এলাকাছাড়া বিএনপি প্রার্থীরা

0

জিসাফো ডেস্কঃ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অব্যাহত চাপ, হুমকি, হামলা ও প্রশাসনের হয়রানির মুখে বিএনপিদলীয় প্রার্থীরা। প্রকাশ্য প্রচারণা দূরের কথা হামলা ও মামলার কারণে এলাকায় অবস্থান করতে পারছেন না অনেকেই। বিএনপি প্রার্থীদের প্রচারণার মাঠে দেখলে হামলা করছে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর লোকজন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায়ও মামলা দায়ের হচ্ছে বিএনপি প্রার্থীসহ দলটির নেতাকর্মীদের নামে। প্রতিকূলতার মধ্যেও যেসব প্রার্থী এলাকায় অবস্থান করছেন তারাও দিন কাটাচ্ছেন আতঙ্কে। রাতের বেলা নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে গোপনে বৈঠক ও আড়ালে-আবড়ালে ভোটারদের সঙ্গে সালাম বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের প্রচারনা। যেন নির্বাচন করাই তাদের অপরাধ। নির্বাচনকে ঘিরে নানা নৈরাজ্যের ঘটনা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করছেন জেলা বিএনপি নেতারা। বিএনপির মনোনয়ন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, জেলা বিএনপি ও প্রার্থীরা এমন তথ্য জানিয়েছেন। ইউপি নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু দেশের কোথাও নির্বাচনের পরিবেশ নেই। সরকার দলীয় প্রার্থী ও প্রশাসন নির্বাচনকে একতরফা করে ফেলেছে। তিনি বলেন, দেশের কোন কোন জেলায় আমাদের দলের প্রার্থীরা নীরবে নিভৃতে এলাকায় থাকতে পারলেও অনেক জায়গায় তারা এলাকাতেই যেতে পারছেন না। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ রীতিমতো আতঙ্কের বিষয় হয়ে ওঠেছে। তারপরও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আমরা দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বারবার প্রমাণ করতে চাই এ সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিএনপি প্রার্থী ও তাদের লোকজনকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিচ্ছে। ভোলা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফারুক মিয়া জানান, আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছেন ভোলায় নৌকা ছাড়া কোন প্রতীক যেন দেখা না যায়। সদর থানার ভেদুরিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের সমর্থন সভায় গণ্ডগোল হয়েছে আর মামলা দেয়া হয়েছে বিএনপি নেতাদের নামে। সেখানে বিএনপির প্রার্থী কাজী আবু তাহের এখন এলাকা ছাড়া। সদরের ইলিশা ইউনিয়নে বিএনপি প্রার্থীর প্রচারণা দূরে থাক আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর নির্বাচনী অফিসই ভেঙে দেয়া হয়েছে। সদরের উত্তর দিগলদী ইউপির বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের মামলা নিলেও বিএনপি প্রার্থীর মামলা নেয়া হয়নি। ফারুক মিয়া বলেন, আমাদের বেশির ভাগ প্রার্থী ও তাদের পরিবারের লোকজনকে আওয়ামী লীগের লোকজন হুমকি দিচ্ছে, পুলিশ হয়রানি করছে। তারা লুকিয়ে পালিয়ে থাকছেন। বিএনপির লোকজন প্রকাশ্য প্রচারণায় অংশ নিতে পারছে না। গোপনে গোপনে যেটুকু প্রচারণা চালানো যায় সেটুকুই করছি। খুলনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম মনা জানান, জেলাজুড়ে বিএনপি প্রার্থীদের বেশির ভাগই এলাকা ছাড়া। ধানের শীষের প্রকাশ্য প্রচারণা খুব কঠিন হয়ে ওঠেছে। বিএনপির লোকজন আড়ালে-আবড়ালে প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। তিনি বলেন, বটিয়াঘাটার আমীরপুর ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ও সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুল ইসলাম খানের ওপর দুদিন আগে পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলা চালানো হয়েছে। তিনি এখন খুলনা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। রূপসার শ্রীফলতলা ইউপির বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থীর ওপর হামরা করা হয়েছে। সেখানে জোর করে সকল ইউপি সদস্যকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করানো হয়েছে। আইচগাতি ইউপিতে বিএনপি নেতা ও খুলনা সিটি করপোরেশন কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি উজ্জল কুমার সাহা ও ছাত্রদল নেতা আসলামের বাড়িতে গুলি চালানো হয়েছে। বাহিরদিয়া ইউপির বিএনপি প্রার্থী বিকাশ কুমার মিত্রকে হামলা করে তার মোটরসাইকেল কেড়ে নেয়া হয়েছে। একজন মেম্বারকে উঠিয়ে নেয়ার পর জানাজানি হলে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪টি ইউপিতে বিএনপি প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী লোকজনের অবস্থান খুবই নাজুক। এদিকে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কোকিলমনি ইউপির বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন ডাবলুর সমর্থককে প্রচারণা চালালে ভারতে পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন ওই ইউপির আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাওসার আলীর ক্যাডাররা। মিহির কান্তি পাল নামে বিএনপির প্রার্থীর কর্মীকে হুমকি দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, এখানে নির্বাচন যাই হোক নৌকাই বিজয়ী হবেন। বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালালে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ওই ইউপিতে ধানের শীষের পোস্টার লাগাতে গেলে মাহফুজ নামে এক বিএনপির কর্মীকে বাসায় গিয়ে হুমকি দেয় পুলিশ। একই উপজেলার গদাইপুর ইউপির বিএনপির প্রার্থী আলাউদ্দিন রাজাকে প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছেন স্থানীয় এমপির নুরুল হকের সমর্থকরা। পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালি ইউপিতে রাম রাজত্ব কায়েম করেছেন স্থানীয় এমপির মনোনীত স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোতুর্জার কর্মী- সমর্থকরা। তারা বিএনপির প্রার্থী শেখ আমিনুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী বেনজির আহমেদ বাচ্চুকে প্রচারণা চালাতে দিচ্ছেন না। এমনকি পোস্টার লাগাতে গেলেও বাধা দেয়া হচ্ছে। যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু জানান, বৃহস্পতিবার ইউপি কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজ করার সময় চূড়ামনকাঠির বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিএনপির প্রার্থী আবদুস সাত্তারকে ঘেরাও করে কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে হত্যার প্রচেষ্টা চালায় সরকারদলীয় প্রার্থীর লোকজন। পরে পুলিশ ইউপি কার্যালয়ের গ্রিল কেটে তাকে উদ্ধার করে। বিএনপির প্রার্থীরা আতঙ্কের মধ্যেই সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাধারণ সভাপতি এমএ সালাম জানান, বাগেরহাটের অনেক ইউপিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রই জমা দিতে দেয়া হয়নি। যারা অনেক প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রয়েছেন তাদের দিন কাটছে হুমকি-হামলা ও নানামুখী চাপের ভেতর। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে তাদের ওপর আওয়ামী লীগের নেতারা দলীয় ও প্রশাসনের মাধ্যমে চাপ দিচ্ছেন। প্রতিদিনই প্রার্থী ও তাদের লোকজনের ওপর হামলা ঘটনা ঘটছে। গতকালও শরণখোলার খোন্তাখাটা ইউপির বিএনপি দলীয় প্রার্থী ও সাবেক চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান খানের ওপর হামলা হয়েছে। বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি মেজবাহউদ্দিন ফরহাদ জানান, বিএনপি প্রার্থীরা এলাকায় সক্রিয়ভাবে কোন নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারছে না। রাতের বেলা বিভিন্ন নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুপিসারে বৈঠক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে প্রচারণা। তারপরও গত কয়েকদিনে মেহেন্দীগঞ্জের ভাসানচর ইউপির বিএনপি প্রার্থী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ও হিজলার মেমানিয়া ইউপির বিএনপি প্রার্থী আফসারউদ্দিনের ওপর হামলা হয়েছে। উলানিয়ায় বিএনপি প্রার্থীর একটি পোস্টারও টাঙানোর সুযোগ দেয়নি আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু বা শান্তিপূর্ণ দূরে থাকুক, নির্বাচনেরই কোন পরিবেশ নেই। পটুয়ালখালীর দশমিনা উপজেলার বহরমপুর ইউপির বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে শনিবার। একই জেলার সদর উপজেলার বদরপুর ইউপি প্রার্থী সালাম শরীফকে গণসংযোগকালে শুক্রবার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওদিকে আগামী ২২শে মার্চ শুরু হচ্ছে দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো ইউপি নির্বাচন। অন্যদিকে প্রথমদফা নির্বাচনের তিনদিন আগে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল। উপজেলা ও থানা পর্যায়ের সিনিয়র নেতাদের অনেকেই দলের কাউন্সিলর। তাদের অনেকেই আবার অংশ নিচ্ছেন ইউপি নির্বাচনে। কাউন্সিলের কারণে কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের বেশির ভাগই এখন দৌড়ঝাঁপ করছেন ঢাকায়। তারা ভূমিকা রাখতে পারছেন না ইউপি নির্বাচনে। এমনিতেই সরকার দলীয় প্রার্থীদের হুমকি- ধামকি ও প্রশাসনের হয়রানীর কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতি মধ্যে নির্বাচন করতে হচ্ছে ধানের শীষের প্রার্থীদের। তার উপর সিনিয়র নেতারা কাউন্সিল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় পিছিয়ে পড়ছেন বিএনপির প্রার্থীরা।