এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ

0

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তারার মতো জ্বলজ্বলে উজ্জ্বলতম একটি নাম। মুক্তিযুদ্ধ তথা পরবর্তী সময়ে ভগ্নদশায় পড়া একটি দেশ ও জাতির পুনর্গঠনে অসামান্য অবদান রাখা এই জাতীয়তাবাদী মহান নেতার পরিচয় এখানেই শেষ নয়। বহুলাংশে তিনি পরিচিত বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, অসমসাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার এবং সর্বোপরি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে।

৩০ মে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকী। ঠিক সাড়ে তিন দশক আগে ১৯৮১ সালের এই দিনে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন তিনি।

জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল মনসুর রহমান এবং মাতার নাম ছিল জাহানারা খাতুন ওরফে রানী। পাঁচ ভাইদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর পিতা কলকাতা শহরে এক সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর শৈশবের কিছুকাল বগুড়ার গ্রামে ও কিছুকাল কলকাতা শহরে অতিবাহিত হয়।

ভারতবর্ষ বিভাগের পর তাঁর পিতা পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহরে চলে যান। তখন জিয়া কলকাতার হেয়ার স্কুল ত্যাগ করেন এবং করাচি একাডেমী স্কুলে ভর্তি হন। ওই স্কুল থেকে তিনি ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং তারপর ১৯৫৩ সালে করাচিতে ডি.জে. কলেজে ভর্তি হন। একই বছর তিনি অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন কাকুল মিলিটারি একাডেমীতে। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদ লাভ করেন।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে লাহোর সীমান্তের খেমকারান সেক্টরে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ভারতের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে দেয়া হয় পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক উপাধি।

১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে পেশাদার ইনস্ট্রাক্টর পদে নিয়োগ লাভ করেন। সে বছরই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটার স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়ে জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন। অ্যাডভান্সড মিলিটারি এন্ড কমান্ড ট্রেনিং কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানিতে যান এবং কয়েক মাস বৃটিশ আর্মির সাথেও কাজ করেন। ১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন।

স্বাধিকারের প্রশ্নে সারা দেশে তখন উত্তাল। যুদ্ধের দামামা বাজছে চতুর্দিকে। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাক সেনারা। জাতি দিশেহারা হয়ে উঠে। ঠিক তখনই জাতিকে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর ব্রত গ্রহণ করেন মেজর জিয়া।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করে জাতিকে নতুন যুদ্ধোন্মাদনায় উজ্জীবিত করেন। এরপর তার নেতৃত্বে অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে এবং যুদ্ধকালে প্রথমে তিনি সেক্টর কমান্ডার ও পরে জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট নিযুক্ত হন চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করলে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। এরপর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠন করেন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি-বিএনপি, যে দলটি বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম দুটি রাজনৈতিক দলের একটি এবং বারবার জনগণ যাদের ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে বিপথগামী সেনাদের হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। সেদিন বিএনপি নেতা আ স ম হান্নান শাহ জিয়ার লাশ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম থেকে অসীম সাহসিকতায় ঢাকায় নিয়ে আসেন।

তখন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের মধ্যে ২ জুন দৈনিক আজাদ পত্রিকা শিরোনাম করে ‘একটি কফিনের পাশে গোটা বাংলাদেশ’ খবরটি তারা ৮ কলাম জুড়ে প্রকাশ করে। দৈনিক ইত্তেফাক এই দিন শিরোনাম করে, ‘ঢাকায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার মরদেহ : অগণিত মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি’ এবং ‘রাঙ্গুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশে জিয়ার লাশ চাপা দেওয়া হয়’।

এর পরদিন দৈনিক আজাদ পত্রিকা শিরোনাম করে ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাই তুমি করে গেলে দান’ এবং ‘পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাশ দাফন’ শিরোনামে ৮ কালামে প্রকাশ করে।

ওই দিন পত্রিকাগুলোর রিপোর্টে বলা হয় : সকাল ১০ টায় চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৭ মাইল দূরে রাঙ্গুনিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ের ঢালুতে নিহত কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজের মাঝে কবর দেওয়া হয় প্রেসিডেন্ট জিয়াকে। ইত্তেফাকের রিপোর্টে বলা হয়, ‘ত্রিপলে জড়াইয়া লাশ তিনটি প্রোথিত হয়’ সেই রক্তাক্ত ত্রিফলও খুড়িয়া বাহির করা হইয়াছে। হত্যাকারীরা ১ লা জুন সকালে পাহাড়তলী বাজার থেকে তালেব আলীসহ আরও দুইজন লোককে লইয়া শনিবার সকালে উক্ত কবর খোঁড়ায়। তাহাদের প্রতিজনকে ২৫ টাকা হারে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। স্থানীয় মাজার থেকে ১০০ টাকা দিয়া একজন মৌলভীকে আনা হইয়াছিল। এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ৩ জন ছাত্র কোতোয়ালী থানায় রিপোর্ট করলে প্রেসিডিন্টের লাশ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাহাড়ের পাদদেশবর্তী কবরের স্থানটিকে স্থানীয় জনসাধারণ সাদা কাপড় দিয়া ঘিরিয়া দিয়াছে। সেখানে কোরআন তেলাওয়াত চলিতেছে’।

এইভাবে বাংলার মাটিতে আরও একবার ঘনিয়ে এসেছিল করুণ অন্ধকার। সূর্যে লেগেছিল গ্রহণ। কুচক্রীরা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে কী পেতে চেয়েছিল, তা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে দেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল আমরা কি আজও তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি? এটিই আজকের প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।