একনজরে পৃথিবীর দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা “মোসাদ”

0

পৃথিবীর সব বড় ও মাঝারি শক্তিধর দেশেরই নিজস্ব বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে । যেমন সিআইএ, এমআইসিক্স , কেজিবি, মোসাদ ইত্যাদি ।
কিন্তু ইসরায়েলের ‘মোসাদ’কে ঘিরে যেসব রহস্যজনক ও চাঞ্চল্যকর গল্প চালু আছে, তার কোন তুলনা হয়না । মোসাদের নামতো কমবেশি সবাই শুনেছেন মাসুদ রানা পড়লে আরও আগে জানার কথা । মোসাদের এমন কিছু অপারেশন রয়েছে যেগুলো গল্পের বই বা সিনেমা কেও হার মানায় । এই গ্রুপটি WORLD MOST EFFICENT KILLING MACHINE নামেও পরিচিত। গুপ্ত হত্যায় মোসাদ এক এবং অদ্বিতীয়। মার্কিন সিআইএ এবং মোসাদের ভিতরে পার্থক্য রয়েছে যে সিআইএ গুপ্ত হত্যার চেয়ে সরাসরি হামলা বেশি চালায় । অন্যদিকে মোসাদ খুব গোপনে তাদের শিকারদের শেষ করে ।

মোসাদ:

হিব্রু ভাষায় ‘মোসাদ’ শব্দের অর্থ ইন্সটিটিউট৷ । আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার নাম ‘দ্য ইন্সিটিটিউট অফ ইনটেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অপারেশনস’ । উল্লেখ্য, ইসরায়েলে আরও দু’টি গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে – অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার নাম ‘শিন বেত(Shin bett)’ এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার নাম ‘আগাফ হা-মোদি’ইন’ – সংক্ষেপে ‘আমন’ ।(Aman)

মোসাদ গঠনের ইতিহাস:

আরব লীগের প্রত্যাখানের মুখে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে দখলভূমিতে ইসরাইলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। ইউরোপে ইহুদী নিধনযজ্ঞ বা ‘শোয়া’র দুঃস্বপ্ন ভুলতে পারে নি সেদেশের মানুষ৷ ফলে আরও একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দূর করতে যে কোন পদক্ষেপ নিতে শুরু থেকেই প্রস্তুত ছোট্ট এই ইহুদী রাষ্ট্র৷ রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার ১৯ মাসের মাথায় দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডাভিড বেন গুরিয়ন ‘মোসাদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ডিসেম্বর ১৩, ১৯৪৯ সালে দ্য সেন্ট্রাল ইন্সিটিটিউট ফর করডিনেসন নামে মোসাদের কর্যক্রম শুরু হয় তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালের মার্চে। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আগেই যেসব ইহুদি নিষিদ্ধ সংগঠন সংগ্রাম চালাচ্ছিল,তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে যে কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তাকে ‘মোসাদ’ এর পূর্বসূরি বলা হয়। মোসাদ সামরিক সার্ভিস নয়। যদিওঅধিকাংশ কর্মকর্তাই ইসরাইলের ডিফেন্স ফোর্সের। ১৯৪৯ সালে মোসাদের জন্ম হলেও ১৯৯৬ পর্যন্ত কেউই জানতো না এই সংস্হাটার প্রধানের কথা। ১৯৯৬ সালে যখন সাবতাই কে অপসারন করে ডেনি ইয়াতমকে নিয়োগ দেওয়া হয় এক ঘোষনার মাধ্যমে, তখন প্রথমবারের মত বিশ্ববাসী জানতে পারে এই সংস্হাটার প্রধান কে। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ২৮তম কম্যুনিস্ট সম্মেলনে যখন নিকিটা ক্রুশ্চেভ এক গোপন মিটিংয়ে ‘স্টালিনকে’ অভিযুক্ত ও অস্বীকার করে নিজেই প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষনা করে, ঐ বক্তব্যের এক কপি মোসাদ সিআইএর হাতে দিয়ে দেয়। এই প্রথম সিআইএ মোসাদের কার্যক্রম উপলব্ধি করে যাতে সিআইএ অবিভূত হয়। কারন সিআইএর মত সংস্হাটিও এই রকম একটা সেন্সেটিভ সংবাদ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছিল।

মোসাদের কাজ:

মোসাদের নীতিমালা ও কার্যক্রম অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ , যুক্তরাজ্যের এমআই৬ ও কানাডার সিএসআইএস এর অনুরূপ। মোসাদের হেডকোয়ার্টার তেলআবিবে।অন্যান্য বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার তুলনায় ‘মোসাদ’এর দায়িত্ব বা কাজের পরিধির বেশ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় । সংস্থাটির স্বঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের সীমানার বাইরে গোপনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা, শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলি যাতে বিশেষ ধরনের অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা এবং দেশে-বিদেশে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর উপর হামলার ষড়যন্ত্র আগাম প্রতিরোধ করা । এছাড়া তালিকায় রয়েছে আরও কিছু উদ্দেশ্য । যেসব দেশে ইসরায়েলের অভিবাসন সংস্থা আইনত সক্রিয় হতে পারে না, সেই সব দেশ থেকে ইহুদিদের ইসরায়েলে নিয়ে আসার দায়িত্বও পালন করে ‘মোসাদ’ । মনে রাখতে হবে, বিশ্বের যে কোন ইহুদি ব্যক্তির জন্য ইসরায়েলের দ্বার খোলা রয়েছে, যাতে তারা সেখানেই পাকাপাকি বসবাস করতে পারে । ইসরায়েলের সীমানার বাইরে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা ও কার্যকর করার বিশেষ দায়িত্বও পালন করে ‘মোসাদ’ ।

নির্বাহী অফিস:

ইসরায়েলি সামরিক ও অসামরিক গোয়েন্দা বিভাগের বাছাই করা কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত মোসাদের মোট আটটি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ডিপার্টমেন্টের কিছু তথ্য জানা যায় :

১.কালেকশন ডিপার্টমেন্ট: এটি মোসাদের সবচেয়ে বড় বিভাগ। বহির্বিশ্বে ডিপ্লোম্যাট, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ অন্যান্য ছদ্মবেশে কাজ করেন এই বিভাগের এজেন্টরা।

২.পলিটিক্যাল অ্যাকশন এবং লিয়াজোঁ ডিপার্টমেন্ট: এ গ্রুপের কাজপ্রতিটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশের গোয়েন্দা ও গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করা।

৩.স্পেশাল অপারেশন ডিপার্টমেন্ট: এই গ্রুপকে গুপ্তহত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়।

৪.ল্যাপ ডিপার্টমেন্ট: এই গ্রুপ প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মনস্তাত্ত্বিকযুদ্ধের জন্য প্রচার চালায় ও শত্রু শিবিরে ভুল খবর ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

৫.রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট: যাবতীয় গোয়েন্দা গবেষণা ও ‘কাউন্টার ইনটেলিজেন্স’-এর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির নিরন্তর কাজ করে চলেন এই গ্রুপের গবেষকরা।

মোসাদের পরিচালকগণ:

(শুরু থেকে অদ্যবধি)

১.রিউভেন শিলোয়াহ : দায়িত্বকাল- ১৯৫১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১৯৫২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। মোসাদ প্রতিষ্ঠার আগে তিনি দ্য সেন্ট্রাল ইন্সিটিটিউট ফর করডিনেসন-এর ডিরেক্টর ছিলেন।

২.ইসার হারেল : দায়িত্বকাল- ১৯৫২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত।

৩.মীর অমিত : দায়িত্বকাল- ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত।

৪.ভি যামির : দায়িত্বকাল- ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত।

৫.ঈঝাক হোফি : দায়িত্বকাল- ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত।

৬.নাহুম আদমনি : দায়িত্বকাল- ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত।

৭.শাবতাই শাভিত : দায়িত্বকাল- ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত।

৮.দানি ইয়াতুম : দায়িত্বকাল- ১৯৯৬ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত।

৯.ইফরাইম হেলভি : দায়িত্বকাল- ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত।

১০.মির দাগান : দায়িত্বকাল- ২০০২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত।

১১.তামির পারদো : দায়িত্বকাল- ২০১১ সাল থেকে বর্তমান।

বিভিন্ন দেশে মোসাদের কার্যক্রম ও অপারেশনের অভিযোগ:

১.অনেকদিন থেকে নাযি ওয়ারে অভিযুক্ত এডল্ফ ইচম্যানকে খুজছিল মোসাদ। ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনায় তার খোঁজ পাওয়া যায়। ওই বছরের ১১মে মোসাদের এজেন্টদের একদল টিম তাকে গোপনে আটক করে ইসরাইল নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে উত্তর ইউরোপে ক্যাম্প গঠন ও পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে ইহুদিদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়। ইসরাইলের আদালতে একটি সাজানো বিচারের মাধ্যমে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। একই অভিযোগে জোসফ মেনজেলকে আটকের চেষ্টা ব্যার্থ হয়। ১৯৬৫ সালে নাযি ওয়ারে অভিযুক্ত লাটভিয়ার বৈমানিক হার্বার্টস কুকার্সকে উরুগুয়ে থেকে ফ্রান্স হয়ে ব্রাজিল যাওয়ার পথে মোসাদের এজেন্টরা হত্যা করে। ১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও কুটনৈতিক এবং চিলির প্রাক্তন মন্ত্রী অরল্যান্ডো লেটেলারকে ওয়াশিংটন ডিসিতে গাড়ি বোমায় হত্যা করে চিলির ডিআইএনএ’র এজেন্টরা। পরবর্তীতে জানা যায়, এটি ছিল মোসাদের একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। তার সাথে তার সহকারী রনি কার্পেন মোফিট্টও খুন হন। রনি কার্পেন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।

২.১৯৬০ সালে ফ্রান্সের মিরাজ ফাইভ জেড বিমানের প্রযুক্তিগত দিকের বিভিন্ন দলিল চুরি করে নেয় মোসাদ। পরে ইসরাইল ওই প্রযুক্তিকে আরো উন্নত ও যেকোনো আবহাওয়ার উপযোগি করে জে৭৯ নামের ইলেক্ট্রিক টার্বোজেট ইঞ্জিন তৈরি করে। ফ্রান্স শিপইয়ার্ডে পাঁচটি মিসাইল বোট দিতে ফ্রান্সের সাথে চুক্তি করে ইসরাইল। কিন্তু ১৯৬৯ সালের ফ্রান্সে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে মিসাইল বোট সরবরাহ করেনি মোসাদ। ১৯৬৮ সালের একটি ঘটনা। ইসরাইলের একটি শিপে ২০০টন ইউরেনিয়াম অক্সাইড সরবরাহ করতে একটি কার্গো বিমান যাত্রা শুরু করেছিল। জার্মনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমানটি তাদের রাডারের বাইরে চলে যায়। পরে তুরস্কের একটি পোর্টের রাডারে এটি ধরা পড়লে ওই কার্গো বিমান থেকে বলা হয় পথ হারিয়ে তারা এদিকে চলে এসেছে এবং তাদের জ্বালানী ফুরিয়ে গেছে। গালফ থেকে জ্বালানী নিয়ে তারা আবার ফিরে যাবে। পরে তার নিরাপদে ওই ইউরেনিয়াম অক্সাইড ইসরাইলের একটি শিপে খালাস করে। এটি ছিল রেকেম ও মোসাদের একটি যৌথ অপারেশন। এটি অপারেশন প্লামব্যাট নামে পরিচিত। ইউরেনিয়াম অক্সাইড পারমাণবিক বোমার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭২ সালে মোসাদ জার্মানীর বিভিন্ন টার্গেট ব্যক্তির কাছে পত্র বোমা পাঠিয়েছিল। চিঠি খুললেই বোমা ফুটবে এবং সে মারা যাবে। অধিকাংশ চিঠিই পাঠানো হয়েছি নাযি যুদ্ধে অভিযুক্ত এলোস ব্রানারের কাছে। অবশ্য মোসাদের এ প্রচেষ্টা জানাজানি হয়ে যায় এবং ব্যর্থ হয়।

৩.যুদ্ধের সময় বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ার রাজধানী সারাজেভো থেকে বিমান ও স্থলপথে ইহুদিদের ইসরাইলে স্থানান্তর করা হয় মোসোদের পরিকল্পনায়।

৪.১৯৫৭ সালে মিশরে ওলফগ্যাং লজের নেতৃত্বে গোয়েন্দা মিশন পাঠায় মোসাদ। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি মিশরে গামাল আবদেল নাসেরের সামরিক বাহিনী ও তার যুদ্ধোপকরণ ও কৌশল জানতে গোয়েন্দা তৎপরতায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৪ সালে লজের চেয়ে বড় মিশন নিয়ে মিশরে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করেন মোসাদের আর এক স্পাই ইলি কৌহেন। তার সহযোগিতায় ছিল হাই প্রোফাইলের বেশ কয়েকজন স্পাই। ইলি কৌহেন ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে সিরিয়ায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে তথ্য পাঠানোর সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হন। মিশর ও সিরিয়ায় মোসাদ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রেডিও লিঙ্ক স্থাপন করেছিল। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ইসরাইলের বিপক্ষে ছিল মিশর, জরডান ও সিরিয়া। এই যুদ্ধটি সিক্স-ডে ওয়ার নামে পরিচিত। যুদ্ধ শেষ হলেও এর রেশ ছিল দীর্ঘ দিন। ১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই মিশরের ছোট দ্বীপ গ্রিন আয়ল্যান্ডে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্স আকস্মিক হামলা চালায়। মোসাদ এই অভিযানের নাম দেয় অপারেশন বালমাস সিক্স। পরবর্তীতে অনেক ইসরাইলী ইহুদি ও পর্যটকরা সিনাই হতে মিশর আসে অবকাশ যাপনের জন্য। মোসাদ নিয়মিত এসব পর্যটকদের নিরাপত্তা দেখভালের জন্য গোয়েন্দা পাঠাত। ধারণা করা হয় এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

৫.ইসরাইল ইরানকে বড় ধরণের হুমকি মনে করে। ফলে মোসাদের তৎপরতা ইরানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ড. আরদেশির হোসেনপুরকে হত্যা করে মোসাদ। মৃত্যুর ছয় দিন পর আল কুদস ডেইলি তার নিহতের খবর প্রচার করে। প্রথম দিকে তিনি গ্যাস বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে দেশের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। ওয়াশিংটনের প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্রাটফোর হোসেনপুরকে মোসাদের টার্গেট ছিল বলে উল্লেখ করে। অবশ্য মোসাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। হোসেনপুর ছিলেন ইরানের একজন জুনিয়র সহকারী অধ্যাপক। ২০০৩ সাল থেকে ইরানে মোসদের হয়ে কাজ করতেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা আসগারি। তিনি মোহাম্মদ খাতামী প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ইরানের সহকারী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাকে সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসাননি।

৬.ইসরাইল বিমান বাহিনী যাদুঘরে সাবেক ইরাকি মিগ-২১, হাজেরীম সিআইএ’র সহায়তায় ইরাকে বাথ পার্টির শীর্ষনেতা আরিফ রহমান ও পরবর্তীকালে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় আসলেও ইরাককে বিশ্বাস করত না ইসরাইল। এজন্য ইরাকে ইসরাইলের গোয়েন্দা তৎপরতার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ইরাকে সিআইএ মোসাদের সহযোগি হিসেবে কাজ করেছে। ইরাকে অনেকগুলো বড় অপারেশন চালায় মোসাদ। এর একটি হচ্ছে ১৯৬৬ সালে। মিগ ২১ জঙ্গী বিমানের পাইলট ছিলেন খৃস্টান বংশদ্ভূত মুনির রিদফা। ১৯৬৬ সালে তাকে বিমানসহ কৌশলে ইরাক থেকে ইসরাইল নিয়ে আসে মোসাদ। তার কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ব্যবহার করা হয় ইরাক বিরোধী প্রচারণায়। সংবাদ সম্মেলন করে ইরাকে খৃস্টান নিধনের প্রচারণাও চালানো হয়। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ইরাকের অসরিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর’র (নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার শক্তি উৎপাদনের জন্য যন্ত্রবিশেষ) স্পর্শকাতর কিছু বিষয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা চালায়। এই অপারেশনের নাম দেয়া হয় অপারেশন স্ফিঙকস। ইরাক এই গবেষণা সম্পন্ন করতে পারলে পারমানবিক গবেষণায় বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে অগ্রবর্তী থাকত। মোসাদ মনে করেছিল এখনই যদি এই প্রোগ্রাম ধ্বংস করা না হয় তাহলে শিগগিরই গবেষণা সেন্টারে পারমানবিক অস্ত্রের কাঁচামাল সরবরাহ করা হবে। এজন্য ১৯৮১ সালের ১৭ জুন এফ-১৬এ যুদ্ধ বিমানে বিপুল গোলাবারুদসহ একটি ইউনিটকে পাঠানো হয় ইরাকের এই প্রকল্প ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। ইরাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই বোমা হামলা করে অসরিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর’র ব্যাপক ক্ষতি করে। ইরাক পরে আর এ প্রকল্পটি অব্যাহত রাখতে পারেনি। এই হামলাটি অপারেশন অপেরা নামে পরিচিত। কানাডার বিজ্ঞানী গিরাল্ড বুল বিভিন্ন দেশে স্যাটেলাইট গবেষণায় কাজ করতেন। ইরাক স্যাটেলাইট উন্নয়ন প্রোগ্রাম ‘প্রোজেক্ট ব্যবিলন’-এর ডিজাইন করলে তাকে ১৯৯০ সালের ২২ মার্চ বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে তার বাড়ির বাইরে গুলি করে হত্যা করে মোসাদ।

৭.ইসরাইলের পারমাণবিক প্রোগ্রামের গোপন তথ্য বৃটিশে পাচার করার কারণে ১৯৮৬ সালে ইতালির রাজধানী রোম থেকে ইসরাইল নাগরিক মোডাচাই ভ্যানুনুকে অপহরণ করে ইসরাইল নিয়ে আসে মোসাদ। পরে তাকে জেলে ঢুকানো হয়।

৮.১৯৭০ সালে ফিলিস্তিনে এক নয়া গ্রুপ গড়ে উঠে ব্লাক সেপ্টেম্বর নামে। জার্মানির মিউনিখে অলিম্পিক গেমস চলাকালে এরা ১১ জন ইসরাইলী এথলেটকে কিডন্যাপ করে। ২০০ ফিলিস্তিনির মুক্তি ও নিজেদের সেইফ পেসেজ দেওয়া ছিলো ওদের দাবী, জার্মান সরকার মেনে নেয় এবং চুক্তির জন্য মিলিটারি এয়ারপোর্টে আসতে বলে। মিলিটারি এয়ারপোর্টে জার্মান এয়ার ফোর্স কমান্ডোরা আগে হতেই প্রস্তুত ছিলো। অপহরনকারীরা যখনই বুঝতে পারে ওদের ফাদে ফেলা হয়েছে তখনই সব বন্দী এথলেটদের হত্যা করা হয়। পুলিশের পাল্টাগুলিতে ৫ জন অপহরনকারী নিহত ও তিন জন বন্দী হয়। ঘটনাটি ছিলো অতি ভয়াবহ। মোসাদ স্পেশাল টিম গঠন করে অপারেশান রথ অফ গড ঘোষণা করে। পুরো ইউরোপ জুড়ে ব্লাক সেপ্টেম্বর গ্রুপকে খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়।৭২ হতে ৭৩ পর্যন্ত এই গুপ্তহত্যার কাজ চলতে থাকে। পিএলওর নেতারা প্রায় দিশা হারাবার উপক্রম। ইউরোপ জুড়ে মোসাদের এই হান্টিং ডাউনে ভুলক্রমে নরওয়েতে এক নিরীহ মরোক্কান ওয়েটারকে হত্যা করে ফেলে মোসাদ।নরওয়ের পুলিশ ৬ মোসাদ এজেন্টকে গ্রেফতার করে।

মোসাদের কিছু ব্যার্থ অপারেশন:

১৯৮০ হতে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মোসাদ দুর্দান্ত আকারে পিএলও এর নেতাদের হত্যা করে। পিএলও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রাম হতে। উল্টা পথে হামাসের উত্থান হতে থাকে। খালিদ মিশাল অনেক বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। ১৯৯৭ সালে খালিদ তার গাড়ি হতে নেমেই মাত্র হামাস অফিসে ঢুকবে এ সময়েই হাতে ব্যান্ডেজ লাগানো তিন জন কানাডিয়ান টুরিস্ট তার গাড়ির পাশেই দাড়িয়ে ছিলো। একজন টুরিষ্ট (মোসাদের স্পাই) হঠাৎ খালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তার কানে কিছু একটা পুশ করতে চেষ্টা করে। বিষ ঢেলে দিয়েছে তার শরীরে। হাসপাতালে ভর্তি করা হলো তাকে। খালিদের অবস্হা ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তিনি মারা যাবেন। জর্ডানের বাদশাহ হোসাইন এবার সরাসরি ফোন দেয় নেতানিয়াহুকে। যদি খালিদ মিশাল মারা যায়, তিন মোসাদ স্পাইকে খুন করা হবে, এবং ইসরাইলের সাথে শান্তি চুক্তি বাতিল হবে। এবার মোসাদের সতর্ক হয়ে উঠে। মোসাদের চীফ নিজেই ল্যাবরেটরীতে মডিফাই করা বিষের প্রতিষোধক নিয়ে আম্মানে আসেন। খালিদ মিশাল সুস্হ হয়ে উঠেন। এই ব্যর্থ হামলার ফলাফল এমনই করুন ছিলো যে মোসাদের চীফকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। খালিদ মিশালের উপর এই হামলায় কানাডার গোয়েন্দা সংস্হা (csis) ও জড়িত আছে বলে মনে করা হয়।

মূলত মোসাদের কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্য ,ইউরোপ,আমেরিকাতে। ভারতীয় উপমহাদেশে এর তেমন বিচরণ নেই।তারপরও সারাবিশ্বের মানুষের কাছে আতংক হিসেবেই সারাজীবন লেখা থাকবে “মোসাদ” এর নাম।