কেন জিতলেন, কেন হারলেন

0

শেষ হলো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। প্রথম মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী আবারও নির্বাচিত হলেন। আগামী পাঁচ বছর এই এলাকার মানুষ তাকেই দেখতে চায় নগরভবনে এমন রায়ই পাওয়া গেল বহুল আলোচিত এই নির্বাচনের মাধ্যমে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। এদের মধ্যে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩৬ জন ভোট দিয়েছেন। শতকরা হিসাবে ৬২ দশমিক ৩৩ ভাগ। ভোটার উপস্থিতির এই হার বাংলাদেশের যেকোনো নির্বাচনের বিবেচনাতেই সন্তোষজনক। এত বেশি ভোটার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, নির্বাচনি পরিবেশ ভালো ছিল, মানুষের মনে কোনো অস্বস্তি ছিল না। ২ লাখ ৯৬ হাজার ভোটারের মধ্যে নৌকা প্রতীক নিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬১১ ভোট। অর্থাৎ কাস্টিং ভোটের ৫৯ দশমিক ৩২ শতাংশই পেয়েছেন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের চেয়ে ৭৯ হাজার ৫৬৭ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

আগেরবারও জিতেছিলেন আইভী। সেবার তিনি তার দল আওয়ামী লীগের সমর্থন পাননি। সরকারি দল সমর্থন দিয়েছিল স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে। বিএনপি থেকেও সেবার এলাকায় পরিচিত মুখ তৈমূর আলম খন্দকারকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল বেশ একটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে, একেবারে নির্বাচনের আগের রাতে বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে যায় আইভী এবং শামীম ওসমানের মধ্যে। লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন আইভী। অনেকেই বলেছিলেন, বিএনপির সব ভোটই নাকি শেষ পর্যন্ত আইভীর পক্ষে গিয়েছিল, সে কারণেই এত বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন তিনি। এসব কথা যারা বলেছিলেন, তারাই এবার ভেবেছিলেনÑ এবার বিএনপির যেহেতু নিজেরই প্রার্থী আছে, তাই এবার বুঝি লড়াই হবে দারুণ। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি।

কেন হারলেন সাখাওয়াত

প্রতীক হিসেবে ধানের শীষ পাওয়ার পর শুরুর দিকে অনেকে ভেবেছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বুঝি বেশ তীব্র হবে। কিন্তু প্রচারণা যতই চলতে থাকল, পার্থক্যটা যেন স্পষ্ট হতে থাকল। প্রধান দুই প্রার্থীর কারও সঙ্গেই তেমন বেশি কেন্দ্রীয় নেতাকে দেখা যায়নি। শেষের দিকে অবশ্য সাখাওয়াতের আশপাশে কেন্দ্রীয় নেতারা ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের অধিকাংশই মন্ত্রী বা এমপি হওয়ার কারণে এদিকে বঞ্চিত হয়েছেন আইভী। তবে এনিয়ে তার মধ্যে তেমন কোনো হতাশা ছিল বলে মনে হয়নি। বরং তিনি যেন একা একা জনগণের মধ্যে যেতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেছেন। তারপরও প্রচারণার এই সময়টাতে দেখা গেছে আইভী যেখানেই গেছেন, তার পিছনে মানুষের ঢল, স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের অংশগ্রহণ। অথচ এর এক-দশমাংশ মানুষও দেখা যায়নি সাখাওয়াতের পিছনে। প্রচারণার এই ধারা দেখে মানুষ যেন বুঝেই গিয়েছিল কি হতে যাচ্ছে ফলাফল। সাখাওয়াত যে নির্বাচনে হেরেই যাবেন, সেটা নিয়ে খুব বেশি মানুষের সন্দেহ ছিল না। তবে ব্যবধান যে এত বেশি হবে, সেটা হয়ত ভাবেননি অনেকেই।

