কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যা ও নির্যাতনের নির্মম ইতিহাস

0

১৯২৫ সালে হরি সিং নামক এক হিন্দু কাশ্মিরের সিংহাসনে বসে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের সময়েও মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মির সেই হিন্দু রাজার শাসনে ছিলো। সে সময় কাশ্মিরের প্রায় ৮০% মানুষ ছিল মুসলমান। দেশ বিভাগের সময় সেও কাশ্মিরের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। তা হতেও পারতো। কিন্তু হঠাৎই ১৯৪৭ সালের ২০ অক্টোবর কিছু পার্বত্য দস্যুদের আক্রমণের শিকার হয় দুর্ভাগা কাশ্মিরের অধিবাসীরা। সে সময় দস্যুদেরর হাত থেকে বাঁচতে ও ভারতীয় সেনাদের সাহায্য লাভের আশায় ভারতের সঙ্গে যোগ দেয় হরি সিং, অথচ কাশ্মিরের প্রায় ৮০% মুসলমান পাকিস্তানের সাথেই যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিল। হরি সিং এর সেই ভারতের সাথে হাত মিলানোর অঘটন আজো কাশ্মিরিদের গলার কাঁটা হয়ে আছে। যে কাঁটা দূর করতে ব্যর্থ ভারতের মতো বিশ্বের বৃহৎ ও উদার (!)গণতন্ত্র। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং ‘ Instrument of Accession’ এ স্বাক্ষর করে যা পরের দিন ভারতের সাধারণ রাজ্যপ্রশাসক কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল। এই স্বাক্ষরের পরই হামলাকারীদের উচ্ছেদ করার জন্য ভারতীয় সৈন্যরা কাশ্মীরে প্রবেশ করে। কিন্তু তীব্র শীত থাকায় তারা সবাইকে বিতাড়িত করতে পারে নি। এমতাবস্থায়, ভারত বিষয়টিকে জাতিসংঘের নিকট উপস্থাপন করে। জাতিসংঘ তখন পাকিস্তান ও ভারত উভয়কেই তাদের দখলকৃত ভূমি খালি করে দিয়ে গণভোটের আয়োজন করতে বলে। কিন্তু ১৯৫২ সালে ভারত এ গণভোটকে নাকচ করে দেয়, কারণ তারা জানত যে গণভোটে জনগণের রায় ভারতের বিপক্ষেই যেত।ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন শুরু থেকেই ছিল। সেই দ্বন্দ্ব ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধে রূপ নেয়। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে। ১৯৬২ সালে ইন্ডিয়ার অধীনে জাম্মু ও কাশ্মিরের ৬০% অঞ্চল (জাম্মু, কাশ্মির ভ্যালি ও লাদাখ) ছিল, পাকিস্তানের অধীনে ৩০% (গিলগিত-বালতিস্তান ও আজাদ কাশ্মির) এবং চীনের অধীনে ১০% অঞ্চল (আকসাই চিন) ছিল।

জাম্মু ও কাশ্মীর পরিচিতিঃজম্মু ও কাশ্মিরকে জালিম রাষ্ট্র ভারত এখনও তার সর্ব উত্তরের প্রদেশ হিসেবে বলবৎ রেখেছে। এর অধিকাংশই হিমালয় পাহাড়ে অবস্থিত। এ প্রদেশের তিনটি অঞ্চল রয়েছে- জাম্মু, কাশ্মির ভ্যালি ও লাদাখ (ছোট তিব্বত)। কাশ্মিরের কিছু অংশ ভারত নিয়ন্ত্রিত ও কিছু অংশ পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত ছিল।

