কে কিভাবে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন সত্যকে মুছে ফেলা যায় না

0

আলফাজ উদ্দিন: একটা মিথ্যাকে বারবার সত্য হিসাবে প্রচার করার ফলে এটা সত্যে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং সত্য জিনিসটা বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে, জনগণ বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর লাভবান হয় মুষ্টিমেয় সুযোগ সন্ধানী দল। তাই বিবেকের তাড়নায় এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (কালুরঘাট) স্থাপনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলাম বিধায় প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছি। এতে করে ব্যাপক জনসধারণ বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্তি পাবেন বলে আমার বিশ্বাস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ২ টার সময় প্রায় ৫০/৬০ জনের বাঙালি সৈনিকের একটি দল ক্যাপ্টেন সাদেকসহ আমাদের বাড়িতে (জান আলী খান চৌধুরী বাড়ি, মোহরা, কালুরঘাট, চট্টগ্রাম) আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ২৬ মার্চ সকালে আমাদের গ্রামে আরও বেশ কিছু বেঙ্গল রেজিমেন্ট (যারা ২৫ মাচের্র রাতে বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন)- এর সৈনিক আমাদের বাড়ির দিকে আসতে থাকে। আমার পিতা মরহুম সারেহ আহমদ খান তখন পাঁচলাইশ থানার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। সকাল ৬ টার দিকে আমি এই খবর নিয়ে কালুরঘাট সংগ্রাম পরিষদ অফিসে যাই এবং সেখানে সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব সেকান্দার হায়াত খান এবং অন্যান্য নেতা ও কর্মীকে এ ব্যাপারে অবহিত করি। এ ধরনের আরো খবর সংগ্রাম পরিষদের নিকট আসতে থাকায় আমরা কালুরঘাট ব্রীজ পার হয়ে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পারে যাই এবং পেট্রোল পাম্প চত্বরে একজন তরুণ সামরিক অফিসারকে বক্তৃতা দিতে দেখি। সেখানে তার সাথে পরিচয় হবার পর জানতে পারি যে, তিনি মেজর জিয়া। তখন তাঁকে একজন ক্যাপ্টেনসহ প্রায় ৩/৪ শত বাঙালি সৈনিকের আমাদের বাড়িতে ও গ্রামে উপস্থিতির কথা জানালে তিনি খুব উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন এবং জানান সেকান্দার হায়াত খানসহ আমাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে ক্যাপ্টেন সাদেকের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন ক্যাপ্টেন সাদেকসহ সকল বাঙালি সৈন্যকে হালিশহরে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার সাথে যোগ দিতে হবে। আমাদের উপর দায়িত্ব অর্পিত হল ট্রাকযোগে সৈন্যদেরকে হালিশহরে পৌঁছে দেয়ার। আমরা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের চট্টগ্রামস্থ বিপণি বিতান পর্যন্ত পৌঁছে দিই। এইভাবে সেকান্দর হায়াত খান, সৈয়দুর রহমান এবং আমার সাথে তৎকালীন মেজর জিয়ার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। আমরা কালুরঘাটের মৌলভী বাজারে এবং কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাড়ে ফুলতলীতে দু’টি ক্যাম্প স্থাপন করি এবং চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে ফুলতলী পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাম্প সংগ্রাম পরিষদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসি। জনগণের সহায়তায় উক্ত এলাকার পেট্রোল পাম্পসহ সকল কর্মকাণ্ড সংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন নিয়ে আসা হয়। ২৫ মার্চ তারিখে আমি বহদ্দারহাটস্থ রেডিও স্টেশন যাই। সেখানে বেলাল ভাই, ফারুক, আবুল কাসেম এবং আরও কয়েকজন বেতারকর্মীর সাথে দেখা হয়। বিভিন্ন সূত্রে বেলাল ভাই আমার পূর্ব-পরিচিত ছিলেন। তাঁর সাথে বেতার কার্য পরিচালনা করা সংক্রান্ত ব্যাপারে আমার আলাপ হয়। তিনি বললেন, বেতারকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে থাকেন। আপনি যদি বেতারের কাজ পরিচালনা করতে চান, তাহলে