বলা হচ্ছিল সাখাওয়াতের অনভিজ্ঞতার কথাও। আইভী এর আগে মেয়র ছিলেন। তারও আগে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। টানা তের বছর ধরে এলাকায় কাজ করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তেমন কিছু নেই। সে হিসেবে অনেকটা ক্লিন ইমেজের প্রার্থী তিনি। বিপরীত দিকে, সাখাওয়াতের পক্ষে বলার মতো তেমন কিছুই নেই। বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী হওয়ার আগে তাকে খুব কম মানুষই চিনত। রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক কোনোই অভিজ্ঞতা তার নেই। হঠাৎ করেই বিএনপি তাকে এই নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়াটাই যেন ছিল একটা চমক।

কিছু কিছু মানুষ এই চমককে হয়ত তুলনা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের চমকের সঙ্গে। রাজনীতির বাইরের একজন লোক কিভাবে হিলারির মতো বাঘা এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিককে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেল! কিন্তু সাখাওয়াত যে ট্রাম্প নয়, সেটা উপলব্ধি করতে মোটেই সময় লাগল না। প্রচারণার দু-একদিন যেতেই মানুষ বুঝতে শুরু করল, সাখাওয়াত যেমন ট্রাম্প নন আইভীও তেমনি হিলারি নন।

সাখাওয়াত ধানের শীষ পেয়েছিলেন, কিন্তু বিএনপিকে কতটুকু পেয়েছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে। বন্দর বা সিদ্ধিরগঞ্জে বিএনপির অনেক বাঘা বাঘা নেতা রয়েছেন। তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকও আছে। এই নেতাদের কিন্তু প্রচারণার সময় সাখাওয়াতের পাশে তেমন একটা দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় নেতারা অবশ্য গেছেন ঢাকা থেকে। কিন্তু ভোটের বাজারে তাদের চেয়ে ওই স্থানীয় নেতাদের দর যে অনেক বেশি, সেটা সবাই জানেন।

উন্নয়ন এবং সন্ত্রাস এই দুটি শব্দ নারায়ণগঞ্জে যেকোনো নির্বাচনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। প্রার্থীদের কাছে ভোটারদের এই দুটি প্রশ্নই থাকে উন্নয়ন কতটুকু করবেন, সন্ত্রাস কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন? উন্নয়ন করতে হলে সরকারের কাছ থেকে অর্থ বরাদ্দ আনতে হবে, সেগুলোকে দুর্নীতির বাইরে থেকে কাজে লাগাতে হবে। আর সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে স্থানীয় গডফাদারদের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে হবে। এই দুটির কোনোটিই যে সাখাওয়াতের নেই, সেটা বুঝতে কষ্ট হয়নি নারায়ণগঞ্জের ভোটারদের। বিশেষ করে সন্ত্রাসের কথা যদি ধরা হয়, নারায়ণগঞ্জের মানুষ জানে, গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই জানে, একমাত্র আইভীই হচ্ছেন সেই মানুষ যিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অকুতোভয় এক চরিত্র। ভোটারদের এই বিবেচনাতেও একেবারেই পিছিয়ে গেছেন সাখাওয়াত।

অপরিহার্য আইভী

আইভী জিতবেন এই নির্বাচনে, সেটা যেন অনেকটা অবধারিতই ছিল। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই তার প্রচারণা ছিল সংযত। ছিল না কোন পেশিশক্তির মহড়া, দেখা যায়নি কোনো দম্ভ। আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দিয়েছে, নৌকা প্রতীকও পেয়েছেন তিনি, কিন্তু সরকারি দলের যে দাপট সাধরণত দেখা যায় প্রার্থীদের ব্যবহার করতে, তা এখানে দেখা যায়নি। সরকারি দলের প্রার্থী হয়েও আইভী প্রশাসনকে ব্যবহার করেছেন, এমন অভিযোগও কেউ করেননি। আইভী যেন সেই আগের ১৩ বছরের অতি চেনা আইভীই থেকে গেছেন। তার এই পরিমিতিবোধই তাকে আরো কাছে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের।

