কথিত ‘শ্রেষ্ঠ ও সৎ’ গভর্নর আতিউরের শ্রেষ্ঠত্বের কিছু নমুনা

0

বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য পদত্যাগী গভর্নর আতিউর রহমানকে ঘিরে তার পছন্দের মিডিয়ার সহায়তায় ‘শ্রেষ্ঠত্ব ও সততা’র একটি মিথ তৈরি হয়ে আছে। আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকরা এই মিথটিকে টিকিয়ে রাখতে সক্রিয়।
গত রোববার প্রধানমন্ত্রী আতিউরের ভারত সফরে যাওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। প্রধানমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, আতিউর কোনোভাবে দায় এড়াতে পারেন না। (সূত্র: বাংলাট্রিবিউন)। সোমবার গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎও করতে পারেননি তিনি।

কিন্তু মঙ্গলবার যখন পদত্যাগপত্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলেন তখন প্রধানমন্ত্রী ‘আবেগে কেঁদে দিয়ে’ বলেন, আতিউর রহমানের পদত্যাগ নৈতিক মনোবল ও সৎ সাহসের বিরল দৃষ্টান্ত!
নিজেই তাকে পদত্যাগের জন্য ‘নির্দেশ’ দিয়ে পরে সেই পদত্যাগকে ‘সততার বিরল দৃষ্টান্ত’ বলে কান্নাকাটির আদিখ্যাতা একজন অতি আওয়ামীভক্ত বুদ্ধিজীবিকে সাধারণ মানুষের সামনে জোর করে সৎ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা, যা আখেরে আওয়ামী লীগেরই সুনামের জন্য।
এভাবে প্রচারণায় আতিউরের যে ‘শ্রেষ্ঠ ও সৎ’ ইমেজ দাঁড় করানো হয়েছে তার সাথে বাস্তবতার মিল কতটুকু? একটু ঘেটে দেখা যাক।

প্রথমে দেখা যাক তার শ্রেষ্ঠত্বের কিছু নমুনা:
২০০৯ সালের ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসাবে চার বছরের জন্য দায়িত্ব নেন আতিউর। এরপর তাকে আরও এক মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
এই দীর্ঘ সময়ে যে তার কোনোই সাফল্য নেই তা নয়। ছোট ছোট বিভিন্ন বিষয়ে তার কিছু উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। যেমন গ্রিন ব্যাংকিং এবং সিএসআর (সামাজিক দায়বদ্ধতা) ইত্যাদিকে গুরুত্ব দেয়া।
কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকিং খাতে যত ধরনের বড় বড় দুর্নীতি ও কেলেংকারির ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সবক’টাই আতিউর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকার সময়ে ঘটে।

বড় আকারের কেলেংকারিগুলোকে এক পলকে দেখা যাক:

শেয়ারবাজার থেকে যে এক লক্ষ কোটি টাকার মতো লুট হয়েছে এর একটি বড় অংশ হয়েছে ব্যাংকিং খাত থেকে। দফায় দফায় ব্যাংকিং পলিসি পরিবর্ন করে ব্যাংকের শেয়ারকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে ৮/১০ গুন বাড়িয়ে টাকা লুটে নেয়া হয়। বারবার পলিসি পরিবর্ন ক করে এ সুযোগ দেয়া হয়। ব্যাংকিং সেক্টরের শেয়ারদিয়েই মূলত অন্য সেক্টরের শেয়ারকেও ম্যানপোলেট করে পুরো শেয়ারবাজার থেকে লুটের আয়োজন করে দেয়া হয় এই গভর্ণর-এর নেতৃত্বে।

২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংক-হলমার্ক অর্থ কেলেংকারিতে ৪ হাজার কোটি টাকা লুট

২০১৩ বিসমিল্লাহ গ্রুপ কর্তৃক দেশের পাঁচটি ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ১১শ’ কোটি টাকা লুট

২০১৩ সালে বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টার পর ১০০ মিলিয়ন চুরি করতে সক্ষম হওয়া।

গত কয়েক বছরে সোনালী ব্যাংক, আল আরাফাহ ব্যাংক, ব্রাক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের বহু শাখায় কর্মকর্তাদের সহায়তায় অসংখ্য ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। যেগুলোর কোনোটিরই বিচার হয়নি।

এসব ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলোই জানাচ্ছে। ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরের ‘বেসিক ব্যাংকে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট’ শিরোনামের খবরে সেই কেলেংকারি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়–
“অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রশ্রয়ে প্রায় চার বছরেরও অধিক সময় অব্যাহতভাবে অনিয়ম করে যাচ্ছে ব্যাংকটির শীর্ষ পদের কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, এ অনিয়ম করে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাংকিং মহলে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
আতিউরের কথিত যোগ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি উজ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে নজীরবিহীনভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীট লোকসান গুনার ঘটনা।

গত সোমবার অর্থনীতি বিষয় পত্রিকা বণিকবার্তা তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট লোকসান ২ হাজার ৬২২ কোটি টাকা”
প্রতিবেদনটি থেকে কয়েক প্যারা–
“বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৪ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। আর এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৪-১৫ ও অন্যান্য সূত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্লথগতি ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, মুদ্রার অবমূল্যায়নে এমনটি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে ডলারের দাম তো সেভাবে কমেনি। বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন অনেক হয়ে গেছে, অর্থনীতিও বড় হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অফিস সময়ে ট্রেড করে তো ভালো কিছু করা যাবে না। সপ্তাহের সাতদিনই ২৪ ঘণ্টা ফরেক্স ট্রেড খোলা থাকা উচিত। এজন্য পৃথক প্রশিক্ষিত জনবলও থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে যে ধরনের ব্যবস্থাপনা চলছে, তা দিয়ে তো ভালো কিছু আশা করা যায় না। ফলে লোকসান হবেই। তবে বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতেই হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা হয় ৫৯৮ কোটি টাকা। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে ৫৩০ কোটি, ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে ৬৩৪ কোটি, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে ৭৭০ কোটি, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ৭৮৬ কোটি ও ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে ৭৯৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়। ২০০০-০১ অর্থবছরে ৭১৫ কোটি, ২০০১-০২ অর্থবছরে ৯৪৯ কোটি, ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৭৬০ কোটি, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৯৩৯ কোটি, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৯১ কোটি, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০৪ কোটি, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৩ হাজার ৪৬০ কোটি, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৫২ কোটি, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০৫ কোটি,
২০০৯-১০ অর্থবছরে ১ হাজার ২৮৭ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৮ হাজার ৮৪২ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৭ হাজার ৩১ কোটি, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩০৪ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়। তবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নিট লোকসান দাঁড়ায় ২ হাজার ৬২২ কোটি টাকা।”

আতিউরের সততার মিথ:

আতিউরের ‘সততা’ নিয়ে মিডিয়া নানা মিথ প্রচারিত হয়। ফলে অনেকে তেমনটা বিশ্বাসও করেন। তবে বাস্তবের সাথে মিলিয়ে দেখলে এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপককে অত্যন্ত নিচু মানের চাটুকার ও অসৎ ব্যক্তি বলেই মনে হবে।
রাষ্ট্রীয় টাকা বিদেশে আতিউরের বিলাসভ্রমণ তার একটি উদাহরণ মাত্র। গত রোববার (১৩ মার্চ) নিউ এইজ পত্রিকা আতিউরের বিলাসভ্রমণ নিয়ে Atiur makes 14 foreign trips in 14 months শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে জানানো হয় আতিউরের নিজের কাজে রাষ্ট্রীয় টাকায় বিদেশ সফরের বিভিন্ন ঘটনা। এমনকি বড় বড় অর্থনৈতিক কেলেংকারিগুলোর সময়ও তিনি খুবই তুচ্ছ ঘটনায় বিদেশ সফরে ছিলেন।

গত ১৪ মাসে ১৪ বার বিদেশে গেছেন তিনি। এর মধ্যে গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ মাসে ভারতে চারবার; যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডে দুইবার এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, পেরু, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও জাপানে একবার করে সফর করেন।

এসব সফরের সবগুলোই ছিল রাষ্ট্রের খরচে। অথচ, এসব সফরের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে নিজের কাজ করে বেড়িয়েছেন আতিউর। সর্বশেষ হ্যাকিংয়ের ঘটনা প্রকাশের পরপরই যেমন তিনি আইএমএফের প্রোগ্রামে যোগ দেয়ার নাম করে নিজের ‘তব ভুবনে তব ভাবনে: রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি ভাবনা’ শীর্ষক বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

এর বাইরে বিভিন্ন পুরস্কার অর্জনে নিজের পদের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে আতিউরের বিরুদ্ধে। গত সোমবার বিডিনিউজের “আতিউরকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন নুহ-উল-আলম লেনিনের” শিরোনামের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে–
“আতিউর ব্যাংকের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পুরস্কার ও পদক সংগ্রহের জন্য গভর্নর পদের অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা বেসরকারি ব্যাংকের অর্থ ব্যয় করেছেন।”

তদন্ত করে এর সত্যতা প্রমাণিত হলে আতিউরের ‘উপযুক্ত শাস্তি’ দাবি করেছেন ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা।

তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, “কী এমন সৃজনশীল প্রবন্ধ রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে আতিউর সমৃদ্ধ করলেন যার জন্য এ বছর তাকে ‘সামগ্রিক প্রবন্ধের জন্য’ বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হল? এর পেছনেও নাকি অবৈধ প্রভাব কাজ করেছে?

“ফলে লেখালেখি করেন এমন ক্ষমতাবান আমলারাও বাংলা একাডেমিকে তাদের একাধিক বই প্রকাশ/ অনুবাদ এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদানে বাধ্য করেন। অধস্তন কর্মকর্তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করে আতিউর ও বড় আমলা গংরা পুরস্কার/পদক এবং নাম কেনার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু করেছে, অবিলম্বে তা বন্ধ না করলে জাতির কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।”