আজ রাতের মধ্যে আমাদের সবাইকে বিভিন্ন স্থান থেকে এনে একত্রিত করতে না পারলে সবাই আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব, তখন বেতার কেন্দ্রের কোন কাজ করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে পাক হানাদার বাহিনী চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে বের হয়ে কালুরঘাটের ব্রীজ ও রেডিও স্টেশন দখলের জন্য সচেষ্ট হচ্ছে। এমতাবস্থায়, আমি ইতিপূর্বে সংগৃহীত ইস্পাহানী জুট মিলে ল্যান্ড ক্রুজার টয়োটা চট্টগ্রাম- খ ৮০৬ গাড়িটি (যার ড্রাইভার ছিল মোহাম্মদ আলী, পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের ড্রাইভার) নিয়ে বেলাল ভাইসহ বেতারের কাজ করতে একটা ইউনিটে যাদের দরকার প্রত্যেককে বাসায় গিয়ে নিয়ে আসি। এদের অনেককে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গানপয়েন্টেও আনতে হয় এবং সকল প্রকার ঝুঁকি নিয়ে ইউনিটের সকল সদস্যকে আমাদের বাড়িতে বৈঠকখানার মেঝেতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করি এবং তারা ২৬ মার্চ রাত ১১ টার দিকে পরবর্তী সকালের খবর পরিবেশনের প্রস্তুতি নিতে শুরু কররেন। বেতারকর্মীদের আমাদের বাড়িতে রেখে আমি রাত ১১-২০ মিনিটের দিকে বের হয়ে কালুরঘাট সংগ্রাম পরিষদের অফিসে যাই। সেখানে মেজর জিয়া পূর্ব নির্ধারিত কথামতো অপেক্ষায় ছিলেন এবং আমার দেরি দেখে তিনি সেকান্দার হায়াত খানকে নিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে রওয়ানা হচ্ছিলেন। তিনি বললেন,আপনার বেতারের লোকজন কোথায়? আমি বেতারে ঘোষণা দিতে চাই, বেতারের লোকদের একত্রিত করার কি ব্যবস্থা করলেন? আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম যে, বেতার কেন্দ্র পরিচালনার প্রয়োজনীয় সকলকেই আমাদের বাড়িতে এনে রাখার ব্যবস্থা করেছি। আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন। তখন তিনি আমাদের বাড়িতে না এসে বেতারকর্মীদের সেই মুহূর্তে কালুরঘাট ব্রীজের দিকে নিয়ে আসার জন্য বললেন। সেখানে তিনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন। রাত বেশি হওয়ায় আমরা একটু ইতস্তত করলাম। তিনি জোর দিলেন, এটা খুবই জরুরী। তখন আমি সেকান্দার হায়াত খান,সৈয়দুর রহমান সহ আমাদের গাড়িতে আসতে বলি। বেতারকর্মীদের নিয়ে আমরা কালুরঘাটের দিকে রওয়ানা হলাম। কালুরঘাটে পৌঁছে দেখি, মেজর জিয়া আমাদের জন্য ক্যাপ্টেন ওলী আহমদসহ অপেক্ষা করছেন। পৌঁছে প্রায় সাথে সাথে জিয়া বললেন, বেতার ঘোষণার জন্য যাদের দরকার তারা সবাই আছে কি না। তখন আমি বললাম প্রয়োজনীয় সবাই আছেন। এরপর তিনি আমাদের বললেন, তাকে অনুসরণ করার জন্য এবং নিজের গাড়ি নিয়ে কালুরঘাট ব্রীজ পার হয়ে পূর্বদিকে বোয়ালখালি থানার ফুলতলী ফেলে পটিয়ার কাছাকাছি মনসারটেক নামক স্থানে গিয়ে গাড়ি থামালেন। জিয়াউর রহমানসহ আমরা সবাই গাড়িতে রাত কাটালাম। সকালে জিয়া সকলের সাথে পরিচিত হলেন এবং আমরা সবাই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। বিকালে আমরা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে যাই এবং জিয়াউর রহমান বেতারে ভাষণ প্রদানের কথা বলার সাথে সাথে সকল বেতারকর্মী যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মেজর জিয়া তখন অফিসের টেবিলের উপর বসে একটা ঘোষণা নিজ হাতে লিখলেন এবং ছিঁড়ে ফেলে পুনরায় আর একটি ঘোষণা লিখলেন এবং ছিঁড়ে ফলে পুনরায় আর একটি ঘোষণা লিখলেন এবং সেটাই ২৭ মার্চ ৭টা থেকে ৭-৩০ মিনিট পর্যন্ত পাঠ করলেন। এই ঘোষণার পর বেতারকর্মীদের কেন্দ্রে রেখে জিয়াসহ আমরা কালুরঘাট পার হয়ে ফুলতলীতে চলে গেলাম। পরবর্তীতে বেতারে ভাষণ দিতে এলে জিয়াউর রহমান এলে তাঁকে বেতার কেন্দ্রের অবস্থা জানানো হয়। এরপর ক্যাপ্টেন চৌধুরী খালেকুজ্জামান-এর নেতৃত্বে প্রায় তিন শতাধিক বাঙালি সৈন্য কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের দায়িত্ব নিয়োজিত থাকেন। আরো পরে পাক হানাদার বাহিনী কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের উপর বিমান থেকে শেলিং করে। শেলিং-এর পর আমরা খুব আতংকগ্রস্ত হয়ে বেতারকর্মীদের অবস্থা দেখার জন্য বেতার কেন্দ্রে উপস্থিত হই। সেখানে গেলে বেলাল ভাইয়ের সাথে দেখা হয় এবং জানা গেল বেতারকর্মীদের কেউ হতাহত হয়নি। ইতিমধ্যে অনেকেই কালুরঘাটের দিকে চলে গিয়েছিল। তবে কালুরঘাটস্থ রেডিও স্টেশনের ১০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যুৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমরা অনেক চেষ্টা করার পরও সেই ট্রান্সমিটার বা কেন্দ্রটি আর চালু করতে সক্ষম হইনি। এদিকে, তখন হানাদার বাহিনী চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ এবং জামালখান এলাকা দখল নিয়ে ফেলেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের জামালখানস্থ ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে যোগাযোগ জনাব বদিউল আলমের সহায়তায় আন্ডারগ্রাউন্ড বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে বেতারকর্মীদের নিয়ে এক কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি চালু করার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হই। বেলাল ভাইকে জিজ্ঞাসা করি ১০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার ছাড়াও এখানে আরো একটি এক কিলোওয়াট মেশিন রয়েছে, তার সাথে ১০ কিলোওয়াট-এর কোন সম্পর্ক আছে কিনা? অর্থাৎ একটা ছাড়া অন্যটা চালানো যায় কি না? তিনি উত্তর দিলেন, দুটি মেশিন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ইউনিট। এক কিলোওয়াট একটি স্বয়ংক্রিয় ট্রান্সমিটার। তখন জিয়াউর রহমানের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা হয় এবং তাঁকে এক কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি ট্রাকে তুলে নিয়ে একটি জেনারেটরের মধ্যমে ভ্রাম্যমাণ রেডিও স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানালে তিনি তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। এরপর আমি এক কিলোওয়াট মেশিনটি ওঠানোর উদ্যোগ নিই এবং যে ঘরে এই মেশিন স্থাপিত ছিল, তার দরজা এবং দেয়ালের কিছু অংশ ভেঙে তা বের করি, প্রয়োজনীয় তার কেটে নিই। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন লিভার ব্রাদার্স-এর ইলেকট্রিশিয়ান আবু তাহের চৌধুরী, বেতারকর্মী শুক্কুর মেকানিক, আমিনুর রহমান এবং সৈয়দুর রহমান আমাকে যথেষ্ঠ সাহায্য করেন। তখন কাপ্তাই থেকে একখানা ট্রাক খাবারসহ অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে বেতার কেন্দ্রে এলে আমরা উক্ত ট্রাকে ১ কিলোওয়াট মেশিনটি উঠিয়ে মোহরা সংগ্রাম পরিষদের অফিসে সেকান্দর হায়াত খানের তত্ত্বাবধানে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাই এবং সকলের সাথে বেতার কেন্দ্র চালু করার পরামর্শ করি। সেখানে সিদ্ধান্ত হল ১ কিলোওয়াট মেশিনটি পটিয়া নিয়ে যেতে হবে। এবং কঙ্বাজার ওয়াপদা থেকে জেনারেটর এনে ট্রাকের মধ্যেই ভ্রাম্যমাণ রেডিও স্টেশন স্থাপন করা হবে। সেই রাতে সেকান্দর খান বেতারকর্মীদের নিয়ে পূর্বে উল্লিখিত মাইক্রোবাসযোগে পটিয়া চলে যান। এবং পটিয়া মাদ্রাসার সম্মুখে ট্রান্সমিটারটি রেখে তিনি অধ্যাপক নূরুল ইসলাম (প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী)-এর সাথে যোগযোগ করেন। তিনি সকল বেতারকর্মীকে সেখানে খাওয়ার ও থাকার ব্যবস্থা করেন। ইতিমধ্যে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হানাদার বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ায় এবং কঙ্বাজার থেকে বৈদ্যুতিক জেনারেটর পটিয়ায় আনা সম্ভব না হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ রেডিও ষ্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা ত্যাগ করা হয়। এবার রেডিও স্টেশন স্থাপনের জন্য রামগড়কে উপযুক্ত স্থান বিবেচনা করে এক কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি সেখানে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এবং সে অনুযায়ী ট্রান্সমিটারটি ও বেতারকর্মীদের তার পরদিন সেকান্দর হায়াত খানের তত্ত্বাবধানে ট্রাক ও মাইক্রোবাসযোগে মদুনাঘাট হয়ে রাউজান এবং রাউজান হয়ে ফটিকছড়ির মোহাম্মদ তকিরহাট হয়ে বিবিরহাট হোয়াকো দিয়ে রামগড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। রামগড়ের এসডিও’র পরিত্যক্ত বাংলোর মধ্যে বেতার কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এই সময় কালুরঘাটে সেনাদের সাথে আমাদের প্রচণ্ড লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হয়। সে লড়াইয়ে ক্যাপ্টেন হারুন (বিডিআর) মারাত্মকভাবে আহত হন এবং পটিয়ায় গিয়ে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হন। ক্যাপ্টেন শমসের মোবিন পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং আমি ও লেঃ মাহফুজ (যিনি পরে জিয়ার প্রাইভেট সেক্রেটারী এবং তারও পরে জিয়া হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার দায়ে তাঁর ফাঁসি হয়) ক্যাপ্টেন করিমসহ মদুনাঘাট, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, রাউজানের মদেরমহাল হয়ে ফটিকছড়ি থানার মধ্য দিয়ে রামগড়ে পৌঁছি। তখন জিয়াউর রহমান অন্যান্য সামরিক অফিসার ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের নিয়ে রামগড়ে পৌঁছে গেছেন। সেখানে পুনরায় বেতারকর্মীদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। রামগড়ে বেতারকর্মীরা সেকান্দার হায়াত খানের তত্ত্বাবধানে থাকেন এবং তাঁর মারফত মেজর জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে রেস্ট হাউসে বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ৩ এপ্রিল ১৯৭১ সাল সেখান থেকে শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচারকার্য ও স্বাধীনতার গান-বাজনা প্রচারিত হয়। পরবর্তী সময়ে রামগড় ত্যাগের জন্য বাধ্য হলে বেতারকর্মীরা ভারতের সাবরুম থানা হয়ে ৯১নং বিএসএফ পর্যন্ত বেতার কেন্দ্র নিয়ে যান। ৯১নং বিএসএফ পর্যন্ত সেকান্দার হায়াত খান বেতারকর্মীদের সাথে ছিলেন। এরপর ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি ভারতের নিরাপদ স্থানে বসিয়ে বেতারকর্মীদের দ্বারা স্বাধীন বাংলার খবরাখবর পরিবেশন করা হয়। মুক্ত অঞ্চলে নিয়ে যাবার পর ১ কিলোওয়াট বেতারকেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ে দায়িত্বে ছিলেন চট্টগ্রামের আজাদীর সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। সেখানে বেতার কর্মীদের সার্বিক আনুকূল্য দান করেন এবং ভারত থেকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিটার স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন জনাব এম আর সিদ্দিকী। কিন্তু এ ব্যাপারে ২৫ মে, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কোন সাহায্য পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (কালুরঘাট) পরিচালনা ও স্থানান্তর কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি পরবর্তীতে আগরতলায় এ্যাম্বুলেন্স হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং ৮০৬ নং জীপটি মেজর জিয়াউর রহমানের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যাওয়া হয়। [কৈফিয়তঃ আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে একটি লেখায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক হারুন-অর-রশীদ বিস্তারিত বর্ননা করেছেন, সেদিন কিভাবে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। আশা করা যায়, এ লেখা থেকে বিতর্কের আপাতত একটা সমাধান পাওয়া যাবে – কে কিভাবে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন। যদিও সত্যি কথা মানতে যাদের সমস্যা, তাদেরকে কখনোই মানানো যাবে না, তবে চেষ্টা করতে আপত্তি নেই। গবেষক শামসুল আলমের দুর্লভ সংগ্রহ থেকে হারুন অর রশিদ সাহেবের সেই লেখাটি প্রবাসীবার্তা ডট কম থেকে সংগ্রহ করে জিয়া সাইবার ফোর্স এর মাধ্যমে পুঃনরায় প্রকাশ করা হল।