শুরুতে আইভীকে প্রার্থী করতে চায়নি ‘নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ।’ চায়নি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা শামীম ওসমান। তাই তৃণমূল আওয়ামী লীগের নামে যখন কেন্দ্রের কাছে সম্ভাব্য তিনজন প্রার্থীর নাম পাঠানোর প্রশ্ন উঠল, তারা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নামটি বিবেচনাতেই নিলো না। তালিকার তিন সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে নিজের নাম না থাকলেও আইভী কিন্তু মুহূর্তের জন্যও বিভ্রান্ত হননি। তিনি আস্থা রেখেছেন দলের শীর্ষনেত্রী শেখ হাসিনার ওপরে। বলেছেন, আমি দুইশ পার্সেন্ট নিশ্চিত যে, দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। শেষ পর্যন্ত তার সেই আত্মবিশ্বাসই বিজয়ী হয়েছে। সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। দলনেত্রীর এই সিদ্ধান্তের পিছনে ব্যক্তি আইভীর প্রতি অনুরাগ-বিরাগের চেয়েও বেশি কাজ করেছে সাফল্যের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ। যাকে প্রার্থী করলে সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে, মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে, তাকেই প্রার্থী করেছেন তিনি। মাঠের অবস্থা জানার জন্য তিনি ‘নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ’ বা তার তৃণমূল নেতৃত্বের উপর নির্ভর করেননি, নিজের বিবেচনাশক্তি প্রয়োগ করেছেন। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে থাকলে, নানা পদ্ধতিতে নির্বাচনে জয়ী যে হওয়া যায়, তার উদাহরণ এই দেশে একেবারে কম নেই। কিন্তু সে পথে যেতে চাননি আওয়ামী লীগ নেত্রী। বরং তিনি কেবল মেয়র পদেই জয় পেতে চাননি, সেই সঙ্গে জয় করতে চেয়েছেন সাধারণ মানুষের মন ও আস্থাও।

নির্বাচন কমিশন কি জিতল?

একটা কথা কিছুদিন আগে থেকেই বলা হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল- নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন হবে বর্তমান বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনের শেষ পরীক্ষা। এই কথাটি নিজেদের মতো করে বিএনপিও বলেছে। একবার-দু’বার নয়, বেশ কয়েকবার বলেছে। তাদের বলার ভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে, এই পরীক্ষায় পাস করলে বুঝি নির্বাচন কমিশনের আগের সব ফেলগুলো আর বিবেচনায় নেওয়া হবে না। এখন এই নির্বাচনে কমিশন তো পাস করেছে, কেবল যেনতেন পাস নয় একেবারে পূর্ণ নাম্বার পেয়ে পাস। এত ভালো নির্বাচন শেষ কয়েক বছরে আর কবে হয়েছে আমি মনে করতে পারছি না। আমরা ধারণা, বিএনপি নিজেও পারবে না। ২২ ডিসেম্বর নির্বাচন হলো, সেদিন বিকাল চারটা পর্যন্ত ভোট ছিল। ঘন্টায় ঘন্টায় প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বিএনপি নেতৃবৃন্দ। এর মধ্যে কিন্তু একবারও বলেননি কোনো অনিয়মের কথা। কেন্দ্রীয় নেতারা অভিযোগ করেননি, আঞ্চলিক নেতারা করেননি, এমনকি খোদ প্রার্থীও করেননি। এত বড় সার্টিফিকেট এই নির্বাচন কমিশন আগে কখনো পেয়েছে বলেও মনে পড়ছে না।

রাতে অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন। সেখানে হাসি হাসি মুখে বললেন অনেক কথা। তার উচ্চারিত কিছু কথাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তিনি ব্যাখ্যা করলেন সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার মূল মন্ত্রগুলো। বললেন, এবার যেভাবে করেছেন, প্রতিবার নাকি ঠিক একইভাবে তারা নির্বাচন পরিচালনা করেন। পার্থক্যটা হচ্ছেÑ এবার ভোটার, এলাকাবাসী, রাজনৈতিক দলগুলো, সর্বোপরি সরকার তাকে সহযোগিতা করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্য কিন্তু খুবই প্রণিধানযোগ্য। উনি কিন্তু বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবে নিজের ব্যর্থতা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন। সরকারের ভূমিকাকেও স্পষ্ট করে দিলেন।

আমি নিজে কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যের একটা অংশের তেমন বেশি বিরোধিতা করতে চাই না। আসলেই তো, নারায়ণগঞ্জে এবার রাজনৈতিক পা-াদের একেবারে দেখাই যায়নি। প্রশাসনও নেতিবাচক কোনো ভূমিকা রাখেনি। সর্বোপরি সরকার ছিল লক্ষ্যণীয় রকম নিরপেক্ষ। তাহলে এর আগে কিংবা পরে যত নির্বাচন হবে, লক্ষ্য রাখতে হবে সরকার, প্রশাসন কিংবা রাজনৈতিক পা-াদের ওপর? সিইসি তো বলেই দিয়েছেন, নির্বাচনের ভালোমন্দ নির্ভর করে এই উপাদানগুলোর উপরই।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি: কে জিতল

সরকারের সামনে এখন দুটি বড় বিষয়। অনতিবিলম্বে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা। আর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি আসবে কি আসবে না, সেটা নির্ভর করবে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে, তার উপর। সে বিচারে নারায়ণগঞ্জে এবার সেটা সম্ভব হয়েছে। সরকার প্রমাণ করতে পেরেছে, তারা চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে।

সন্দেহ নেই, আগামী নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে, সেটা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। আর সেই বিতর্কের প্রতিটি স্তরেই আওয়ামী লীগ সরকার উদাহরণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনকে উপস্থাপন করবে। এদিক দিয়ে বলাই যায় যে, এই নির্বাচনে অনেকটাই এগিয়ে গেছে আওয়ামী লীগ।

বিএনপির হাতেও কিন্তু জেতার মতো একটা কার্ড ছিল। সেটা হলো বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার মানসিকতাজাত কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন না করা। ২২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার পুরো দিন তারা সেই কার্ডটি ব্যবহার করেনি। একাধিক ব্রিফিং করেছেন, কিন্তু সরকার বা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কোনোই অভিযোগ করেননি। উল্টো বলেছেন, ‘দৃশ্যত’ নির্বাচন ভালোই হচ্ছে। পর্যবেক্ষক হিসেবে যে সব সংগঠন নারায়ণগঞ্জে ছিলেন, তাদের বক্তব্যের সঙ্গে বিএনপির প্রতিক্রিয়া মিলে যাওয়ার এমন ঘটনাও আগে কখনো দেখা যায়নি। এসব দেখে সাধারণ মানুষ কিছুটা আশ্বস্তই হয়েছে। ভেবেছে, তাহলে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসছে? রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে?

জনগণের এই প্রত্যাশা অবশ্য পরদিন সকালেই মৃদু একটা হোঁচট খেলো। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব সংবাদ সম্মেলন করে বললেন, নারায়ণগঞ্জে সুষ্ঠু নির্বাচনের বাতাবরণ সৃষ্টি করে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে । এটা কি হলো? ওনার গত ২৪ ঘন্টার ধারাবাহিক বক্তব্যের সঙ্গে যে এই অভিযোগ মোটেই সামঞ্জস্য নয়, সেটা সম্ভবত তিনি নিজেও কিছুটা উপলব্ধি করে থাকবেন। হয়ত সে কারণেই তিনি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের একটি অভিযোগকে হাজির করলেন ‘প্রমাণ’ হিসেবে।

আমরা আশা করব, এই অভিযোগগুলো নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করা হবে না। বরং নারায়ণগঞ্জে যেমন আইভী পরদিন সকালেই মিষ্টি নিয়ে সাখাওয়াতের বাসায় গিয়েছিলেন, সেই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশই অব্যাহত থাকবে। আর সেটা তৈরিতে অন্যতম বৃহত্তম দল বিএনপি রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মানুষ আর জেদাজেদির রাজনীতি দেখতে চায় না। রাজনীতিতে বিরোধ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে, তবে এসবেরই নিরসন হবে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে।

রাজনৈতিক সমীকরণ, সমীকরণের রাজনীতি

`পলিটিক্স ইজ এ ম্যাথমেটিক্স’এই বাণীটি দিয়েছেন শামীম ওসমান। এমন বাণী এর আগে দুনিয়ার আর কোনো রাজনীতিবিদ দিয়েছেন কি? সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে যে গুগল, সেখানেও ঢু মেরে দেখলাম, কোনো লাভ হলো না। অথচ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন এ বাক্যটিই উচ্চারিত হয়েছে তার মুখে। আপাতদৃষ্টিতে এই মহান বাণী হয়ত কোনো গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু যারা নারায়ণগঞ্জের মাটি ও রাজনীতিতে শামীম-আইভীর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বমূলক বাস্তবতা সম্পর্কে কিছুমাত্র জানেন, তাদের কাছে নিঃসন্দেহে তার এই উক্তি অনেক অর্থ বহন করবে।

এ কথা সত্য, শামীম ওসমান চাননি যে নির্বাচনটা এভাবে হোক। আবার মেয়র দূরে থাক, আইভী আবার নির্বাচন করুক এবং আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দিক এটাও তিনি চাননি। মেয়র নির্বাচনে আইভীই সবচেয়ে উত্তম প্রার্থী এটা গণভবনে বসে শেখ হাসিনা বুঝতে পারেন আর নারায়ণগঞ্জে বসে শামীম ওসমান বোঝেন না তা কি করে হয়। তিনি সব বোঝেন, কিন্তু তারপরও ব্যক্তিগত বিরাগ-বিরোধ তাকে এতটাই কব্জা করতে পারে যে, ঈর্ষা বা ক্রোধ চরিতার্থ করতে তিনি অবলীলায় দলের স্বার্থকেও জলাঞ্জলি দিতে পারেন।

কিন্তু তাকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিলেন স্বয়ং শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, আইভীকে পাস করানোর দায়িত্ব শামীম ওসমানের। দলনেত্রীর এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ আর কেউ বুঝুক না বুঝুক, শামীম ওসমান ঠিকই বুঝেছেন। তিনি আসলে আইভীকে জেতানোর দায়িত্ব দেননি, বরং বলেছেনÑ আইভী যদি হেরে যায় তার দায়িত্ব শামীম ওসমানকেই নিতে হবে। আসলে এই জায়গাটিতেই ধরা খেয়ে গেছেন শামীম ওসমান। ধরা যে খেয়েছেন সেটা দলের নেতা-কর্মীরা তো বটেই নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বুঝেছেন। বলা বাহুল্য, সাধারণ মানুষের এই উপলব্ধি শামীম ওসমানের জন্য স্বস্তিকর নয়। সেই অস্বস্তি এড়াতেই কি তিনি বললেন ‘ম্যাথমেটিক্স’ এর কথা?

কিন্তু এখানে গণিতটা কোথায়? কিভাবেই বা এটি গণিতের সঙ্গে তুলনীয়? নাকি তিনি কথাটি একেবারে এমনি এমনি বলেছেন? এই ভদ্রলোককে যতটুকু বুঝি, এমনি এমনি কথা বলার লোক তিনি নন। কেবল বাগাড়ম্বর করে রাজনীতিতে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এত প্রভাব-প্রতিপত্তি করা যায় না। তাহলে ওনার গাণিতিক সমীকরণটি কি? তাহলে কি উনি কোনো হুমকি দিচ্ছেন? আগামী দিনগুলো কি তাহলে আইভীর জন্য আরও কঠিন করে দেওয়ার মতলব আঁটছেন? নাকি দলনেত্রীর ধমকে কাবু হয়ে মসৃণ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে চাইবেন? হয়ত সময়ই একমাত্র দিতে পারবে এসব প্রশ্নের উত্তর।