কাশ্মীরের দুর্ভাগ্যের কারণ ও ইতিহাসঃতবে কাশ্মিরীদের বর্তমান গোলামী দশার জন্য শুধু ভারতই দায়ী নয়, আরও কিছু লোক দায়ী। তারা কারা? তারা হল কাশ্মীরের কিছু নেতাবৃন্দ। স্বাধীনতা খয়রাতের মাল নয়, এটি অতি কষ্টে অর্জনের বিষয়। এজন্য অপরিহার্য হল, যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব এবং জনগণের কোরবানি। মুসলমানদের অপূরণীয় ক্ষতি শুধু অমুসলিম শত্রুরাই করেনি। বড় বড় ক্ষতি করেছে মুসলমান নামধারি সেকুলার ও ইসলামের প্রতি প্রচন্ড বিদ্বেষী জাতীয়তাবাদী মুনাফিক নেতারা। আজ মুসলিম বিশ্ব যেরূপ বিভক্ত, শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন তার কারণ তো তারাই। বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের মুসলমানদের ন্যায় কাশ্মিরীদেরও স্বাধীন হওয়ার মোক্ষম সুযোগ এসেছিল। ভারতবর্ষের বুকে মুসলমানদের জন্য স্বাধীন দেশ রূপে যারা পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখতেন তারা কাশ্মির নিয়ে যতটা ভাবতেন কাশ্মিরীদের নিজেদের নেতারাও ততটা ভাবেনি। ক্যাম্ব্রিজের ছাত্র চৌধুরি রহমত আলী তার আবিস্কৃত পাকিস্তান শব্দটির ‘ক’ অক্ষরটি নিয়েছিলেন কাশ্মিরের প্রথম অক্ষর থেকে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার একমাত্র যে ট্রেনটি নতুন স্বপ্নের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে সেটি ধরতে তারা দারুন ভাবে ব্যর্থ হয়। এর জন্য দায়ী তাদের ইসলামের প্রতি বিদ্বেষী সেকুলার নেতারা। এ নেতাদেরই একজন হলেন শেখ আব্দুল্লাহ। কাশ্মিরের অমুসলিম ডোগরা রাজার বিরুদ্ধে তুমুল গণ আন্দোলনের সূত্রাপাত হয় ১৯৩১ সালে এবং সেটি জম্মুতে রাজার সৈন্যদের দ্বারা পবিত্র কুরআনের অবমাননা হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তখন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল মুসলিম কনফারেন্স এবং তার নেতা ছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ। তিনি ছিলেন চিন্তা-চেতনায় সেকুলার এবং ইসলামে অঙ্গিকার শুন্য। পাকিস্তানের স্বপ্ন তার ভাল লাগেনি। অথচ পাকিস্তান গড়ার কাজ চলছিল তার ঘরের পাশে। তার ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব ছিল কংগ্রেস নেতা জওহার লাল নেহেরুর সাথে। নেহেরুও ন্যায় তিনিও মুসলিম লীগের দ্বি-জাতি তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। বিশ্বাসী ছিলেন ভারতীয় এক জাতি তত্ত্বে।ফলে মুসলিম লীগের সাথে সম্পর্ক না গড়ে তিনি সম্পর্ক গড়েন কংগ্রেসের সাথে। তার কাছে যেটি অধিক গুরুত্ব পায় সেটি কাশ্মিরের মুসলমানদের ঐক্য নয়, বরং সেটি কাশ্মিরের হিন্দু পন্ডিতদের সাথে একাত্ব হওয়া। ফলে দুই টুকরায় বিভক্ত হয় কাশ্মিরী মুসলমানেরা। ১৯৩৯ সালের ১১শে জুনে শেখ আব্দুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্সের নাম পাল্টিয়ে রাখেন ন্যাশনাল কনফারেন্স। এভাবে একতার গুরুত্ব যে সময়টিতে সর্বাধিক ছিল তখন অনৈক্যই তীব্রতর হয়। মুসলিম কনফারেন্স দ্বিখন্ডিত হয়ে যায়। ন্যাশনাল কনফারেন্সের বিপরীতে মুসলিম কনফারেন্সের নেতৃত্ব দেন চৌধুরি গোলাম আব্বাস এবং মির ওয়াইজ ইউসুফ শাহ। মুসলিম কনফারেন্স পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পক্ষে জোর দাবী জানায়।

1959581_545033122283725_549634689_n১৯৪৭ সালে হিন্দু রাজা হরি শিংয়ের সাথে শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মির ভূক্তির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। মুসলিম স্বার্থের সাথে এরূপ বিশ্বাসঘাতকতার বিণিময়ে শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী হন। এবং কারারুদ্ধ করা হয় পাকিস্তানপন্থি নেতা চৌধুরি গোলাম আব্বাসকে। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক নিছক বিশ্বাসঘাতকই, তাদের গুরুত্ব বেশীকাল টিকে থাকে না। এমনকি যাদের কাছে নিজেদের বিক্রি করে তাদের কাছেও না। নেহেরুও সাথে শেখ আব্দুল্লাহর সম্পর্কে ফাটল ধরতে থাকে। ১৯৫৩ সালে তার মনে কাশ্মিরকে স্বাধীন দেশ রূপে দেখার স্বপ্ন জাগে। কিন্তু কুমিরের পেটে একবার ঢুকলে কি সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা যায়? ভারত সরকার তাকে এ স্বপ্ন দেখার শাস্তি স্বরূপ ১৯৫৩ সালের ৯ই আগষ্ট কারারুদ্ধ করে। শেখ আব্দুল্লাহ যখন জেলে তখন ভারতের শাসনতন্ত্রে কাশ্মিরের যে আলাদা মর্যাদা ছিল সেটিও বিনষ্ট করা হয়। পাকিস্তান তখনও জাতিসংঘে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে মাঝে মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনার সূত্রপাত করতো। ১৯৬৭ সালে শুরু হয় গোপন স্বাধীনতা সংগ্রাম। নেতৃত্ব দিচিছল আল ফাতাহ নামে একটি সংগঠন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের বছরে ভারত সরকার এ গোপন আন্দোলনকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ তখন ভারতের পালে প্রচন্ড বাতাস। পকিস্তানকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার সুযোগ ভারত তখন খুব ভাল ভাবেই কাজে লাগায়। আর তার কিছুটা ইফেক্ট কাশ্মীরেও পড়ে। অবশেষে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধি সরকার শেখ আব্দুল্লাহর সাথে চুক্তি করে। এবং আবার তাকে কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী করে। শেখ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর একই চেতনার অনুসারি পুত্র ডাঃ ফারুক আব্দুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী হন। তবে এখন এ পরিবারটি রাজনীতির মৃত ঘোড়া।

