ক্ষমতাবানরা উন্মাদ হয়ে উঠেছে

0

জিসাফো ডেস্কঃ সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। একথা না বলে এখন বলা উচিৎ সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে! ক্ষমতাবানরা উন্মাদ হয়ে উঠেছে। উন্মার্গগামী এসব উন্মাদদের উন্মত্ততা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে ক্ষমতাহীনের ওপর। যেখানেই ক্ষমতাহীনের বসবাস সেখানেই ক্ষমতাবানের আস্ফালন। নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাঁওতাল নির্যাতন সবকিছু এই একই ব্যাকরণ মেনে হচ্ছে। আর কিছু নয়, আগাগোড়া সবই ক্ষমতার খেলা!

ভিডিওটি যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় বুঝেছেন, এটি ক্ষমতার আস্ফালনের একটি ভিডিও। দেখতে না চাইলেও এই ভিডিওটি ফেসবুক ওয়ালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার বার খুলে যাচ্ছে। মাত্র ৫৪ সেকেণ্ডের এই ভিডিওর পুরোটা আমি একবারও দেখতে পারিনি। কী জঘণ্য, কী নির্মম…এসব শব্দ দিয়ে এই নৃশংসতাকে বোঝানো যাবে না। এসব ভিডিও দেখলে বুক ধড়ফড় করে। কমজোর সিনায় টান লাগে। বস্তুত, মানুষের সীমানা থেকে নিচে নেমে গেলেই কেবল এমনটি করা সম্ভব।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একজন বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাকে বেধড়ক পেটাচ্ছে ছেলের বয়সী কতগুলো জানোয়ার। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে যে মানুষটা এই দেশের জন্মে অবদান রেখেছেন সেই স্বাধীন দেশেই তাকে পিটিয়ে হাড় ভেঙ্গে দেয়া হল। যারা এমনটা করলো তারা আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতি করে। গত আট বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের ঠিকাদারির দায়িত্বও পালন করছে।

শরীরের যন্ত্রণাতো তুচ্ছ, হাসপাতালের বেডে শুয়ে কতটা মানসিক যন্ত্রণা পোহাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আলী? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের কারও পক্ষেই দেয়া সম্ভব না। মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আলীর অপরাধ দুটি। একটি হল, তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। কারণ তিনি যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন না করলে এই দেশের সরকারের পালিত গুণ্ডা তাকে এভাবে মারতে পারতো না। তার আরেকটি অপরাধ হল, তিনি সংসদ সদস্য কিংবা তার চ্যালাদের সঙ্গে টেন্ডার নামক ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

যারা এই মুক্তিযোদ্ধাকে পেটালো প্রথাগতভাবে কোনো মায়ের গর্ভে তাদের জন্ম হলেও এদের দ্বিতীয় জন্মতে ত্রুটি ছিল। পেশি শক্তির রাজনীতির গর্ভে এদের দ্বিতীয় জন্ম। এই জন্মে এসে এরা বিকৃত মস্তিস্ক নিয়ে বেড়ে ওঠে। এখানে সম্মান-শ্রদ্ধা বলে কিছু নেই, ক্ষমতাই সব কিছুর নির্ণায়ক। এই ক্ষমতাবলেই এরা যা-তা করে বেড়ায় এবং এই ক্ষমতাবলেই এসব করেও এদের কিছুই হয় না।

কি সাংঘাতিক আর কি পৈশাচিক দেহভঙ্গী। এরাই নাকি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়বে, জাতির জনকের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবে। একদল স্বপ্নকাতর মানুষ বসে বসে এমন দিবাস্বপ্ন দেখে আর সব কিছুতে ডিজিটালের গল্প শোনায়। তাদের এই গল্পের ফাঁক গলে এরা এমন নিষ্ঠুর আর বর্বর হয়ে উঠেছে। উন্নয়নের গল্প আর উন্নত শ্রেণীর বর্বরতা পাশাপাশি হাত ধরে চলছে। বোঝা গেল, উন্নয়নের মার মুক্তিযোদ্ধাও চেনে না। তার এখন মনে হতেই পারে মুক্তিযোদ্ধাকে পেটানোও বোধ করি উন্নয়নের অংশ!

