একটি গণভোট তছনছ করল একটি সাম্রাজ্যকে

0

একটি গণভোট শুধু বৃটেনকেই নয়, গোটা ইউরোপীয় রাজনীতি, কূটনীতি ও অর্থনীতির হিসাব-নিকাশকে এলোমেলো করে দিয়েছে। বাকি বিশ্বকেও কম চমকে দেয়নি এ গণভোট। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন-এর নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তিনিও ক্যামেরনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। এখন একটি আগাম নির্বাচন এবং সেই সঙ্গে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক লন্ডন মেয়র বরিস জনসন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে এবং বিচারমন্ত্রী মাইকেল গোভের নাম আলোচনায় এসেছে। স্কটল্যান্ডে ইতিমধ্যে দ্বিতীয় গণভোটের কথা উঠেছে। বৃটিশ পাউন্ডের অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। আর খোদ ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইইউ’র প্রভাবশালী রাজধানীগুলোতে নানামাত্রিক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

৭২ শতাংশ মানুষ গণভোটে অংশ নেন। আর ৫১ দশমিক ৯ ভাগ ভোট পড়ে বৃটেনের ইইউ ত্যাগের পক্ষে, যা অনেকের মতে বৃটেনের স্বাধীনতার স্বপক্ষে এক গণরায়। নির্বাচনী পরাজয় মেনে নিয়ে মিস্টার ক্যামেরন কিছুটা নাটকীয়ভাবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে স্ত্রী সামান্থাকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। গণভোটের আগেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মিস্টার ক্যামেরনের টোরি দলীয় নয় মন্ত্রী এবং ১৩৭ এমপি তার নিজের পক্ষ ত্যাগ করেছেন। ক্যামেরন তার বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি মনে করি না বৃটেনকে পরবর্তী গন্তব্যে নিয়ে যেতে চালকের ভূমিকায় থাকা আমার জন্য ঠিক হবে’।

পদত্যাগের আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে তিনি শলাপরামর্শ এবং তাকে সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করেন। উল্লেখ করা যায় যে, ক্যামেরনের পদত্যাগের সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। সম্পূর্ণ নৈতিকতার কারণে তিনি পদত্যাগ করেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, গণভোটের ফল প্রকাশের পর বৃটিশ পাউন্ডের অস্বাভাবিক দরপতনে বৃটিশ জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এ মুহূর্তে তিনটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে।

এক. বৃটেনকে এক রাখা সম্ভব হবে কি না

দুই. পাউন্ডের দরপতন ঠেকানো যাবে কি না

তিন. শত শত বছরের বৃটিশ ঐতিহ্যকে ধরে রাখা যাবে কি না।

শরণার্থী সমস্যাটাও এখন প্রকটভাবে উঠে এসেছে। আর এ সমস্যাটিই গণভোটে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলে। তবে সবাই একবাক্যে বলছেন, এটা গণতন্ত্রের বিজয়। এখানে ফ্লোর ক্রসিং কোনো সমস্যা হয়নি, কনজারভেটিভ এবং লেবার পার্টি, দুই দলের লোকজনই উভয়পক্ষে ছিলেন।

ওদিকে ইইউ থেকে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার বিধানে লেখা আছে লিসবন চুক্তির ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে। আর এই চুক্তিবলেই ইইউ গঠিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে। আর এটা প্রয়োগ করেই বৃটেনের একটি পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বেরিয়ে আসতে আগামী দুই বছরের ক্রান্তিকালের প্রক্রিয়াটি ততটা মধুর না হয়ে কিছুটা তিক্ততা দেখা দিতে পারে।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বৃটিশ বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে সরব ছিলেন। বিশেষ করে রেস্টুরেন্টের মালিকরা। তাদের ধারণা, বৃটেন যদি ইইউ থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে তারা লাভবান হবেন। কিন্তু যাদের হাতে নেতৃত্ব যাচ্ছে তাতে করে বাংলাদেশীরা লাভবান হবেন কিনা এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

এখানে বলে রাখা ভালো, দশম শতাব্দীতে গড়ে ওঠা কিংডম অব ইংল্যান্ড ১৭০৭ সালে যুক্তরাজ্যে রূপান্তরিত হওয়া পরবর্তী ৩০৯ বছরে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষের দেশটি ইতিহাসে এই প্রথম স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব জড়িত এমন একটি গণভোটে অংশ নিলো। আর যে গণভোটের ফলাফল বৃটেনের ভবিষ্যতকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। ২৩শে জুনকে বৃটেনের ইতিহাসে একটি লাল হরফে লেখা দিন বলা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই ইউকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্টির নেতা নাইজেল ফ্যারাজ ২৩শে জুনকে স্বাধীনতা দিবস বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

গণভোটে ত্যাগের রায়

ঐতিহাসিক এই গণভোটে ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৭৪২ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ জন। ভোটে অংশ নিয়েছেন ৩ কোটিরও বেশি ভোটার।

লন্ডন ও স্কটল্যান্ডের ভোটাররা ব্যাপকহারে ইইউতে রয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষ বিপুলভাবে সরে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। আর উত্তর ইংল্যান্ডেই মানুষ বেশি। ওয়েলস ও ইংলিশ-শায়ারের ভোটাররাও ইইউ ছাড়ার পক্ষে বিপুল হারে ভোট দিয়েছেন।

এ গণভোটে অংশগ্রহণার্থীর সংখ্যা গত সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও ছিল বেশি।

পদত্যাগের ঘোষণা ক্যামেরনের

গণভোটের ফল আসার পরই আবেগি বক্তব্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এ সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী সামান্থা ক্যামেরন। ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘ব্রেক্সিট নামের বিরূপ পানিতে আমি আর রাষ্ট্র নামের এই জাহাজের ক্যাপ্টেন হতে পারবো না’। এভাবেই তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২৩ মিনিটে ক্যামেরন যখন ডাউনিং স্ট্রিটে বেরিয়ে আসেন তখন তাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি স্বীকার করে নেন, দেশ চালাতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। আবেগ সংবরণ করে তিনি নিজেকে সামলে নেন। আবার বক্তব্য দেন। বক্তব্য শেষ হতেই স্ত্রী সামান্থার হাত ধরেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে তা এড়িয়ে সোজা কালো দরজা দিয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের ভিতরে চলে যান। ব্রেক্সিট ভোট বিজয়ী হওয়ায় ক্যামেরনের প্রতিক্রিয়ার জন্য গতকাল সকাল থেকেই বিশ্ব মিডিয়ার সাংবাদিকরা জড়ো হতে থাকেন ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে। তাদের মধ্যে অসংখ্য প্রশ্ন জমা হতে থাকে ডেভিড ক্যামেরন কী ঘোষণা দিতে পারেন তা নিয়ে। এ সময় মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে থাকে টিভির হেলিকপ্টার। ১০ ও ১১ ডাউনিং স্ট্রিটে তখনও উড়ছে দুটি ইউনিয়ন পতাকা। ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে ডেভিড ক্যামেরন বললেন, আমি এই দেশকে ভালোবাসি। এর সেবা করতে পেরে নিজেকে সম্মানিত মনে করছি। আমাদের একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী থাকা উচিত এখন।

কে হবেন পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী?

ক্যামেরনের পদত্যাগের ঘোষণার পর কে হবেন পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তা নিয়ে চলছে জল্পনা। প্রচারণা চালানোর সময় ক্যামেরন বলে আসছিলেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়বেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের ঘোষণাই দিলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। এবার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কে হবেন তাহলে পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী?

প্রত্যাশিতভাবেই ফেভারিট তালিকার শীর্ষে আছেন লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসন। এই প্রভাবশালী রাজনীতিক এবার ইইউ ছেড়ে বৃটেনের চলে যাওয়ার পক্ষে (ব্রেক্সিট) ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন।

বলতে গেলে ব্রেক্সিট প্রচারণার মূলব্যক্তিই হয়ে ওঠেন বরিস জনসন। পুরো লড়াইটা হয়ে দাঁড়ায় তার ও প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের মধ্যে! ব্রেক্সিটের আগে থেকেই অবশ্য তাকে রক্ষণশীল কনজারভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। এমনকি তাকে হবু প্রধানমন্ত্রী বলতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি অনেকে। ব্রেক্সিট প্রচারণায় অবদান ও প্রভাবের দরুণ তার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আরো উজ্জ্বল। কনজারভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রকৃতপক্ষে তারই বেশি। কিন্তু প্রচারণার সময়, তিনি কিছু অসমীচীন কাজ করেছেন, যা তার সম্ভাবনার ক্ষতি করতে পারে। এরপরও জনমত জরিপ থেকে শুরু করে জুয়াড়িদের বাজিতেও অন্যদের তুলনায় বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে আছেন বরিস জনসন। এছাড়া আছেন অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্ন। যদিও দলীয় প্রভাবের দিক থেকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। ইইউতে রয়ে যাওয়ার পক্ষে তার মতো প্রচারণা চালিয়েছেন যে প্রভাবশালী নেতারা, তারাও কনজারভেটিভহোম জনমত জরিপে ভালো করেননি। এ তালিকায় আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে এবং বিচারমন্ত্রী মাইকেল গোভ। থেরেসা মে’কে গণভোটের আগেও অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রার্থী ভাবা হতো।