রক্তাক্ত কাশ্মীর ও দখলদার ইন্ডিয়াঃভারতের অহংকার, এ বিশ্বে তারাই সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু একথা বলে না, তারাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণবাদী ও দখলদার দেশ। তার নমুনা কাশ্মির। দুনিয়ার আর কোথাও মাথাপিছু হারে এত অধিক সংখ্যক দখলদার সৈন্য নেই যা রয়েছে কাশ্মিরে। ইরাকের জনসংখ্যা ২ কোটি ৭৫ লাখ (জুলাই, ২০০৭য়ের একটি হিসাব মোতাবেক) এবং আয়তন ১৬৯,২৩৫ বর্গমাইল। ইরাকে দখলদার মার্কিন ও তার মিত্রবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। আফগানিস্তানের জনসংখ্যা তিন কোটি বিশ লাখ (জুলাই, ২০০৭য়ের হিসাব মোতাবেক) এবং আয়তন ২৫১, ৮৮৯ বর্গমাইল। এবং সেখানে দখলদার ন্যাটো বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা এক লাখের মত (২০০৭ এর একটি হিসাব অনুযায়ী এবং এটা আরও বেশি হওয়ার কথা!)। কাশ্মিরের জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি এবং আয়তন ৮৫, ৮৬৬ বর্গমাইল। অধিকৃত সে কাশ্মিরে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর সেনা সংখ্যা ৫ লাখ। অর্থাৎ প্রতি একলাখ মানুষের জন্য ইরাকে যেখানে ৫৪৫ জন এবং আফগানিস্তানে যেখানে ৩১২ জন দখলদার সেনা, কাশ্মিরে সে সংখ্যা হল ৫ হাজার!!! হিসাবে দাঁড়ায়, গড়ে প্রতি ১০০০ কাশ্মিরীর জন্য রয়েছে ২০জন ভারতীয় সৈন্য। প্রতিটি কাশ্মিরী পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি গড়ে ৫ জন ধরা হয় তবে অর্থ দাঁড়ায়, যে গ্রামে ২০০ ঘর মানুষের বাস সেখানে অবস্থান নিয়েছে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তানে সর্বমোট সৈন্য সংখ্যা হল ৬ লাখ ১৯ হাজার।তাহলে বুঝুন শুধু কাশ্মীরেই যদি ৫ লক্ষ সৈন্য থাকে তাহলে কি পরিমান সৈন্য ভারত সেখানে মোতায়েন করেছে!

1972514_545033645617006_310486548_nকাশ্মিরে ভারতীয় বাহিনীর বিশাল অবস্থান আজ থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই। তবে সে সংখ্যা ব্যাপক ভাবে বেড়েছে ১৯৮৯ সালে। কারণ তখন থেকেই কাশ্মিরে ভারতপন্থি শেখ আব্দুল্লাহ পরিবারের প্রভাব ব্যাপক ভাবে লোপ পায় এবং তীব্রতর হয় স্বাধীনতার দাবী। সে দাবী এখন প্রতিদিন তীব্রতর হচেছ এবং সে সাথে দিন দিন বাড়ছে সৈন্য সংখ্যা। সম্ভবতঃ সেদিন বেশী দূরে নয় যখন এ সৈন্য সংখ্যা ১০ লাখে গিয়ে পৌঁছবে। অথচ ভারত বিশ্বজুড়ে বলে বেড়ায়, ভারত উদারপন্থী, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক দেশ ব্লা ব্লা ব্লা!! গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিগণ তো সে দেশের নাগরিকত্ব স্বেচ্ছায় বরণ করে নিবে, আইন মেনে চলবে।কিন্তু তাদের মাথার উপর এত সৈন্য কেন? কোন গণতান্ত্রিক দেশে এর নজির আছে কি? সমগ্র ভারত শাসনেও এতজন ইংরেজ সৈন্য ছিল না যা এখন ভারতীয় সৈন্যের লেবাসে রয়েছে কাশ্মীরে। এটিই কি গণতন্ত্রের নমুনা? ভারত একথাও বলে বেড়ায়, কাশ্মিরী জনগণ ভারতের সাথে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছে এবং তারা ভারতীয় নাগরিক রূপেই থাকতে চায়।

1506031_545034102283627_1449733010_n

কাশ্মীরবাসীরা কি আদৌ ইন্ডিয়ার সাথে থাকতে চায়ঃ?

