এ কেমন মধ্যম আয়ের দেশ যাদের মাথা পিছু আয় ১২শ ডলারের বেশী সেই দেশের মানুষ সামান্য ইফতারের জন্য একদিন আগে থেকেই লাইনে দারিয়ে থাকে …?

0

২০০৭ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় ইফতার সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে নিহত হয়েছিল ছয়জন। প্রায় ১১ বছর পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। তবে, আরো ভয়াবহ রূপে। এবার মরল দশজন।

আজ সোমবার সকালে উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসার মাঠে এ ঘটনা ঘটে।

প্রতিবছর এই এলাকায় ইস্পাত তৈরির প্রতিষ্ঠান কবির স্টিল রোলিং মিলসের (কেএসআরএম) মালিক মো. শাহজাহান দুস্থ ও দরিদ্রদের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নেন। এবারও এই আয়োজন করেন তিনি।

কিন্তু ইফতার সামগ্রী নিতে গিয়ে চলে গেলো ১০টি প্রাণ। এই মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, চাপাচাপিতে পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর কথা। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে উল্টো। ধারণার চেয়ে বেশি মানুষ এসেছে স্বীকার করলেও কোনো ধরনের চাপাচাপি হয়নি বলে তাদের দাবি।

ইফতার সামগ্রী নিতে আসা ভুক্তভোগী এক নারী বলেন, ‘সকাল ৬টা বাজে আইছি গো বাবাজি। চাপে মরছে। আমার মাইয়া মইরা যাইতে নিছে, টান দিয়া লইয়া আইছি। ঢুকার সময় চাপাচাপিতে মইরা গেছে।’

আরেক নারী যিনি ইফতার সামগ্রী আনতে গিয়েছিলেন। তবে চাপাচাপিতে না নিতে পেরে ফিরে এসেছেন। প্রশ্ন করা হলে বলেন, ‘বারবার কষ্ট পাই কিন্তু জিনিস ন পাই।’

কেএসআরএমের উপ-মহাব্যবস্থাপক রফিক বলেন, ‘এটা আমাদের কর্মসূচি ছিল। আমরা প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫ হাজারের মতো মানুষের জন্য বিনামূল্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা করি। ওই পরিমাণেই ছিল। মানুষ এবার অনেক বেশি আসছে। আমাদের ধারণা, সেটা বাঁশখালী এবং রোহিঙ্গা। প্রচুর রোহিঙ্গা এখানে আছে। এখনো পর্যন্ত আমরা দুজনের লাশ শনাক্ত করতে পারিনি। বুঝতে পারছি না। ভাষা তো একই। এবং চেহারা দেখেও বোঝার কোনো কায়দা নাই। যেহেতু আমরা শনাক্ত করতে পারছি না, যে এটা কোন এলাকার, যেমন বাঁশখালী, লোহাগড়া, চকরিয়া, বা সাতকানিয়া যেসব জায়গা আছে, তাদের লোকজন আছে তো। আমরা তো দেখাইছি, এরা কারা। বা কোত্থেকে আসছে। শুরু করার কথা ছিলো, সকাল সাড়ে সাতটা থেকে না, আটটা থেকে।’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এমরান ভূঁইয়া বলেন, ‘উনাদের এই যে, পরিবার, পারিবারিক এলাকা এইটা। বছরে তারা রমজান উপলক্ষে ইফতার সামগ্রী, কিছু নগদ টাকা এবং তাদের কিছু কাপড় বিতরণ এখানে করে। সেই সূত্রে এখানে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও তারা আয়োজন করেছে। তাদের যে পরিমাণ আয়োজন ছিল বা যে পরিমাণ মানুষ হবে বলে তারা ধারণা করেছে তার চাইতে প্রায় ৫ থেকে ৭ গুণ মানুষ এখানে হয়েছে। এবং আরেকটি বিষয় হয়েছে যে গতকাল রাত থেকে তারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। যাতে খুব দ্রুত তারা এখান থেকে রিলিফ মেটারিয়ালটা নিতে পারে। অনেকক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে প্রচণ্ড গরমের কারণে, কিছু লোক অসুস্থ হয়ে এখানে মৃত্যুবরণ করে। এই পর্যন্ত আমরা ১০ জনের লাশ পেয়েছি। এর মধ্যে আমরা সাতজনকে শনাক্ত করতে পেরেছি। আর বাকি তিনজনের পরিচয় আমরা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।’

চাপাচাপিতে বা পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যু হতে পারে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘ওই ধরনের ঘটনা আমরা এখানে এসে পাই নাই। আমরা যেটা দেখেছি, সেটা হলো, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে, অধিকাংশ মানুষ এখানে বোরকা পড়ে এসেছে, প্রচণ্ড গরম ছিল। আর তারা অনেকটা ক্ষুধার্ত ছিল। শারীরিকভাবে তাদের ততটা সক্ষমতা ছিল না। যার কারণে এ রকমটা হয়েছে। হুড়াহুড়ি বেসিক্যালি এখানে ও রকমটা ঘটেনি।’

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোবারক হোসেন বলেন, ‘সকাল বেলা ইফতার সামগ্রী নেওয়ার জন্যে প্রচুর মানুষ এসেছে। তাদের প্রেসারে এই ঘটনাটা ঘটেছে। ভিড়ের চাপাচাপিতে হয়তো পদদলিত হয়ে ঘটনাটা ঘটে থাকতে পারে। এটা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। আমাদেরকে আসলে তারা (কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ) অবহিত করেনি, তথ্য দেয়নি। ইফতার সামগ্রী যে বিতরণ করবে, এটা প্রশাসনকে জানায়নি। তারা তাদের মতো করে অ্যারেঞ্জ করেছে। আমরা উপজেলা প্রশাসন কিংবা জেলা প্রশাসন বিষয়টা অবহিত নই। আমাদের জানা থাকলে হয়তো, অন্যভাবে সহযোগিতা করতে পারতাম। অথবা আমরা, যেহেতু অতীতেও এ ঘটনা ঘটেছে, আমরা এ বিষয়গুলোকে এখন ডিসকারেজ করি। আমরা এখানে এসে যা শুনেছি, সবাই বলতেছে, ২০০৪ সালের দিকেও এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে।’

নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘আসলে কেএসআরএম পরিবার তো প্রতি বছরই জাকাত এবং ইফতার সামগ্রী বিতরণ করে থাকে। তো প্রতিবারের মতো উনারা এইবারও উদ্যোগটা নিলেন। এটা গতকালই আমি জানতে পারছি। আজকে সকাল ১১টার দিকে আমার কাছে খবর আসলো যে এখানে একটা দুর্ঘটনা হলো আর কি। ঘটনাস্থলে এসে দেখলাম যে, ধারণ ক্ষমতার চাইতে অনেক বেশি লোকের সমাগম ছিল এইখানে। এটা শুধু আমার উপজেলায় না, পার্শ্ববর্তী উপজেলা এবং বান্দরবান থেকেও লোকজনের সমাগম ছিল। প্রচণ্ড ভিড় ও গরমে হিটস্ট্রোক করে মারা গেছে। ঘটনাস্থলে নয়জন মারা গেছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো একজন মারা গেছে। সবাই মহিলা।’ উৎস- এনটিভি