ওলামা লীগের নামের আড়ালে চলে অবৈধ ব্যাবসা, তদবির ও চাঁদাবাজি

0

জেনিফার আজমাইনঃ আওয়ামী লীগের কোনো সহযোগী অথবা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নয় ওলামা লীগ। কিন্তু শাসক দলের নাম ভাঙিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিভিন্ন কাজের তদবির, চাঁদাবাজি, কাজী ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সংগঠনটি। ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে ওলামা লীগ। এমনকি প্রকাশ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। ক্ষমতাসীন দলের স্বীকৃত কোনো সংগঠন না হলেও আন্দোলন-সংগ্রামেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশে ওলামা লীগের নেতাদের দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সংগঠনটির দুটি অংশের একটিকে সরাসরি সমর্থন দেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং অন্যটির পেছনে রয়েছেন আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ওলামা লীগ নামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কোনো বৈধ সংগঠন নেই। তবে একটা সময় তিনি দলের নির্দেশে ওলামা লীগকে একত্র করে একটি একক কমিটি করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যে হাজারও বিভেদ, একে অপরকে জঙ্গি বলে দোষারোপ করে- এসব কারণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ওলামা লীগকে স্বীকৃতি দেননি। একই কারণে তাদের একক কোনো কমিটিও হয়নি। তবে নারীনীতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ওলামা লীগ তাদের কার্যক্রম দিয়ে সহায়তা করেছে বলে জানান তিনি। আবদুল্লাহ বলেন, এখন ওলামা লীগের একেক অংশ একেকভাবে যার যার মতো কাজ করে বলে শুনেছি। তাদের (ওলামা লীগের নেতা) অনেকে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেন। কিন্তু কোনোভাবেই ওলামা লীগ আওয়ামী লীগের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সংগঠন নয়।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া  বলেন, ইলিয়াস বিন হেলালীর (ওলামা লীগের একাংশের সভাপতি) নেতৃত্বে অনেকে এ সংগঠনটি করেন। এরা আওয়ামী লীগের হয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন।

গত শনিবার ওলামা লীগের বোখারী অংশের মানববন্ধনের ওপর চড়াও হন হেলালী অংশের নেতাকর্মীরা। বোখারী অংশের সভাপতির দায়িত্বে আছেন টাঙ্গাইলের মাওলানা আখতার হোসেন বোখারী এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা শেখ আবুল হাসান শরীয়তপুরী। এরা দু’জনই পেশায় কাজী। আর হেলালী অংশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা ইলিয়াস বিন হেলালী এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন মাওলানা দেলোয়ার হোসেন। হেলালীর স্থায়ী কোনো পেশা না থাকলেও দেলোয়ার একসময় ট্রাকড্রাইভার ছিলেন, এখন ট্রাকের মালিক। দু’বছর আগে ওলামা লীগের আরও একটি গ্রুপ ছিল যেটি বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে ইসলামিক ইউনাইটেড ফ্রন্ট নামে স্বতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই অংশের নেতা মাওলানা ইসমাইল হোসেন হেলালী এখন এই দলটির সভাপতি। আর একসময়ের প্রতাপশালী হাবিবুল্লাহ কাঁচপুরী গ্রুপ রূপান্তরিত হয়ে হেলালী গ্রুপে মিশেছে। হাবিবুল্লাহ কাঁচপুরী মাদকদ্রব্য এবং নারীসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এখন জেল খাটছেন।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, এর আদি নাম ছিল আওয়ামী ওলামা পার্টি। যার জন্ম ১৯৬৯ সালে। মূলত ছয় দফাকে কেন্দ্র করে এ সংগঠনটির জন্ম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করলে পাকিস্তানি আলেম-ওলামারাও এর বিরোধিতা করেন। তারা এটাকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দেন। তখন পূর্ব পাকিস্তান অংশে ছয় দফাকে সমর্থন করেন মাওলানা শেখ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বিন সায়ীদ জালালাবাদী (জালালাবাদী হুজুর)। ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু তাকে সমমনাদের নিয়ে কাজ করতে বলেন। এরপর মাওলানা ওলিউর রহমান, মাওলানা বেলায়েত হোসেন প্রমুখকে নিয়ে ‘শরিয়তের দৃষ্টিতে ছয় দফা’ নামে প্রচারণায় নামেন তারা। তারা বলেন, ছয় দফা ইসলাম পরিপন্থী নয় বরং ইসলামের পরিপূরক। এরপর ১৯৬৯ সালে তারা আওয়ামী ওলামা পার্টি গঠন করেন।

’৭৫ পরবর্তী সময়ে আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যায় এই সংগঠনটি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবারও ওই সংগঠনের সাবেক নেতারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৯৮ সালে তারা আনুষ্ঠানিক সম্মেলনের মাধ্যমে মাওলানা হাবিবুল্লাহ কাঁচপুরী সভাপতি এবং মাওলানা জহির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে কাজ করতে থাকেন। এই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন ইলিয়াস বিন হেলালী। কিন্তু ২০০১ সালে ভাঙনের মুখে পড়ে সংগঠনটি। সে সময় কাঁচপুরীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এদিকে মাওলানা ইসমাইলের নেতৃত্বে একটি অংশ আলাদা সম্মেলন করে তাকে সভাপতি এবং মাওলানা শেখ আবু হাসান শরিয়তপুরীকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে। আর হেলালী কাঁচপুরী অংশের হাল ধরেন। ২০০৪ সালে মাওলানা আখতার হোসাইন বোখারী ইসমাইল অংশের সভাপতি নির্বাচিত হলে মাওলানা ইসমাইল আরেকটি ওলামা লীগ কমিটি করেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ায় ক্রমান্বয়ে সব অংশই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তবে, মাঝে মধ্যে বোখারী অংশকে আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের পাশে দেখা যায়। প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিমকে পুলিশ পেটানোর সময়ও ওলামা লীগের এই অংশ নেতাদের উপস্থিতির ছবি সে সময়ে সংবাদপত্রে ছাপা হয়। আর হেলালী অংশকে মায়ার সঙ্গে আন্দোলন করতে দেখা যায় কখনও কখনও।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর আবার রাজনীতির মাঠে আবির্ভূত হয় ওলামা লীগ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শুরু থেকেই বিবাদে জড়িয়ে পড়ে বুখারী ও হেলালী অংশ। এদের মধ্যে হেলালী বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে এবং বুখারী অংশ তোপখানা রোডে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুই অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগও বিস্তর। হেলালীকে অহরহই সচিবালয়ে তদবিরবাজি করতে দেখা যায়। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। আর বোখারী অংশের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার অভিযোগ রয়েছে। কেননা তারা সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে পাঠ্যপুস্তকে ইসলামবিরোধী রচনা ও পাঠ্যক্রম আছে দাবি করে তা বাদ দেয়ার আহ্বান জানায় । শিক্ষানীতির বিরুদ্ধেও তারা অবস্থান নিয়েছিল। গতকালের মানববন্ধনে তারা বঙ্গবন্ধুর নামের আগে শহীদ ও পরে রহমতুল্লাহ আলাইহি যোগ করার দাবি জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওলামা লীগের সাবেক এক শীর্ষ নেতা অভিযোগ করেন, বিনা পয়সায় হজে যাওয়ার সুযোগ, কাজী ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ইসলামী ফাউন্ডেশন ও বায়তুল মোকাররমের পদ বাগানোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণেই এদের মধ্যে বিভেদ।

ওলামা লীগের বোখারী ও শরীয়তপুরী গ্র“পের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান শেখ শরীয়তপুরী যুগান্তরের কাছে দাবি করেন, তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাদের সংগঠনের দেখভাল করেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ মো. আবদুল্লাহ ও দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ। আবুল হাসান দাবি করেন, দলের দুর্যোগের সময় তারা মাঠে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে সরকারিভাবে হজে পাঠিয়েছেন। কাজী ও বিবাহ নিবন্ধক বানিয়েছেন। এমনকি এ বছর দ্বিতীয় রমজানে তারা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গণভবনে ইফতার মাহফিলে অংশ নেন। ঢাকায় হেফাজতের অবস্থানের সময় প্রধানমন্ত্রীর ওই উপদেষ্টার বাসায় এবং নারীনীতি করার সময় গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন তারা।

আবুল হাসান শরিয়তপুরী বলেন, ধর্মের কথা বললে যদি সাম্প্রদায়িক হয়, তাহলে কিছু করার নাই। তবে, আমরা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করি। তিনি হেলালী অংশ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং এক এগারোর সময় নিষ্ক্রিয় ছিল বলে দাবি করেন। এর জবাবে হেলালী  বলেন, তারা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সঙ্গে সব আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন। যেটা তাকে (মায়া) জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে।
 জানা গেছে, আলেম-ওলামারাই ওলামা লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, কাজী, মাদ্রাসা শিক্ষকরা ওলামা লীগের নেতা ।