1010671_545035875616783_1806556845_nজাতিসংঘ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন করে ভারতই প্রমাণ করুক কাশ্মিরীরা কোন দিকে যোগ দিতে চায়, ভারতে না পাকিস্তানে। ভারত বলে, সেখানে বহু নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু কথা হল, সে নির্বাচনগুলো হয়েছে কে মন্ত্রী বা এমপি হবে সে প্রশ্নে। কাশ্মির কোন দিকে যোগ দিবে সে মৌলিক বিষয়ে নয়। এমন নির্বাচন তো ব্রিটিশের উপনিবেশিক শাসনামলে ভারতেও হয়েছে। তাদের রচিত সংবিধানই বলে এই ভোট জনগণের অধিকার। গণতন্ত্র নিয়ে বড়াই করলেও ভারত সে অধিকার কাশ্মিরীদের দিতে রাজী নয়। জেলখানায় বসে বার বার ভোট দিলেই কি গণতন্ত্রচর্চা হয়? কাশ্মিরীদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ নয় যে ভোটে কে মন্ত্রী হবে বা এমপি হবে। তাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ হল তারা কোন দেশের সাথে থাকবে। ভারতের সাথে থাকতে কোনভাবেই রাজি নয়। আর সেটি নির্ধারিত হলেই পরের প্রশ্নটি আসে সে দেশে কারা মন্ত্রী বা এমপি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ভারত তাদেরকে সে অধিকার দিতে রাজী নয়। কাশ্মির আজ অশান্ত এবং দেশটিতে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে অবিরাম রক্ত ঝরছে মূলত এ ন্যয্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই। ভারতের এ গণতন্ত্রকে তার আর গণতন্ত্র বলতেও রাজী নয়। তাদের কাছে এটি ডিমোক্রাসী নয়, বরং ডিমোনক্রেজী। ইংরাজি শব্দ ডিমোনের অর্থ ভূত, আর ক্রেজ হলো খ্যাপামী। কোটি কোটি দেব-দেবতার ও ভূত-পেতের দেশে এখন কাশ্মির প্রসঙ্গে ভূতুড়ে খ্যাপামীই চেপেছে। এমন খ্যাপামীর কারণে অসম্ভব হয়ে পড়েছে গণতন্ত্র-সম্মত সমাধানের। এবং গুরুত্ব হারিয়েছে শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলন। কাশ্মিরীদের স্বাধীনতা আন্দোলন কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছে সেটা বুঝানোর জন্য প্রখ্যাত ভারতীয় সাহিত্যিক অরুণদ্ধুতি রায় লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ানে কয়েক বছর আগে যে নিবদ্ধ লিখেছেন সেটি তথ্যবহুল।তিনি লিখেছেন, গত ১৫ই আগষ্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। সেদিন শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থল লালা চক দখলে নিয়েছিল বিশাল জনসমুদ্র। তারা আওয়াজ তুলছিল ‘জিয়ে জিয়ে পাকিস্তান’। অর্থাৎ পাকিস্তান জিন্দাবাদ। স্লোগান তুলছিল, ‘হাম কিয়া চাহতে হেঁ?’ (আমরা কি চাই?)জনতার মুখে জবাব ছিল ‘আযাদী’ (স্বাধীনতা)।জ্বিজ্ঞাসার সুরে স্লোগান উঠছিল, ‘‘আযাদী কা মতলিব কিয়া (অর্থঃ স্বাধীনতার লক্ষ্য কি?) জনতা সমস্বরে জবার দিচ্ছিল- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আওয়াজ উঠছিল, পাকিস্তান ছে রিশতা কিয়া? (অর্থঃ পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি?) জনতা জবাব দিচ্ছিল, ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’। তারা বলেছে, ‘‘এ্যায় জাবেরো, এ্যায় জালেমো! কাশ্মির হামারা ছোড় দো’’ অর্থঃ ‘‘হে অত্যাচারি, হে জালেম! আমাদের কাশ্মির ছেড়ে দাও।’’ অরুন্ধতি রায় আরো লিখেছেন, তারা আরো বলেছে, ‘‘নাঙ্গাভূখা হিন্দুস্তান, জানছে পেয়ারা পাকিস্তান।’’১৫ই আগষ্টে সবুজ পতাকা ছেয়ে ফেলেছিল শ্রীনগর শহর। অথচ ভারতের স্বাধীনতার এ দিনটিতে ভারতের পতাকা শোভা পাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। ঐ দিনকে ‘গোলামীর দিন’ রূপে ধ্বণিত করছিল। জনতার ঢল নেমেছিল শুধু শ্রীনগরে নয়, শহরতলীর গ্রামগুলোতেও।

দেখুনঃ http://www.theguardian.com/world/2008/aug/22/kashmir.india

বাস, টেম্পো, ট্রাক, মটর সাইকেল ও রিকশায় চেপে মানুষের ঢল নেমেছিল শ্রীনগরের রাজ পথে। ভারতপন্থি দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিপলস’ ডিমোক্রাটিক পার্টির নেতাদের দিল্লিস্থ টিভি স্টুডিওতে দেখা গেলেও তাদের কারো সাহস ছিল না শ্রীনগরের রাজপথে নামার। undefinedমনে হচ্ছিল, জনগণ যেন নতুন ভাবে নিজেদের আবিস্কার করেছে। লোপ পেয়েছে ভয়, জেগে উঠেছে তাদের প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস। অরুন্ধতি রায়ের কথায় মনে হয়, ফিলিস্তিনীদের ইন্তেফাদা (গণঅভ্যূর্ত্থাণ) যেন নেমে এসেছে শ্রীনগরের অলি-গলিতে। ফিলিস্তিনী শিশু ও যুবকেরা যেমন নির্ভয়ে পাথর ছুড়ে ইসরাইলী আর্মির টহলদার গাড়ির উপর, তেমন চিত্র শ্রীনগরেও। শহর জুড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির শোভা পাচ্ছে সবুজ পতাকা। শ্রীনগর শহরের যেন নতুন সাজ। ভারতীয় গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুললে মহিলারা তারস্বরে বলে, কিসের স্বাধীনতা? ভারতীয় সৈন্যদের হাতে ধর্ষিতা হওয়ার স্বাধীনতা? তবে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পথে শুরু হলেও ভারতী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সেটিকে শান্তিপূর্ণ থাকতে দেয়নি। ইতিমধ্যে বহু নিরীহ নাগরিককে তারা হত্যা করেছে। প্রায় প্রতিদিনই চলছে গুলিবর্ষণের ঘটনা। ভারতীয় সেনারা শ্রীনগর শহরে কারফিউ জারি করছে, কিন্তু কারফিউ ভেঙ্গে মিছিল হচ্ছে। এবং প্রাণও দিচ্ছে। এ প্রাণদান গণ্য হচেছ পবিত্র শাহাদত রূপে।

