিত্তিক ১৯টি কুইক রেন্টাল দিয়ে ভর্তুকি দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা; যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেখানে সরকার টাকার অভাবে ও দাতা সংস্থা না পেয়ে দুই হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ছয়টি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে পারছে না, সেখানে কুইক রেন্টালের জন্যই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা।

বেশির ভাগ কেন্দ্রের মালিকানার সাথে সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতাকর্মী আর মন্ত্রী-এমপি জড়িত থাকায় সরকার তাদের কাছে এক দিকে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করে টাকা গচ্চা দিচ্ছে; অন্য দিকে রেন্টালদের কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে তা গ্রাহকদের কাছে কম দামে বিক্রি করে রাজস্ব হারাচ্ছে।

এ ছাড়া ভর্তুকির নামে ছাড় করা অর্থ পিডিবির নামে ঋণ হিসেবে দেখিয়েও প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকার বেশি গচ্চা দিচ্ছে সরকার। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই রেন্টাল, কুইক রেন্টালগুলো জিইয়ে রাখতে গিয়ে যথাসময়ে সরকারের বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসতে দিচ্ছে না। বর্তমানে দেশে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩টি। আর তেলভিত্তিক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের সংখ্যা হচ্ছে চারটি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে খরচ হতো চার টাকা ২৬ পয়সা। কিন্তু ২০১০-১১ অর্থবছরে এসে এই খরচ বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা পাঁচ পয়সা।

২০০৯ সালের ২১ জুলাই শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট দফতর। এরপর বিশেষ গ্যাস সংযোগ প্রদানের নামে জনগণ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ছাড়াও জ্বালানি তেলের দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কেটে সরকার মুনাফা করছে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। ‘গণতন্ত্রের পরিবর্তে উন্নয়ন’ হচ্ছে সরকারের কূটকৌশল আড়াল করার একটি মাধ্যম মাত্র। গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন জনমানুষ ও দেশের কল্যাণ বয়ে আনে না। তা শুধু ক্ষমতাবলয় এর সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর উদরপূর্তির উপলক্ষ মাত্র। যখন জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থাকে না, তখন দুর্নীতি, লুটপাট ও নৈরাজ্য বাধাহীন হয়ে পড়ে। সেটির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ বর্তমান সময়ের বাংলাদেশ।

জনগণের প্রকৃত কল্যাণের জন্য প্রয়োজন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় এবং জনগণের ম্যানডেট নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকার ব্যবস্থা। সেই ধরনের একটি সরকার যার দায়বদ্ধতা থাকবে জনগণের প্রতি এবং যার অস্তিত্ব নির্ভর করবে জনগণের ইচ্ছার ওপর। তবেই প্রকৃতভাবে উন্নয়নের সুফলভোগী হতে পারবে সাধারণ মানুষ। তাই সাধারণ মানুষ ও দেশের প্রকৃত উন্নয়ন এর জন্য চাই একটি সত্যিকারের গণতন্ত্র।

লেখক : এ্যাডঃ শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস

বিশেষ সহকারি, বিএনপি চেয়ারপার্সন

সাবেক চেয়ারম্যান, বিআইডব্লিউটিসি।