গণগ্রেফতার >> সারাদেশে স্বজনদের আহাজারি, উৎকণ্ঠা

0

জিসাফো ডেস্কঃ গ্রেপ্তারকৃতদের কয়েকজনকে আদালতে নেয়া হচ্ছে।একেকটি প্রিজন ভ্যান আদালতপাড়ায় প্রবেশ করতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন স্বজনরা। খুঁজছেন নিজেদের পরিবারের সদস্যকে। স্বজনদের খোঁজ করতে যাওয়া অনেকে বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাদের স্বজনকে ধরে নেয়ার পর আর সন্ধান পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট থানায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য আদালতে খুঁজতে এসেছেন।

গতকাল দিনভর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানার সামনে এমন দৃশ্য দেখা যায়। ভ্যান থেকে নামানোর সময় আসামিকে দেখে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের কেউ কেউ কাঁদছেন। কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

সিএমএম হাজতখানার সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধা। সঙ্গে এক কিশোর। ওই বৃদ্ধা জানান, তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ছেলের নাম আলতাব হোসেন। শাহবাগ থেকে গতকাল দুপুরে আলতাবকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি রাজনীতি করেন না। তার নামে কোনো মামলা নেই। এলাকার মানুষের কাছে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত আলতাব পুরান ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসা করেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বাসায় যাচ্ছিলেন। গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে নাতিকে নিয়ে ছুটে এসেছেন তিনি। বারবার টেলিফোনে খোঁজ নিচ্ছিলেন আলতাবের স্ত্রী ইয়াসমিন। স্বামীকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই তার। কাজল নামক এক পুলিশ কনস্টেবলের মাধ্যমে বৃদ্ধা নিশ্চিত হন তার ছেলে ভেতরে রয়েছেন। মিরপুরের বাগবাড়ি এলাকা থেকে স্বপন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে দারুস সালাম থানা পুলিশ। স্বপনকে গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ ছিল না বলে জানান তার মা। এমনকি স্বপনের নামে আগে কোনো মামলা ছিল না। গুলিস্তান থেকে আমান উল্লাহসহ অন্তত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পল্টন থানা পুলিশ। আমান একজন শ্রমিক। কারখানা থেকে ব্যবসায়ীদের মালপত্র মাথায় বহন করে দোকানে পৌঁছে দেন তিনি। আমানের ভাই নিয়াজ জানান, মালামাল বহন করে ঢাকা ট্রেড সেন্টারের সামনে টুকরি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমান। বেলা প্রায় ১১টা। হঠাৎ পুলিশের ভ্যান থামে ওই এলাকায়। রাস্তা থেকে পথচারীদের ধরে ধরে উঠানো হয় ভ্যানে। পথচারীদের সঙ্গে ভ্যানে উঠানো হয় আমানকে। পরে কয়েকদিন আগের দায়ের করা লুটপাট, ভাঙচুরের দায়ে করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একইভাবে ইমন, রিয়াদ, মোর্শেদ ও আবু হানিফ নামে পথচারীদের ওই এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান নিয়াজ। দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরুর পর এমন অবস্থা চলছে সর্বত্রই।

বুধবার রাতে ডেমরা থানার সুকুশী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সবুজ মিয়াকে। স্বজনদের অভিযোগ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা সবুজকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের তিনদিন পর গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে বলে জানান সবুজের মা আনোয়ারা বেগম। গতকাল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানার সামনে আলাপকালে তিনি বলেন, তিনদিন পর্যন্ত তিনি ছেলের কোনো খোঁজ পাননি। থানায় গেলে পুলিশ তাকে আদালতে যেতে বলে। কিন্তু বৃস্পতিবার আদালতে সবুজকে আনা হয়েছে কি-না তা অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারেননি। আজ (গতকাল) এসে তিনি জানতে পেরেছেন সবুজকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তবে, কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার ও আদালতে হাজির করা হয়েছে তা তিনি জানেন না।

মুগদার মাণ্ডা এলাকা থেকে বুধবার রাত ১২টায় গ্রেপ্তার করা হয় হুমায়ুনকে (৩০)। হুমায়ুনের স্ত্রী সুমী আক্তার স্বামীকে একনজর দেখার আশায় গতকাল প্রায় সারাদিন ঢাকা সিএমএম আদালতের হাজতখানার সামনে অধীর অপেক্ষায় ছিলেন। আলাপকালে তিনি জানান, স্বামী হুমায়ুন কমলাপুর স্টেডিয়াম ও তার আশপাশ এলাকায় শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন কাজ করেন। বুধবার রাত থেকে স্বামী হুমায়ুনের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে জানতে পারেন তাকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় থানার পুলিশ। এরপর পুলিশের কাছে গেলে তাকে আদালতে যেতে বলা হয়। সুমি জানতে পারেন হুমায়ুনের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের মামলা করেছে পুলিশ। সুমি আক্তার বলেন, আমার স্বামীর নামে কোনো মামলা নেই। কোনো দিন কারও সাত-পাঁচেও ছিলেন না। কিন্তু স্বামীকে ছিনতাই মামলার আসামি করা হয়েছে শুনে তিনি মুষড়ে পড়েছেন। হুমায়ুনের দুই বন্ধু মনির ও সুজন জানান, বুধবার হুমায়ুনকে গ্রেপ্তার করার পর তারা স্থানীয় পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের পাত্তা দেয়নি। এমনকি কিসের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাও তারা বলেনি। পরে জানতে পারেন তাদের বন্ধুকে ছিনতাই মামলায় আসামি করা হয়েছে। হুমায়ুনের নামে এর আগে কোনো মামলা ছিল না বলে জানান মনির ও হুমায়ুন।

বুধবার থেকে নিখোঁজ ছিলেন রাজধানীর ইব্রাহীমপুর এলাকার মোহাম্মদ আলী (১২)। গতকাল ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানার সামনে ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন মা নূরজাহান বেগম (৫৫)। তিনি দাবি করেন, মোহাম্মদ আলী স্থানীয় একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ছেলে দুদিন নিখোঁজ থাকার পর শুক্রবার তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় গিয়ে জানতে পারেন মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এমনকি তার কাছে ইয়াবা পাওয়া গেছে- এমন অভিযোগে মোহাম্মদ আলীর নামে মামলাও করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। গতকাল ছেলের জামিনের আশায় আদালতে এসেছেন নূরজাহান বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, দুদিন ছেলের কোনো খোঁজ পাইনি। শুনছি পুলিশ না কি ধরপাকড় করছে। আমার ছেলেরে আরো দুদিন আগে ধরে আজ (গতকাল) আদালতে হাজির করেছে। আমার ছেলে ঘর থেইক্যা বাইর হইলেও আমার অনুমতি ছাড়া বাইরে যায় না। স্কুলে পড়া একটা বাচ্চা ছেলে না কি ইয়াবার ব্যবসা করে।

ঢাকার আদালতপাড়ার বেশ কজন আইনজীবী মানবজমিনকে বলেন, চলমান সাঁড়াশি অভিযানের দুদিন আগে থেকেই গ্রেপ্তারকৃত অনেকের স্বজনরা তাদের কাছে এসেছেন। এক্ষেত্রে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, সাঁড়াশি অভিযানের দুদিন আগেই পুলিশের গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে, ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে যেহেতু উচ্চ আদালতের বিধি-নিষেধ রয়েছে, তাই পুলিশ এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে বলে মনে করেন আইনজীবীরা। ঢাকা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ নাজমূল হোসেন বলেন, ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে যেহেতু উচ্চ আদালতের কিছু বিধি-নিষেধ রয়েছে তাই চলমান সাঁড়াশি অভিযানের ক্ষেত্রে পুলিশ কিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। এক্ষেত্রে সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণার আগেও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে গ্রেপ্তারকৃত স্বজনদের অনেকেই জানিয়েছেন।