999971_545036402283397_1024226066_n

বর্তমান অবস্থা, দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন ফিলিস্তিনঃ

কাশ্মিরে ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন যেন দিন দিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। স্বাধীনতার দাবিতে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে বিচ্ছিন্নতাবাদী ট্যাগ লাগিয়ে গুলি করে খুন করা হচ্ছে।undefinedশুধু পুরুষরাইনয়, রেহাই পাচ্ছেনা নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেওই।এ ঘটনাগুলার বেশিরভাগই ঘটছে জম্মু এবং কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগরে।যখনই ইনডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী কাউকে হত্যা করছে বিচার না পাওয়ায় তখনই অন্যরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে এবং নিরস্ত্র শিশুরা গুলির জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছুঁড়ছে।ট্যাঙ্ক সহ সামরিক বহর ওয়ালা ইনডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র বাহিনীর দিকে কিছু শিশুর পাথর ছোঁড়া এততাই বিপজ্জনক যে সে কারণেই এ কে ৪৭ দিয়ে নির্বিচারে ব্রাশ ফায়ার করে সৈন্যরা তার জবাব দিচ্ছে। একইসাথে কাশ্মিরের রাজ্যশাসক ও ইনডিয়ান ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর এ গুলিবর্ষণকে আত্মরক্ষার কথা বলে ন্যায্যতা দিয়ে যাচ্ছে। নিরস্ত্র কিছু শিশু একটা সুসজ্জিত বাহিনীর জন্য হুমকি–বিশ্বকে এখন এটাও মেনে নিতে হবে।

10151790_545037045616666_641857349_nঅপহরণ, হত্যা ও ধর্ষণঃ

কাশ্মিরি নারীদের গুম করে নিয়ে ধর্ষণ করে ইনডিয়ার সেনারা। আবার খোলামেলা সবার সামনেই গণধর্ষণ করছে তারা। এটাসেখানে এখন খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়েছে। ইনডিপেন্ডেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালের দেয়া তথ্য অনুযায়ী উনিশশ একানব্বই সালের বাইশে ফেব্রুয়ারি ইনডিয়ার সেনাবাহিনীর একটা দল কুনান পুশপরা গ্রামে এসে প্রথমে নারী ও পুরুষদের আলাদাভাবে আটক করে। এরপর চৌদ্দ থেকে একশ বছর বয়সের অন্তত তেইশ জন নারীকে তাদের স্বামী, সন্তান বা বাবার সামনে গণধর্ষণ করে। গত ২০১০ সালের পয়লা এপ্রিল জম্মু কাশ্মিরের পুলিশ জানিয়েছে, নভেম্বর দুই হাজার দুই থেকে জুলাই দুই হাজার আট সাল পর্যন্ত–ছয় বছরে ইনডিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে একান্ন জন নারী ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে। কাশ্মিরের রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার কমিশন–স্টেট হিউমেন রাইটস কমিশন (এসএইচআরসি) ২০০৮-২০০৯ বছরে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ৪০৪ টা মামলা করেছে। যার মধ্যে ৬ টা ধর্ষণ, ৪৩ টা নিখোঁজ এবং ৯ টা পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা অন্যতম।

২০১০ সালের জুন মাসে জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর নির্বিচার গুলীবর্ষণে ১০২ জনের মৃত্যু হয়ে। এদের কেউ তথাকথিত সশস্ত্র জঙ্গি নন এবং মৃতদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও আছে। ভারতীয় জঙ্গি বাহিনীর এ নির্দয় নির্বিচার গণহত্যার প্রতিবাদে কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে উচ্চকিত স্লোগান দিয়েছে।

বিস্তারিত দেখুনঃ http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=39625

‘ডেইলি গ্রেটার কাশ্মির’ ২৯ জুন,২০১০ প্রতিবেদন ছাপে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত কাশ্মিরে নিহতের মধ্যে বারো জন ছিল তেরো থেকে উনিশ বছর বয়সের। তাদের মধ্যে নয় জনকেই আধা সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে।পত্রিকার পাতায় যে প্রতিবেদনগুলা ছাপা হয়েছে সেগুলা আসল ঘটনার খুবই সামান্য চিত্র। কারণ কাশ্মিরে ইনডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলা অপরাধ করে সে অপরাধ প্রকাশের আলামত ও উপায়ও বন্ধ করে দেয়। একইভাবে মানবাধিকার কর্মী বা সাংবাদিকদের ওপর সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে তারা তাদের সুবিধা মত বহু বিধি নিষেধ আরোপ করে রেখেছে। ফলে সেখানে ইনডিয়ান সেনাদের ভয়ে অত্যাচারিত হয়েও অনেক নিরীহ মানুষ মুখ খুলতে পারে না। যেকারণে গুমহত্যা সহ অসংখ্য হত্যা, ধর্ষণ এবং অপহরণের খবর অজনাই থেকে যায়।