বিজয়ী হয়েছে নারায়ণগঞ্জের মানুষ

আসলেই, এই নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের মানুষ। তারা বুঝতে দেননি, কি হতে যাচ্ছে। বিএনপির ভোটার, প্রার্থী এমনকি নয়াপল্টনে বসে থাকা নেতারা পর্যন্ত বুঝতে পারেননি। অনেকে ভেবেছিলেন ট্রাম্পের মতো বুঝি এখানেও অভাবিত কিছু হয়ে যাবে। আমার যেসব সহকর্মী নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে নারায়ণগঞ্জে বৃহস্পতিবার পুরো দিন ছিলেন, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেও কোনো পরিষ্কার জবাব পাইনি। দুপুরের দিকে জানতে চেয়েছি, বিকালে শেষ বেলায় জানতে চেয়েছি, এমনকি ভোট শেষ হওয়ার পরও জিজ্ঞাসা করেছি। তারা কেউই বলতে পারেননি, কি হতে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ নীরবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে।

সাধারণত এমন হয় না। সরকারি দলের প্রার্থীকে যারা ভোট দেয়, তারা এতটা নীরবে থাকে না। তাহলে এখানে কেন এমন হলো? কারণ হয়ত আইভী প্রতীক হিসেবে নৌকা পেলেও তাকে সরকারি দলের প্রার্থী মনে করে না নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা। এই বন্দর নগরীতে সরকারি দল মানেই শামীম ওসমান। গত বারের মেয়র নির্বাচনে শামীম ওসমান মেয়র হতে চেয়েছিলেন। পথে বেপথে নানাভাবে চেষ্টা করেছেন আইভীকে পরাজিত করতে। সরকারের সমর্থন নিয়েও শেষ অবধি পারেননি। নতুন সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এরপর মেয়র হিসেবে পুরো মেয়াদ তাকে যে সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে তার শীর্ষে ছিল শামীম ওসমান। এমনকি এবার যখন মেয়র হিসেবে দলীয় মনোনয়নের প্রশ্ন উঠল, তখনও শামীম ওসমানের প্রভাবে তৃণমূল থেকে আইভীর নামই দেওয়া হয়নি। তারপরও দলীয় সভানেত্রীর বিশেষ বিবেচনায় আইভী মনোনয়ন পেলেও নারায়ণগঞ্জের মানুষ কিন্তু সারাক্ষণই শামীম ওসমানের ভূমিকা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কোন দিকে যান, কতটুকু সহযোগিতা বা বিরোধিতা করেন, গাছের উপরে পানি দিয়ে গোড়া কেটে দেন কি না, সেসব নিয়েও দ্বন্দ্বে ছিলেন। হয়ত সে কারণেই তারা আইভীকে দলে দলে ভোট দিয়ে এসেও মুখে কিছু প্রকাশ করেনি। রেজাল্ট না হওয়া পর্যন্ত চুপচাপ থেকেছে।

যতদূর বুঝেছি, নারায়ণগঞ্জের মানুষের চাহিদা ছিল দুটি। বাংলাদেশের গতানুগতিক রাজনীতির মতো এখানেও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির কিছু রিজার্ভ ভোট আছে। কিন্তু এর বাইরে সাধারণ যে ভোটার, যারা সরাসরি কোনো রাজনীতি করেন না, তারা ভোট দিয়ে থাকেন প্রার্থীর যোগ্যতা বিচারের মাধ্যমে। এই বিপুল সংখ্যক ভোটার চেয়েছেন এমন একজন মেয়র, যিনি এলাকার উন্নয়ন কর্মকা-ে সৎ ও আন্তরিক থাকবেন। আর সেই সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সামনে সাহস নিয়ে দাঁড়াতে পারবেন। এই দুই বিবেচনাতেই অবধারিতভাবে এসে গেছে সেলিনা হায়াৎ আইভীর নাম। অরাজনৈতিক এই ভোটারের সংখ্যা বেশি হলেও এরা হইচই পছন্দ করে না, মারামারি করতে চায় না। তাই ভোট দিয়েও তারা চুপচাপ থেকেছে, কাউকে বুঝতে দেয়নি, উল্লাস করেনি, কিন্তু নিজের মতটা প্রকাশ করেছে দৃঢ়ভাবে। আদায় করেছে নিজেদের বিজয়।

 

মাসুদ কামাল

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক