এমপিদের প্রচারণার সুযোগ দিয়ে তোপের মুখে নির্বাচন কমিশন

0

সিটি নির্বাচনে এমপিদের প্রচারণার সুযোগ দিয়ে আচরণবিধি সংশোধনের ফলে ভোটের মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এমপিরা এলাকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা প্রচারণায় নামলে পরিস্থিতি ইসির নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে ইসি ভাবমূর্তির সংকটে পড়বে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। নির্বাচন কমিশনের এ সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এমপিরা যখন এলাকায় যান তখন নানা ধরনের প্রভাব তৈরি হয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ, প্রশাসন তাদের কথা শোনে। কারণ, আমাদের এখানে স্থানীয় এমপিরা সবকিছুর শীর্ষে থাকেন। ফলে পরিস্থিতি ইসির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত ভালো হয়নি। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার যে ধারণা সেদিক বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মূলত এমপিরা স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ক্ষমতাবান হন। যদি এটি বাস্তবায়ন হয় তাহলে প্রতিপক্ষ প্রচারণার সুযোগ পাবে না। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এক কথায় বলা যায়, প্রচারণার জন্য প্রার্থীদের সমতল পরিবেশ থাকবে না। সুজন সম্পাদক বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এমপিরা প্রচারের সুযোগ পেলে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। এমপিরা নিজ এলাকায় প্রচণ্ড প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী। যেসব দলের এমপি নেই তারা বৈষম্যের শিকার হবেন। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অন্তরায় হবে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, সিটি করপোরেশনের আচরণবিধির এমন সংশোধনী ইসির ভাবমূর্তি সংকট আরও ঘনীভূত করবে। খুলনা সিটি নির্বাচনে গণগ্রেপ্তারে নীরব ভূমিকা, ভোটের দিন পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা- এসব নিয়ে ইসিকে প্রশ্নের সম্মুখে পড়তে হয়েছে। এ মুহূর্তে ইসির সিদ্ধান্তে জনমনে আরও প্রশ্ন ও সন্দেহ বাড়াবে; নিরপেক্ষতার সংকটও তৈরি করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি অন্য দেশেও সংসদ সদস্যদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রচারের সুযোগ থাকার কথা বলেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক তোফায়েল বলেন, কিন্তু তাদের নির্বাচনী কালচার আর বাংলাদেশের কালচার এক নয়। এখানকার এমপিরা স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনে সম্পৃক্ত। সেক্ষেত্রে তাদের দূরে রাখাই ভালো। এর আগে কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে কমিশন সিটি নির্বাচনে এমপিদের প্রচারণার সুযোগ প্রদানের উদ্যোগ নিলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তারা সরে এসেছিল। ২০০৯ সালে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন কমিশন এমপিদের নির্বাচনী প্রচারের বাইরে রাখার বিষয়টি বিধিমালায় যুক্ত করে।

পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তের পর মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারের সুযোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তৎকালীন কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন। প্রাথমিকভাবে মন্ত্রী-এমপিদের নাম উল্লেখ না করে সরকারি সুবিধাভোগীদের প্রচারের (সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র বাদ দিয়ে) সুযোগ করে দিয়ে খসড়া তৈরি করে। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যে সরকারি সুবিধাভোগীদের সফর ও প্রচারণায় অংশ নেয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আচরণবিধি চূড়ান্ত করা হয়। এ ধারাবাহিকতায় সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মন্ত্রী-এমপিদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আচরণবিধি করা হয়। এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

কেএম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর কুমিল্লা সিটি ভোট সামনে রেখেও আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন বেশি নিরপেক্ষতা দেখাতে গিয়ে সরকারি দলের প্রতি বেশি নিষ্ঠুর আচরণ করছে। এবারে গাজীপুর ও খুলনার সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মন্ত্রী-এমপির ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণারোপ না করার দাবি জানায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

গত বৃহস্পতিবার কমিশন সভায় এমপিদের প্রচারণার সুযোগ রেখে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণবিধিমালা সংশোধনের অনুমোদন দেয় ইসি।