গণকবরঃ

২০১১ সালের আগস্টে কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলের তিনটি এলাকায় ৩৮টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যাই। জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর স্টেট হিউম্যান রাইটস কমিশন (সিএইচআরসি) গত তিন বছর ধরে চেষ্টা চালানোর পর এসব গণকবর খুঁজে পাওয়া পায়। সিএইচআরসি জানিয়েছে, এসব গণকবরে ২ হাজার ১৫৬টি লাশ পাওয়া গেছে।ধারনা  করা হয় ৯০ এর গণ আন্দোলনের গণহত্যার লাশ এগুলি।

 

শ্রীনগরভিত্তিক সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী উনিশশ উনানব্বই সাল থেকে এ পর্যন্ত কাশ্মিরে আট হাজার লোক গুম হয়েছে। ইনডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে ফেরত দেয় নাই। এবং এরপর তাদের আর কোন খোঁজও পাওয়া যায় নাই। সংগঠনটি তথ্য প্রমাণ দিয়ে দেখাচ্ছে, উত্তর কাশ্মিরের বান্ডিপুরা, ব্যারামুল্লা ও কুপওয়ারা জেলার পঞ্চান্নটা গ্রামে দুই হাজার সাতশটা অজ্ঞাত ও অশনাক্ত গণকবর আছে। এগুলা শনাক্ত করে লাশ উদ্ধারে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত পরিষদ গঠনে শ্রীনগর সরকার ও দিল্লি সরকারের কাছে আহবান জানিয়েছে আইপিটিকে

সরাসরি খুনঃ

গাজা উপত্যকায় সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম নির্যাতন ব্যাপক আকারে শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালের ২০ জানুয়ারি এক ব্যাপক হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করতে মিছিল করে নিরস্ত্র মুক্তিকামী কাশ্মিরি জনগণ। কিন্তু ইনডিয়ার সেনা সহ রাজ্য সরকারে নিরাপত্তা বাহিনী মিছিলটিতে নির্বিচারে বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করে কমসে কম একশ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। গোয়াকাডাল ব্রিজে সংঘটিত সেই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বীভৎস স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় কাশ্মিরের জনগণকে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা এখন পর্যন্ত চলছে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এসব অবিচার এবং খুনের ঘটনার জন্য এ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা সেনা কর্মকর্তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয় নাই। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিটা খুনই জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। যেখানে একদিকে ইনডিয়ান সেনাদের জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, ধর্র্ষণ আরেক দিকে কাশ্মির রাজ্য সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর দমন পীড়ন, রাজ্যের বেআইনি হত্যাকা- ও অন্যায় নিপীড়ন সমান তালে চলছে কাশ্মিরে। মোটকথা এসব ঘটনা কাশ্মিরিদের বিক্ষোভ, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা আরো শক্তিশালী করে তুলছে।

হত্যার উদ্দেশ্যে মাথা ও বুক বরাবর গুলি বর্ষণঃ

ইনডিয়ার সরকার বলছে, তারা মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য পায়ের নিচে গুলি করছে। কিন্তু হাসপাতালের রেকর্ড বুকগুলায় পায়ের নিচে গুলির আলামতের কোন কথাই নাই।undefinedকারণ বেশিরভাগ গুলি ও টিয়ারগ্যসের সেল ছোঁড়া হয় মাথা ও বুক বরাবর। কাশ্মিরের শীর্ষস্থানীয় ট্রমা সেন্টার এসএমএইচএস হসপিটালে বিশ দিনের একটা অনুসন্ধান করা হয়। তাতে দেখা যায়, নানা বিক্ষোভ ও আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ চৌদ্দ জনের মধ্যে ছয় জনের বুকেই গুলি পাওয়া যায়। একজনের গলায়, একজনের বাম কাঁধে এবং একজনের বাহুতে গুলি করা হয়েছে।হাসপাতালের অপারেশন কক্ষের রেকর্ডবুকে গুলি লাগা বা গুরুতর আহত রোগীদের যে তথ্য সংরক্ষণ করা হয় সেখান থেকেই এ তথ্যগুলা পাওয়া গেছে। তিন সপ্তাহে তারা মাত্র একজনকে পেয়েছে, যে গুলিতে না টিয়ার সেলের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছে। এবং এটাও ছিল মাথায় আঘাত। হাসপাতালের দুর্ঘটনা বিভাগের একজন সিনিয়র ডাক্তার কাশ্মির টাইমসকে জানান, শরীরের নিচের অংশে গুলিবিদ্ধ হয়েছে এমন একটা ঘটনাও তারা গত তিন মাসে পান নাই। গুলি লেগে, টিয়ার সেলে বা বন্দুকের বাঁটের আঘাতে আহত–সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে দেহের ওপরের অংশেই আঘাতের দাগ। তিনি বলেন, এই কয়দিনে আমরা গুলি লাগা কাউকেই পাই নাই, যাকে দেখে মনে হয়েছে লক্ষ্যবস্তু ছিল দেহের নিচের অংশে। এমনকি আমরা অনেকের সম্পর্কে কোন তথ্যই নিতে পারি নাই। কারণ সেসব আহত রোগীদের ভয় ছিল এখানে তথ্য প্রকাশ করলে যেকোন সময় গ্রেফতার হতে পারে তারা। যেহেতু হাসপাতালের সব তথ্যই সিআইডি সদস্যরা প্রতিদিন নিয়ে যায়। এসব কারণে হাসপাতালে আসা সব আঘাত প্রাপ্তদের সংখ্যা জানা যায় না।