ঘটনার আরেকটু বিবরণ দেয়া যাক। হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরোক্তি করলেন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আলী নিজেই, ‘দীর্ঘদিন ধরে তারা এখানকার টেন্ডার সিন্ডিকেট করে আসছে। সব কাজ তাদের মাধ্যমে পাওয়া যায়। একটা বড় অংকের কমিশন দিয়ে তাদের কাছ থেকে টেন্ডার কিনে নিতে হয়। সেটা ভেঙে আমি কেন অনলাইনে আবেদন করলাম, এটা নিয়েই তাদের যত রাগ। ওরা সবাই আমার ছেলের বয়সী। এভাবে সম্মান হারাতে হবে কল্পনাও করিনি কখনও।’

মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আলীর ছেলে একটি মামলা করেছিলেন বটে তবে অনুমিত ঘটনাই ঘটেছে। পুলিশ আসামীদের গ্রেপ্তারও করেছিল কিন্তু অচিরেই জামিনে বেরিয়ে আসেন মামলার ১০ আসামীর সবাই! অনুমিত আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, হামলার ১০ দিন পর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শামীম হোসেন মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক শামীম শিকদারকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাওন শিকদারকেও একই অপরাধে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল পারভেজ কর্নেল ও সাংগঠনিক সম্পাদক শিহাব হোসেন মোল্লাকে জেলা কমিটির পক্ষ থেকে শোকজ করা হয়েছে। বিচারের আশা সুদূরপরাহত। চাইলে আপাতত এইটুকু নিয়েই মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আলী সান্ত্বনা পেতে পারেন।

বহিস্কার-বহিস্কার খেলাটা খুবই মজার। কাগজে কলমে পদটা থাকে না কিন্তু আর সবই থাকে। পরবর্তীতে কোনো এক সময় খোয়া যাওয়া পদটাও আবার যথাস্থানে উঠে আসে, বেশিরভাগ সময়ে সেটা গণমাধ্যম কিংবা আম জনতা টের পায় না। সাপও মরলো আবার লাঠিও ভাঙলো না। এটাকে বলে রাজনীতির ‘রাজনৈতিক’ বিচার।

অনুমিত আরেকটা ঘটনা ঘটতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আলীর চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করবেন। সবাই হাসি হাসি মুখ করে প্রধাণমন্ত্রীর এই দরদের কথা প্রচার করবে। নেতারা প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন, আমাদের দল একটি মুক্তিযোদ্ধাবান্ধব দল। ব্যাস্, ঘটনাটি চাপা পড়ে গেল। কারা মেরেছিল, কেন মেরেছিল এইসব প্রশ্ন তখন অবান্তর এবং অপ্রাসঙ্গিক, দল আহত মুক্তিযোদ্ধার দায়িত্ব নেয় এটাই তখন প্রাসঙ্গিক। রাজনীতিতে এভাবেই ‘গরু মেরে জুতো দান’সম্পন্ন হয়।

একটি দল মুক্তিযুদ্ধ নামক বাটখারা নিয়ে সব কিছু বিচার করবে। বিরোধি পক্ষকে অহর্নিশি গালাগালি করতেও এটাই তাদের একমাত্র সম্বল। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এমন নির্মমভাবে আঘাত করার পরও তারা কিছু বলছেন না, সম্ভবত এখানে রাজনীতি করার সুযোগ নেই বলে। ঐ হায়েনাগুলো বিএনপি-জামায়াতের হলে রাজনীতিটা জমতো এবং তারাও এ নিয়ে বক্তৃতা বিবৃতি দিতে কাছা খুলে নেমে পড়তেন!

দেশটা আসলে কসাইখানা কিংবা অত্যাচার কেন্দ্র কিংবা মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। মনে হয়, আইনহীন কোনো বর্বর জনপদের বাসিন্দা আমরা! নাসিরনগরে হামলা, সাঁওতাল উচ্ছেদ, মুক্তিযোদ্ধাকে পেটানো এসব কারা করেছে তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তারপরও তারা অবলীলায় ক্যামেরার সামনে এসে বলেন, ‘অপরাধীরা যে দলেরই হোক…’। চক্ষুলজ্জারও একটা সীমা থাকে, এদের সেটাও নাই। পচে যাওয়া ব্যক্তি বা ব্যবস্থাকে যত দামি পোশাক পরান না কেন তার পচন বেরিয়ে আসবেই। আমাদের রাজনীতি আর রাজনৈতিক নেতাদের হয়েছে সেই দশা।

মুক্তিযোদ্ধাদের চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি সর্বোপরি তাদের নির্যাতনের কথা প্রায়শই গণমাধ্যমে আসে, কিন্তু এগুলোর বিচার হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো তাদেরকে সম্মান-শ্রদ্ধার বদলে তাদেরকে নিয়ে রাজনীতি করতে বেশি আগ্রহী। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে এক মুক্তিযোদ্ধাকে লাথি মেরেছিলেন এক শিবির নেতা। বিচার হয়নি, অবশ্য হওয়ার কথাও ছিল না। কিন্তু যারা প্রসঙ্গে-অপ্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের জিকির তোলে, তারা…?

মনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব খানের কথা, দলদাস এক সচিবের গলা ধাক্কার অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা! এই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকারই তখন ক্ষমতায় থেকেও নির্বিকার ছিল। হয়ত একজন মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে, একজন দলদাস অসৎ সচিব সরকারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ!

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ওরফে মিজানের নির্দেশে যুবলীগের স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মী মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী মরিয়ম বেগমের ওপর চড়াও হন। তাঁরা এই দম্পতিকে লোকজনের সামনে জুতাপেটা করেন। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪)।

এমন উদাহর অগুনিত। সব ঘটনার আখেরে একটা মিল হল, এসবের একটারও বিচার হয়নি। রিকশাচালক কিংবা সবজি বিক্রেতা মুক্তিযোদ্ধার কালশিটে চেহারা তো হরহামেশাই কাগজে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে। সেইসাথে আস্ফালন দেখা যায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারও। সব সম্ভবের এই দেশে অনেক সময় রাজাকাররাও দেখি মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বলে! মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ-দেশপ্রেম-বিবেক শব্দগুলোকে চোখ বেঁধে কোথাও নিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে ওরা আর কখনও ফিরে আসবে না।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম যথার্থ বলেছেন, ‘জীবিত থাকাকালে কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি যথাযথ সম্মান না পান তাহলে মৃত্যুর পর পুলিশের ময়লা বুট দিয়ে মাটিতে লাথি মারার প্রয়োজন নেই। আমি মারা যাওয়ার পর আমার লাশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্যালুট করা হোক সেটা আমি চাই না।’

নির্যাতনের শিকার মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার আলী বলেছেন আরও তাৎপর্যপূর্ণ কথা। ‘যখন যুদ্ধ করেছি, তখন শত্রু-মিত্র চিনতাম। এখন চিনি না। অর্থ, প্রতিপত্তি, দম্ভের কাছে আমরা পরাজিত। এর চেয়ে একাত্তরে যে সহযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন, তারা ভাল আছেন। মরে গিয়ে তারা বেঁচে গেছেন। দেশের জন্য যে হাত দিয়ে যুদ্ধ করেছি, আমার সে হাতটি তারা ভেঙে ফেলেছে।’

জন্মদাতা পিতাকে অস্বীকার করলে যেমন জন্মটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তেমনিভাবে আমরাও মুক্তিযোদ্ধাকে পিটিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছি। প্রশ্নবিদ্ধ করছি জাতি হিসেবে আমাদের জন্মকে, স্বাধীনতাকে, আমাদের মুক্তি সংগ্রামকে।

সাইদ রহমান : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
sayd.rahman@ yahoo.com