এর পরেও কি চলবে জিয়াকে নিয়ে সমালোচনা ?

0

জিসাফো ডেস্কঃ জিয়াউর রহমান ছিলেন সময়ের সাহসী সন্তান। সময়ের প্রয়োজনেই জিয়া আর্বিভূত হয়েছিলেন দৃশ্যপটে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল, সাতই নভেম্বর সিপাহী জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে সেই অস্থিরতার আপাত অবসান হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন জেনারেল জিয়া। তিনি ক্ষমতাসীন হয়েই প্রথমে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনেন।

জাতীয় চার নেতা হত্যার সাথে অনেকে জিয়াউর রহমানকে জড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিহাস তেমন কোনো সাক্ষ্য দেয় না। তৎকালীন ২২ ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক এইচ গাফ্ফার ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোয় তার একটি লেখায় উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক হিসেবে সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। তাই জিয়াকে অন্তরিণ রাখাকে সাধারণ সৈনিকেরা পছন্দ করেনি। এই সাবেক সেনাকর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী জিয়া তখন আটক ছিলেন।

এছাড়া প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনীতিক সিরাজুল হোসেন খান তার একটি বইতে লিখেছেন, ‘… পয়লা নভেম্বর একটি মন্ত্রিসভায় খন্দকার মোশতাক আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু ঐ মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত কোথাও প্রকাশ পায়নি। পরে জানা যায়, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পরিকল্পনা ছিল যে, তারা খন্দকার মোশতাক আহমদকে দিয়ে একটা ঘোষণা জারি করবেন, যার বলে পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে এসে মুজিব আমলের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামকে প্রেসিডেন্ট, এম. মনসুর আলীকে ভাইস প্রেসিডেন্ট, তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে সংসদীয় পদ্ধতিতে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের সূচনা করবেন।

এ ধরণের একটি ঘোষণায় স্বাক্ষরদান করতে অস্বীকার করলে অন্য আরেকজন ব্রিগেডিয়ার খন্দকার মোশতাককে গুলি করতে উদ্যত হন। তখন বঙ্গভবনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও সাবেক মন্ত্রী জেনারেল ওসমানী অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সবাইকে শান্ত করেন। বঙ্গভবনে যখন এমনি এক টলটলায়মান উত্তপ্ত অবস্থা চলছে তখন এবং যখন শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারী সেনাবাহিনীর অংশের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ দুই-একদিনের মধ্যেই ক্ষমতা গ্রহণ করবেন এবং আওয়ামী বাকশালী রাজত্ব পুন:প্রতিষ্ঠা হবে, তখন তারা বলপূর্বক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে উপরোক্ত চারজন আওয়ামী লীগ নেতাকে ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে ৩ নভেম্বর হত্যা করে।’ [সিরাজুল হোসেন খান (প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং শ্রমিক নেতা, সাবেক মন্ত্রী), ‘উপমহাদেশের সামাজিক- রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত’, ঝিনুক প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী ২০০২, পৃ. ২০০-২০২]

দুই
দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক ছিলেন জিয়া। দেশ যখন বাকশালী শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে হাঁসফাঁস করছিল। তখন জিয়ার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া, বাংলাদেশের মানুষকে মত প্রকাশের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে তাদের মুক্তির স্বাদ পেতে সাহায্য করেন। কেন জিয়াকে সমর্থন করেছিলেন ভাসানী, এই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা দরকার।

অসুস্থ মওলানা ভাসানীকে হাসপাতালে দেখতে যান তমদ্দুন মজলিশের অধ্যাপক আবদুল গফুরসহ কয়েকজন। তখন জিয়াউর রহমানকে প্রকাশ্যেই সমর্থন দিচ্ছিলেন ভাসানী। সেদিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অধ্যাপক গফুর বলেন : ‘আপনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা। সেই আওয়ামী লীগ ছিল ক্ষমতায়। প্রকাশ্য জনসভায় আপনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের বলেছেন, দুর্নীতি করলে, জনগণের জন্য কাজ না করলে তোমাদের পিঠে চাবুক মারা হবে। আপনার নিজের দলের নেতাদেরও এমন কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন, আর আজ একজন সামরিক শাসককে আপনি সমর্থন দিচ্ছেন? জিয়ার প্রতি কেন আপনার এই দূর্বলতা?

‘‘মওলানা বললেন : ‘আবদুল গফুর, আমি তোমার বাবার বয়সী। আমি আমার জীবনে তোমার চেয়ে বেশি সরকার ও বেশি নেতাদের দেখেছি। ব্রিটিশ আমলে দেখেছি, পাকিস্তান আমলে দেখেছি, বাংলাদেশ আমলেও দেখেছি। তুমি আমাকে একটা এক্সাম্পল দেখাও, কোন রাজনৈতিক নেতা কম-বেশি দুর্নীতি করে নাই বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় নাই এবং কোন নেতা স্বজনপ্রীতি করে নাই। ‘অধ্যাপক গফুর চুপ করে রইলেন। মওলানা বললেন : এখন পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। কোনোরকম স্বজনপ্রীতিও তার মধ্যে নাই। তার আত্মীয়-স্বজনকে কেউ চেনে না। তাদেরকে সে কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয় না। ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে এ ধরণের শাসককে মানুষ পছন্দ করে। একজন সৎ শাসকের তো প্রশংসাই প্রাপ্য। দেখা যাক কিছুদিন, জনগণের জন্য কী করে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ন্যূনতম ঐক্য নাই। আত্মশুদ্ধির চেষ্টা নাই। দেখা যাক, আগামী নির্বাচনে কারা আসে। [ভাসানী কাহিনী : সৈয়দ আবুল মকসুদ, আগামী প্রকাশনী]

জিয়া মুক্তিযুদ্ধ করেননি তিনি ছিলেন পাকিস্তানী চর, একজন স্বাধীনতার ঘোষককে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আওয়ামীলীগ নেতারা খোঁচা দিতে দ্বিধা করেন না। এক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি ভাষণ স্মরণ করা যেতে পারে। ভাষণে তিনি বলেন, ‘‘… চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরোধব্যুহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলার ভাই-বোনেরা যে সাহসিকতার সাথে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরোধ স্ট্যালিনগ্রাদের পাশে স্থান পাবে। এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের জন্য চট্টগ্রাম আজও শত্রুর কবলমুক্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের কিছু অংশ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সম্পূর্ণ নোয়াখালি জেলাকে ‘মুক্ত এলাকা’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।’’

আমরা আরও স্মরণ করতে পারি সাবেক কর্মকর্তা আমীন আহম্মেদ চৌধুরীকে। তিনি ‘১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন’ বইতে লিখেছেন, জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা প্রথমবার নিজের নামে দিলেও দ্বিতীয়বার তিনি বঙ্গবন্ধুর নামে দিয়েছিলেন। এর ফলে তাঁর যে ভাবমূর্তি দেশে এবং বিদেশে গড়ে ওঠে, আজও তা অম্লান। দেশ ও জাতির চরম বিপদের সময় তাঁর কণ্ঠস্বরে জনগণ উজ্জীবিত হয়েছিল। এটা তাঁর এক বিরাট অবদান।

অবশ্য এ কাজটি তখন যে কেউই করতে পারতেন। কিন্তু ভাগ্যবান বলে তিনি এটা করেছিলেন। তাঁর সেই ভরাট গলার আহবানে বাঙালি জাতির মধ্যে আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছিল। অন্যদিকে, ব্যক্তিগতভাবে জিয়ার দেশপ্রেম, সততা, ঐকান্তিকতা ছিল সব সন্দেহের উর্ধ্বে। যদিও কর্নেল তাহেরের বিচার নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও ধুম্রজাল রয়েছে। কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীর ভেতরে যেভাবে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিলেন, সেটা ছিল এক ঘৃণ্য অপরাধ। অনেক নিরীহ মানুষকে তাঁর বিপ্লবী সংস্থা হত্যা করেছে। নিহতদের কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে দুর্নীতির কোনো অভিযোগও ছিল না। অন্যদিকে জনগণের মধ্যে কর্নেল তাহেরের কোনো ভিত্তি ছিল না। জাসদের যে গণবাহিনী ছিল, তারা বিভ্রান্তিকর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে…।

…তাহেরের কাজটি কোনো মূল্যবোধের পর্যায়ে পড়ে না। এটা কোনো ধরনের দর্শন হতে পারে না। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাতে তাঁর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা স্লোগান দিয়েছে, অফিসারের রক্ত চাই/সুবেদারের ওপরে অফিসার নাই। অর্থাৎ এটা প্ল্যানটেড কোনো স্লোগান। বিদেশ থেকে আমদানি করা স্লোগান, যাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শক্ত ভিতের ওপর গড়ে উঠতে না পারে। সেনাবাহিনী যদি গড়ে উঠতে না পারে, তাহলে যারা সুবিধাটা নেবেন, তাঁরাই এই কাজ করিয়েছিলেন। এ কারণেই জিয়া তাঁদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অ্যাকশনে চলে যান। সেনাবাহিনীতে ডিসিপ্লিন বরখেলাপ করে যখনই কেউ কাজ করবে, ডিসিপ্লিন ভঙ্গের যে ধারাগুলো আছে, সেটা তাঁর ওপর বর্তাবে। সুতরাং, বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। কেউ তাঁকে জোর করে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে না। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণেই বিচার। সেটা

সংক্ষিপ্ত আকারেও সেনাবাহিনী করতে পারে। কোর্ট মার্শাল যেটা হয়, সেটা বৈধ এবং আইনগতভাবে এটার বৈধতা আছে। … মূলত এরশাদই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সামরিক আইনের মাধ্যমে দেশ শাসন করেছিলেন। এর আগ পর্যন্ত সামরিক আইনের মাধ্যমে কেউ দেশ শাসন করেননি। জিয়া সামরিক আইন জারি করেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর মোশতাক ক্ষমতায় এসে সামরিক আইন জারি করেন। জিয়া তাঁর অধীনে ছিলেন। পরে তিনি সায়েমের অধীনে ছিলেন। পরে যদিও জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি নিজে কোনো ফরমান জারি করেননি। … জিয়া দ্রুত সামরিক আইন প্রত্যাহার করে গণতন্ত্রে ফিরে গিয়েছিলেন। [১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন : আমীন আহম্মেদ চৌধুরী, প্রথমা প্রকাশন-২০১৬, পৃ. ৭২,৭৪,৭৬]

এবার শোনা যাক আওয়ামী লীগ এমপি-মন্ত্রী চট্টগ্রামের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের স্মৃতিচারণ, তিনি লিখেছেন, ‘… অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ছে। আপনার (জিয়া) সাথে আমার অনেক স্মৃতি আছে, অনেক মিল আছে। আপনি যুদ্ধের সময় যে ঘড়িটা ব্যবহার করতেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও সে ঘড়িটা হাতে আছে। আমি আমার বাবার দেয়া বাড়িতেই আছি, বাবার কেনা আসবাবপত্রই ব্যবহার করছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনিও এক কাপড়ে ছিলেন, আমিও এক কাপড়েই ছিলাম। তখন যুদ্ধ করা, হানাদারদের আঘাত করা, দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপার আমাদের মাথায় ছিল না। সে সময় ভাবীদের কি অবস্থা হবে, তারা কোথায় থাকবে, ভারতে চলে আসবে কিনা – এসব ব্যাপার নিয়ে যখন কথা বলছিলেন তখন আমি আপনার সামনে ছিলাম। আপনি তাদেরকে বলেছিলেন – ‘তারা কোথায় থাকবে, কি করবে সে বিষয়ে ভাববার অবকাশ নেই। তাদেরকে তাদের মত করে সেভ থাকতে বলো।’… মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা। war time friend-এর কথা। পরে আমি শুনেছি সে সময় জেনারেল জিয়ার মিলিটারী সেক্রেটারী ছিলেন কর্নেল অলি। চট্টগ্রামে আমি আক্রান্ত হয়েছি (বিরোধীদলের মিছিলে) এবং আমার অবস্থা সংটাপন্ন – এ খবর শুনে জেনারেল জিয়া বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি কর্নেল অলিকে নির্দেশ দেন সরাসরি মেডিকেল থেকে খবরাখবর নেয়ার জন্য এবং যতক্ষণ পর্যন্ত অপারেশন হওয়ার খবর পাননি ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি জেগে ছিলেন।

… বেশ কিছুদিন পর জিয়াউর রহমান নিহত হলেন। জেনারেল জিয়া মারা গেলেন শুক্রবার রাতে। বৃহস্পতিবার রাতে আমরা চট্টগ্রাম ক্লাবে বসে তাস খেলছিলাম। দেখি কর্নেল (যে জিয়াউর রহমানকে  গুলি করে। তার নাম ঠিক মনে করতে পারছিনা) আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন – ‘মোশাররফ ভাই, আজ তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছি, সুখবর আছে আপনাকে পরে জানাব।’ আমি মনে করলাম তার হয়তো প্রমোশন হবে, ভালো কোনো জায়গায় পোস্টিং হবে হয়তো। আমি উৎসাহিত হয়ে আর কোনো প্রশ্ন করলাম না।… আমি ঘরে ফিরে এসে চুপচাপ বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। জিয়া বিএনপি করে, আমি আওয়ামী লীগের কর্মী সেটা বড় কথা নয়। জেনারেল জিয়া আমার যুদ্ধকালীন বন্ধু। আমরা জীবনবাজি রেখে

একদিন যুদ্ধ করেছি। তার মৃত্যুর খবর আমাকে বিশাল এক শুন্যতার সাগরে ঠেলে দিল।’ [ইঞ্জি: মোশাররফ হোসেন (আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী) ‘ফেলে আসা দিনগুলি’, তৃপ্তি প্রকাশ-জুন ২০১১, পৃ. ১৪৯-১৭২]

এবার দেখি কাদের সিদ্দিকী কি লিখেছেন জিয়া সম্পর্কে, ‘… ১৪ই সেপ্টেম্বর। বেলা এগারোটা। ঘড়ির কাঁটার সাথে মিল রেখে একজন ক্যাপ্টেনকে নিয়ে কর্নেল জিয়াউর রহমান আমাদের ক্যাম্পে এলেন। জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানানোর জন্য আবদুল হাকিম, লোকমান হোসেন, মনিরুল ইসলাম, হুমায়ুন, বেনু ও অন্যান্য কোম্পানি কমান্ডার সহ আরো প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আমরা দু’সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গাড়ী থেকে নামতেই জিয়াকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানালাম। সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে কর্নেল জিয়া অভিবাদন মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। দু’হাজার মুক্তিযোদ্ধা তাকে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানাল। এরপর আমি জিয়াউর রহমানকে সম্বর্ধিত করে স্বাগত ভাষণ দিলাম। কর্নেল জিয়া জবাবে টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন এবং তাদের নেতা হিসাবে বারবার আমার আন্তরিক প্রশংসা করতে লাগলেন। মুক্তিযোদ্ধারা খুবই আগ্রহের সাথে জিয়ার দীর্ঘ বক্তৃতা শুনল। জিয়ার বক্তৃতায় আমার প্রতি তার অকৃত্রিম বন্ধুত্বের পরিচয় পেয়ে সহযোদ্ধাগণ বেশ অনুপ্রাণিত হল। শেষে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমান প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নানা ধরণের আলাপ আলোচনা, মেলামেশা করে প্রায় তিন-চারশ’ মুক্তিযোদ্ধার সাথে খাবার খেলেন। খাওয়া শেষে তাকে বিদায় জানালাম। ছয়-সাত দিন আগে কর্নেল জিয়াও তার ক্যাম্পে আমাকে এমনি সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন।’ [স্বাধীনতা ’৭১-বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরোত্তম; বঙ্গবন্ধু প্রকাশনী-জানুয়ারী ১৯৮৫, পৃ. ৪১৪]

এর পরেও কি চলবে জিয়াকে নিয়ে সমালোচনা?  এর পরেও কি সমালোচকদের মুখ বন্ধ হবে না!

মুজতবা খন্দকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
mujtobantv@gmail.com