বিশ বছরে লাখো মানুষ হত্যাঃ

কাশ্মিরে এ পর্যন্ত ঠিক কতজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, কত নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে, কি পরিমাণ বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে এবং কত সংখ্যক মানুষকে নিরাপত্তা বাহিনী ধরে নিয়ে ফেরত দেয় নাই তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। This image has been resized. Click this bar to view the full image. The original image is sized 720×504.undefined নানা পক্ষ থেকে নানা পরিসংখ্যান দাবি করা হয়েছে। কাশ্মিরের স্বাধীনতার প্রচারণা সংগঠন কাশ্মির আমেরিকান কাউন্সিলও (কেএসি) একটা পরিসংখ্যান করেছে। তাতে তারা দাবি করেছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের গত বিশ বছরে নারী, শিশু ও যুবক মিলিয়ে এক লাখ নিরীহ কাশ্মিরি ইনডিয়ান সেনা এবং রাজ্যের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে খুন হয়। স্থানীয় এনজিও আইপিটিকের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মির উপত্যকায় ইনডিয়ান সৈন্যদের হাতে নিহতের সংখ্যা সত্তর হাজারেরও বেশি।

হত্যা সহ সমস্ত অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানো বৈধঃ

ইনডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মিরে খুন, অপহরণ, লুটপাট, নির্যাতন, ধর্ষণ, নিজস্ব হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ সহ সব অপরাধ কর্মকা-ই বৈধভাবে করতে পারছে। এসব কর্মকা- অপরাধ হলেও এগুলা তাদের জন্য বৈধ।undefinedকারণ এর পেছনে আছে আর্মড ফোর্সেস অ্যাক্ট বা বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৫৮ (এএফএসপিএ)। আইনটার মাধ্যমে এ অঞ্চলে নিয়োজিত বাহিনীর সব ধরনের অন্যায় ও অপরাধ কর্মকা- বৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছে ইনডিয়া। আইনটা জারি করা হয় ১৯৯০ সালের জুলাই থেকে। এতে আসলে কাশ্মিরিদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে কোন অভিযোগ আনারই আইনগত অধিকার রাখে নাই ইনডিয়াসরকার। ফলে আইনটি ব্যবহার করে এখন ইনডিয়ান সেনারা নির্বিচারে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। মোটকথা এর ফলে জনগণের তরফে ন্যায্য অভিযোগ তোলারই কোন আইনি অধিকার নাই।

ইনডিয়ান সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইজরাইলি সেনা কর্মকর্তারাঃ

কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামীদের দমনে ইনডিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রণকৌশলগত বন্ধু ইজরাইলের সহযোগিতা নিচ্ছে। ইজরাইলি সেনাকর্মকর্তারা কাশ্মিরে এসে ইনডিয়ান সেনাদের হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছে কিভাবে নির্যাতন চালিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে হয়। এবং সংখ্যাগুরু একটা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্যাতন করে কিভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে হয়। এ সংখ্যালঘু করাটা তাদের নিছক একটা কৌশল; যার আসল মানে হল, সেখানকার স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।

দেখুনঃ http://www.informationclearinghouse.info/article1164.htmইনডিয়া

তার প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইটে বলেছে, ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ইজরাইলি সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল আভি মিজরাহি অনির্ধারিত সফরে কাশ্মিরে এসে ইনডিয়ান সেনা ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। এছাড়া তিন দিন ইনডিয়ায় অবস্থান করে মিজরাহি উর্ধতন ইনডিয়ান সেনা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি ইজরাইলি সেনাবাহিনীর দ্বারা ইনডিয়ার সন্ত্রাস বিরোধী কমান্ডোদের প্রশিক্ষণের খসড়া নিয়ে আলোচনা করেন। প্রশিক্ষণের ব্যাপারগুলাতে গোপনীয়তা বজায় রাখা এর অন্যতম নীতি। এ সফলে ইজরাইল ইনডিয়াকে পরামর্শ দিয়েছে, ‘আমরা ফিলিস্তিনিদের সাথে যা করছি তোমরাও কাশ্মিরিদের সাথে তাই কর। ২০০২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ইজরাইলের কাছ থেকে ইনডিয়া পাঁচ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে। ইনডিয়ার সাথে ইজরাইলের সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করা যায় কারগিল যুদ্ধের সময়। ওই যুদ্ধে ইনডিয়াকে জয়ী করতে অস্ত্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণে এগিয়ে আসে ইজরাইল।

হিন্দুদের বিশেষ আকর্ষণ কাশ্মীরি মুসলিম নিধনঃ

কাশ্মিরীদের মাঝে ক্ষোভের যে আগুণ ভিতরে ভিতরে বহুদিন ধরে জ্বলছিল সেটিতো বিস্ফোরিত হওয়ারই ছিল। বিস্ফোরণের জন্য পেট্রোল যেন বিছানোই ছিল। সরকার তাতে বারুদ ঢেলে দিয়েছে। আর সে বারুদটি হল, কাশ্মির সরকারের পক্ষ থেকে ১০০ একর সরকারি জমি অমরনাথ মন্দির কমিটির হাতে হস্তান্তর। অমরনাথ মন্দিরের বিষয়টিও হঠাৎ করে সামনে আসেনি। এসেছে পরিকল্পিত ভাবে। ১৯৮৯ সাল অবধি অমরনাথ মন্দিরে বছরে প্রায় ২০,০০০ তীর্থযাত্রী আসতো। কিন্তু ১৯৯০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএস এ মন্দিরকে ঘিরে এমন প্রোপাগান্ডা শুরু করে যে হিন্দুদের মধ্যে এক নতুন ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টি হয়। ফলে বাড়তে থাকে অমরনাথ মন্দিরে তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা। ২০০৮ সালে এসে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ লাখে। মাস খানেক আগে প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে যখন মন্দিরের জন্য সরকারি জমি দেওয়ার ঘোষণা হয় তখনই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। কাশ্মিরী মুসলমানদের বক্তব্য, ইসরাইলীরা যেমন ধর্মীয় ইস্যুর ভিত্তিতে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের আবাদী বাড়িয়ে চলেছে, উগ্র হিন্দুরাও তেমনি কাশ্মিরের কেন্দ্রভূমিতে হিন্দু আবাদী বাড়াতে চায়। এভাবে তারা কাশ্মিরের জনসংখ্যায় মুসলমানদের অনুপাতটি কমাতে চায়। তাদের কথা, মন্দিরের নামে ১০০ একর জমিদানকে তারা সে প্রকল্পেরই অংশ। মুসলিমদেরকে যেনতেন প্রকারে নির্মূল করতে এই হিন্দুরা সদা প্রস্তুত!

স্থানীয় গণমাধ্যমের ওপর নির্বিচার বলপ্রয়োগঃ

কাশ্মিরের গণমাধ্যমগুলাকে হত্যাকা- নিয়ে কথা বলতে দিচ্ছে না ইনডিয়া। সংবাদ পত্র এবং টিভি চ্যানেলগুলার ওপর কড়া সেন্সরশীপ আরোপ করেছে তারা। আদেশ অমান্য করলে পত্রিকা বন্ধ করে দিচ্ছে। আবার কোন কোন টিভি চ্যানেল বা পত্রিকার বিরুদ্ধে মামালা ঠুকে সংবাদ প্রচারের কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিক্ষোভের সংবাদ ছাপানোর অপরাধে এ পর্যন্ত কাশ্মিরের দুইটা টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে ইনডিয়া। যাদের বেশি বিপজ্জনক মনে করছে সে সব সংবাদিকদের গুম করে ফেলছে তারা।

কড়া বিধি নিষেধ জারি করায় নিরাপত্তা বাহিনীর অনুমতি বা ইচ্ছার বাইরে কোন তথ্য সংগ্রহ বা সরবরাহ করতে পারছে না সাংবাদিক ও মানবাধিকারা। কারফিউর সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পাসও দেয়া হয় না। ফলে কাশ্মিরের ভেতরে আসলে লাখ লাখ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং আর্মি কি করছে তা জানার সুযোগ বাইরের দুনিয়ার খুব কমই আছে। সরকারের দমন-নির্যাতন ও বেআইনি কর্মকর্তা বিরুদ্ধে কথা বলার মানে সেখানে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করা। এমনকি নির্যাতিতদের আইনি সহায়তাও জীবনের ঝুঁকি নিয়া করতে হয়। কারণ যারা এ সহায়তা দিচ্ছে তাদের ওপরও সরকার নির্যাতন চালাচ্ছে। জম্মু এবং কাশ্মির বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মেয়া গাইয়ুমকে গত মাসের সাত জুলাই মধ্যরাতে বাড়ি রেড দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। তার অপরাধ, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে কথা বলেছেন। এবং অত্যাচারিতদের আইনি সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি তাকে অন্যায়ভাবে নিয়ে যাবার প্রতিবাদ করলে বার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জি এন শাহীনকেও আটক করে।

প্রতিরোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই যখন বিকল্পঃ

কাশ্মিরের জনগণের ওপর ইনডিয়ার দমনমূলক আচরণ তাদের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ দমন-নির্যাতন প্রক্রিয়া তারা দিনেদিনে আরো ব্যাপক করে তুলেছে। যেকারণে শিশুর কিশোর, নারীরাও এখন প্রতিবাদ প্রতিরোধে রাস্তায় নেমে আসছে। একইসাথে নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা, নির্যাতন, হামলা ও দমনও আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনা জারি রেখেই ইনডিয়া নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দাবি করছে। আর কাশ্মিরিরা যুগের পর যুগ তাদের হত্যা, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। এখন তাদের সামনে প্রতিরোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কায়েমের জন্য সরবোচ্চ যা করার সেটা ছাড়া কোন উপায় নেই। বিশ্ব মুসলিম নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাশ্মীরের মুসলিমদের পাশে দাড়ানোর এখনই সময়।