“একদলীয় ব্যবস্থাকেই ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন শেখ হাসিনা” : দ্যা ইকোনোমিস্ট

0

জিসাফো ডেস্কঃ একদলীয় ব্যবস্থাকেই ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন শেখ হাসিনা

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সরকার অব্যাহতভাবে দাবি করছে, দোষীদের খুঁজে বের করার তৎপরতা চলছে, তাদের ধরা হচ্ছে এবং বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে এসব হামলায় ভুক্তভোগীদের কথিত ইসলামবিরোধী অপরাধ নিয়ে সরকার যতটা সরব, হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ততটা নয়। এখানে দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতির ধারণা তৈরি হয়েছে। আর আওয়ামী লীগও ইসলামপন্থীদের তুষ্ট করছে বলে মনে করা হচ্ছে। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে বলতে গেলে এক ধরনের ঘূর্ণায়মান একদলীয় ব্যবস্থা ছিল। শেখ হাসিনা চেষ্টা করছেন একদলীয় ব্যবস্থাকেই ধরে রাখতে। তবে সেটা রদবদল ছাড়াই।

ইকোনমিস্ট আরও জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি খবরের শিরোনাম হচ্ছে কিছু অপ্রীতিকর কারণে। প্রথমে এলো ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা। ২০১৩ সাল থেকে এসব হত্যাকাণ্ডের শিকারদের মধ্যে দুই ডজনেরও বেশি ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, উদারপন্থী ও অন্যরা রয়েছেন। এদের হত্যা করা হয়েছে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে। এরপর ১১ মে মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর এলো। খবরে যা কম এসেছে তা হল, কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের পথে বাংলাদেশের অনুকম্পাহীন অধঃগতি। এই তিন ঘটনার সবই একই রোগের লক্ষণ- একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি যা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না এবং যা ক্ষমতাকে দেখে ভিন্নমত নিষ্পেষণের উপায় হিসেবে।

জামায়াত ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়লেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। নিজামীর ফাঁসি কার্যকরের পর প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। তবে তাদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। ৫ মে নিজামীর আবেদন খারিজ হওয়ার পর জামায়াতের ডাকা হরতাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়।

তবে দেশটির একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতা থেকে সরানো আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন ব্যর্থতা এবং আত্মসমৃদ্ধকরণ ও বিরোধীদের দমনে ক্ষমতা ব্যবহার করায় সৃষ্ট জনঅসন্তোষ এতে ভূমিকা রেখেছে। বিজয়ীরাই সবকিছু পাবে এমন মানসিকতা এতটা গভীরে প্রোথিত যে, অবাধ নির্বাচনের সম্ভাবনা অচিন্তনীয়। আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো কথিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু ২০০৮ সালে বিজয়ের পর, আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রীতিমুক্ত হতে সংবিধান সংশোধন করে। ফলে, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে হওয়া সর্বশেষ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। জনপ্রিয় ম্যান্ডেটবিহীন এবং বিরোধীদের কোণঠাসা অবস্থায় লীগ গণমাধ্যমের ওপর বলপ্রয়োগ ও কণ্ঠরোধ করেছে। বড় অংকের বেতন বৃদ্ধি করে সরকারি কর্মকর্তাদের নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে। আদালত, বেসামরিক প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ- প্রত্যেককে আদ্যোপান্ত রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনকে পদদলন করে বাংলাদেশ সরকার যে পার পেয়ে যেতে পারে তার পেছনে অনেকটাই ভূমিকা রাখে দুটি কারণ। একটা- দ্য ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’। এটা হল- সবকিছু সত্ত্বেও দেশটির উন্নয়নের ধারা সম্মান করার মতো। যেমন করেই হোক রাজনৈতিক বিশৃংখলা অর্থনীতির ওপর তেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। দমন-পীড়ন, প্রতিবাদ-অবরোধ আর নিয়মিত সহিংসতা সত্ত্বেও প্রতিবছর জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে ৬ শতাংশের বেশি হারে।

২য় কারণ হল, সাম্প্রতিক বিএনপি সরকারের জঘন্য দৃষ্টান্ত। তাদের অযোগ্যতা, দুর্নীতি আর কর্তৃত্বপরায়ণতা তো ছিলই। তার ওপর উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দিতে দেখা গেছে তাদের। তাদের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে। বিরোধীদল হিসেবেও বিএনপির রেকর্ড আহামরি ভালো নয়। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে, সরকার পতনের প্রচেষ্টা হিসেবে পরিবহন অবরোধ পালন করতে গিয়ে বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের পর উদারমনা, ধর্মনিরপেক্ষতার যে স্বপ্ন অনেক বাংলাদেশী দেখেছিলেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের যাবতীয় অপকর্ম সত্ত্বেও ওই স্বপ্নের উত্তরাধিকারী। তবে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো এসব আদর্শকে তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে। যারা টার্গেট হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছে নাস্তিক, উদারমনা, হিন্দু, সমকামী অধিকার কর্মী এবং সুফি মুসলিম নেতা।

মূলধারার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উগ্রপন্থী দলগুলোর বলিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। ধর্মীয় হত্যাকাণ্ডগুলো হয়তো এটারই বীভৎস প্রমাণ দিচ্ছে। এগুলো বহির্বিশ্বে শিরোনাম হচ্ছে, যা একটি দুঃস্বপ্নের ধারণা সৃষ্টি করছে। শেখ হাসিনাকেও ওই দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়ায় বলে বলা হয়ে থাকে। সেটা হল- দেশে নিজের শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করার পর, কোনোভাবে হয়তো তার পতন ঘটাবেন অনধিকারচর্চাকারী বিদেশীরা। সরকার সম্প্রতি হত্যাকাণ্ডগুলোর জন্য দোষারোপ করছে বিএনপি ও জামায়াতকে। একইসঙ্গে তারা আইএস ও আল কায়দা দায়ী হওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করছে। কেননা তারা বাংলাদেশে ইসলামপন্থী উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে নিজেদের সর্বোত্তম সুরক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। তবে বহির্বিশ্বের অনেকের শংকা উগ্রপন্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে।